মাইগ্রেন

মেঘনা চট্টোপাধ্যায়

লাটাইয়ে হ্যাঁচকা মারতে একটু বেশিই নীচু হয় উত্তীয়; ঠিক যে লেভেলে এসে বাঁদিকে হালকা ঘাড় ঘোরালে কৃষ্ণচূড়ার ফাঁকে মিঠিদের ব্যালকনিটা চোখে পড়ে। প্রত্যেক রথের দিনই অভিরূপদের ছাদে তুমুল ঘুড়ি ওড়ায় বন্ধুরা। উত্তীয়ও আসে - ঘুড়ির টানে নয়, মিঠিকে অনেকক্ষণ দেখা যাবে বলে। মিঠি ওদের ক্লাসেই পড়ে। আর ওর কৈশোরে রঙধনু ছড়ায়। উত্তীয় জানে, আজ সারাদিন ব্যালকনিতে বসে ছবি আঁকবে মিঠি, কানে ইয়ারফোন গুঁজে রেডিও শুনবে আর কখনো সখনো অভিরূপদের ছাতের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসবে। ক্লাস সেভেন থেকেই চলছে এই চোখের ব্যায়াম। এবারেই শেষ। সামনে উচ্চমাধ্যমিক। তারপর কে যে কোথায়...। মিঠি যা ব্রিলিয়ান্ট - এই ছোট্ট মফস্বল শহর ছেড়ে ও তো চলেই যাবে। চোখদুটো করকর করে ওঠে। একবার আড়চোখে ব্যালকনিটা মেপে নিয়েই ঘুড়ি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে। যা যা, যতদূর যাবি যা...!

মিঠি আসলে খুবই লক্ষ্মী মেয়ে। কোনদিন কখনো এতটুকু জেদ, বায়না, অন্যায় আবদার করেনা সে। কিন্তু শুধু আজকে তার ভীষণ ইচ্ছে করছে অভিরূপদের ছাতে গিয়ে ঘুড়ি ওড়াতে। মা কে বললে মা কি খুব বকবে মিঠিকে? ভাবতে ভাবতেই মা এসে পড়লো প্লেটে একটুকরো পুডিং নিয়ে। মিঠি তড়াক করে লাফিয়ে উঠে মার গলা জড়িয়ে চুমুটুমু খেয়ে একসা। মা ছাড় ছাড় বলে হাসতে লাগলেন। সেই ফাঁকে আবদারটা পেশ করেই ফেললো মিঠি। মায়ের মুখ থমথমে। একঝলক অভিরূপদের ছাতের দিকে তাকিয়েই চোখটা সরিয়ে নিলেন। তুঝে সব হ্যায় পাতা মেরি মা...। অথচ উলটো মুখে একটা ট্রেন ছুটছে ভীষণ গতিতে। পুরনো হলুদ রঙের দোতলা বাড়ি, ঘুড়ি, লাটাই, আঠা জ্বাল দেওয়া বাটি, লোহার বড় হামানদিস্তায় টিউবলাইট,শিশিবোতল গুঁড়ো, রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট এ জড়িয়ে রাখা রঙিন মাঞ্জাসুতো। দীপুদা,আমার হাতে একটু দিবি? কী রে? লাটাই! নে না... আমার লাটাই তো তোরই হাতে মণি... সাবধানে ওড়াস... ভেসে না যাই। বুকের ভেতর মধুপর্কের বাটি ঘিরে লাখে লাখে লাল পিঁপড়ে। দূর দূর! অঘ্রাণ এলে কে আর মনে রাখে আষাঢ়ে মেঘের নাম! চোখে বুঝি বালি পড়ে মণীষার। আঁচলে ভাপ দিতে দিতে মেয়েকে বলে, " যাও, কিন্তু দেরী করোনা একদম। টুপি, ছাতা,সানগ্লাস, জলের বোতল নিয়ে যাও। ছায়ায় বসবে। হুড়োহুড়ি করবে না। মাইগ্রেনের ব্যথা বাড়লে কিন্তু...।"

ফেসবুক মন্তব্য