কবিতা

অঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়

সন্ধের মুখে রবিদা এল মেয়ের বিয়ের নেমন্তন্ন করতে। মা বসার ঘরে বসে জোরে জোরে কাগজ পড়ছিল। রবিদাকে দেখে থমকে গেল। রবিদা এগিয়ে এসে কার্ডখানা মার হাতে দিয়ে সবিনয়ে বলল, আসবেন মাসিমা।
বিয়ের ব্যাপারে মার আগ্রহ দেখার মত! মানবজীবনে বিয়ের চেয়ে আনন্দজনক, উত্তেজনাময় এবং আকর্ষণীয় ঘটনা মার কাছে দ্বিতীয়টি নেই। কার্ডখানা হাতে নিয়ে একগাল হেসে রবিদাকে পাশের চেয়ারটায় বসতে বলে। লাখ কথা নইলে বিয়ে হয় না। সেই লাখ কথার দরজা অবারিত করে দেওয়া লালরঙা কার্ডখানা সযত্নে টেবিলের ওপর রাখে মা। আপাতত ওটা না দেখলেও চলবে। আসল মানুষ যেখানে হাজির সেখানে সরাসরি লাখ কথার সূচনা করে ফেলাই সঙ্গত।
কার বিয়ে?
রবিদা হেসে বলে, আমার ছোট মেয়ে কাজরীর মাসিমা!
ও! বয়স কত?
কাজরী কলাম্বাস ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়। ওখানকারই আমেরিকান কলিগ মার্ককে বিয়ে করছে। বস্তুত দু বছর লিভ-ইন করার পর ধরে নেওয়া যেতে পারে ওদের তথাকথিত বিয়ে হয়ে গেছে, এখন দেশে আসছে বলে বাবা-মা সামাজিক একটা অনুষ্ঠান করছে মাত্র! এতসব তথ্য মার জানার কথা নয়, বোঝার তো নয়ই! তাই মার প্রথাগত প্রশ্নের উত্তরে মেয়ের প্রথাবিবর্জিত কার্যকলাপ সম্বন্ধে বলতে রবিদা বেশ অস্বস্তি বোধ করে। কাঁচুমাচু স্বরে বলে, এই শ্রাবণে তিরিশ হবে।
আর ছেলে?
মার্ক কাজরীর চেয়ে দু বছরের ছোট। আজকাল কেউ এসব ধরে না। ওদের জীবন, ওরা সুখী হলেই হলো। কিন্তু মা সে যুগের মানুষ, তাঁর ধ্যানধারণা আলাদা। রবিদা শুকনো মুখে বলে, ওই একই বয়েসী।
কী করে?
দুজনে একই কলেজে পড়ায়। মার্ক ওদেশের ছেলে।
অ, ইংরেজ? তা, বাপ-মা জীবিত?
ইংরেজ আর আমেরিকানের তফাতের মধ্যে না গিয়ে রবিদা বলে, হ্যাঁ মাসিমা, তাঁরা দুজনেই বর্তমান। তবে কলাম্বাসে না, পিটসবার্গে থাকেন।
ও! তার মানে শ্বশুর-শাশুড়ির দায় নেই।
রবিদা নিজেকে আরো অপরাধী বোধ করে ।
ভাইবোন?
আছে, আছে, এক বোন আছে।
এতক্ষণে মার্ককে একটা বড় রকম মার্কা দিতে পেরে রবিদা উৎফুল্ল। মার জেরা শুনে আর থাকতে পারি না। রান্নাঘর থেকে এসে বলি, বিয়েতে তো যাবেই মা! তখন নয় সব জেনে নিও। এখন ওঠো, সন্ধে দেবে না?
কটা বাজে?
ছটা বাজতে চললো। এরপর কিন্তু তোমার মহাপ্রভু শুরু হয়ে যাবে!
মা শশব্যস্তে ঠাকুরঘরের দিকে পা বাড়ায়। মহাপ্রভুর সঙ্গে টক্করে রবিদার জেতার কোনও চান্স নেই!

পরদিন দুপুরে খাবার টেবিলে বলি, আচ্ছা মা, কাল রবিদাকে অত প্রশ্ন করছিলে কেন?
মা অসন্তুষ্ট স্বরে পাল্টা প্রশ্ন করে, কেন, তাতে হয়েছেটা কি?
না, বলছি মেয়ের বিয়ে, একটা আনন্দের ব্যাপার, খুশি প্রকাশ করো, ব্যস। তা না, যত সব হাঁড়ির খবর জানতে চাইছিলে... কি দরকার আমাদের?
বাঃ বিয়ে হচ্ছে, কুটুমরা কেমন জানতে হবে না?
কেন? তুমি কি তাদের সঙ্গে লৌকিকতা করতে যাবে?
তা বলে চুপ করে বসে থাকব? কথা বলব না?
কথা মানে কি খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে গুষ্টির খবর নেয়া? নিজের কথা বলো। তোমার কি এমনি বলার মত কোনও কথা নেই?
মা রুষ্টমুখে খেয়ে যায়। চাটনি এত ভালোবাসে, আজ চাটনি দিতে গেলে গম্ভীরমুখে না করে দেয়। বোঝা যায়, কথাগুলো একটুও পছন্দ হয় নি।
বিকেলে টিভি দেখছে, সিরিয়ালের বিরতিতে শুনি দীপালির কাছে নালিশ করছে, আমি নাকি কথা বলতে জানি না! এই বয়সে আমাকে ওর কাছে শিখতে হবে কিভাবে লোকের সঙ্গে কথা বলব! দীপালি উত্তর না দিয়ে অ্যাড দেখে যায়, মা গজগজ করে যায় আর আমি ঘরে বসে নিজের কাজ করে যাই।
এর দিন কয়েক বাদে আমার ননদ ইতুর ছেলে রাণা এসে হাজির। সদ্য ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করে ব্যাঙ্গালোরে চাকরি নিয়ে গেছিল, এই প্রথম ছুটি নিয়ে বাড়ি, ওরই একফাঁকে মামীর সঙ্গে দেখা করতে আসা। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করায় মা যারপরনাই প্রীত। বেশ, বেশ! কি পড়ছ?
পড়ছি না দিদুন, চাকরি করছি!
ওমা তাই! এই তো সেদিন জন্মাতে দেখলাম! এত বড় হয়ে গেলে!
আদর করে পাশে বসায়। নাও প্রসাদ খাও। একটা বাতাসা হাতে তুলে দেয়।
কোথায় আছ এখন তুমি?
ব্যাঙ্গালোর।
বিয়ে করেছ?
রাণা হেসে ওঠে, না দিদুন!
একাই থাকো?
একটা ফ্ল্যাট নিয়েছি, দুজন বন্ধু মিলে থাকি।
আর মা-বাবা এখানে?
হ্যাঁ।
তোমাদের ওই বাড়িটা বিক্রি হলো?
এখনও হয়নি।
তোমার কাকার খবর কি? ওই বাড়িতেই থাকে এখনও?
হ্যাঁ দিদুন।
আবার কি একটা জিগেস করতে যাচ্ছিল, জলখাবারের প্লেট নিয়ে আমি ঢুকতেই চট করে কথা পাল্টে দেয়। আ-র কি বলব, কিছু মনে থাকে না...একেবারে অকর্মণ্য হয়ে গেছি। না শুনি কানে, না দেখি চোখে, না পারি কিছু খেতে, না কোথাও যেতে। এই একখানা ঘরের মধ্যে চব্বিশ ঘন্টা। একটু কাগজ পড়ি নয়তো টিভি দেখি। শরীরের জোর কমে গেছে, এঘর থেকে ওঘর যেতে হাঁপিয়ে যাই...
রাণা মুখে আগ্রহ মাখিয়ে শোনে। আমি বলি, নে চল্ টেবিলে বসে খাবি। এখানে হাতে নিয়ে খেতে অসুবিধে হবে।
দুপুরে খাবার টেবিলে কথাটা পাড়তে বাধ্য হই। লোককে সবসময় নিজের কষ্টের কথা বলো কেন? কার ভালো লাগে? বয়স হলে এসব তো থাকবেই। বরং ভাবো কেমন খালি চোখে পড়তে পারছ, সুগার নেই, ইচ্ছে মত মিষ্টি খাচ্ছ, ঘুমের ওষুধ ছাড়া ঘুমোচ্ছ। এসব কম কথা?
মা রাগতস্বরে বলে, ও, এটাও দোষের হলো? তুই তো বললি সেদিন, নিজের কথা বলো। এগুলোই আমার নিজের কথা! ঠিক আছে যা! আমি আর কারো সঙ্গে কথাই বলব না, হোলো?
মনে মনে প্রমাদ গণলাম। বললাম, তা কেন? তোমাকে বাদ দিয়ে কি এবাড়িতে কেউ আসে না আসতে পারে? বরং এক কাজ করো, কেউ এলে না... তুমি কবিতা বোলো।
মা ভাবে ঠাট্টা করছি। তির্যকভাবে বলে, সে-ই, বাড়িতে কেউ এলো আর আমি কবিতা বলতে শুরু করব!
হেসে বলি, তা না, সেই যে একবার আমার বন্ধু মীরা এসে জিগেস করেছিল না তুমি কেমন আছ আর তুমি বলেছিলে - হাল ছেড়ে আজ বসে আছি আমি...
তোতাপাখির মত মা ধুয়ো ধরে, ছুটিনে কাহারো পিছুতে, মন নাই মোর কিছুতেই নাই কিছুতে!
মনে আছে? মীরা এখনও সে গল্প করে! আরেকবার কানাডার মলিদি-মলিদির বর কলকাতাকে নিন্দে করছিল, মনে আছে কি বলেছিলে?
মা স্কুলবালিকার মত সলজ্জ হেসে বলে, যত বড় হোক ইন্দ্রধনু সে সুদূর আকাশে আঁকা, আমি ভালোবাসি মোর ধরণীর প্রজাপতিটির পাখা।
বড়পিসাইকে কিন্তু কলকাতা সম্বন্ধে উল্টোকথা বলেছিলে।
কি বলতো? ইঁটের টোপর মাথায় পরা শহর কলকাতা?
উঁহু... ওটা না...
মা বলে ওঠে, ও হ্যাঁ মনে পড়েছে, ইটের পরে ইট মাঝে মানুষকীট নাইকো ভালবাসা নাইকো খেলা।
তবে? তোমার তো রবীন্দ্রনাথ মুখস্থ!
মার মুখে যুগপৎ অবিশ্বাস ও আনন্দ। সুদীর্ঘ সংসারজীবনে কবিতা বলার জন্য কেউ তাকে বাহবা দেয় নি!
আমাদের খাবার টেবিলের কাব্যসভাটি বেশ জমে ওঠে।
সেদিন মা শেষপাতে চাটনি খায়নি ঠিকই তবে রাগের বশে নয়, কবিতার আবেশে।

ফেসবুক মন্তব্য