চিঠি

অপরাজিতা ভট্টাচার্য

অনেক বছর তো হল এই বারান্দায় যাতায়াত। প্রয়োজন মূলতঃ ভেজা জামা কাপড় শুকোতে দেওয়া। সেই সুবাদে মাথা সামান্য উঁচু করে আকাশ দেখে নেওয়া। কিছুই নয়। মুম্বইতে আজকাল গরম কাল বেশ আর্দ্র এবং তাপমাত্রাও বেশ বেশি থাকে। সামুদ্রিক কড়া রোদ ঝলমল সারাদিন। বর্ষাও প্রফেশানাল। আসা যাওয়ার সময় মাপা। অকাল বর্ষণে ভেজায় না। শীতকাল বলে সেভাবে কিছু নেই। এই তিনটে ঋতুর যাওয়া আসা খুবই প্রেডিকটেবল। পুবমুখী পেল্লাই বারান্দা। সকালের সহজাত টানে শহুরে অভ্যেসে যতটুকু চোখ যাবার কথা ততটুকুই। ওয়াশিং মেশিন থেকে তুলে আনা আধ শুকনো জামা কাপড় গুলোকে মেলবার সময় একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে নিলে নিজেকে কেমন যেন অ্যামেচার আবহবিদ মনে হয়।

মায়ানগরীতে সূর্য ওঠে দেরিতে। সকাল সাতটা নাগাদ রোদ কড়া হয় না। কাপড় বোঝাই বালতি নিয়ে এসে দাঁড়ানো বারান্দায়। সকালের এই রোদটা হাড়ে ভিটামিন ডি তৈরির জন্য খুব ভাল। মা থাকলে বসিয়ে রাখতাম রোদে দিকে পিঠ করিয়ে। এর বেশি কিছু ভাবি নি কোনদিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে। ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি মা, ঠাকুমা কাপড় মেলার সময় মুখটা ওপরের দিকে থাকত। হয়ত তাকাতেনও না আকাশের দিকে। দড়ি উঁচুতে থাকত বলে মনে হত আকাশের দিকে দেখে নিলেন বুঝি। ছোটবেলার অনুকরণপ্রিয়তাই হয়ত অবচেতনে থেকে গেছে। নয়ত বারান্দার তারে কাপড় মেলার জন্য আকাশের দিকে রোজ চোখ যাবার দরকার হয় না বর্ষাকাল ছাড়া। মানে আদৌ রোদ উঠবে কি না বা বৃষ্টি কমবে কি না এইসব। বিকেলেও জামা কাপড় ঘরে আনার সময় কিন্তু রোজ তাকাই আকাশের দিকে। খুব যে কিছু খেয়াল করি তেমনটা নয়। এও বোধ হয় সেই অনুকরণপ্রিয়তারই রেশ।

এরই মধ্যে বিকেলের বারান্দায় এল তোমার চিঠি। এতটাই অনভিপ্রেত এবং অকস্মাৎ যে বুঝে উঠতে পারি নি প্রথমটায়। চিঠিতে বলেছিলে আকাশ দেখতে শেখাবে। হাই রাইজের বারান্দায় সুরক্ষার জন্য হাফ এবং ফুল দু প্রস্থ রেলিং দেওয়া আছে। জীবন বিপন্ন হবার প্রশ্ন নেই। আকাশ বলতে রেলিঙের রকমারি খোপে আঁটা টুকরো টুকরো নীল বা ধূসরের কোলাজ। রোদ বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া ছাড়া আর কোন এফেক্ট তাতে হয় বলে আমার জানা নেই। আমি সত্যি তাই সামান্য হলেও হকচকিয়ে গেছিলাম। কি দেখতে হয় আকাশে। সপ্তর্ষিমণ্ডল, কালপুরুষ, ধ্রুবতারা, শুকতারা, পূর্ণিমা, অমাবস্যা সবই তো দেখতে জানি। কোন দিকে তাকালে কী দেখা যায় তাও। তাহলে আকাশ চেনা কাকে বলে! কী দেখতে হয় আকাশে?

স্কুলে বিভিন্ন বিষয়ের এক একটা অধ্যায় শুরুর আগে দিদিমণিরা ভূমিকা উত্থাপন করতেন এমন ভাবে যে আমরা ছাত্রীরা অধীর আগ্রহে বসে থাকতাম পরবর্তী আলোচনা শোনার জন্য। ভূমিকাগুলো ধরতাইয়ের মত কাজ করত। সেই ধরতাইয়ের হাত ধরেই পরের ক্লাস গুলোতে একটু একটু করে গ্রুমিং হত অধ্যায়ের সঙ্গে। ডুব দিতাম আমরা।

কিছুটা তেমনই পরের চিঠিতে আকাশ চেনার প্রথম পাঠ পাঠালে। দ্বিতীয় এই চিঠি এল যখন তখনও আমি বিকেলের বারান্দায়। তাতে ঠিক যে আকাশ সম্পর্কে খুব বেশি কিছু লিখেছিলে এমনটা নয়। শুধু একটা টান রেখে দিয়ে গেলে, বলে গেলে পরে আবার। আমি তারপর থেকে দুবেলা জামাকাপড় মেলা তোলার ফাঁকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকি বহুক্ষণ। তোমার চিঠি কখন এসে চেনাবে আলাদা আকাশ।

লাগোয়া ফ্ল্যাটটাতেও এক বাঙালি পরিবার থাকে। একটা মেয়ে দেখি ওদের বারান্দায় ঘুরে ঘুরে ফোনে কারো সঙ্গে কথা বলে রোজ বিকেলবেলা। এতকাল সেভাবে কানে আসে নি কথোপকথন। এখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকি বলে কিছু কিছু কথা কানে আসে। মনে হয় কাউকে ওর লেখা কবিতা পড়ে শোনায়। সুজন হবে বা। রাস্তার গাড়ি চলার শব্দে ভাল করে পুরোটা বোঝা হয়ে ওঠে না। কিন্তু কিছু কিছু শব্দ কানে আসে। কথা বলার সময় অদ্ভুত এক দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ে ওর মুখে। বিহান শুনি, বন্ধু শুনি, ব্রীড়া, বিষ, ব্যবধান। ব দিয়েই কত কত শব্দ আমি আমার বারান্দা থেকে শুনি। জামাকাপড় মেলা তোলার মত রোজকার কাজগুলোতে যাপনের ক্লান্তি আসে। শিখেছি ওর থেকেই। তাতে নাকি আঙুল বরফ আড়ষ্ট হয়ে যায়। নবীকরণ দরকার হয়। কিন্তু এতকাল কাজগুলো করতে করতে ক্লান্তি সত্যি এসেছে কিনা আলাদা করে ভেবে দেখি নি। শরীরের বায়োলজিক্যাল ক্লকে স্নান খাওয়া ঘুমের পাশাপাশি নিত্যকাজ গুলোর অ্যালার্ম সেট করা থাকে বৈ কি। সেই অদৃশ্য টিকটিকেই তো চলতে থাকি আমরা। তাহলে ক্লান্তি কিসে আসে? স্পষ্ট হয় না।

ওপার থেকে কিছু ভেসে আসার পর মেয়ের মুখ আলো হয়ে ওঠে। তোমার চিঠি আসে না। আমার কিছু এগোয় না। আমার মুখ কালো দেখায় হীনমন্যতায়। তারপর আমরা দুজনেই যে যার ঘরে ঢুকে যাই। প্রায় রোজই চলে এমন করে। আমি রোজ ঐ নীল বা ধূসর টুকরোগুলোকে মুছে ফেলে আকাশ দেখতে চেষ্টা করি। পারি না। কোলাজ দেখি। আবার চেষ্টা করি। থাকি স্থির, মগ্ন, যখন শব্দেরা ঢোকে পড়শি বারান্দা থেকে। ক্রমশঃ বুঝতে পারি চেয়ে থাকার, অপেক্ষার অভ্যাস তৈরি হচ্ছে আমার বারান্দা থেকে।

এমনি এক বিকেলে মেয়ের মুখে ঝড়। বারান্দায় পায়চারির গতি বেড়ে গেছে। এত তাড়াতাড়ি কথা বলে চলেছে ফোনে যে ঠিক ধরতে পারছি না। এটুকু বুঝতে পারছি যে আজ কবিতা বলছে না। বড়ই উত্তেজিত স্বরপর্দা। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার পর ক্ষুধার্ত বাঘিনীর মত চেঁচিয়ে উঠল মেয়ে “ইউ বাস্টার্ড“। ব দিয়ে শব্দ বাস্টার্ড। আমার কান লাল হয়ে ওঠে। আমাদের বারান্দা থেকে সূর্যাস্ত দেখা যায় না, পুবমুখী। কিন্তু সূর্যাস্ত হয়েছে সদ্য। মেয়ের মুখেও সূর্যাস্ত। দেখতে শিখেছি আকাশ চিনতে গিয়ে। আমি সবে ধীরে ধীরে মেয়ের থেকে শুনে শুনে কিছু কিছু কথা জমানোর চেষ্টা করছি। ব্যূহ, বিচ্ছেদ, বিবর্তন, ব্যাপ্তি, ব্যোম এইসব। কবিতা তো আমি লিখতে চাই না। পারবোও না জানি। আমি তো আকাশ চিনতে চাই।

তোমার চিঠি আসে না। কিন্তু আমি বেশ বুঝতে পারছি রেলিঙের জ্যামিতিক ভাঁজগুলো খুলে যাচ্ছে ক্রমশঃ। রেলিং নেই। সামনে কোন হাই রাইজ নেই। ন্যাড়া বারান্দা আমার। পড়ার ভয় নেই। মরারও নয়। আকাশ কনভেয়ারের মত ঢালু হয়ে মিশেছে আমার বারান্দায়। লাফ দিতে হবে না। শুধু পা বাড়াও প্রথম ধাপ। তারপর এগিয়ে যাওয়া।

এই ভারহীন পথশ্রমে শ্রান্তি নেই। চরাচর মুছে নিয়ে ওপরে হাঁটতে থাকি। তোমার পরের চিঠি এসেছে হয়ত। প্রথম চিঠির বয়ানটা ঠিক মনে করতে পারি না। কি চেনাবে বলেছিলে! ঘরের মধ্যে আকাশ নাকি আকাশের মধ্যে ঘর! আমি কি ততক্ষণে ছুঁয়ে নিলাম ক্লাউড নাইন? নাকি তুমি চিঠিতে বুঝিয়েছ ইউফোরিয়া! সমাপতন হবে বা।

পড়শি মেয়েটা বোধ হয় কবিতাতে লিখছে এসব।

ফেসবুক মন্তব্য