লাখামণ্ডলের রহস্য

পার্থ প্রতীম চ্যাটার্জী



ষষ্ঠ শতাব্দীর কোনো এক সময়ের কথা। উত্তর ভারতের সিংহপুরা প্রদেশের রাজকুমারী ঈশ্বরা চলেছেন তাঁর স্বামী, জলন্ধরের রাজকুমার চন্দ্রগুপ্তের মৃত দেহ নিয়ে। চলেছেন গাড়োয়াল হিমালয়ের এক গ্রাম "মোরার" উদ্দেশ্যে। লোক মুখে শুনেছেন "মোরা" তে নাকি মৃত মানুষ পুনর্বার জীবিত হয়ে ওঠে। তাই তিনি আশায় বুক বেধেঁছেন যদি রাজকুমার আবার জীবিত হয়ে ওঠেন। জানা যায় না, রাজকুমার চন্দ্রগুপ্তের মৃত শরীরে আবার প্রাণের সঞ্চার হয়েছিল কিনা। কিন্তু এই গ্রামে পাওয়া এক প্রাচীন শিলালিপি থেকে জানা যায় যে রাজকুমারী তাঁর স্বামীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই "মোরা" গ্রামে স্থাপন করে ছিলেন এক শিবমন্দির। সেটাই হয়তো শুরু এই অঞ্চলে শিব মন্দিরের স্থাপনার। এখনো এই গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় খননকার্য্য হলে খুঁজে পাওয়া যায় শিব মূর্তি।

২০১৭ এর সেপ্টেম্বর মাসের এক দুপুর, আমরা কজন উত্তরাখণ্ডের, গাড়োয়াল হিমালয়ের রাস্তা দিয়ে চলেছি যমুনোত্রীর দিকে। মুসৌরির কিছু পর থেকেই যমুনা নদী আমাদের সঙ্গী হয়েছে। এক স্বর্গীয় আনন্দে মন ভরে যাচ্ছে, ভাবতেই পারছি না কি দেখছি। যে যমুনা নদীকে আমরা সমতলে প্রায় এক দূষিত নালাতে পরিণত করেছি, সেই নদী এত সুন্দর, এত অপরূপ, এত স্বচ্ছ ও পরিষ্কার যে ভাষায় প্রকাশ করা যাবেনা। ১৫০ কিমি এর মতো রাস্তা ইতিমধ্যেই পেরিয়ে এসেছি। রাত্রিবাসের কথা আরো প্রায় ৬০-৭০ কিমি দূরের রানাচটিতে। হিসাবমতো এর পরের হল্ট আরো ২৫ কিমি দুরে, বারকোটে, যেখানে আমাদের ID card এর জন্য registration করতে হবে। হঠাৎ আমাদের গাড়ির চালক রমেশজি, প্রধান রাস্তা ছেড়ে বাঁদিকে যমুনা নদীর সেতু পার করে অন্য এক রাস্তা ধরে নিলেন। কারণ জিজ্ঞেস করতে বলে উঠলেন - "সাব, ইঁহা এক বহুত পুরানা শিব মন্দির হ্যায়, আপলোগকো আচ্ছা লাগেগা, অউর বহুত আচ্ছা ফটো ভি মিলেগা"।


( যমুনা নদী )


নদী পার হয়ে পাকদন্ডী বেয়ে বেশ কিছুটা উপরের দিকে প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট চলার পর, গাড়ি এসে পৌঁছলো পাহাড়ের কোলে অবস্থিত এক অপরূপ জনপদে। নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে যমুনা নদী আর চারিদিকে মনোমোহিনী সৌন্দর্য্য নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে গাড়োয়াল হিমালয়। দূরে দেখা যাচ্ছে যমুনা বা কালিন্দীর উৎসস্থল বান্দরপুচ্ছ পর্বতমালা। মনটা আনন্দে ভরে উঠলো। রমেশজি ঠিকই বলেছিলেন ছবি তোলার প্রচুর রসদ আছে এখানে। চোখ ফেরানো যাচ্ছে না এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থেকে। নিজের অজান্তে কখন যে ব্যাগের ভিতর থেকে ক্যামেরা বেরিয়ে এসেছে বুঝতেই পারিনি।


( লাখামন্ডলের বর্তমান মন্দির )


জনপদটির নাম লাখামণ্ডল। পেয়ে গেলাম এক স্থানীয় গাইডও। তাকে সঙ্গে নিয়ে পাহাড়ি রাস্তায় প্রায় ২০০ মিটার উপরের দিকে হাঁটার পর এসে পৌঁছলাম এক অপরূপ শিব মন্দিরে। এই জনপদের ইতিহাস বলতে গিয়ে গাইড ভদ্রলোক আমাদের বললেন, স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী এখানেই নাকি ছিল মহাভারতের বিখ্যাত জতুগৃহ বা লাক্ষাগৃহ। দুর্যোধন নাকি পাণ্ডবদের পুড়িয়ে মারার জন্য জতুগৃহ তৈরী করেছিলেন এই জায়গায়। এই তথ্যের উল্লেখ আমি পেয়েছি, শ্রী গনেশ শৈলী-র লেখা "গাড়োয়াল হিমালয়" বইটিতেও। যদিও এই তথ্যের সপক্ষে অনেক খুঁজেও আর কোনো বিশ্বাসযোগ্য যুক্তি পাওয়া যায় না। গাড়োয়াল হিমালয় জুড়ে রয়েছে মহাভারতের বিভিন্ন কাহিনী, মনে হয় তাই, কোনো ভাবে “লাখামন্ডলের” সঙ্গে জুড়ে গেছে “লাক্ষাগৃহ”।

লাখামন্ডল নামটির উৎপত্তি সম্মন্ধে বিভিন্ন তথ্য খুঁজতে গিয়ে যেটি আমার যুক্তিপূর্ণ মনে হয়েছে সেটি হলো, "লাখা" মানে "লক্ষ্য" বা “অনেক” এবং "মন্ডল" অর্থাৎ "মন্দির"। অর্থাৎ কোনো এক সময় এই অঞ্চলে ছিল অনেকগুলি মন্দির। এই যুক্তির সঙ্গে ভারতীয় পুরাতত্ব বিভাগের তথ্যও মেলে। পুরাতত্ব বিভাগের তথ্য অনুযায়ী এই অঞ্চলে খনন করে অনেক শিব মন্দির খুঁজে পাওয়া গিয়েছিলো আর তাঁদের মতে এই শিবমন্দিরগুলির বেশিরভাগই তৈরী হয়েছিল পঞ্চম শতাব্দী ও অষ্টম শতাব্দীর মধ্যে| হয়তো এই অসংখ্য শিব মন্দিরের জন্যই এই স্থানের নামকরণ হয় "লাখামন্ডল"।

বর্তমানে যে মন্দিরটি দেখতে পাওয়া যায় সেটি দ্বাদশ শতাব্দী নাগাদ তৈরী হয়েছিল। এই মন্দিরটি এক বিশাল পরিসর জুড়ে অবস্থান করছে। মন্দিরটির বাম পাশে এক বেদিতে রয়েছে এক বিশাল শিবলিঙ্গ। এই শিবলিঙ্গটি পশ্চিমমুখী। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী এই শিবলিঙ্গকে ধর্মরাজের (কোনো কোনো মতে জ্যেষ্ঠ পান্ডব যুধিষ্ঠির) প্রতীক হিসাবে মানা হয়। শিবলিঙ্গটির সামনে রয়েছে দুটি পাথরের মূর্তি, একটি "মানব" আর অন্যটি "দানব"। মানবের মূর্তিটির শিরোস্থানে রয়েছে একটি রত্ন আর দানবের শিরোস্থানে করোটি। কথিত আছে, প্রাচীন কালে মানুষ মারা যাবার পর তার মৃতদেহকে নিয়ে আসা হতো এই মন্দিরে, আর রাখা হতো এই দুই মানব ও দানবের মূর্তির মধ্যে অবস্থিত এক বিশেষ শিলার উপর। মন্দিরের পূজারী মৃত শরীরের সামনে পূজা করার পর, কিছুক্ষনের জন্য হলেও মৃত শরীর পুনর্জীবিত হতো। ধর্মরাজের সভায় বিচারের পর মৃত আত্মার ঠিকানা হতো স্বর্গ অথবা নরকে। এই লাখামন্ডল গ্রামেরই আরেকটি নাম "মোরা"। এই নাম পুনর্জীবনের কাহিনীর সঙ্গে মেলে।



( মানবের মূর্তি ) (ধর্মরাজ) ( দানবের মূর্তি )




( মন্দির চত্তরে অসৎখ্য শিব মূর্তি )


এই মন্দির চত্বরে এখনো রয়েছে ছোট বড় অনেক শিব মূর্তি| প্রধান মন্দির চত্বর থেকে ডানদিকে কিছুটা যাবার পর দেখতে পেলাম গ্রাফাইট পাথরের এক শিবলিঙ্গ। শিবলিঙ্গে জল ঢালতে শিবলিঙ্গের উপর নিজের প্রতিচ্ছবি পরিষ্কার ভাবে ফুটে উঠলো। এই শিবলিঙ্গ সম্বন্ধেও এক অদ্ভুত গল্প জানতে পারা গেলো। প্রায় ৫০ বছর আগে হরি নামক এক ছুতারমিস্ত্রী ঘর বানানোর জন্য খননকার্য্য করার সময় মাটি খুঁড়ে খুঁজে পায় এই শিবলিঙ্গ।



মন্দির চত্বরে রয়েছে এক সংগ্রহশালা, যেখানে পুরাতত্ত্ব বিভাগের অনেক আবিষ্কার রয়েছে। আমাদের দুর্ভাগ্য সেদিন বন্ধ ছিল এই সংগ্রহশালা। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ (Archaeological Survey of India) এখন এই মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছেন। দেখে বেশ বোঝা যায় স্থানীয় অধিবাসী এবং পুরাতত্ত্ব বিভাগের যৌথ সহযোগিতায় বেশ ভালো রক্ষণাবেক্ষণ হয় লাখামন্ডলের। এখানে আবিষ্কৃত শিবলিঙ্গগুলি দেখে মনে হলো সত্যিই আমরা শিবের বাসস্থান শিবালিক পর্বতে এসে পড়েছি। মন্দির ছাড়াও আশপাশের বাড়ির নির্মাণ কৌশল চোখে পড়ার মতো। বেশ কিছু অপূর্ব কাঠের তৈরী বাড়িও চোখে পড়লো। সব মিলিয়ে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। সবাই তো এই রাস্তা দিয়েই যমুনোত্রীর দিকে যায়, কিন্তু খুব কম সংখ্যক লোকেই এই জনপদ দর্শন করেন।




পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, “লাখামন্ডল” বা “মোরা”, হয়তো মানুষকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয়। সে মহাভারতের পাণ্ডবদের লাক্ষাগৃহে মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে যাওয়াই হোক বা মৃত মানুষের কিছুক্ষনের জন্য পুনর্জীবনই হোক।

গাড়িতে উঠে আবার যাত্রা শুরু করার সময় কানে কানে কেউ যেন বলে উঠল:-

"ওঁম ত্র্যম্বকম যজমাহে

সুগন্ধিম পুষ্টি - বার্ধনাম

উর্বরুকমিভা বন্ধনং

মৃত্যের - মক্ষীয় মাম্মৃতা।"

ফেসবুক মন্তব্য