এক সাত পুরনো গল্প

অনিরুদ্ধ সেন

“ঐ ওরা এল – পালা, পালা, পালা!
মেয়েটি ছুটতে শুরু করল। ছুটছে তো ছুটছে তো ছুটছেই –”

শর্মিলা ঐতিহাসিক দুর্গটার প্রাকারের পাশে দাঁড়িয়ে নিবিষ্ট মনে অনেক নিচের শহরের প্যানোরামা দেখছিল, এমন সময় কথাগুলো বাতাসে ভেসে তার কানে ধাক্কা মারল। একটু নিচে দুর্গের প্রশস্ত চাতাল। সেখানে দাঁড়িয়ে কে যেন উত্তেজিত ভঙ্গীতে তার সঙ্গীকে গল্প শোনাচ্ছে।
কে এই বক্তা? আর গল্পের মেয়েটিই বা কে? শব্দগুলো যেন তখনও বাতাসে অনুরণিত হচ্ছে। সম্ভবত কোনও গাইড দর্শকদের দুর্গের কাহিনি শোনাচ্ছে। এই প্রাচীন দুর্গকে ঘিরে অনেক জনশ্রুতি আছে। শোনা যায়, এক রানি নাকি শত্রুর হাত থেকে ইজ্জত বাঁচাতে এই প্রাকার থেকে নিচে ঝাঁপ দিয়েছিলেন।
কিন্তু নিচে চাতালের দিকে তাকিয়ে শর্মিলার নজরে পড়ল শুধু কিছু ফুর্তিবাজ ছেলেমেয়ে। ওরা জোড়ায় জোড়ায় বকম বকম করছে আর মাঝে মাঝে প্যাকেট খুলে এটাসেটা এ-ওর মুখে পুরে দিচ্ছে। তাহলে হয়তো কোনও তরুণ তার সঙ্গিনীকে পটানোর জন্য কোনও সুপারহিট সিনেমার দৃশ্য রং চড়িয়ে বর্ণনা করছে।
নাকি এ ইতিহাসের কণ্ঠস্বর? “পালা শর্মি, পালা!” কে যেন তার কানের কাছে মুখ রেখে অনবরত বলে চলেছে।
একটু পরেই সে পাথুরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে কিছুটা হেঁটে দুর্গের তোরণের কাছে হাজির হল। তার সফরসঙ্গীরা ততক্ষণে সেখানে অপেক্ষা করতে করতে বেশ অধৈর্য হয়ে পড়েছে। শর্মিলা অবশ্য নাচার। এলাম, সেলফি নিলাম আর গেলাম, ঐ দলে সে নেই। কোথাও গেলে তার আত্মস্থ হতে, পরিবেশ ও প্রকৃতির সাথে একাত্ম হতে একটু সময় লাগে।

“পালা শর্মিলা, পালা!” বাসে করে পাহাড়ের পাকদণ্ডি বেয়ে নামতে নামতে তার মনে অনবরত অনুরণিত হচ্ছিল। সত্যি বলতে, শর্মিলার পালানোর সূচনা তার জন্মের আগে থেকেই – যখন তার মা চিহ্নিত কন্যাভ্রূণটিকে বাঁচাবার বেপরোয়া তাগিদে শ্বশুরবাড়ি থেকে চম্পট দেয়। সহৃদয়, ন্যায়নিষ্ঠ দাদামশাইয়ের দাক্ষিণ্যে অবশ্য মা’র বাপের বাড়িতে ঠাঁই হয়েছিল, পৈতৃক সম্পত্তির অংশও জুটেছিল। ফলে সে শর্মিলাকে অন্তত প্রাইমারি স্কুল অবধি যত্নে বড় করতে পেরেছিল।
তারপর এল পালানোর পরবর্তী পর্ব। শর্মিলার বয়স তখন বছর বারো। সে আমলের কলকাতার ধারা অনুসারে তাদের এলাকাতেও শুরু হল দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের এলাকা দখলের লড়াই। আর এই শুম্ভ-নিশুম্ভের যুদ্ধে ওষ্ঠাগত হয়ে উঠল পাড়ার সাধারণ মানুষের প্রাণ। তারপর একদিন ‘বহিরাগত’ রাজনৈতিক দলটি তাদের এলাকা দখল করে নিল। পাড়ার বাসিন্দাদের বুক দুরুদুরু। তারা কম বয়সি সব ছেলেদের সাময়িকভাবে আত্মীয়বন্ধুদের বাড়ি পাঠিয়ে দিল। কিন্তু দুর্ভোগের তখনও বাকি ছিল। একদিন গুজবে শোনা গেল, দখলদারি বাহিনী নাকি পাড়ার কম বয়েসি মেয়েদেরও তুলে নিয়ে যাচ্ছে। এবার ‘বয়স্থা’ মেয়েদের পালাবার পালা। শর্মিলা তত দিনে ডাগর হয়েছে, মাকেও কেউ প্রৌঢ়া বলবে না। সুতরাং এই পলাতকাদের দলে তারাও নাম লেখাল। রাতারাতি কাঁধের কয়েকটি ঝোলা সম্বল করে দু’জন পেছনের দরজা দিয়ে পালাল।
“পালা শর্মি, পালা!” আবার কিছু কাল অনিশ্চিতি আর বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে কাটাবার পর তারা একটু থিতু হল। মা সৌভাগ্যক্রমে একটা চাকরি পেয়ে গেল। তার সাথে সে সম্পত্তির যে অংশ পেয়েছিল তা মিলে তাদের আর্থিক নিরাপত্তা মোটামুটি সুরক্ষিত হল। কিন্তু সামাজিক দিক দিয়ে তাদের পিতৃহীন পরিবার লোভী পুরুষদের সহজাত লক্ষ্য হয়ে উঠল। মা উৎপাতগুলি কিছুদিন মুখ বুঁজে সহ্য করার চেষ্টা করল। তারপর যখন তার বাপের বাড়ির পাড়া আবার ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে গেল, সে সেখানে ফিরে যাওয়া মনস্থ করল। কিন্তু বেরিয়ে আসা যত সহজ, ফিরে যাওয়া ততটা নয়। সদয় দাদামশাই তদ্দিনে বৃদ্ধ ও অশক্ত। পরিবারের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে মামাদের হাতে, যারা বোনের প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে আদৌ উৎসাহী নয়। তাদের ক্রমান্বয় ছলচাতুরির মোকাবিলা করতে করতে ক্লান্ত মা শেষ অবধি যা হয়ে থাকে, অর্থাৎ একটা থোক টাকা নিয়ে পৈতৃক ভিটের অংশ ছেড়ে দিল।
টাকা তো জুটল। কিন্তু ‘পুরুষহীন’ পরিবারের সহজাত সমস্যা মিটল না। নাচার মা শেষে তার চেয়ে বছর দশেকের বড় এক সহকর্মীর বিয়ের প্রস্তাব মেনে নিল। শর্মিলা প্রথমে এ নিয়ে একটু অস্বস্তিতে ছিল। কিন্তু বেচারা মা অনেক কষ্টের পর একজন সঙ্গী পাবে ভেবে সে শেষ অবধি খুশি মনেই ব্যাপারটা মেনে নিল। তার খুশি অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হল না, কারণ কিছুদিন পরই তার সৎ বাবার কুনজর পড়ল তার দিকে।
বেচারা মা! তার কথা ভেবে শর্মিলার বুক ফেটে যেত। কিন্তু প্রতিবাদ করে মা’কে অস্বস্তিতে ফেলতে চায়নি দেখে সে নিঃশব্দেই সব সহ্য করতে লাগল আর সমস্ত বুদ্ধি ও কৌশল প্রয়োগ করে লোভী মানুষটার নোংরা হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে লাগল। তারপর প্রথম সুযোগেই সে পড়ার চাপের অজুহাতে বাড়ি ছেড়ে কলেজ হস্টেলে চলে গেল।
মা দুঃখ পেলেও কিছু সন্দেহ করেনি। ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়াবার উদ্দেশ্যে শর্মিলা পড়াশোনায় আরও বেশি মন দিল আর ভালো নম্বর পেয়ে গ্র্যাজুয়েট হল। সে ইংরেজিও ভালো জানত। তাই সহজে একটা কল সেন্টারে চাকরি পেয়ে গেল। এখন সে আরও তিনজন কল সেন্টার ও আই-টি’র চাকুরে মেয়ের সঙ্গে একটা ফ্ল্যাট শেয়ারে ভাড়া করে থাকে। রুমমেটদের পীড়াপীড়িতেই সে এক ট্যুরিস্ট দলের সঙ্গে এই পশ্চিম ভারত সফরে এসেছে।

“পালা শর্মি, পালা!” ভাবতে ভাবতে হঠাৎ তার মনে হল এই যে সে বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ না করে ক্রমাগত পালিয়েই যাচ্ছে, ব্যাপারটা কি লজ্জার নয়? উঁহু, এটাই তো প্রকৃতির নিয়ম। সবলের হাত থেকে বাঁচতে দুর্বল পালিয়েই থাকে। এটাই তার সহজাত আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি। ইঁদুর বাজপাখি দেখলে পালায়, খরগোশ পালায় শেয়ালের সাড়া পেলে। আর নারী পালায় পুরুষের থাবা এড়াতে। অনাদিকাল থেকেই এটা হয়ে আসছে, এতে লজ্জার কী আছে?
অবশ্য একটা সংশয়। যে মুহূর্তে পুরুষদের কথা মনে হল, তার মানসপটে ভেসে উঠল দাদামশাইয়ের সদয় মুখচ্ছবি। পুরুষ নারীশিকারী, কিন্তু তাদের মনে স্নেহ, ভালোবাসাও আছে। সব মিলিয়ে তবে তাদের কী বলা চলে – শত্রু, না বন্ধু? নাকি দুইই – যাকে আজকাল ফ্রেন্ড আর এনিমি মিলিয়ে বলা হয় ‘ফ্রেনিমি’?
“তখন থেকে কী ভেবে যাচ্ছিস রে, শর্মি?”
রুমার কথায় তার হুঁশ ফিরল। “না না, তেমন কিছু নয়”, সে দায়সারা জবাব দিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল।
“ও প্রকৃতিপ্রেমিক। নিশ্চয়ই দৃশ্যগুলির কথা ভাবছে।” দীপ্তি বলল।
“অথবা হয়তো বয়ফ্রেন্ডের কথা।” আরতি ফুট কাটল। তারপর তারা হি-হি করে হেসে গড়িয়ে পড়ল। শর্মিলাকেও বাধ্য হয়ে তাতে যোগ দিতে হল।

না, শর্মিলা ওসব ভাবছিল না। সে শুধু ভাবছিল বাতাসে ভেসে আসা ঐ শব্দগুলির কথা, “মেয়েটি ছুটছে তো ছুটছে তো ছুটছেই।”
তার নিজের দীর্ঘ ছোটার পর্বেরও তো আশু সমাপ্তির কোনও সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। বরং সে এখন দৌড়ের পরের ল্যাপটার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাতাসে ইতিমধ্যেই দুর্যোগের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। আর তার মূল কারণ ঐ একটাই – তার এই সর্বশেষ সংসারও পুরুষরক্ষী বিহীন।
তাদের ফ্ল্যাটটা এক মধ্যবিত্ত বাঙালি ভদ্রলোক পাড়ায়। তবে আশেপাশে ছড়ানো ছেটানো কিছু বস্তি। এই ‘অরক্ষিত নারী’দের দিকে যাদের কুনজর তাদের অধিকাংশই সুযোগসন্ধানী কাপুরুষ। তাদের মোকাবিলা করা সহজ। কিন্তু এর বাইরেও আছে এলাকার রাজনৈতিক নেতাদের স্নেহধন্য কিছু সমাজবিরোধী, যাদের সাথে পুলিশেরও যোগসাজস। তাদের চার রুমমেটের মধ্যে শর্মিলারই বিপদ সবচেয়ে বেশি। এক প্রাচীন কবি এক দোঁহায় বলে গেছেন, হরিণের মৃত্যুর কারণ তার শরীরের মাংস। একই কথা মেয়েদের সম্বন্ধেও প্রযোজ্য। পুরুষ্টু গড়ন আর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সৌন্দর্যের জন্য শর্মিলাকেই ঐ দুর্বৃত্তগুলির অশ্লীল মন্তব্য আর টিটকিরি বেশি শুনতে হয়। সে অবশ্য কিছু না বলে চলে যায়, কারণ প্রতিবাদ করলে ওরা সেই অজুহাতে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠবে। কিন্তু এত করেও শেষ অবধি আত্মরক্ষা করা যাবে কিনা সন্দেহ। শর্মিলার শিফট ডিউটি, প্রায়ই ফিরতে রাত হয়। তখন ঐ লোফারগুলি বেসামাল হয়ে একটা মদের ঠেকে বসে আড্ডা দেয়। বিপদের আশঙ্কা মাথায় রেখেই শর্মিলা কোনওমতে জায়গাটা পেরিয়ে যায়। তবে কদ্দিন? আবার তাকে কিছু একটা করতে হবে আর সেটা শিগগিরই।
“পালা শর্মি, পালা!” কিন্তু পালাবেটা কোথায়? অপেক্ষাকৃত নিরাপদ কোনও পাড়ায় ঘর ভাড়া করা তার সাধ্যে কুলোবে না। আর কুলোলেও সেখানেও যে একই সমস্যা দেখা দেবে না, কে বলতে পারে? মা’র কাছে ফিরে যাওয়া হয়তো অসম্ভব নয় – ঘরের একজন লোচ্চা মানুষ রাস্তার পাঁচজন নারীশিকারীর তুলনায় নিশ্চয়ই অনেক ভালো। কিন্তু বেচারা মা’র কথা মনে করলেই তার চোখে জল আসে, চিন্তাটাকে সে আর তেমন আমল দিতে পারে না। তবে কি সে নিজেই একজন পুরুষ রক্ষক খুঁজে নেবে – যে তার দেহমনের অধিকারের বিনিময়ে বাইরের বর্বর সমাজের হাত থেকে তাকে সুরক্ষা দেবে?

আশ্চর্য এই যে কথাটা মনে হতেই পাড়ার একটি অল্পবয়সি ছেলের মুখ তার মনে ভেসে উঠল। সে তাদের কেব্‌ল বয় মনা। প্রতি মাসে ও কেব্‌ল বিলের টাকা নিতে আসে, তখন দুজনের দেখা হয়। প্রথমে ছিল দু-চারটে কাজের কথা, সৌজন্য বিনিময়। তারপর ধীরে ধীরে তারা নিজেদের পরিবারের কথা, আরও কিছুদিন পর নানা সুখদুঃখের কথা বলাবলি করতে লাগল। ক্রমে শর্মিলার ভেতরের নারী উপলব্ধি করল, বেচারা ছেলেটা তার প্রেমে পড়ে গেছে।
ব্যাপারটা অবশ্য অকল্পনীয়। মোনা স্বল্পশিক্ষিত একটা ছেলে, যার পরিবেশ, সংস্কৃতি সবই শর্মিলার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তবু ধীরে ধীরে শর্মিলার মন তার প্রতি নরম হতে শুরু করল, কারণ সে বুঝতে পারছিল ছেলেটা তাকে গিলতে চায় না, ভালোবাসে। তবু শর্মিলা ওকে এতটুকুও প্রশ্রয় দিত না, কারণ তাহলে হয়তো তারা এমন এক পরিস্থিতিতে গিয়ে পড়বে যার থেকে বেরিয়ে আসার পথ নেই। শেষ অবধি সে যখন কানাঘুষোয় শুনল ছেলেটি গোপনে ড্রাগ ও অস্ত্রের লেনদেন করে, তখন তার সব দোলাচলেরও শেষ হল। এক অস্ত্র কারবারির সাথে সম্পর্কে জড়ানোর কথা ভাবাও যায় না।
কিন্তু নিজের মনের গভীরে শর্মিলা জানত, যদি সে কোনওদিন কোনও বিপদে পড়ে তবে একমাত্র ঐ মনার ওপরই ভরসা করতে পারে। তাদের এক্সপ্রেস ট্রেনটা যখন কলকাতার দিকে ছুটে চলেছিল, সে এই কথাই ভাবছিল।

কিন্তু অঘটনটা সে যা আশঙ্কা করেছিল তার আগেই ঘটল। রাজীব বলে পাড়ার একটি গুণ্ডাপ্রকৃতির ছেলে তাদের ফ্ল্যাটে কোনও একটা উৎসবের অজুহাতে চাঁদা চাইতে এসেছিল। অনিচ্ছাসত্ত্বেও রাজি হওয়ার পর শর্মিলা যখন পার্স থেকে টাকা বের করে দিতে যাচ্ছে, রাজীব সেটা নেওয়ার অছিলায় খপ করে তার হাত চেপে ধরল। সহজাত প্রবৃত্তির বশে শর্মিলা হাতটা ছাড়িয়ে ওকে টেনে চড় কষাল। রাজীবের চোখ রাগে রক্তবর্ণ হয়ে গেল। খ্যাপা বাঘের মতো সে শর্মিলার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করল। ঘরে তখন আর কেউ ছিল না, তবে দরজাটা খোলাই ছিল। শর্মিলার চিৎকারে আশেপাশের ফ্ল্যাট থেকে লোকজন ছুটে এল। সুতরাং শয়তানটার পৃষ্ঠপ্রদর্শন করা ছাড়া উপায় ছিল না। কিন্তু যাওয়ার আগে সে শাসিয়ে গেল, “আমি যাচ্ছি। তবে আবার এসে তোর পাওনাটা মিটিয়ে যাব।”
শর্মিলা জানত, কথাটা সত্যি। ও আবার আসবে। আর তখন যে প্রতিবেশীদের সাহায্য পাওয়া যাবে তারও কোনও গ্যারান্টি নেই। সংঘবদ্ধ গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার সাহস ক’জনেরই বা হয়! তাছাড়া সে শুনতে পাচ্ছিল কিছু মহিলা ফিসফিস করে বলাবলি করছে, “ব্যাপারটা অত সহজ নয়। মেয়েটার সাঁট না থাকলে ছোঁড়া ঘরে ঢুকল কীভাবে?”
অসহায়, হতাশ শর্মিলা বিছানায় লুটিয়ে পড়ল। “পালা শর্মিলা, পালা”, কিন্তু কোথায়? শিকারীদের হাত থেকে বাঁচতে তুমি আজীবন ছুটেই যাবে। কিন্তু শেষে একদিন যখন তোমার পিঠে দেওয়াল ঠেকে যাবে তখন কী করবে? প্রবাদের সেই রানি পালাবার পথ বন্ধ হওয়ার পর মৃত্যুবরণ করে আক্রমণকারীদের হাত এড়িয়েছিলেন। অকুতোভয় ‘নির্ভয়া’ প্রতিরোধ করে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। এবার শর্মিলার পালা। একই সাত পুরনো গল্পের ক্লান্তিহীন পুনরাবৃত্তি হয়ে চলেছে।
কিন্তু শর্মিলা তো ইতিহাস হতে চায় না – সে শুধু চায় বাঁচতে! জীবন এত সুন্দর, এত উপভোগ্য আর তার বয়স এত কম! তার দু’চোখ ছাপিয়ে জল এল।

ডোরবেল বেজে উঠল আর শর্মিলার বুকটা ধক করে উঠল। জানত ওরা আসবে – কিন্তু এত তাড়াতাড়ি? সে আই-হোলে উঁকি মারল – মনা কেব্‌ল বিল নিয়ে দাঁড়িয়ে!
তার এক অদম্য ইচ্ছা হচ্ছিল মনার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু নিজেকে সংযত করে সে শুধু বলল, “ভেতরে এসো।” মনা এলে সে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
“মনা”, বিল মেটানো হয়ে গেলে সে সোজা ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল।
সেই চাউনির সামনে কুঁকড়ে গিয়ে মনা বলল, “বলো?”
“আমি জানি, তুমি আমায় পছন্দ করো। তাই না?”
শর্মিলার এই সামান্য প্রশ্রয়ে বরাবর সংযত ছেলেটির যেন এক বিস্ফোরণ হল। কাঁপা কাঁপা গলায় সে বলে উঠল, “আমি তোমায় ভালোবাসি, শর্মি! তোমার একটা চুমুর জন্য আমি গোটা পৃথিবীটা দিতে পারি।”
পরমুহূর্তেই অবশ্য সে গুটিয়ে গিয়ে ভীরু চোখে শর্মিলার মুখের দিকে তাকাল। তার আশঙ্কা হচ্ছিল, তার বান্ধবী এবার রাগে ফেটে পড়বে। কিন্তু তাকে আশ্বস্ত করে শর্মিলা এক মনভোলানো হাসি হেসে বলল, “পৃথিবী নয়, আমি তোমার কাছ থেকে একটাই জিনিস চাই। আর তার বদলে তুমি একটা চুমুর চেয়ে কিছু বেশিই পাবে, তবে খুব বেশি নয়। চলবে?”
“চলবে না, দৌড়োবে! আমি ভালো করেই জানি শর্মি, আমি তোমাকে পাওয়ার যোগ্য নই। তুমি এক অন্য ধরণের মেয়ে, তোমাদের দুনিয়াটাই আলাদা। কিন্তু তবুও বলব, আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমি শুধু একবার বলো, কী চাও। আমার সাধ্যের মধ্যে হলে আমি অবশ্যই তা এনে দেব।”
“জিনিসটা তোমার সাধ্যের মধ্যেই।” শর্মিলা বলল। কিন্তু যখন সে নামটা বলল, মনা চমকে উঠল। “তুমি শিওর – ওটাই চাও? পারবে?”
“পারতেই হবে।”
“বেশ, তাহলে –” ছেলেটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে যাওয়ার উদ্যোগ করছিল। কিন্তু তার আগেই শর্মিলা তাকে নিবিড় বাহুবন্ধনে বেঁধে পাগলের মতো চুমু খেতে লাগল।
“এত তাড়ার কী ছিল?” বিহ্বল মনা কোনওমতে উচ্চারণ করল।
“ধরো আজ রাতেই যদি কিছু ঘটে যায়? আমি তোমার কাছে ঋণী থেকে মরতে চাই না, মনা।”
“ছিঃ, অমন কথা মুখেও আনে না।” শিউরে উঠে মনা তাড়াতাড়ি শর্মিলার মুখে হাত চাপা দিল, যেন এভাবেই সে তার প্রিয়ার সব অমঙ্গলের আশঙ্কা দূর করতে চায়।

“পালা শর্মি, পালা!”
সে বুঝতে পারছিল তার দিন ঘনিয়ে আসছে। শিগগিরই একদিন ওরা তার ফ্ল্যাটে এসে হানা দেবে। অথবা তার চেয়েও খারাপ, হয়তো পথেই আক্ষরিক অর্থে তার ওপর চড়াও হবে, একের পর এক! ওরা ধরে ফেলার আগেই তাকে ছুটতে শুরু করতে হবে – ইঁদুর, খরগোশ, হরিণ, গল্পের রানি ও আরও অজস্র মাংসল শিকারের মতো। সেই একই সাত পুরনো গল্পের ক্লান্তিহীন পুনরাবৃত্তি!
অবশ্য এই গল্পের শেষে একটু ‘ট্যুইস্ট’ আছে। পাগলের মতো ছুটতে ছুটতে যখন শর্মিলার পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যাবে, সে কিন্তু কিঁচ কিঁচ আর্তনাদ করেই খাদ্যে পরিণত হয়ে যাবে না।
সে যুঝবার জন্য তৈরি – মনার কল্যাণে এখন তার আস্তিনে রয়েছে এক লুকনো তাস!

ফেসবুক মন্তব্য