অনার কিলিং

রুখসানা কাজল

গেটের উপর বসে ব্লেড দিয়ে হাঁটুর কাছে জিন্সের প্যান্ট কাটছিলাম। তনিমা হাঁ করে দেখছিল, নতুন প্যান্ট কাটলি? ধ্যেত কই কাটলাম! একটু ফুটো ফুটো করে নিলাম। ওটাই স্টাইল। নীলসাদা সূতোগুলো ঝ্যালঝেলে করতে করতে জবাব দিই। আমাদের ছোট শহর। তার মধ্যে আমার দিদিরা হেব্বি হট ।হলি-বলির স্টাইল মারে । জামা জুতো চুল ব্যাগ সব কিছু আপ টু ডেট। আমিও সেভাবে গড়ে উঠছি। পত্রিকায় দেখেছি ছেঁড়াফাটা জিন্স হচ্ছে এখনকার ধামাকা। স্পেশাল। ঢাকা থেকে নতুন জিন্সের প্যান্ট পাঠিয়েছে দিদি। খুলে দেখি হাঁটুর কাছে ছেঁড়াফাটা নেই। লেগে গেলাম ছিঁড়তে –
তনিমার চোখের সামনে ব্লেড দুলিয়ে বলি, কি ভাবলি, ডাকবি আমাকে আপু বলে? আপু বললেই পুরানা জিন্সটা তোকে দিয়ে দেব। ভ্যাদভেদে গলায় তনিমা বলে, তুই আমার পনের মাসের ছোট। নীচু ক্লাশে পড়িস! বাঁ চোখ সরু করে বলি, আমি তো এবছর তোর ক্লাশে উঠব। ডাবল প্রমোশন পেয়েছি। তাইলে? যা জিন্স দেবোনা।
খুব জানি জিন্সের প্যান্টের জন্যে তনিমা আমাকে আপু ডাকবেই। এই সুযোগ। আমাকে কেউ আপু বা দিদি ডাকে না। ক্যারাম বোর্ডের রেড গুটির মত আমি একা। বড়রা সব সময় স্ট্রাইক মেরে ইচ্ছা মত সাদাকালো মাঠে খেলিয়ে নিয়ে বেড়ায়। আজ পর্যন্ত কাউকে নাম ধরে ডাকতে পারিনি। সবাই হিসেব করে বুঝিয়ে দেয়, শোন ছোটি তুই আমার এত বছর বা এত মাসের ছোট। তখন পিছলে পিছলে গলায় আপু, ভাইয়া, দাদা ডাকতেই হয়। নইলে ওরা খেলায় নেয় না।
তনিমা কিন্তু বেশি সময় নেয় না। ইংলিশ টু বাংলা ট্রানশ্লেসন করার মত বাধো বাধো গলায় বলে, আপু তোমার পুরানো জিন্সের প্যান্টটা আমাকে দিবা? লে ছক্কা! তুই বক্কা! আমি লাফ দিয়ে নীচ নেমে একপাক নেচে নিই, দিল তো ছোটি হ্যায়, ছোটি সি আশা! ওকে চুপ করে বাগানে থাকতে বলি। লুকিয়ে আনতে হবে। মা দেখি নতুনটা আসার পর পুরানো জিন্সটা বেশি যত্নে আলমারীতে তুলে রেখেছে। প্যান্ট এনে দিই, শোন তনু ক্লাশেও কিন্তু আপু বলবি!
আচ্ছা দে দে --- ঝপ করে হাফ প্যান্ট খুলে জিন্স পরে ফেলে তনিমা । একটু টাইট আর ছোট হয়েছে।আমি বাটকু, গুল্লুগুল্লা ফুচকার মত। তনিমা লম্বা । টোপা দেবদারু গাছের মত সটান। দুরন্ত লাগছে। ইংলিশ ফিল্মের মেয়েদের মত হাঁটছে।
তবে এটা পরে ওদের বাসায় গেলে ক্যাচাল হয়ে যাবে। ওর বাবা বাচ্চুকাকু খড়ম ভাংবে ওর পিঠে। তনিমাকে তো মারবেই সাথে ওর ছোট বোনদেরও ম্যারাথন মার দিয়ে সবক্ শেখাবে ভুলেও যেন কেউ কখনো এরকম পোশাক না পরে। আমাকেও ডাকতে পারে। তাই আগেভাগে উত্তর তৈরি করে রেখেছি। “হে আপনার মেয়ে না চাইলে কি আমি দিতাম কাকিমা! বলে একটা প্যান্টের কত্ত দাম! তাও তো মা এখনো জানে না। জানলে আমার হাড় মাংস আলাদা করে ছাড়বে! মাকে তো চেনেন।” তনিমা বাগানে হাঁটে আর খুশি গলায় বলে, বুঝলি এর সাথে শার্ট হলে স্মার্ট লাগত। আর এই শালার খড়ম! খড়ম উড়ে রেন্টুদের ড্রেনে গিয়ে পড়ে। আমি আপু ডাক শোনার লোভে দিদির রেখে যাওয়া একজোড়া পুরানা শর্ট হিল এনে দিই। থ্যাংকু আপু- তনিমা খটখটিয়ে পাড়া ঘুরতে বেরিয়ে যায়।
ছ মাস ধরে তনিমাদের বাসায় খড়ম উৎসব চলছে। বাসার সবার জন্যে বাচ্চুকাকু খড়ম কিনে এনেছে। উনার যুক্তি আমাদের নবীজী নাকি খড়ম পায়ে চলাচল করতেন। ইট মাথায় দিয়ে ঘুমাতেন। চরম ধর্মান্ধ মানুষ। প্রকাশ্যেই আমার মাকে বলে, আপনাদের সবকিছু ধর্মবিরোধী। আপনারা বেজাতের মুসলিম। জালি মুসলমান। আপনার মেয়েরা টিপ পরে, চুল কাটে, গগলস পরে, নেলপালিশ লাগায়, ছেলেদের সাথে ঘোরে ফেরে কথা বলে, ছিঃ — আপনাদের হাতের কোনকিছু খাওয়াও মহাপাপ । আপনারাই কেয়ামত টানি আনতেছেন এই দুনিয়ায়। মা কিছু বলার আগেই ফোঁস্‌ করে উঠে তনিমা, নবীজি খড়ম পায়ে দিতেন তার প্রমাণ আছে ? আর অই সময় কি মক্কায় ইট ছিল! লে হালুয়া মাগনা সিনেমা! বাচ্চুকাকু খড়ম ছুঁড়ে মারে ওর দিকে। ছুটে বাগানে পালিয়ে হিহি করে হাসে তনিমা।
ওদের বাসায় সবকিছু মেপে কেনা হয়। ছয় বোন কোন ভাই নেই। ছয় প্লাস দুই, আটটি জাম, জামরুল, ছোট পেয়ারা, জব্বারের দোকানের আটটা টোষ্ট এরকম জিনিস কেনা হয়।ছাদে ছয়টি নানারঙ্গের ছোট্ট গামছা আর দুটো বড় গামছার সাথে ওদের একরকমের ছিটের ছয়টা জামা দোল খেত।বিকেলে কাকিমা ওগুলো তুলতে এসে মার সাথে গল্প করত। এইটুকু বিনোদন ছাড়া উনার জীবনে আর কিছু ছিলনা। সারাক্ষণ ভয়ে সিটকে থাকত ছেলে না হওয়ার দুঃখে । কাকু যদি আবার বিয়ে করে! তবে কখনো কাকুর নামে কোন নালিশ করত না। কাকু যদি পুর্বদিককে পশ্চিম বলতে আদেশ করত কাকিমা তাই করত। কিন্তু তনিমা ক্ষেপে উঠত, আম্মা আপনার দেখি চাকর স্বভাব। ন্যায় অন্যায় কোন বোধই নাই। তনিমার জন্যে প্রায়ই শাস্তিস্বরূপ রান্না বন্ধ থাকত। তাতে ওর থোড়াই অসুবিধা হত। আমাদের বাসায় তো কেড়েই খেত, পাড়া বেপাড়ার অন্য সব বাসায়ও ওর অবাধ আমন্ত্রন ছিল। কিন্তু ওর ছোট ছোট বোনদের সারাক্ষন ক্ষুধা লেগে থাকত। কারো বাসায় গেলে হুমড়ি খেয়ে খেতে বসত। এমনকি মাঝে মাঝে সেমাইয়ের প্লেট পর্যন্ত জিভ দিয়ে চেটে খেত । আমাদের পেয়ারা, আমড়া, তেঁতুলের কাঁচাফল, পাতা কিচ্ছু খেতে বাদ রাখত না ওরা।
খড়ম পায়ে হাঁটা বেশ কঠিন। পা পিছলে যায় হঠাত হঠাত। তাছাড়া প্রায়ই ফিতা খুলে যায় । তনিমা ইচ্ছা করে ফিতা ছিঁড়ত। কাকু আবার খড়ম কিনে আনত নইলে নিজেই ঘুট ঘুট করে পেরেক মেরে দিত। প্রচন্ড রাগে গজরাতো তনিমা, স্যান্ডেল কেনার মুরোদ নাই গাদা গাদা বাচ্চা নেওয়ার মুরোদ আছে। কাকু শুনেও না শোনার ভাণ করত। তাতে আরো বিদ্রোহী হয়ে কাকিমাকে শুনিয়ে বলত, আবার যদি বাচ্চা হয় ত মেরে ফেলব। জেলে যাব, ফাঁসিতে ঝুলব। লজ্জা করেনা এত বাচ্চা নিতে! মানুষ বিজ্ঞাপন দেখেও ত শেখে! এই নিয়ে ওদের বাসায় মহাহুলুস্থুল। বাচ্চুকাকু তনিমার ঘাড় ধরে গেটের বাইরে বের করে দিয়ে তালা মেরে দিয়েছে । মুখে বলেছে, জানোয়ার মেয়ে। ইসলামে ত্যাজ্য করার বিধান নাই। নইলে ওকে আমি ত্যাজ্য করতাম।
তনিমার তাতে খুব মজা হয়েছে। মিছিল করে ওকে বড় চাচার বাসায় দিয়ে এসেছি। বড় চাচা আবার খুব আধুনিক। সবকিছু শুনে মুচকি হেসে তনিমাকে ভেতর বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। আমরা হাত নেড়ে “বাই বাই ইশকুলে দেখা হবে” বলে চলে আসি। পরদিন তনিমা ইশকুল ড্রেস ছাড়াই ইশকুলে এসেছে বলে হেডমিস ডেকে পাঠিয়েছেন । নিশ্চয় অফিস রুমের সামনে রোদ্দুরে ওকে দাঁড় করিয়ে রাখবেন! কিন্তু কিছুই না। বরং তনিমা হাসতে হাসতে এসে খালি ব্যাগ নিয়ে পিয়নের সাথে বাসায় চলে গেল। পিয়নের হাতে ইশকুলের সিল লাগানো চিঠি। পরের ক্লাশে রেবু মিস ছ্যাঁত ছ্যাঁতে গলায় আমাদের পিতামাতার কর্তব্য পড়তে দিয়ে পাশের ক্লাশের সুতপা মিসের সাথে গল্প করল, আজকাল বাবা মাদেরও বুদ্ধি নাই।এতবড় ছেলেমেয়ে ----
বাচ্চুকাকু এই সময়ে অফিসে থাকে। এই সুযোগে তনিমা ঢুকে গেল বাসায়। কাকিমা ভয়ে ভয়ে ওকে খাইয়ে স্টোর রুমের ভেতর লুকিয়ে রাখে। বাচ্চুকাকু বিকেলে নাস্তা করে পান মুখে দিয়ে চিঠিটা পড়ে। চোখমুখে জ্বলে উঠে লাল আগুন। কাকিমা ও বোনেরা পা জড়িয়ে ধরে। হ্যাঁচকা টানে সবাইকে ফেলে অন্ধকার স্টোররুমে ঢুকে দরোজা লক করে দেয় কাকু। কাকিমা জায়নামাজে লুটিয়ে পড়ে, "আল্লারে সংসার বাঁচাতে সন্তানকে ছদকা দিলাম, ছদকা দিলাম আল্লাহ্‌।”
সন্ধ্যায় নয় ফুট উঁচু দেয়ালের ওপাশে মই রেখে কাকিমা আমাদের জিগ্যেস করেন, তনুকে দেখেছিস? কাকিমার গলা ভাংগা, কাঁদো কাঁদো। সমস্বরে বলি নাতো! সান্ত্বনা দিই চিন্তা কি কাকিমা। বোধহয় বড় চাচার বাসায় চলে গেছে।পাড়ার বাসায় বাসায় খোঁজে বাচ্চুকাকু। কেউ কেউ জানায় ফারুক পুলিশের ছেলের সাথে প্রায়ই গল্প করে।ওই বাসা দেখেন। কাকু থমথমে মুখে ফিরে আসে। কোথাও তনিমা মেই।
অনেক ভোরে কাকু কাকিমা বাক্সপ্যাঁটরাসহ অন্য মেয়েদের নিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে গেছে। ক্লাশ এইটের একটি মেয়ে পালিয়ে গেছে নিশ্চয় কোন ছেলের সাথেই পালিয়েছে এরকম কথা সারাদিন ভেসে বেড়ায় ইশকুল আর পাড়ায়। আমরা কানাকানি করি সিওর শহিদভাইয়ের কাছে গেছে। বেশ করেছে! শহিদভাই পুলিশের ছেলে। কাকু ঘাটাতে সাহস পাবেনা। দেয়ালের উপর বসে পা দুলিয়ে তনিমা গল্প করত, পালিয়ে ঢাকা যাবে। শহিদ চাকরি করবে ও পড়াশুনা করবে।আবার ও চাকরি করবে শহিদ পড়াশুনা করবে। “বুঝলি ত সবকিছু ফিফটি ফিফটি । আমার বাপের মত না। শালা চেঙ্গিস খান।”
আমরাও তাল দিতাম। প্রতিদিন ওদের বাসার একেকটি মর্মান্তিক কাহিনী ঘটত। আমাদেরও মনে হত কোন উপায়ে যদি সলভ করা যেত! কাকুর খড়ম পিটুনির ভয়ে ছোটবোনগুলো জড়সড়ো পুটুলি বেঁধে একসাথে থাকত। যেন এক দড়িতে বাঁধা কতগুলো মুরগী। তনিমার অবাধ্যতার শাস্তিতে ওদেরও না খেয়ে থাকতে হত দিনের পর দিন। তাই তনিমার জন্যে ওদের বাসায় কাউকে ব্যস্ত হতে দেখা গেলনা। একদিন পরে ফিরে এলো সবাই। কাকুর মুখ হাড়িপানা। কপালের এককোন কালো হয়ে ফুলে উঠেছে। ফর্সা মুখের একপাশে কালো কালো লম্বা দাগ। কাকিমা কেঁদে কেঁদে সবাইকে বলছে তনিমার জন্যে লজ্জায় ঘৃনায় কাকু নাকি দেয়ালে মাথা ঠুকে ঠুকে সারারাত কেঁদেছে। মানী বাপের মান রাখলো না মেয়েটা। এরমধ্যে একজন ছুটে এসে জানালো তনিমাকে লঞ্চঘাটা দেখা গেছে। আমরা দৌঁড়ে গেলাম। তনিমাই তবে লাশ হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে নদীর কিনারে।
এই প্রথম কাকিমা গেটের বাইরে বেরিয়ে এলো। তনিমার হোগলায় পেচানো লাশ রাখা হয়েছে বাড়ির পাশের মাঠে। সুপারি গাছে হেলান দিয়ে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে আছে কাকু । শহিদভাইয়ের আব্বা্ পুলিশের গাড়িতে নিয়ে গেল তনিমাকে। কাকুকেও নিয়ে যাবে। শুনে কাকিমা চিৎকার করে কেঁদে উঠে, আল্লার কসম উনি কিছু করেন নাই। উনাকে নিয়ে যাচ্ছে কেন ও বড় ভাইজান? উনার কিছু হলে এতগুলো মেয়ে নিয়ে আমি কোথায় যাব? বড়চাচা লাল চোখে কাকিমার দিকে তাকিয়ে বল্লেন, একটা অমানুষকে সাপর্ট করলে তুমি বউমা।
তনিমা মারা গেছে প্রায় দুই বছর হল। কাকুর আবার জমজ মেয়ে হয়েছে। ওদের বাসায় কেউ যায় না। ওরাও কারো বাসায় আসে না। বাচ্চুকাকুর পাঞ্জাবীর ঝুল পায়ের গোড়ালি ছুঁয়ে নেমে এসেছে। ছয়মাস জেলে থেকে আরো ধার্মিক হয়েছে। সর্বক্ষণ হাতে তসবিহ্‌। তনিমাদের ছাদ বরাবর আমাদের জানালাটা বন্ধ করে দেবে বলে মিস্ত্রীদের দেখিয়ে দিচ্ছে মা বাপি। কাকিমা অনুরোধ করে, বন্ধ না করলে হয় না বড়ভাবি? মার পাতলা ঠোঁটে দৃঢ়তা ভেসে উঠে, "তনুর মা, বাচ্চু যখন মেয়েটাকে মারছিল, তুমি তো একবার এই জানালা দিয়ে আমাদের ডাকতে পারতে? ভয় কি মাতৃত্বের চেয়েও বড়?"

ফেসবুক মন্তব্য