তিন যাপন

জ্যোতির্ময় মল্লিক

১) ব্রীজের নীচে বৃষ্টি

ধরো সেই পাইনের জংগল ধরে আমরা দুজন হেঁটে চলেছি। আকাশ জুড়ে ঘন কালো মেঘ, বৃষ্টির প্রবল সম্ভাবনা। একটু আগেও গুমোট ছিলো বেশ। এখন একটা ঠান্ডা ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে। তুমি একটা হলুদ শাড়ি পড়েছো। খোলা চুল দিয়ে ঢাকা ডিপকাট ব্লাউজে না সামলানো পিঠ। গলায় টেরাকোটার হার, গতবার পৌষমেলায় কেনা। আমরা একটাও কথা বলছি না। সংকোচ, ভয়, আর ভালোলাগার তীব্রতা আমাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছে। শুধু সংকীর্ণ রাস্তায় পাশাপাশি হাঁটতে গিয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে আঙুল। ভদকা মেশানো স্প্রাইটের বোতলে মাঝে মাঝে চুমুক, মন্দ লাগছে না। মদ আস্তে আস্তে মাথায় চড়ে, সংকোচ কাটিয়ে দেয়, ভেঙে ফেলে নৈতিকতার দেওয়াল।

একটু দূরেই নদী- পাহাড়ি, দুরন্ত, অগভীর। চকচকে জল আয়নার মতো, বেয়াব্রু হয়ে থাকে বুকের রংচঙে নুড়ি পাথর। পরিচ্ছন্ন, মসৃণ, তবু পাথর তো! নদীর এপার ওপার জোড়া নির্জন ব্রীজ।

হঠাৎ বড় বড় ফোঁটার বৃষ্টি শুরু হয়। আমরা একছুটে আশ্রয় নিই ব্রীজের নীচে, অপর্যাপ্ত জায়গা। কালো মেঘ ফুঁড়ে নেমে আসে অনিমেষ বৃষ্টি। তির্যক ধারাপাত রেহাই দেয় না আমাদের। ভেজা দেশলাই আর জোলো হাওয়ার সাথে তীব্র যুদ্ধ জিতে আমি একটা সিগারেট ধরাই। তুমিও কাউন্টার নাও। অনভ্যস্ত আঙুলে, বুক ভরে নাও ধোঁয়ার উষ্ণতা। ফিরিয়ে নিয়ে দেখি, তোমার গোলাপি লেগে আছে সিগারেটে। ঠোঁটের স্বাদ পাই প্রথমবার। হলুদ ফুলের আমিষ গন্ধে তখন ম ম করছে আদিম প্রকৃতি।

২) উষ্ণতার জন্য

একটু উষ্ণতার আশায় দিন থেকে রাত করে ফেলি। আগুন জ্বালাই যত্র তত্র। এই তীব্র শীত থেকে আমায় মুক্তি দাও। এতো রক্ত দিয়েছিলে বুকে? এতো গুলো হৃৎস্পন্দন? কাঁসর ঘন্টার মতো পাথর প্রতিমার মন্দিরে বেতালা বাজতে থাকা, এই ক্রমাগত শব্দ থেকে মুক্তি দাও। তুমি তো জানো এই অপাপবিদ্ধ মন, তা অন্তত অমৃতের সন্তান! তবে কেনো এই তুষারপাত? কেনো রোজকার চাপা পড়া অভ্যাসের কবরে? তুমি অন্তর্যামী! আবিল দৃষ্টি দিয়ে দেখতে পাও সমস্ত পাটীগণিত! সন্ধি আর বিচ্ছেদের আপাত সরল সমীকরণ! অদেয় রখিনি কিছু, অপাংক্তেয় করিনি কোনো দাবী! সহমরণ হাসি মুখে পালন করেছে সমস্ত স্পৃহা! তবে কেনো এই ভিখারিনী তটে সমূদ্রের আনাগোনা শুধু পা ভেজানো গভীরতা পর্যন্ত? কেনো প্লাবনে ডুবে যায় না সব কিছু? অনুরণন কেনো শুধুই সুখস্বপ্নে সীমাবদ্ধ?

তোমার আলিঙ্গনের দিন, নিজেকে হারিয়ে, তোমাতে হয়েছি লীন। মূর্তিপুজো অথবা একেশ্বরবাদে তোমাকে দেবতা বলে জেনেছি। করেছি অর্চনা, পুজোর দায়িত্বে আর অভ্যাসে। নিজের বুকের পঞ্চম নীল পদ্ম দিয়ে, করেছি তোমার চক্ষুদান। আমার রাজ্য চাই না, বিজয় চাই না, চাই না সসাগরা জীবনের অধিকার।

শুধু একটু উষ্ণতা। শক্তি ক্ষরনের কোনো রকম বিবেচনা ছাড়াই, এক মাটীর প্রদীপ ভরা উষ্ণতা। এদেশে সূর্যাস্তের গল্প তুমি জানো! জানো মথুরাগামী নারায়ণের রাস্তার আড়ালে, শ্রীরাধার কাকুতি। জানো তুমি। অথবা বিস্মৃত করো, আমার পূর্বজন্মের স্মৃতি।

তাই আজকে সারারাত একটুখানি ছুঁয়ে থাকো আমায়। একটা আঙুল রাখো আমার গায়ে অথবা জামার কোনাটুকু আঁকড়ে থাকো। যখন রাত্রি গভীর হবে, মেঘের আড়ালে লুকোবে একফালি চাঁদ, আমিও পালটে যাবো। সকালে উঠে হয়তো দেখবে, একটা বদখৎ রকমের শুঁয়োপোকা পাশে শুয়ে আছে। মেটামরফোসিস। তুমি কি শিউরে উঠবে? নাকি পরম মমতায় আমার বাসোপযোগী একটা কোকুন বানিয়ে দেবে? রোজ সকাল বিকেল এসে দেখে যাবে আমার প্রজাপতি হওয়ার বৃত্তান্ত? আগামী সকালে আমার রক্তের রঙ হবে নীল, হাড়গোর বিলকুল ভ্যানিস, ত্বকের বদলে জন্মাবে ছোট ছোট রোঁয়া। আজ সারারাত ছুঁয়ে থাকো আমাকে, কারন মৃতপ্রায় কে একা ছাড়তে নেই।

৩)মৃত্যুশোক

তার বাড়ির পাশের খাল দিয়ে, যে যুবকের মৃত দেহ ভেসে যাচ্ছে, তার পাঁজরে ছুরির আঘাত স্পষ্ট। এই অন্তিম যাত্রায় তার সাথে কোনো বেহুলা নেই। নেই যত্ন করে বানানো কলার ভেলা। এই যাত্রার শেষে সে প্রাণ ফিরে পাবে না। পবিত্র গঙ্গা নয়, গন্ধময় কালো রঙের জলে, ভেসে চলে, একলা লখিন্দর।

গল্পটা দুফোঁটা চোখের জল, দু-চারটে আহা উহুতে শেষ হতে পারতো। হলো না। সে ভাবলো, সে তারস্বরে কাঁদতে পারে না, চিৎকার করে প্রতিবাদ জানাতে পারে না। তার এমন কোনো ক্ষমতা নেই যে, সব কটা লোককে, যারা এই কাজের জন্য দায়ী, নিয়ে গিয়ে রাজসভায় দাঁড় করাবে। চুপচাপ ছেলেটা শুধু লিখতে পারে, কখনো কখনো লেখা লাইন গুলোতে সুর ছোঁয়াতে পারে। কোনো মায়াবী বিকেলে, নদীর ধারে দাঁড়িয়ে, গেয়ে উঠতে পারে স্বরচিত কথা গুলি।

ওই মৃতদেহের কথা কে লিখেছে আগে? কে বেঁধেছে তেমন গান? ছেলেটি খোঁজ শুরু করলো। পদাবলীতে খুঁজলো। খেয়াল, ঠুমরী, ধ্রুপদ, তন্নতন্ন করে খুঁজলো। নাহ, এই লাশ ভেসে যাওয়ার সুর কোথাও নেই। বাঙালীর ইহকাল পরকালের ভরসা, রবিঠাকুর, না:, সেখানেও নেই।

নিরাশ ছেলেটি ঘুমিয়ে পড়েছে। স্বপ্ন দেখছে সে পাশ্চাত্যের কোনো এক বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছে সে। মোড়ের কাছে এক বৃদ্ধ ভাঙা গলায় গিটার বাজিয়ে গান করছে:

"হাজার কবর ছেড়ে/ এই সমাধির পথ ধরে/ আমি তোমার কাছে এসেছি/ পুত্র আমার/
একটা গোলাপ এই/
ফুটেছিলো বাগানেই/ রেখে যাবো/ ফিরে যাবো/ সময় হয়েছে রাত্রি নামার"

ঘাম দিয়ে ঘুম ভাঙে যুবকের। মৃত্যু শুধুই শোকের নয়! মৃত্যু শান্তির, নিবেদনের, ক্ষমা করার, ক্ষমা চাওয়ার। মনে করার, মনে রাখার। এতো গুলো উদযাপন শুধু শোকের জন্য ম্লান হতে পারে না।

ফেসবুক মন্তব্য