ও তোর মাহুত চড়ায় হাতি...

সুবীর সরকার

চিলাপাতার হাটে ঢোল বাজাতে বাজাতে নিকটবর্তী হয়েছিল জার্মান রাভা।আন্দুবস্তীতে হাড়িয়া খেতে খেতে কত কত বছর আগে জার্মান তার জীবনের নানাকিসিমের গল্প শুনিয়েছিল। কত কত বাদ্যগান মোরগলড়াই কবরখানা ধামসা মাদল! এক ফাঁকে জেনেছিলাম শিবজির বৃত্তান্ত, যাকে গিলে ফেলেছিল মেন্দাবাড়ির হাতি। মাঠে মাঠে ঘুরি। ছড়ানো রোদের মায়ায় ভরভরন্ত শীতকাল। নকসাদার। অপরূপ। প্রান্তিক সব গঞ্জবাজারে উত্তরজনপদের, নিম্ন অসমের নদীজলবাতাসে পুষ্ট হতে হতে কেমন এক চিরকালিনতাই এসে যায় বুঝি। কত সম্পর্ক। বর্ণময় এক জীবন।

অসমের গৌরীপুর। সাদা ফিতের এক নদি গদাধর। লাওখাওয়ার বিল। ৩০০ বলির দূর্গাপূজা। রাজা প্রভাতচন্দ্র বড়ুয়া। রাজকুমার প্রমথেশ। লালজি রাজার গল্পগাথা। আর হস্তির কন্যা প্রতিমা বড়ুয়া। জনশ্রুতিতে ‘আজার বেটি’। গৌরীপুরের পথে পথে হাঁটি। পাগলের মত হাতি খুঁজি। সেই সব মাহুতফান্দীদের খুঁজি। আমার শরীর জুড়ে গোয়ালপারিয়া লোকগান। কাঠি ঢোল। মায়াময় এক জীবন নিয়ে আমার গতজন্মের ‘মাটিয়াবাগ রাজবাড়ি’। বিমল মালির বাজনা বাজে, বাজে সীতানন্দের সারিন্দা। প্রতিমা বড়ুয়ার গানের সুরে সুরে আমার আবহমানের অনুভুতিময় স্মৃতিকাতর কুয়াশাঘেরা জীবনের দিনগুলি জীবন্ত হয়ে বেঁচে থাকে। তুমুল এক শীতরাতে রাজবাড়ি থেকে বিমল মালির সঙ্গী হয়ে ফিরছিলাম। বিমল শোনাচ্ছিল প্রতিমার নেশাময় জীবনের হরেক গাথাগল্পগুলি। প্রতিমার জীবন,তার গান,গানময় বেঁচেবর্তে থাকবার আর্তি প্রবলভাবে উজ্জীবিত করেছিল। নাসিরুদ্দিন বিড়ি আর দেশী মদ খতে খেতে হাতিমাহুতের সে এক অন্তহীন পৃথিবী-

‘ও তোর মাহুত চড়ায় হাতি/ গদাধরের পারে পারে রে’

আবার হেরম্ব বর্মণ কে কি করে ভুলি! সাহেবপোঁতার হাটে, পাটকাপাড়ার হাটে টর্চলাইট বিক্রি করত হেরম্ব। সে ছিল আমুদে, রসিক মানুষ। কোচবিহার রাজার শিকারযাত্রায় হাঁকোয়ালি করত। ‘কুষাণ পালায়’ ছুকরি সেজে খোসা নাচতো। আবার হেমন্তের সদ্য কাটা ধানখেতে ঘুরে ঘুরে ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান কুড়িয়ে নিয়ে আসতো। হেরম্ব গল্প বলতো, যেন বহুপ্রজ এক কথোয়াল! পুরোন দিনের সব ধনীজোতদার, কোচবিহারের রাজারাণীরাজকুমারেরা কী জীবন্ত হয়ে বর্তমানে ফিরে আসতো যেন।

গল্পের পাকে পাকে, স্মৃতির পাকে পাকে জড়িয়ে যাওয়া জীবন।অথচ কোথাও জায়মানতা থাকে না! নদীতীরের বাতাসে তিরতির কেঁপে ওঠা জীবন। কাঠামবাড়ির জঙ্গল ভেঙ্গে হাতিরা বেরিয়ে আসে, হাঁটতে থাকে গজলডোবার দিকে। আমি বুঝে ফেলি, দিনে দিনে খসিয়া পড়িবে রঙিলা দালানের মাটি।

রহস্যের মায়ামাখা সেই বন্দুক প্রবাদপ্রতিম হয়ে উঠতে উঠতে বর্ষাশীতহেমন্তের দিনগুলিকে আত্মগত করতে থাকলে বিলখালের মাছেরা পাশ ফেরে নুতন খাতে প্রবাহিত জলধারায় আকুলিবিকুলির জেগে থাকবার দৃশ্যময় বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনবার প্রয়াসটুকুন নিয়ে পুরাকালীন কোন যুদ্ধক্ষেত্র যেন জীবন্তভাবেই জীবিত হয়ে ওঠে! হরিচরণের হাতে হাতে হেন্তালের লাঠি। উলটে যাওয়া কচ্ছপকে সোজা করতে করতেই তার আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে আসে। বুড়াবাবুর টাড়ির দিকে বিকেলের শেয়ালেরা। বন্দুকের জং ধরা ট্রিগারে ক্ষয়াটে আঙ্গুল রাখলেও হরিচরণকে মোটেও বয়োবৃদ্ধ মনে হয় না। বন্দুকের রহস্য ভেঙ্গে দিতে চাইলেও কোথাও বুঝি কপট এক আড়াল। রক্তপাত হাহাকার পলায়নের তাড়সে কাঁপতে থাকলেও বন্দুক কিন্তু ফোটে না। ফাটে না।গুলির শব্দের ধ্বনি প্রতিধ্বনি মিথ্যে মনে হয়।বন্দুকের গল্পটিও হরিচরণ তার উত্তরকালের হাতে বাধ্যতই সঁপে দেন!
হাহাকার ভরা পাথারবাড়ি থেকে ধুতুরার ফুল নিয়ে ফিরছে আলিজান মিঞা। নয়ারহাট জোড়শিমুলি কেশরীবাড়ি টপকে টপকে কন্ঠে গান গান নিয়ে সর্বাঙ্গে নাচ নিয়ে জলঢাকার চরে শেষতক তাকে প্রবেশ করতে হবে আর খন্ড অনুখন্ড দিয়ে আলিজান মিঞা নিজের মতন সাজিয়ে নিতে থাকবেন বৃত্তান্তের পর বৃত্তান্তই।

ফেসবুক মন্তব্য