হার

অঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়

ভীষণ আর্জেন্ট একটা কাজ নিয়ে নাস্তানাবুদ খাচ্ছি, মা এসে ঘরে ঢোকে। উদ্ভ্রান্ত চেহারা। বুঝলাম ইমিডিয়েট অ্যাটেনশন চাই।
চেয়ার ঘুরিয়ে মা-র দিকে ফিরি। কি হয়েছে?
-আমার হারটা পাচ্ছিনা?
- কোন হার? সোনার?
- না না, ওই ইমিটেশনের।
-তাই বলো। আমি চেয়ারটা ফের ঘুরিয়ে বসি।
- ঘরে টেবিলের ওপর রেখেছিলাম। কোথায় গেল?
- দ্যাখো কোথায় রেখেছ। ওখান থেকে আর কোথায় যাবে।
মা-র চোখে টেনশন। - স্পষ্ট মনে আছে ওইখানে টেবিলটার কোণায় রেখেছিলাম।
- আচ্ছা মা, ওখানে রাখলে তো ওখানেই থাকত। নেই যখন, তার মানে ওখানে রাখোনি।
এরকম কথা শুনলেই মা-র মাথায় রাগ চড়ে যায়।- তার মানে আমি ভুল বলছি?
- ভুল বলছো না, ভুলে গেছ।
সর্বনাশ! সে তো আরো অপমানজনক। বুড়ো বয়সে যত ভুল হতে থাকে তত ভুলে না যাওয়ার কথা প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লাগে বুড়োমানুষেরা।
- কইলেই হইলো! মার মুখের ভাষা থেকে মনের ভেতরটাকে স্পষ্ট পড়া যায়। যখন মাথা গরম হয় তখন ওপার বাঙলার আপনতর ভাষায় চলে যায় মা।
ল্যাপটপ ছেড়ে উঠতেই হয়। ব্যাপারটা সিরিয়াস হয়ে গেছে।
একদিকে ভালো হলো, আলমারিটা গোছানো হয়ে গেল। কিন্তু নাঃ, ইমিটেশন হারের হদিশ মিললো না। ব্যাগ, বইয়ের তাক, ডেস্ক সব খোঁজা হলো। আমার খুচরো গয়নাগাটির বাক্সগুলোও আতিপাতি করে দেখা হলো। বিকেলে দীপালি কাজে আসতে আলতো করে কথাটা বলি।
- আমি ইমিটেশন গয়না নিয়ে কি করবো? থমথমে মুখে বলে দীপালি ।
আহা ভুল তো সবারই হতে পারে, তাই না? আমার প্রতি প্রবল অসন্তোষ দেখিয়ে গজগজ করতে করতে চায়ের জল চড়াতে চলে গেল দীপালি। দেখলাম প্রাত্যহিক জীবনে ‘ভুল’ শব্দটার নেগেটিভ কনোটেশনই বেশি। যে শোনে সে-ই রেগে যায়!
চা টা সেদিন বলাবাহুল্য কড়া হয়ে গেছিল। এবং পরদিন সকালে দীপালির শরীরটা প্রচণ্ড খারাপ হয়ে যাওয়ায় সে কাজেই আসতে পারল না। এগুলো চেনা গৎ, অবাক হই না। কিন্তু মার হারের হদিশ কোথায় পাই? হে ব্যোমকেশ, হে ফেলুদা, উদ্ধার করো।
রাতের খাওয়া নমো নমো করে সারে মা। মাথাভর্তি চিন্তা কিলবিল করছে, ক্ষুধাতৃষ্ণা আসবে কোথা থেকে। গেল কই জিনিসটা? বেয়াল্লিশ বারের পর তেতাল্লিশ বার মা সেই এক কথা বলে যায়। ডাক্তারের কাছ থিকা ফিরা সেদিন তো গলাতেই পরা আছিল, পষ্ট মনে আছে। সকালে বাথরুম থিকা আইস্যা ওটা খুইল্যা বিছানার ধারের টেবিলডার উপর রাখি। ওই বইখানার পাশে। আশ্চর্য! ওখান থিকা কই গেল? ডানা মেইল্যা উইড়্যা গেল নাকি?
হজমের ওষুধটা ধরি। নাও খেয়ে শুয়ে পড়ো। কাল সকালে আবার ভালো করে খুঁজে দেখবো খন।
জলের গ্লাসটা রেখে এসে দেখি তখনো বিছানার ধারে বসে ভাবছে। ঘোর চিন্তাক্লিষ্ট মুখ।
আশ্চর্য! একটা ইমিটেশন হার, তার জন্য এই হাল! কি হলো, শুয়ে পড়ো! আমি তাড়া দিই। মা শুলে তবে ফের আমার কাজ নিয়ে বসবো। কাল সকালের মধ্যে শেষ করতে হবে। পিঠে পাউডার ঘষে দিই, চশমাটা নাকের ওপর থেকে খুলে নিই। নাও আর চিন্তা কোরো না, এবার ঘুমোও। কাল উঠে দেখবে পট করে মনে পড়ে গেছে কোথায় রেখেছ।
অন্যমনস্কভাবে বালিশে মাথা রেখে শোয় মা। চাদরটাকে টেনে গায়ে বিছিয়ে দিই। আলো নিবিয়ে বেরিয়ে আসছিলাম, হঠাৎ খেয়াল হলো ওই যা, মার চশমাটা তো হাতেই রয়ে গেছে! ঘরে গিয়ে বিছানার ধারের টেবিল থেকে চশমার খাপটায় চশমা রাখতে যাব, চমকে দেখি ও মা! এই তো ভেতরে কুন্ডলি পাকিয়ে শুয়ে মার সেই হারানিধি হার! বুঝলাম সকালে বাথরুম থেকে এসে মা ওটাকে খুলে টেবিলের ওপরে নয়, টেবিলের ওপরে থাকা চশমার খাপের মধ্যে সযত্নে রেখে দিয়েছে। আর তারপর যথারীতি ভুলে গেছে। কাছে গিয়ে বললাম, এই দ্যাখো মা, তোমার হার! ধড়মড় করে উঠে বসে মা। আলো জ্বালতে দেখি, দুচোখে আনন্দ উবছে পড়ছে । কই দেখি দেখি! হাত বাড়িয়ে হারটা নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে। মার সবকটা ফাঁকা দাঁত হাসিতে ভরে ওঠে। ওপার বাংলাকে ছুটি দিয়ে মা বলে ওঠে, সত্যি তো, এটার ভেতরে আসলো কি করে?
ভুলেও আর ভুলের প্রসঙ্গ তুলি না। মালাটা হাত থেকে নিয়ে ফের চশমার বাক্সে রেখে দিই। এখন আর ওসব ভেবে লাভ আছে? জিনিসটা পাওয়া গেছে, ব্যস। এবার নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ো!
আলো নিবিয়ে বেরিয়ে আসি।

ফেসবুক মন্তব্য