অসময়ের মুসাবিদা

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়, অর্ঘ্য দত্ত



সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ সভ্য হওয়ার কথা। সভ্যতার সংজ্ঞাও নতুন করে লেখা হয় সময়ের প্রতিটি চৌরাহায়। তাই এক শতাব্দীর সভ্যতার ধারণার সঙ্গে সর্বৈব মিল থাকে না অন্য শতাব্দীর। আধুনিক মানুষ নতুন করে লেখে তার সময়ের সভ্যতার খসড়া। আমাদের মনে হচ্ছে তেমনি এক সভ্যতার নতুন মুসাবিদা চলছে যেন এসময়ে। নির্দ্বিধায় আমরা এখন এমন একটা অশান্ত হিংস্র সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি যে বোধশক্তি ভোঁতা হয়ে আছে, ধন্ধ জাগছে পুরোনো বোধে, লিখতে বসে আঙুল চলছে না, নিজেকে হয় অসৎ মনে হচ্ছে, নয় তো পিছিয়ে পড়া মানুষ। সাধারণভাবেও মানুষের ধৈর্য্য কমছে। মানুষ সাহিত্য পড়ছে কম। ধর্ম আর রাজনীতির ইস্তাহার পড়ছে বেশি। এমন নয় যে সাহিত্য পড়লেই তাদের মন বদলে যেত। তারা মেট্রো ষ্টেশনে আলিঙ্গনাবদ্ধ যুগলকে না পিটিয়ে ঘরে এসে নিজের বৌকে আদর করত। তবু বলা কি যায়? ঝড়, বাদল, নিম্নচাপ নিয়ে জেরবার জীবনেও তো বসন্ত আসে, ফুল ফোটে! সেই আশায় লোডশেডিঙের রাত্তিরে কী-বোর্ডের ওপর মোম গলে, রাতজাগা চোখ অক্ষর খোঁজে। কোন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে লেখা এসে জমা পড়ে বম্বেডাক সম্পাদকের ইন-বক্সে। একদম অচেনা নাম অথচ লেখা দেখে মনে হয় লোকাল বেকারীর সদ্য সেঁকা পাঁউরুটি-কেক। যদিও সে সংখ্যা যথেষ্ট নয়। আরো নতুন লেখা খুঁজি, কিন্তু পাচ্ছি কোথায়!

যে সাহিত্য পৌনঃপুনিক, সমসাময়িকের থেকে নিজেকে আলাদা করে সরিয়ে রাখা তার কি আদৌ কোনও যৌক্তিকতা আছে? সৎ সুস্থ সাহিত্য সময়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে থাকে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নির্মাণের (এবং বিনির্মাণের) রীতিপদ্ধতি বদলে যায়। বিষয়, ভাষা এবং শৈলী সংক্রান্ত নিরীক্ষা বম্বেডাকে সর্বদাই স্বাগত। সঙ্গে সঙ্গে অনুশীলনের লেখা ছাপতেও আমরা আগ্রহী। কারণ জানি কৃতীদের পাশে পাশে নতুনদের লেখা তাদের উৎসাহ দেবে, দায়িত্ব বাড়াবে। ক’দিন পরেই তারা এমন একখানা লেখা লিখে ফেলবে যাতে বদলে যাবে ক্ষয়িষ্ণু সমাজ। হয়তো কেউ সেই লেখা পড়ে অবসাদের অন্ধকার সুড়ঙ্গর শেষে আলো দেখতে পাবে। হঠাৎ মনে পড়ে যাবে বেঁচে থাকা ব্যাপারটা নেহাত মন্দ নয়। কে বলতে পারে? তেমন নতুনরা লেখা পাঠান। ভালো লেখা। ধক্ আছে এমন লেখা। আরো বেশি বেশি করে।

ইতিমধ্যে, বম্বেDuck গত এক মাসে দুটো অনুষ্ঠান করে ফেলল মুম্বাইয়ে। প্রথমটি 'মঞ্জরী', সাংস্কৃতিক সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে। দ্বিতীয়টি কলকাতার 'শাম্ভবী'-র সঙ্গে একসাথে। এবং এর আয়োজন করতে গিয়ে আমরা টের পেলাম এখানকার সাধারণ মানুষের সাহিত্যপ্রীতি। শুধু যে অনেক বই বিক্রি হল তাই নয়, মানুষ মন দিয়ে প্রায় চার ঘন্টা বসে দেখল নতুন বইয়ের উদ্বোধন। শুনলো পশ্চিমবাংলায় অকালমৃত কবি সুপ্রভাত রায়ের কথা, নতুন করে প্রকাশ করা হল তার বই। নাচ-গান নয়, শুধুমাত্র কবিতা পাঠ ও সাহিত্য আলোচনায় এত মানুষের এমন সপ্রাণ উপস্থিতি যেন এক নজির স্থাপন করল।

এসব দেখেশুনে স্বাভাবিক ভাবেই আমরাও বেশ উদ্বুদ্ধ। ঠিক হয়েছে মাসিক সাহিত্য আড্ডার আয়োজন করবে বম্বেDuck। আমাদের কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ততা বাড়ছে, সময়ের আকাল, তবু দুটি বিষয়ে আমরা মনস্থির করেছি, এক: বম্বেDuck-এর নিয়মিত প্রকাশ এবং দুই: নতুন নতুন কবি, লেখক খুঁজে বের করা। পরিচিত পুরোনো কবি-লেখকদের লেখার পাশেই যাদের লেখা নতুন আলোর ঝলকানি নিয়ে ঝলমল করবে।

ফেসবুক মন্তব্য