পুরোনো ছাতা

বর্ণালী মুখোপাধ্যায়



কোন পুরোনো অভ্যেস ছাড়তে পারি না মল্লিকা। না তোমাকে, না ঘরের কোণে সোজা করে রাখা পুরোনো ছাতাটা। ওটা বাবার ছিল। বাবা টিউশন পড়াতে গেলে ঐ ছাতা থাকতো বগলে। কি করে আমাদের ওলোট পালোট সংসারে আজো এঁটুলির মতো এঁটে রইলো সে এক বিষাদ আখ্যান। পরীক্ষা গুলিতে কোনমতে উৎরে বাবার কাছে অনিবার্য ঐ ছাতা পেটা খেয়েছি আমি। তারপর গর্ভস্রাব আমাকে আর ছাতাকে আর মা কে রেখে বাবা চলে গেলো। বাবার পুরোনো লুঙ্গি আর গেঞ্জি ঘর মুছতে লেগে গেল, ঘড়িটা অচল হলে সারানোর তাগিদে রেখে এলাম পপুলার ক্লক সেন্টারে, আনলাম না আর। কিন্তু ছাতাটা ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে কেমন একবগ্গা। আমাদের বারান্দা হীন এক কামরার কোয়ার্টারে দৃশ্যান্তর নেই, যেহেতু, ঘোর বর্ষায় ঘরের সিলিঙের কাছাকাছি তার বেঁধে কাপড় শুকোয়, সেখান থেকে গামছা আর শার্ট নামাতে আকশির মতো ব্যবহার হয় ছাতার ডাঁট। একদিন উত্তাপে ফেটে পড়া কলোনির রাস্তায় আমি হাঁটছিলাম, মাথায় ঐ ছাতা, পড়শীর ছোট ছেলেটি স্কুল থেকে ফিরছে। টমেটোর মতো লাল তার মুখ। শৈশবের সামনে দাঁড়ালেই উথাল পাথাল হই আমি। আজও হলাম। আশুকে কাছে টেনে ছাতা ধরলাম তার মাথায়। সে খুব অবাক হয়ে বললো-"চাচু, ইয়ে যাদু ছত্রী হ্যায় ক্যায়া!!"

আসলে অজস্র ফুটো দিয়ে সরু সরু হয়ে আলো ঢুকে পড়ছিল সেই ছাতার গা বেয়ে, আলো উছলে পড়ছিল যেন। কথাটা খুব মনে ধরলো আমার ।বললাম, "বটেই তো। তুই আসবি আমার বাড়ি, ম্যাজিক দেখাবো ক্ষণ।"

ছাতাটা দরজার কোণে টিকে গেল। তুমি আপত্তি করলে না। কিসেই বা আপত্তি করো তুমি! এতো সহজ তুমি, এতো সোজা সাপ্টা, বহুবার কষে ফেলা অঙ্কের উত্তর যেন!

এই যে আজ স্নান করে এসে আমার চোখের সামনে উজ্জ্বল আলোকবৃত্তে দাঁড়িয়ে তুমি উদোম হলে,পাউডার লাগাচ্ছো, নাগা সন্ন্যাসীর শরীরে লেপ্টে থাকা ভস্মের মতো থুপথুপে পাউডার তোমার বিভাজিকা জুড়ে ফুটে রইলো, আমার অপমান বোধ হয় খুব। আমার পৌরুষ কি এতো জোলো, এতো বিস্বাদ ডাল ভাত, এতো ব্যবহৃত মল্লিকা যে তুমি আজকাল একটিবারও সঙ্কোচ করো না আর।

আমাদের সংসার পরিধি এই তো ছিল মলি। গত কুড়ি বছর ধরে, এই এক কামরার কোয়ার্টার। শুরুতে তুমি সন্ধের স্নান সেরে ঘুপচি রান্না ঘরে ঢুকে যেতে। কাপড় বদল ছিল যেন এক উৎসব! কখনও শ্যামল হাতটি বাড়িয়ে বলতে-শুনছো, খাটের উপর ব্লাউজটা আছে, একটু দেবে?

আমি সেই আঙুর লতা হাতে, শাখায়-পলায়-জলতরঙ্গে রোমাঞ্চিত হয়ে একটি নিরুচ্চার আহ্বানে ডুবতে ডুবতে, ভাসতে ভাসতে একটি ঘাটে এসে পৌঁছোতাম, অথবা কোথাও না পৌঁছে শুধু খুঁজতে খুঁজতে দেখতাম, ঘুপচি রান্নাঘরের অনেক উপরে আরও ঘুপচি জানলাটার গায়ে কচি কলাপাতা রোদ। সন্ধের তরকারী ডাল টক গন্ধ ছাড়ছে। তুমি ঘুমিয়ে গিয়েছো তবু অসম্বৃত আঁচল সামলে রেখেছো, তৃপ্ত ক্লান্তি তোমার চোখের পাতায় খুব ভারী ঘুম এনে দিয়েছে, আর শাড়ির প্রান্ত ভাগে একটি আলগোছ পায়ের পাতা। আমি তোমার সেই ব্রীড়ার শরীরে আবার হাত ছোঁয়াতাম।

মল্লিকা ডেকে বল্ল-'পিঠের হূকটা লাগাও তো অসিত। আজকাল বাঁদিকের বুকটা ভারী লাগে। কেমন শক্ত ড্যালা যেন। ডাক্তার দেখাবো একবার।'

অসিত যণ্ত্রের মতো উঠে আসে। ব্রায়ের জং ধরা হূক লাগাতে তেতো লাগে তার।

মল্লিকার 'শক্ত ড্যালা পাকানো' শব্দটা শব্দ হয়ে ঘরের বাতাসে ঘুরপাক খায়। সে জবাব করে না। মল্লিকা আয়না দিয়ে স্বামীর মুখটা খোঁজে। খুঁজে পায় না বলে রুটি করতে যায়।

নির্মল জানা তাকে একটা ঠিকানা টেক্সট করেছে। জুলি সিঙের মাসাজ পার্লার। কলোনির বাইরে পরিচিত রাস্তাগুলি খুব সরু হয়ে অলিগলি হয়ে এলে, সন্ধের পরে যাওয়া যায়। গেরস্ত পাড়াতেই পার্লার। বাছা বাছা লোকজন যায় নিয়মিত। নির্মল বলেছে - জুলি খুব হাইজিন মেন্টেন করে, সে নিজে আর তার কর্মচারী মেয়েটি, সকলে।

অসিত ভাবে যাবে, একবার যাবে। তার সঙ্কোচ হয় তবু। নির্মল আশ্বস্ত করে তাকে - "বায়োলজিকাল নিড এড়াবে কি করে শুনি। সবই অব্যেস। তোমাদের ছেলে নেই, পুলে নেই, তোমার চাকরিতে উথ্থান বা পতন নেই, বৌরা ওরম মেদিয়ে গেলে যেতেই হয়। চেঞ্জ আনো, একটা ঢিল মারো, দ্যাখো জল তিরতিরিয়ে কেঁপে উঠলে আলাদা ফিলিং। এটা অভ্যেস। মনে ঢুকতে দিও না।"

অসিত নির্মলের হাত ধরে বলে - "দেখো নির্মল, তুমি বন্ধু তাই বলছি। কেউ যেন না জানতে পারে, আমার রেপুটেশন, মল্লিকা কিন্তু ভালো মেয়ে খুব।"

নির্মল হো হো করে হেসে বলে "ফিনান্সের ক বাবু গত পাঁচবছর যাচ্চেন, আসচেন!! জানতে কি এদ্দিন।"

অসিত রাজি হয়।

আজ সন্ধের আলো যেন একটি অন্য যণ্ত্রনা ছড়ালো। পরিচিত ঘর উঠোন, বেসামাল বিছানা, সস্তার ধূপ দানি থেকে উঠে আসা তীব্র ধোঁয়া আমার কোষগুলিতে সঞ্চারিত আজ। আমি আমার জিন্সের উপর সাদা কুর্তা পরলাম। একটি পারফ্যুম বহুদিন ব্যবহৃত, ঐটাই আবার গলায় ও বাহুমূলে, আমার সদ্যকামানো গালে আফটারশেভ।

মল্লিকা আজ সন্ধেয় স্নান করে নি, কারণ এ শহরে আজ জোলো হাওয়া। কারণ এ শহরে আজ বৃষ্টি আসবে। একটা ঢলঢলে নাইটিতে অন্তর্বাস হীন উন্মুক্ত শরীর যথারীতি এতো খোলামেলা যেন কেউ কোথাও নেই। নারীটি একা!!

সে বললো- 'বেরোচ্ছ!'
আমি বললাম- 'হ্যাঁ।'

সে কেমন গলায় বললো- "জ্বর এসেছে অসিত, বাঁদিকের বুকে খুব ব্যথা। লাল হয়েছে যেন। দেখো একবার।"

আমি তাড়াতাড়ি- "এখন নয় পরে", বলে হুড়মুড়িয়ে বেরোতে গিয়ে সেই ছাতাটায় হোঁচট খেলাম। সেটা শুয়েছিল দরজার আড়াআড়ি। আমি সেটাতে লাথি মেরে বেরিয়ে এলাম বাইরে।

তখনই অসিতের সঙ্গে এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল। দুমুখী রাস্তার কিনারে এসে সবে সে পৌঁছেছে, এমত সময় একটি অতিবৃহৎ পুরোনো ছাতার বাঁট তাকে পিছন দিকে টানতে লাগলো। একটি তেলগন্ধ রাত্রিবাসে বেসামাল মেয়ে, তার রগের চুলে চুনের দাগ, তার বাম স্তন বেয়ে ধীরে ধীরে পিঁপড়ে গুলো উঠছে, ঢুকছে, সুড়ঙ্গ বানাচ্ছে শরীরের ভিতর! অসিতকে বলেছিল,‘একবার দেখবে অসিত!!’

অসিতের হঠাৎ শ্বাস বন্ধ লাগে, মল্লিকার ঐ তেল গন্ধটুকু বাদ গেলে আর কি কি থাকবে! একটা ছাতা, খাট বিছানা আর ঘরবারান্দায়!! সেই কি থাকবে কোথাও। তবু ফিরতে ইচ্ছে করে না অসিতের! তবু সে যেতেও পারে না জুলির ম্যাসাজপার্লার।

বেওকুফ হয়ে মাঝপথে দাঁড়িয়ে থাকে অসিত।

ফেসবুক মন্তব্য