বিস্ময়কর কৈলাস

পার্থ প্রতীম চ্যাটার্জী

প্রায় ১২৫০ বছর আগের কথা, দক্ষিণ ভারতের এক প্রবল প্রতাপশালী রাজা বেশ কিছুদিন ধরে খুব দুশ্চিন্তায় ভুগছেন, রানির উপবাস ভাঙ্গানোর সমাধান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে। রাজা কিছুকাল আগে অবধি এক মারনরোগে ভুগছিলেন আর রানি তাঁর সেরে ওঠার জন্য স্থানীয় শিবমন্দিরে মানত করেন, রাজা সেরে উঠলে নতুন এক শিবমন্দির বানাবেন আর সেই মন্দিরের চুড়া না দেখা অবধি রানি উপবাসে থাকবেন। রাজা তো সেরে উঠলেন কিন্তু সমস্যায় পড়লেন মন্দির তৈরি করা নিয়ে। খুব কম সময়ের মধ্যে চূড়া সহ এক মন্দির তৈরি করা অসম্ভব কাজ, আর সেটা না করতে পারলে তো রানির উপবাস ভঙ্গ হবে না। এইসময় এক স্থপতি রাজাকে পরামর্শ দিলেন যদি শিখর থেকে নির্মাণের কাজ শুরু করা যায় তা হলে মন্দির হওয়ার আগেই তার চূড়া বানানো সম্ভব, আর তা করা যাবে কেবলমাত্র কোন একটি পাহাড়কে উপর থেকে কেটে কাজ শুরু করলে। রাজার মনে ধরল এই প্রস্তাব এবং এইভাবে কাজ শুরু করে কিছুদিনের ভিতরই মন্দির তৈরি হওয়ার অনেক আগেই শেষ হল চুড়া নির্মাণ, আর রানি ভাঙলেন উপবাস। কিন্তু মন্দির তৈরি বন্ধ হল না, রাজার তত্বাবধানে প্রধান স্থপতি এবং বাকি অনেক শিল্পী মিলে চালিয়ে গেলেন স্থাপত্য শিল্পের এক অসামান্য ইতিহাস রচনার কাজ, পাথরের বুকে লেখা হল এক অভূতপূর্ব শিল্পপ্রেমের কবিতা। আমি ইলোরার ১৬ নং গুহার কথা বলছি। এই গুহা-মন্দির সৃষ্টির অনেক প্রচলিত কাহিনীর মধ্যে উপরোক্ত কাহিনিটির উল্লেখ পাওয়া যায় “কৃষ্ণ যাজ্ঞবল্কি” লিখিত “কথা-কল্পতরুতে”।

মনে পড়ে, খুব ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে গীতাঞ্জলী এক্সপ্রেসে চেপে বোম্বে বেড়াতে আসার সময়, ট্রেন যাত্রার দ্বিতীয় দিনের দুপুরে ভুসওয়াল স্টেশনে ট্রেন থামতে বাবা বলেছিলেন, এখান থেকে চেঞ্জ করে আওরঙ্গাবাদ যাওয়া যায়, আর আওরঙ্গাবাদ থেকে ইলোরা এবং অজন্তা দেখতে যেতে হয়। সেবার আর সময় হয়ে ওঠেনি ইলোরা বা অজন্তা দেখতে যাওয়ার। ইলোরার স্থাপত্যের প্রথম দর্শন হয় সত্যজিৎ রায়ের লেখা “কৈলাসে কেলেঙ্কারি” গল্পের উপর তৈরি সন্দীপ রায় পরিচালিত সিনেমা দেখার সময়। ততদিনে অবশ্য চাকুরীতে বদলি হয়ে আমি মুম্বাই এসে পড়েছি। এর কিছুদিন পর গেলাম ইলোরাতে, কৈলাসের দর্শনে।

ভারতবর্ষের প্রাচীন অনেক স্থাপত্যের মতোই ইলোরাও বিভিন্ন ধর্ম, শিল্প এবং সংস্কৃতির সমন্বয়ের প্রতীক, এখানে হিন্দুধর্মের ভাবনার সঙ্গে মিলেছে বৌদ্ধ আর জৈনধর্ম। ইলোরাতে মোট ৩৪টি গুহা আছে, ১-১২নং গুহা বৌদ্ধধর্মের আদর্শে তৈরি, ১৩-২৯নং হিন্দু গুহামন্দির এবং শেষ ৫টি অর্থাৎ, ৩০-৩৪নং জৈন-মন্দির| অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভাবে এই ৩৪টি গুহার মধ্যমণি, ১৬নং গুহা, যা “কৈলাসনাথ মন্দির” নামে পরিচিত|




অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি রাষ্ট্রকূট বংশের রাজা, মহারাজ কৃষ্ণের (প্রথম) রাজত্বের সময় কৈলাসনাথ মন্দিরের সৃষ্টির কাজ শুরু হয়| কিছু ঐতিহাসিকের মতে মহারাজ কৃষ্ণের পূর্ববর্তী রাজা, মহারাজ দন্তিদূর্গের আমলে শুরু হয় এই নির্মাণকার্য। যদিও এই গুহা-মন্দির তৈরির সঠিক সময় বা কারণ নিয়ে মতভেদ আছে কিন্তু এটা ঠিক যে রাষ্ট্রকূট রাজাদের নেতৃত্বে সেই যুগের অসামান্য সব স্থাপত্য শিল্পীরা পাথরের বুকে লিখেছিলেন মধ্যযুগীয় দক্ষিণ ভারতীয় স্থাপত্য শৈলীর এক অভাবনীয় আখ্যান। আজ থেকে প্রায় ১২৫০ বছর আগে, কৈলাসনাথ মন্দিরের নির্মাণকার্যের সূচনা হয় এবং সম্পূর্ণ হতে ১০০ বছরের ও বেশি সময় লাগে। এই মন্দিরটির নির্মাণের বিশদ পরিকল্পনা করা হয়েছিল এর শুরুর সময় এবং পরবর্তী রাজা ও শিল্পীরা তা পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে অনুসরণ করেছেন।

মন্দিরটি দেখতে একটি বহুতল ভবনের মতো কিন্তু একটিমাত্র পাহাড়কে উপর থেকে ধীরে ধীরে নিপুণ ভাবে কেটে এর রূপ দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের স্থাপত্যকে ইংরাজিতে বলা হয় “Monolithic Structure”। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে এই মন্দির তৈরি করতে গিয়ে প্রায় ২০০,০০০ টনের ও বেশি পাথর খোদাই করে তুলে ফেলা হয়েছিল পাহাড়টি থেকে। সেই সময়, যখন পাথর কাটার যন্ত্র বলতে সম্বল ছিল কেবলমাত্র ছেনি ও হাতুড়ি, ভেবে অবাক লাগে কি নিপুণতার সাথে সেই যুগে এই মন্দিরের নির্মাণ করা হয়েছিল| মন্দিরটিকে দেখলে বোঝার উপায় নেই যে এককালে এখানে একটি পাহাড় ছিল আর মন্দির ও তার আনুষঙ্গিক শিল্পশৈলী সেই একটি মাত্র পাহাড় কেটেই তৈরি করা হয়েছে।





কৈলাসনাথ মন্দির আয়তনে বিশাল, দৈর্ঘ্যে ৮৪ মিটার, প্রস্থে ৪৭ মিটার ও উচ্চতায় ৩৬.৬ মিটার, যা এথেন্সের পার্থেনন এর থেকে উচ্চতায় প্রায় ১.৫ গুন আর আয়তনে দ্বিগুণ, এবং পৃথিবীর যে কোনো প্রাচীন মন্দিরের থেকেও বৃহৎ| প্রধানদ্বার দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করে ৩৭০০ বর্গ মিটারের এক প্রাঙ্গণে উপনীত হওয়া যায় যার মধ্যস্থলে অবস্থান করছে এক দ্বিতল শিবমন্দির, আর এই প্রাঙ্গণটিকে বেষ্টন করে রয়েছে প্রায় তিনতল বিশিষ্ট স্থম্ভকার দালান যার গায়ে খোদাই করা রয়েছে বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি| প্রধান মন্দিরের নিম্নতলের দুপাশে রামায়ণ এবং মহাভারতের বিভিন্ন দৃশ্য খোদাই করা রয়েছে, আর এর তলদেশটি এমন পারদর্শিতার সাথে তৈরি করা হয়েছিল যা দেখে মনে হয় যেন অনেকগুলি হাতি মন্দিরটিকে মাথায় করে ধরে রেখেছে| প্রধান মন্দিরটির দ্বিতীয় তলে ষোলোটি স্তম্ভসহ এক বিশাল নাটমন্দির আছে আর এই নাটমন্দিরের শেষপ্রান্তে এক গর্ভগৃহে আছে ভগবান শিবের মন্দির| প্রধান মন্দিরের বিপরীতে নন্দী মণ্ডপের দুপাশের প্রাঙ্গণে রয়েছে দুই বিশাল ধ্বজাস্থম্ভ যা রাষ্ট্রকূট বংশের শৌর্য্যের প্রতীক| প্রধানমন্দির ছাড়াও এখানে রয়েছে আরও পাঁচটি ছোট মন্দির, যার মধ্যে তিনটি ভারতের তিন প্রাচীন নদী, গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতীর প্রতি উৎসর্গীকৃত| মন্দিরের অনেক ভাস্কর্যের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্য হল রাবন এর কৈলাস পর্বত উত্তোলনের চেষ্টার দৃশ্য| প্রধান মন্দিরটি তৈরি হওয়ার পর কৈলাস পর্বতের বরফের আবরণ মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য এর দেয়ালগুলিকে সাদা পলস্তারা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল| সব মিলিয়ে এই মন্দির প্রাচীন ভারতের শিল্পশৈলীর এক অভূতপূর্ব নিদর্শন, যা হয়তো আজকের যুগে আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে করাও খুব কষ্টসাধ্য ও অভাবনীয়|















এই সৃষ্টি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিল্প প্রেমীদের টেনে নিয়ে আসে বারবার| UNESCO ১৯৮৩ সালে কৈলাসনাথ মন্দিরকেএক Heritage স্থাপত্য হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে| কৈলাসের মাধুর্য আমাকেও ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকবার ইলোরাতে টেনে নিয়ে গেছে, আর প্রতিবারেই এই ১৬নং গুহায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থেকেছি অবাক বিস্ময়ে।

ফেসবুক মন্তব্য