পাওভাজির শহরে

ঋজু পাল

"কি রে বাবাই, স্টেশন থেকে ট্যাক্সি পাবো তো?"
"হুমম, বড় স্টেশন... রাত এমন আর কি হয়েছে!"
হাতঘড়িতে সাড়ে বারোটা। কেঁপে ওঠা গলার স্বর নিজেকেই আশ্বস্ত করতে পারলো না, সঙ্গে আবার বাবা রয়েছে। ব্যাঙ্গালোরের অ্যাকাডেমিক লাইফ ভালোমন্দ মিশিয়ে শেষ করে মাত্র কয়েকদিনের ছুটিতে বাড়ি এসেছিলাম। মা ঠিকই বলেছিলো, কাঁধের ব্যাগটা নামাতে না নামাতেই তো সেই গোছানো শুরু করতে হবে। তবুও ওই আর কি... ইডলি ধোসার রাজ্য থেকে ফিরে মাছভাতের সান্নিধ্যলাভের লোভ কোন বাঙালি ছাড়তে পারে? এরপর আবার সুদূর পাওভাজির শহরে ছুটতে হবে।

"বাহ, বেশ ভালো হিন্দি জানো তো... ফার্স্ট প্রেফারেন্স তবুও ইস্ট জোন?!" অর্গানাইজেশনের ভিপির মুখে ইন্টারভিউ প্যানেলে কথাটা শুনেই মনে মনে প্রমাদ গুনেছিলাম... শেষে যা হওয়ার তাই হলো... এরিয়া অফিসের বদলে পোস্টিং হলো সেন্ট্রাল কর্পোরেট অফিসে।
"কি রে সারারাত ট্রেনে থাকবি নাকি? ট্রলিটা ধর... "
ধুঁকতে ধুঁকতে ট্রেন ঢুকছে সিএসটি তে। ইসস, ভুল বললাম... সিএসএমটি... ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ টার্মিনাস... এই "মহারাজ" শব্দটা উচ্চারণ না করলে ঘাড়ে গর্দানে এক করে দেবে এখানকার লোকজন।

পরের দিনটা ছিলো খুশির ইদ। তাই নিশুতি রাতেও রাস্তার মোড়ে মোড়ে লোকের ভিড়। আলোঝলমলে রঙিন পসরা সাজানো। উবেরের খোলা জানলা দিয়ে মুখটা বার করতেই দমকা হাওয়া ঝাপটা মারলো। একই রকম ঘ্রাণ, একই রকম শীতলতা, একই রকম স্পর্শ... তবে যে সবাই বলে মুম্বাই বড়ই আলাদা।

"দাদা, কোলকাত্তা সে হো?"
"জি, আপ প্রপার মুম্বাই সে?"
"নহি জি, মেরা ঘর তো লক্ষ্ণৌ... দশ সাল হো গয়া ইধার... শাদী ভি ইধার কিয়া ম্যয়নে।"
"ক্যয়সা হ্যেয় মুম্বাই? আচ্ছা লগতা হ্যেয়?"
"স্রিফ হাজার রুপেয়া লেকর আয়েথে ইধার কাম মাঙনে... আজ দেখো কাম ভি হ্যেয়, দো বক্ত কা রোটি ভি মিল রহা হ্যেয়... তো আচ্ছা হুয়া না মুম্বাই... ও ক্যেয়া বলতে হো আপ বাঙ্গালি লোক... ভালো... মুম্বাই ভালো আছে... হা হা... "
"আচ্ছা লগা আপসে বাত করকে... আসলি বাত ঘরসে ইতনা দূর... মাম্মি পাপাকো ছোড়কর রহনা হোগা... ইসিলিয়ে পুছা...।।"

হোটেলের নরম বালিশে মাথা রেখে ক্লান্ত চোখদুটো বন্ধ করতে গিয়েও মাথায় এলো উবেরচালক আহমেদ ভাইয়ের শেষ কথাটা...
"শুরু তো কিসি এক কো করনা হোতা হ্যেয় না দাদা... আপ প্যয়ার করনা স্টার্ট করো ইস শাহের কো... সেম প্যয়ার ঘুমকে আপকে পাস আয়েগা... জিন্দেগী কি মাফিক... খুদা হাফিস দাদা... আচ্ছাসে রহনা। 

যে পিজিতে এখন উঠেছি, বলা ভালো অফিসের কাছাকাছি বাজেটে যা পেয়েছি, রুমমেটরা সবাই দক্ষিণী। দুজন কেরালার আর একজন চেন্নাইএর। বার্তালাপ শুধু ইংলিশেই হয়, হিন্দির হ এরা জানে না নাকি বলতে চায়না সেটা জানি না। একটা ওয়ান বিএইচকে তে চারজন থাকি। কিচেন, ওয়াশিং মেশিন, ফ্রি ওয়াইফাই এমনকি একটা ছোট টিভিও আছে। হয়তো একজন কর্মরত ব্যাচেলার এর আর কিছুরই দরকার হয়না, তবুও ক্লান্ত শরীরে অফিসের পর রুমে এসে মনটা চায় একটু স্বস্তি... একটু শান্ত পরিবেশ... চেয়ার নিয়ে ব্যালকনিতে বসে খানিকটা নিরালায় নিজের সাথে আড্ডা... সেটা হয়ে ওঠেনা। হয়তো ভবিষ্যৎ এ নিজের জন্য আস্তানা ঠিকই খুঁজে নেবো।

এখন আমি থাকি ঘনশোলির সেক্টর ফাইভে। নভি মুম্বাইয়ের হার্বার লাইনে এর অবস্থান। মফঃস্বল শহর বলার চেয়ে গ্রাম বলাই ভালো, গায়ে লেগে থাকা মুম্বাইয়ের ট্যাগলাইনটা বড়ই বেমানান। বাজারহাট ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। হাস্যকর লাগে এখানকার সব ওষুধের দোকান আর মুদির দোকান এক... মানে ওই ওষুধের দোকানে ম্যাগি পাওয়া যায় আরকি। একটা ডিমার্ট আছে... ভীষণ সস্তায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাওয়া যায়। চোখে পড়ে এখানকার সব বাড়িতেই যেসব মহিলারা রান্নার কাজ করতে আসেন, তারা সবাই বাঙালি।

অফিস আইরোলি সেক্টর 19-এ। আমাদের হাওড়া-খড়গপুর লাইনের লোকালের মত এখানকার লোকাল ট্রেনগুলো নয়। প্রতি পাঁচমিনিট অন্তর অন্তর ট্রেন আসে। ট্রেনের চারটে কম্পার্টমেন্ট প্রথম শ্রেনী। চমকে উঠলেন? লোকালে প্রথম শ্রেণী? হ্যাঁ... নর্মাল সেকেন্ড ক্লাসে দুটো স্টপেজ যেতে যে টিকিটের দাম পাঁচটাকা, ফার্স্ট ক্লাসে সেটাই চল্লিশ টাকার কাছাকাছি। প্রথম প্রথম না জেনে খালি দেখে উঠে পড়তাম ফার্স্ট ক্লাসে।

আইরোলি স্টেশন থেকে অফিসের বাস ছাড়ে। দশমিনিট ছাড়া ছাড়া। পিক আপ এন্ড ড্রপের সুযোগটা ভালোই, নয়তো অটোতে উঠলেই চল্লিশ টাকা। দশমিনিট বাসে MIDC এর প্রজেক্ট গুলো রাস্তার ধারে দেখতে দেখতে গিগাপ্লেক্সে পৌঁছাই। আইটির বড় বড় সব অফিস এখানেই। আমার ফ্লোর থেকে রীতিমত দূরের রুক্ষ পাহাড়, ট্রেনলাইন দেখা যায়, যদিও মন ভরেনা। বড্ড শব্দ, বড্ড ব্যস্ততা মনকে ধরে রাখে... হারাতে দেয়না।

অফিস টিমে সবাই আমার চেয়ে সিনিয়র, বয়স এবং ডেজিগনেশন দুটোতেই। কাজের চাপ সেভাবে প্রথম প্রথম অনুভব করতাম না কর্পোরেট অফিস বলেই। প্রোটোকল আর মেকী হাসি মুখে রেখে অফিস ম্যানার্স রপ্ত করতে হতো। আস্তে আস্তে প্রজেক্টের কাজ আসতে লাগলো। সমস্যা হলো যখনই আমার কোন কাজ রিপোর্টিং ম্যানেজারের ভালো লাগতে শুরু হলো, ওমনি ধপাধপ আরো গুরুদায়িত্ব এসে পড়তো কাঁধে।
সবদিক সামলে যখন অফিস থেকে বেরোই, পা টা ঠিক চলেনা। বাসে উঠেই এলিয়ে পড়ি সিটে। একটা বিরক্তিকর দিনের অবসান, আবার যা ফিরে আসবে চেনা ছবি নিয়ে আগামীকাল...!

"ঘর যা ভাই... আট বাজনে ওয়ালা হ্যেয়... ইয়াদ সে ক্যালপল লেনা ডিনার কে বাদ।"
মাঝেমাঝে সিনিয়র কলিগদের যত্নশীল মনোভাব কর্পোরেট সম্পর্কে চিন্তাভাবনা পাল্টাতে বাধ্য করে, আবার কখনো বিরক্তি, অত্যাধিক প্রত্যাশা, বিষন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সোমবার থেকে শুক্রবার একটা চক্রাকারে সময় কাটতে থাকে। সকাল সাড়ে পাঁচটায় ঘুম থেকে ওঠা, ব্রাশ করে স্লিপার গলিয়ে নীচে নেমে খানিক মর্নিং ওয়াকের চেষ্টা করা, সামনের কালীমন্দিরের দাওয়ায় খানিক বসে জেগে ওঠা মুম্বই কে দেখা, ফিরে এসে স্নানটানের কাজকর্ম সারা, দুটো ধূপকাঠি জ্বালানো ঠাকুরের সামনে, ড্রেসট্রেস পরে আইডি গলায় ঝুলিয়ে খবরের কাগজ পড়া, ঘড়ির কাঁটায় সাতটা পঞ্চাশ বাজলেই পড়িমরি করে ব্যাগপত্র নিয়ে স্টেশন পানে দৌড়ানো, আটটার লোকাল ধরা, এবং সাড়ে আটটার মধ্যে অফিসে ঢোকা... ব্যাস এই রুটিনের অদলবদল আজ ওব্দি একটুও হয়নি। অফিস ক্যান্টিনে মিসল পাও কি সাবুদানা খিচড়ি দিয়ে ব্রেকফাস্ট সারতে সারতে মা বাবা কে আলাদা আলাদা করে ফোন করে অফিস পৌঁছে গেছি, এই খবর জানানো টাও রুটিনের মধ্যে পড়ে।

কাজ করতে ভালোলাগে। বেশী বেশী করে চাপ নিতে ভালো লাগে। নতুন জয়েনি হয়েও বড় দায়িত্ব নিতে ভালো লাগে। সবাই ভাবে এই ছেলের কাজের প্রতি বিশাল ঝোঁক। আদপে তা কতটা সত্যি বলতে পারবো না। ওই যে ভালোবেসে বিয়ে আর বিয়ের পর ভালোবাসা এই দুইয়ের মধ্যে যেমন একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে, এটাও ঠিক তেমনই। সব কিছু করি ব্যস্ত থাকার জন্য... যত বেশী ব্যস্ত থাকবো তত কম নেগেটিভ চিন্তাভাবনা মাথায় আসবে... তত বেশী ভালো থাকবো... আর তত বেশী ভালো রাখতে পারবো... মা বাবা কে। তবে অত্যাধিক ধকল শরীর বিগড়ে দেয় মাঝেমধ্যেই, নতুন জায়গার খাদ্যসম্ভার মুখে রোচে না, হঠাৎ হঠাৎ দুর্যোগ নেমে আসে জীবনে, ফলত দমবন্ধ হয়ে আসে এক এক সময়ে।
তারপর দেখতে দেখতে ক্লান্ত শুক্রবারের রজনী নেশাতুর চোখে বিদায় নেয়। চলে আসে উইকএন্ডের মেকি সুখ। আলস্য আর অসহয়তায় মোড়া দুটো দিন। সময় কাটতে চায় না... কারোর কারোর অভাব বড্ড বেশী ধরা পড়ে তখনই। বিনা কারণেই মনটা ঝিমিয়ে যায়, বিছানায় শুয়ে ফেসবুকের টাইমলাইন কেবলই স্ক্রল করে যাই।
নাহ, বন্ধুভাগ্য আমার ভীষণই খারাপ। ছোট থেকেই একরাশ প্রত্যাশার পাহাড় এক এক করে বন্ধ করে দিয়েছিল পড়াশোনার বাইরের দুনিয়ার জগতটাকে। কখনো সেভাবে নিজেকে খুলে সবার মাঝে মিশে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। স্বভাবতই কলেজ লাইফও সেভাবেই কেটেছে। মিশতাম সবার সাথে, কিন্তু গভীরতা টুকু মাপা যেত... খালি চোখে দেখা যেত। একটা সময়ের পরে যোগাযোগ কমতে থাকলো এবং পুরোনো ইতিহাসের খোলা পাতাটা আবারো ভেসে উঠলো মানসচক্ষে। এলো সোশ্যাল মিডিয়ার দুনিয়া... সাকুল্যে যে দু তিন জন ভালো বন্ধু হয়েছিল তাদেরকে ধরে রাখার প্রবণতা পেয়ে বসলো... আর বাঁধলো এখানেই চেনা গন্ডগোল... যাক সে কথা।

কয়েকমাসের কথা। আইরোলি স্টেশন চত্বরে অফিস বাস এসে দাঁড়ালো। সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা। দ্রুতগতিতে পা চালিয়ে সবাই ছুটছে ট্রেন ধরার জন্য।
"স্যার প্লিজ হেল্প আস" 
থমকে দাঁড়িয়েছিলাম প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির গলার আওয়াজে। উপেক্ষা করতে গিয়েও করতে পারিনি... ভাগ্যিস পারিনি।

সেদিনের পর কেটে গেল এতগুলো দিন। এখন প্রতি রোববার কাটে সামনের বস্তির বাচ্চাদের সাথে। পঁচিশের কোঠায় পা রাখা আমরা তিনজন পালা করে শিখিয়ে যাই অঙ্ক, ইংলিশ আর জিকে। ওদের ভাষা আমি বুঝিনা... ওদের শূন্য দৃষ্টি আমি পড়তে পারিনা... ওদের চোখের জল আমি দেখতে পারিনা... পারি যেটা, সেটা কেবল খানিকটা ভালো সময় উপহার দিতে। মনকেমনের প্ল্যাটফর্মে সবসময় বসে থাকা ছেলেটা যদি একজনেরও মন ভালো করতে পারে, তাহলেও কি ট্রেন আসার খবর সে পাবে না?

এক দিকে তো পিএমএফবিওয়াই এর প্রজেক্ট নিয়ে নাকানি চোবানি খাই অফিসে, তো অন্যদিকে ট্রাক্টর আর এন পি এ অ্যাকাউন্ট নিয়ে বিস্তর ঝামেলা পোহাতে হয়। তো এসব সামলে সুমলে ব্যাগপত্র গুছিয়ে যখন গ্রাউন্ড ফ্লোরে নামি... লাস্ট বাসটাও বেরিয়ে যায় প্রায়ই।

"স্টেশন জায়েঙ্গে আপ?"

সুবেশা তরুণীর উগ্র পারফিউমের গন্ধ দমকা হাওয়ায় নাকে এসে লাগলো। আড়চোখে আইডি দেখে বুঝতে পারলাম... কগনিজেন্ট। এদের বাস ও কি বেরিয়ে গেছে? ঘড়িতে অবশ্য নটা চল্লিশ।
ঘাড় এলিয়ে সম্মতি দিতেই তরুণীর তড়িৎগতিতে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা খালি অটোতে উঠতে দেখে, আমি তো কোন ছাড় খোদ অটোচালক ওব্দি ঘাবড়ে গেল। হ্যাঁ, শেয়ারিং ছাড়া অটোয় খুব একটা উঠি না বলে, অভ্যাসবশত চড়ে বসলাম। 
"চলিয়ে দাদা, স্টেশন ...।"
ঠান্ডা বাতাস যেন চামড়া কেটে শরীরের মধ্যে ঢোকার চেষ্টা করছে। মা'র সাথে ফোনে কথা বলতে গিয়ে অসাবধানবশত পাশের জনের গায়ে হাল্কা ধাক্কা লাগলো। ছ্যাঁকা খেলাম যেন... গা গরম নাকি... বোঝার উপায় নেই যদিও... ইয়ারফোন লাগিয়ে তিনি এলিয়ে পড়েছেন এককোণে।
"হম তুম এক কামরে মে বন্ধ হো... ওর চাবি খো যায়ে..."
এ অটোওয়ালা আবার গান গাইতে শুরু করলো কেন... মেয়ে দেখে নাকি! কি আপদ... দেখো দেখো কোন গলির মধ্যে ঢোকাচ্ছে..." আরে ও দাদা সিধে রাস্তে সে চলোনা... ইধার কিউ ঘুমা রহে হ্যো..."
"পুরা জ্যাম স্যার আইরোলি চক মে... আধা ঘন্টা লগ জায়েগা উধার সে জায়েঙ্গে তো...।"
কথাটা যে পুরোপুরি মিথ্যে নয় সেটা জানি, আইরোলি সার্কেলের জ্যাম গোটা মুম্বাইয়ের লোকের চেনা। কিন্তু, এই অন্ধকার মাখা মার্কেটের গলিপথ... সঙ্গে একজন যার কোন সাড়া শব্দই পাচ্ছি না অটোতে ওঠার পর থেকে... কেস খাবো না তো! ভালোয় ভালোয় স্টেশন পৌঁছালে হয়।
"ও ম্যাডাম উঠিয়ে ...স্টেশন আ গয়া... আরে ও ম্যাডাম...।"
চোখেমুখে জলের ঝাপটা দেওয়ার পর কোনমতে চোখ খুলে মেয়েটি তাকালো... কিছু বলার আগেই..." লিজিয়ে পহেলে থোড়াসা পানি পিজিয়ে... স্যার থোড়াসা হেল্প করোনা... সামনেওয়ালা মেডিশিন শপ পর ম্যাডাম কো... ম্যাডামজী কাঁহা জায়েঙ্গে আপ? কোপারখারনে ইয়া থানা?"
হ্যাঁ, ঘরে ঢুকতে সেদিন আমার তাই পাক্কা দেড়ঘণ্টা দেরী হয়েছিল। জ্বরগ্রস্থ মেয়েটিকে সেক্টর ফাইভে ওর পিজিতে ছেড়ে আসতে যেটুকু বাড়তি সময় লাগে আরকি। গোটা সময়ে বিশ্বাস করুন অটোচালক একবারও গান গায়নি।
"আপকা চাল্লিশ রুপেয়া দাদা... লিজিয়ে।"
"চাল্লিশ কিউ স্যার ...শেয়ারিং মে আয়ে না আপ! বিশ দিজিয়ে।"
"আরে উসনে তো উস হালত মে... উসকা ভি রখ লো..."
"ওহ তো মিল গয়া না স্যার... আজ কা দিনমে কৌন কিসি অনজান ইনসানকো ঘর ছোড়নে যাতা হ্যেয় আপনা টাইম বরবাদ করকে... উপর সে রাত দশ বজ চুকা হ্যেয়... যাইয়ে স্যার আপকা ট্রেন ছুট যায়েগা... ফির মিলেঙ্গে।"
কখন যে সশব্দে অটোটা আমার সামনে দিয়ে হারিয়ে গেছিল একটু একটু করে, আর কখন যে আমি বালিশে মাথা রেখেছিলাম ঘরে এসে... খেয়াল করিনি... বা বলা ভালো খেয়াল করতে ইচ্ছে করেনি।

তারপর একদিন নিজের আলাদা ফ্ল্যাট নিলাম, তিনমাসের সংসার ভেঙে বেরিয়ে আসতে গেলে ঠিক যতটা কষ্ট লাগে, তার চেয়ে ঢের বেশী কষ্ট পেয়েছিলাম। রুমমেটদের বিরক্তিকর স্বভাব গুলো হঠাৎ করেই মিস করতে আরম্ভ করেছিলাম।

যেদিন থেকে CRY এর সংস্পর্শে এসেছি একটা নতুন বাঁধনে জড়িয়ে পড়েছি। একরাশ কচিকাচার দল অপেক্ষায় থাকে আমাদের। ওরা কেউ স্যার বলে তো কেউ দাদা বলে। কেউ ভীষণ ভয় পায় তো কেউ ভীষণ রকম ভালোবাসে। যখন ওদের পড়াতে বসাই যেন নিজে পরীক্ষা দিচ্ছি সেটা মাথায় আসে। একটা টিনের শেড দেওয়া গ্যারেজঘরে প্রতি রবিবার একই দৃশ্য চলতে থাকে।

ওরা আমার তোমার থেকে যথেষ্ট বেশী পরিণত। তাই জানে পড়াশোনা না করলে ঠিক কি থেকে বঞ্চিত হবে! সারাদিনের পারিবারিক কলহ, মদ্যপ বাবার হাতে চোখের সামনে মাকে মার খেতে দেখা, পাশের বাড়ির কাকুর সাথে মা র পালিয়ে যাওয়া... এসব ওদের জীবনের সাতকাহন... আর পাঁচটা বস্তিতে যা হয় ঠিক তাইই, মুম্বাই বলে রূপকথার রাজত্বে এরা বাস করেনা।

যেদিন এই এনজিও তে জয়েন করি, একজন শ্রদ্ধেয় বন্ধুপ্রবর জানতে পেরে প্রশ্ন তুলেছিলেন..."কত টাকা দেবে রে?" বিস্মিত হয়ে বলেছিলাম "টাকা কোথায়... সংস্থার দেওয়ার কথা তো নয়... আর আমি দিব্যি তো নুনভাত জোগাড় করতে পারি... আর কিসের দরকার?"
বিদ্রুপের হাসি সেদিন বড্ড কানে লেগেছিল। যারা আমার কাছের বন্ধু তারা জানে ঠিক কতটা দুর্বলতা আমায় ঘিরে থাকে এই ক্ষেত্রে... ফলত দমে গেছিলাম... হ্যাঁ সত্যিই দমে গেছিলাম।

আজ যখন একটি মেয়ে তার খাতার শেষ পাতায় কতকগুলো গুন ভাগের অংক দেখাতে আসে, আর আমি বলে উঠি "পিছে কিউ কিয়ে হো... সামনে তো ইতনা খালি পেজ..."
হাসতে হাসতে বছর আটের মেয়েটির উত্তর আমার সব দমে যাওয়া এক লহমায় উড়িয়ে দিলো...
"স্যার এ তো আই (মারাঠী তে মা) কো শিখা রহি থি... দেখো না আই নে ভি কিয়া হেয়... দেখো দেখো..."

"এই ঋজু? কি রে, মাথেরান পৌঁছে গেছি, নাম গাড়ি থেকে। সেই ওঠার সময় থেকে দেখছি ডাইরি হাতে নিয়ে চুপচাপ ভেবে যাচ্ছিস কিসব। আর ইউ ওকে?"
"ইয়া, আম আল রাইট, লেটস গো।"

নাহ, দেখতে দেখতে আটমাস হয়ে গেল ।সবাই বলে বানিজ্যনগরীর সব আছে, কেবল হৃদয় টুকু নেই। আমি মানি না সেটা। মনখারাপের বিকেলে আমায় সঙ্গ দেয় নির্জন মেরিন ড্রাইভের শান্ত সৈকত, আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করে এখানকার সরল মানুষগুলো, নিজের আসল সত্ত্বা কে টেনে আয়নার সামনে নিয়ে আসে এখানকার কঠিন বাস্তবতা। সবাই ছুটছে একটা লক্ষ্যের দিকে, কিন্তু কেউ ক্লান্ত হয়ে পিছিয়ে পড়লে পাশ থেকে একটা হাত এগিয়ে আসছে সামাল দেওয়ার জন্য... এটাই মুম্বাই।

আর কি চাই বলতে পারেন? আমি তো দিব্য আছি এইখানে... এই পাওভাজির শহরে।
একবার ঘুরেই যান না, শহরের প্রেমে পড়বেন এর গ্যারান্টি তো সলমন রুশদি কবেই দিয়ে গেছেন... "You can take the boy out of Bombay, but you can’t take Bombay out of the boy."




ফেসবুক মন্তব্য