অবন্তিকা ও তার গয়নার বাক্স

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়




ঘুমের মধ্যেও অবন্তিকা কলিং বেলের শব্দ শুনতে পেল... টিং-টং। ধড়মড় করে উঠে বসল। দরজায় কেউ এসে দাঁড়িয়ে আছে। কটা বাজে এখন? এত তাড়াতাড়ি আলো পড়ে গেল? কতক্ষণ ঘুমিয়েছে সে? সন্ধে হয়ে গেল এর মধ্যেই? না, মেঘ করেছে। তাই জানলার কাঁচে আলো নেই। টলমল পায়ে উঠে গিয়ে অবন্তিকা পীপহোলে চোখ রাখল। সেই অ্যালবিনো ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে। দরজা খুলে দিলেই সাদা চোখের পাতায় একরাশ মুগ্ধতা ঝাপ্টে বলবে, ‘গুড আফটারনুন ম্যাডাম, ক্যুরিয়ার...।’ হাতের খামটা এগিয়ে দেবে। সই নেবার জন্য নাম আর ফোন-নম্বর ছাপা পাতাটাও। অবন্তিকা জানে ওই খামে কী আছে? বিপ্লবের ক্রেডিট কার্ডের মান্থলি স্টেটমেন্ট। প্রতি মাসেই আসে। এই চিঠির আলাদা কোনও রহস্য নেই। বিপ্লবই ওকে বলেছিল যাদের গায়ের চামড়া অস্বাভাবিক রকমের সাদা হয়ে যায় তাদের অ্যালবিনো বলে। এ এক ধরণের জন্মরোগ। তবে ছোঁয়াচে নয়। বিপ্লব জানে না এমন কিছু নেই এই পৃথিবীতে। কত বয়স হবে ছেলেটার? খুব বেশি হলে পঁচিশ ছাব্বিশ। চনমনে প্রাণোচ্ছল যুবক, ভাল স্বাস্থ্য, জিম-টিম করে নিশ্চয়ই। তার যে কী করে এমন রোগ হয় কে জানে! অবন্তিকার যদিও খুব একটা অস্বাভাবিক লাগে না। মানুষের কি গায়ের রঙ ফর্সা হয় না? অবন্তিকা যতক্ষণ সই করে, ছেলেটা ওর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। তা থাক, অবন্তিকা আপত্তি করে না।
সদর দরজা বন্ধ করে, চিঠিটা খাবার টেবিলের ওপর রেখে অবন্তিকা শোবার ঘরে ফিরে আসে। সে এমন কিছু হুরি পরি অপ্সরা নয় যে তাকে কেউ আলাদা করে দেখবে। আবার নেহাত কুরূপাও নয়। গায়ের রঙ চাপা, বিয়ের সময় ছোটকাকা কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল – উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা। ছোট কপাল, চাপা নাক, পাতলা ঠোঁট। ঠোঁটের কোণদুটি ঊর্ধমুখী। দেখে মনে হয় সর্বদাই মুখটি হাসি হাসি হয়ে রয়েছে। সত্যিকারের হাসলে গজদাঁতের শোভাও দেখা যায়। তখন মুখখানিতে লাবণ্য ঢলঢল করে। অথচ বিকেলবেলা ঘুম ভেঙে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়ালেই তার মন খারাপ হয়ে যায়। যেমন এখন, আয়নায় নিজেকে খেঁদি-পেঁচির বেশি কিছু মনে হচ্ছে না। অসময়ে ঘুম ভাঙা বিকেলের সমস্যাই এই। বিশেষ করে যেদিন মেঘ করে।
এমন নয় যে মন খারাপ সারানোর উপায় জানে না অবন্তিকা। সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে গালে হালকা রঙ ছোঁয়ায়। দুই ভুরুর ঠিক মাঝখানে একটা কল্কা-কালো টিপ গেঁথে দেয়। ঠিক যেমন সিরিয়ালের মেয়েরা পরে। চোখের নিচে সরু করে কাজল টানে। খোলা চুল হাতে জড়িয়ে মাথার ওপর চুড়ো করে একটা হেয়ার ব্যান্ডের শাসনে বাঁধে। আয়নার মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করে, খুব কি মন্দ দেখতে আমায়? বল না আয়না! বল না! যেন আয়নার ভেতরের মেয়েটার নামও আয়না। মেয়েটা হাসি হাসি মুখ করে চেয়ে আছে। জবাব দিচ্ছে না। যাহ, আর কথাই বলব না তোর সঙ্গে। মোবাইলটা টেনে নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়েই একখানা সেলফি তোলে অবন্তিকা। জানে ঠিক কোন অ্যাঙ্গেল থেকে ছবি নিলে তাকে “সো কিউট” দেখায়। থুতনির নিচের ভাঁজ দেখা যায় না। জানলা দিয়ে আলো এসে গালে হালকা মেচেতার ছাপ মুছে দেয়। ছবি তুলেই ফেসবুকে পোস্ট করে দেয়, মেঘ-বিকেলের জলছবি। জলছবি কই? কেন, ওই যে আয়নার কাঁচে আটকে আছে, দেখতে পাচ্ছ না? তাই তো! তাহলে আয়নার সামনের মেয়েটা কে? চিনতে পারছ না বুঝি? আমি গো আমি! ও তুমি? আমি ভাবলুম কোনো মেঘ বালিকা!
অবন্তিকা খুশিতে গুন গুন করে গেয়ে ওঠে। ওর মন ভালো হয়ে যায়। বারান্দা থেকে শুকনো জামা-কাপড় তুলতে যায়। ক্লিপ খুলে ব্লাউজের খুঁট ধরে টান দিতে দিতে অভ্যাসবশত আড় চোখে দেখে নেয় পাশের বিল্ডিঙের জানলা। একটা সতর্ক কিশোর মুখ সরে যায়, জানলার গ্রিল থেকে ঘরের ভেতরের আচ্ছন্ন অন্ধকারে। সবে দাড়ি উঠছে ছেলেটার। ধুলোমাঠে প্রথম বর্ষার ঘাসের মত। জানলার ঐ মুখটা অবন্তিকার গা সয়ে গেছে। না থাকলেই বরং খালি খালি লাগে আজকাল। এই ছেলেটা, দুয়ো, রোজ পালিয়ে যাস কেন? কী দেখার জন্য বারান্দার দিকে চেয়ে অপেক্ষা করে থাকিস? পাতলি কোমর না আঁখির ভ্রমর? কোন দিকে তোর নজর?
কোমর কি আর পাতলি আছে? ভাতঘুমের আদরে মেদের বেড় পড়েছে। মেঘে মেঘে বেলা হল! এখন আর অবন্তিকা কলেজের খুকিটি নয়। স্কুল পড়ুয়া ছেলের মা। বলতে বলতে মনে পড়ল সায়ন্তনের ফেরার সময় হল। রোজ একরকম জলখাবার তার মুখে রোচে না। আজ চাউমিন হলে কাল আলু পরোটা! না পেলেই মুখ ব্যাঁকাবে। পাতে অর্ধেক খাবার ফেলে রেখে যাবে। আজ কী বানায়? এসেই তো ব্যাগ ছুঁড়ে ফেলে বলবে, খেতে দাও। পেটে রাক্ষসের খিদে নিয়ে ঘরে ঢোকে। খাবার অপছন্দ হলেই চিৎকার। মনোমত কিছু পেলে গোগ্রাসে খেয়ে খেলতে বেরিয়ে যায়। ভাল লেগেছে কি না সে কথা বলারও ফুরসৎ থাকে না। এই ব্যাপারে বাপ ব্যাটা সমান অকৃতজ্ঞ। বিপ্লবও খাবার সময় টুঁ শব্দটি করে না। সে কোপ্তা কালিয়া যাই বানাও। ভালো হয়েছে, জিজ্ঞেস করলে কেবল ঘাড় নেড়ে “হুঁ!” জবাব দেয়।
অবশ্য বিপ্লবের স্বভাবই অমন হিসেবী, সাবধানী। প্রয়োজনের বেশি একটা কথাও সে খরচা করে না। অবন্তিকা চায় বিপ্লব অফিস থেকে ফিরে একবার অন্তত ওর দিকে আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে দেখুক, ‘কোথাও বেরিয়েছিলে নাকি?’
‘না, না, এমনিই। কেন? না বেরোলে বুঝি টিপ পরে চুল বাঁধতে নেই?’
সাজগোজ রূপের প্রশংসা করা তো দূর অস্ত, বিপ্লব অফিস থেকে ফিরে তার দিকে মুখ তুলে তাকায় না পর্যন্ত। হয় নিউজপেপার না হলে পেপারব্যাক নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কোনও কোনও দিন মর্জি হলে টিভি খুলে বসে। এমন নয় যে রাতেরবেলা নিয়মমত কাছে টানে না। কিন্তু সে নিতান্তই অভ্যাসে। পাশের ঘরে ছেলে ঘুমিয়ে পড়লে আলো নিভিয়ে অন্তরঙ্গ হয়। অবন্তিকার ইচ্ছে হয় আলোটা জ্বালাই থাকুক। বিপ্লব দেখুক ওকে। ওর চিবুকের ডৌল, গ্রীবার নতি। বলুক, ‘রানি, পৃথিবীতে তোমার থেকে সুন্দর কেউ নেই।’ বিপ্লব সে পথই মাড়ায় না। অন্ধকারে অন্ধের মতই শরীর খোঁজে। শুধুমাত্র স্পর্শ দিয়েই সব কিছু চিনে নিতে চায়। অবন্তিকার সারা সন্ধের প্রসাধন মাটি হয়ে যায়। অবন্তিকা নিজেকে খেলো মনে হয়। রাগ করে ভাবে আর কোনোদিন সে বিপ্লবের জন্য সাজবে না।
সে বরং অ্যালবিনোর জন্য সাজবে। ফর্সা রঙের মানুষ তার খুব প্রিয়। সে নিজে কালো বলেই বোধ হয়। বিকেলবেলা ঘুম থেকে উঠেই অমন আলুথালু হয়ে অ্যালবিনোকে দরজা খুলে দেবে না। আগে থেকেই সেজেগুজে চুল-টুল বেঁধে মোহময়ী হয়ে বসে থাকবে। দরজা খুলে কাগজে সই করার সময় দরকারের থেকে বেশি সময় নেবে। অ্যালবিনো রোদ-চশমা খুলে তাকে দেখবে। তার চোখের পাতা পড়বে না। সে জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে বলবে, ‘ম্যাডাম, একটু জল খাওয়াবেন? রোদ্দুরে ঘুরে ঘুরে গলাটা শুকিয়ে গেছে।’
জল নিয়ে ফিরে এসে যদি দেখে অ্যালবিনো ঘরের মধ্যে ঢুকে এসেছে? তখন অবন্তিকা কী করব? কাকে ডাকবে? নাকি অবন্তিকা তাই চায়? অ্যালবিনো ঘরে ঢুকে আসুক, জলের গ্লাস হাত থেকে নিয়ে বলুক, ‘থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাডাম। আমার চামড়া কটা বলে আমায় কেউ ভালোবেসে ডাকে না, কথা বলে না। আপনি ডাকলেন, জল দিলেন। থ্যাঙ্ক ইউ!’
‘তুমি মন খারাপ কোরো না। আমার দিকেও কেউ চেয়ে দেখে না।’
বলেই অবন্তিকা লজ্জা পায়। চোখের কোণ দিয়ে দেখে নেয় জানলায় পর্দা টানা আছে কিনা। বাইরে মাঝ দুপুরের স্তব্ধতা। একটু আগেও সামনের রাস্তা থেকে হল্লার আওয়াজ আসছিল। মাথায় লাল কাপড়ের ফেট্টি বেঁধে, লাল রঙের ধুতি পরে দাড়িওলা একটা লোক নিজের খোলা পিঠে পাকানো দড়ির চাবুক মারছিল। আর চিৎকার করে করে দেবতার নামে ভিক্ষা চাইছিল। লোক চলাচল কমে যেতে সে আপাতত রাস্তার ধারেই বসে পড়েছে। ঘর থেকে বেরোনোর সময় তার বৌ রুটি সবজি বানিয়ে দিয়েছিল। সে ঝুলি খুলে খবরের কাগজের ওপর স্টিলের বাটি নামিয়ে রাখছে। যে বাচ্চাটা এতক্ষণ ঢোলের ওপর লাঠি ঘষছিল, তার মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে। মনে হয় সে তার ছেলে। কার্নিশে মা পায়রাগুলোও দানা খাবার জন্য নিজেদের ছেলেপুলেদের ডেকে ডেকে ক্লান্ত হয়ে ডানায় ঠোঁট গুঁজে ঘুমিয়ে পড়েছে।
বারন্দায় হাওয়া উঠেছে। মেঝেতে ধুলোর ঘূর্ণি, কয়েকটা ছেঁড়া কাগজের টুকরো ঘুরপাক খাচ্ছে। অবন্তিকা পুরোন চিঠি ছিঁড়ছিল। গয়নার বাক্সয় চিঠি জমিয়ে রেখে কী লাভ? তবু কী মমতায় রেখে দেয়। সব চিঠিগুলোই ওর মুখস্ত। তবু প্রাণ ধরে ফেলতে পারে না। যখন খুব মন খারাপ হয় বাক্স খুলে আলটপকা একটা চিঠি তুলে নেয়। পড়ে না। টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে বারান্দা থেকে উড়িয়ে দেয়। তারই কয়েক টুকরো হাওয়া ফেরত দিয়ে গেছে। সেই নিঃসঙ্গ সময়ে অ্যালবিনো অবন্তিকার সামনে এক পা মুড়ে বসে তার হাত ধরবে। বলবে, ‘আমার সঙ্গে চল। এ শহর ভালো নয়। এখানে থাকলে তুমি মরে যাবে। তুমি আর আমি আমাদের দেশের বাড়িতে গিয়ে থাকব। বাড়ির ঠিক সামনে একটা বকুল গাছ আছে। রোজ বিকেলে তোমায় বকুল ফুল এনে দেব।’
‘সারা বছর কি বকুল ফোটে? যেদিন বকুল ফুটবে না?’
‘সেদিন হাটের থেকে জুঁই ফুলের গজরা এনে দেব। অন্ধ্রর এক বুড়ি বসে গঞ্জে, ফুলের ঝাঁপি সাজিয়ে। শাল পাতার মোড়ক খুলে খোঁপায় জড়িয়ে নিও।’
‘আর সকালে?’
‘আমি ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠতে পারি না। চোখে রোদ পড়লে আমার কষ্ট হয়। সকালে না হয় তুমি ফুল তুলতে যেও। ফিরে এলে আমি তোমার শিশির ভেজা পায়ের পাতা থেকে একটা একটা করে ঘাসের কুচি তুলে দেব। আর শাড়ির থেকে চোরকাঁটা।’
‘যাবার সময় আমার গয়নার বাক্সটা নিয়ে যাব।’
‘গয়না দিয়ে কী হবে? আমাদের গ্রামে সবাই ফুল পরে।’
‘গয়না নয়, ওর মধ্যে আমার অনেক চিঠি আছে। অনেকদিন ধরে ওগুলো আগলে রেখেছি।’
অ্যালবিনো যদি জিজ্ঞেস করে বসে, কার চিঠি, কী জবাব দেবে অবন্তিকা? মায়ের চিঠি। মায়ের চিঠি গয়নার বাক্সর মধ্যে লুকিয়ে রেখে দিয়েছ? না না... । সত্যি কথাটাই বলে দেবে। সে একজনের চিঠি যে তোমার মতই আমার রূপমুগ্ধ ছিল। বিয়ের আগের দিন পর্যন্ত আমায় চিঠি লিখেছে। তখন অবশ্য এত ক্যুরিয়ারের চল ছিল না। বিকেলের পোস্টম্যান তার চিঠি দিয়ে যেত। তার চিঠি পেয়ে আমি তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তার বৌ ছিল, সংসার ছিল, অন্য শহরে। আমিও পরের দিন বিয়ে হয়ে চলে যাব। তবু গিয়েছিলাম। তার চোখ জলে ভাসছিল, আমারও। শেষবারের মত সে আমার ছুঁয়েছিল। আনন্দ বিষাদে আমার অঙ্গে অঙ্গে বাঁশি বেজে উঠেছিল, শেষবারের মত। তার মত করে কেউ আমায় দেখেনি, জানো? আজও তার চিঠি পড়লে আমার মন ভালো হয়ে যায়। রাগ কোরো না, অ্যালবিনো! তার গায়ের রঙও তোমার মত ফর্সা ছিল। তোমাকে দেখে আমার তার কথা মনে পড়ে যায়।

অফিস থেকে ফিরে সন্ধেবেলা নিউজপেপার নিয়ে বসেছিল বিপ্লব। যেমন রোজ বসে। হঠাত চোখ তুলে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি বলছিলে না একজন অ্যালবিনো ক্যুরিয়ার দিতে আসে?’
অবন্তিকা চমকে উঠল। বিপ্লব অন্তর্যামী হল নাকি? কী করে জানল সে এতক্ষণ অ্যালবিনোর কথাই ভাবছিল। গত রাতে ঘুমের মধ্যে কিছু উল্টোপাল্টা বলে ফেলেছে কি? বিপ্লব বলল, ‘আজকের কাগজ পড়নি? লোকাল জুয়েলারি শপ লুঠ করে পালাবার সময় পুলিশের গুলিতে একটা ইয়াং ছেলে মারা পড়েছে। বাকি যারা সঙ্গে ছিল, সবাই পালিয়েছে। যে ছেলেটা মারা পড়েছে সে অ্যালবিনো। দেখো না, ছবি দিয়েছে। ছেলেটার নাম রাজেশ, বয়স উনতিরিশ, একটা ক্যুরিয়ার কোম্পানিতে চাকরি করত।’
অবন্তিকার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল, ‘কী বলছ?’
বিপ্লব হাতের কাগজটা বাড়িয়ে দিল। ছবি দেখে অবশ্য চেনা যাচ্ছে না। কপালে গুলি লেগে মাথাটা চুরমার হয়ে গেছে। বীভৎসতা এড়ানোর জন্য মৃত ছেলেটার চোখ-মুখ ব্লার করে দিয়েছে। এক ঝলক দেখেই অবন্তিকার কান্না এল। চায়ের জল চাপানোর অজুহাতে কিচেনে পালিয়ে এল।
চায়ের জল ফুটে ফুটে শেষ হয়ে যাচ্ছে। অবন্তিকা কিচেন প্ল্যাটফর্মে ভর দিয়ে সেদিকে তাকিয়ে স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জলে চায়ের পাতা দেবার কথা মনে নেই। বুকের ভেতর উথাল-পাথাল। গলার কাছে এক দলা ব্যথা ঠেলে উঠছে। অ্যালবিনো আর আসবে না। দরজায় দাঁড়িয়ে বলবে না, ‘ম্যাডাম, আজ তোমার জন্য চিঠি আনিনি। উইকেন্ডে দেশের বাড়ি গেছিলাম। সেখান থেকে কমলা লেবু এনেছি। এই নাও, ধর। আমাদের নিজেদের গাছের।’ অ্যালবিনো, আমি যে স্যুটকেস গুছিয়ে রেখেছিলাম, তোমার সঙ্গে যাব বলে। গয়নার বাক্স নিয়েছিলাম ঢাউস হ্যান্ডব্যাগটায়। আর আমার সাজের জিনিষ। জল শুকিয়ে চায়ের বাসনটা চড়চড় করছে। অবন্তিকার হুঁশ ফিরল। কাপ মেপে জল চড়াল আবার। একজন বসে আছে, চা খেতে খেতে মৌজ করে লুঠেরা অ্যালবিনোর হত্যা কাহিনি পড়বে বলে।
আচ্ছা, অ্যালবিনো হঠাত জুয়েলারি লুঠ করার দলে ভিড়েছিল কেন? নিশ্চয়ই অবন্তিকার সঙ্গে সংসার পাতবে বলে। তাছাড়া আর কী কারণ থাকতে পারে? লুঠের মাল নিয়ে অবন্তিকার হাত ধরে দেশের বাড়ি চলে যেত। পুলিস খুঁজে পেত না। বেচারা অবন্তিকার সুখ স্বাচ্ছন্দ্যর জন্য অকালে নিজের জীবনটা দিয়ে দিল। অ্যালবিনোর মা কি খবর পেয়েছে? সে বুড়ি হয়তো এখনও দেশের বাড়িতে বসে আছে ছেলের আসার পথ চেয়ে। অ্যালবিনো কি তার মাকে অবন্তিকার কথা বলেছিল? অবন্তিকার খুব কষ্ট হচ্ছিল। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল খানিকক্ষণ। একা থাকার জো নেই। ছেলে ডাকল, ‘মা আমায় অঙ্কটা দেখিয়ে দাও না।’
‘বাবাকে বল না!’
‘না বাবার কাছে যাব না। বাবা খালি বকে।’
অবন্তিকা চলে গেলে কার কাছে অঙ্ক করত সায়ন্তন? কে জানে?
অন্য দিন অবন্তিকাই যা টুকটাক কথাবার্তা বলে। খেতে বসে সায়ন্তন খাবার প্লেটে ঢুলে ঢুলে পড়ে। বিপ্লব যথারীতি মুখ বুজে খেয়ে উঠে যায়। আজ অবন্তিকাও চুপ করে রইল। কথা বলতে ভালো লাগছে না। খাওয়া শেষ হলে বাসন সিঙ্কে নামিয়ে, কিচেন গুছিয়ে আসতে আসতে সায়ন্তন সোফার ওপর ঘুমে কাদা। দামড়া ছেলেকে টেনে তুলে তার নিজের ঘরে শুইয়ে মশারী টাঙিয়ে দিল। বর্ষা পড়তে মশা বেড়েছে। এই কাজটা অবন্তিকাকে প্রায় দিনই করতে হয়। কোনো কোনো দিন সায়ন্তন দুষ্টুমি করে। ঘুমের ভান করে মটকা মেরে শুয়ে থাকে। টেনে নিয়ে খাটে শোয়ানোর পর চোখ খুলে হাসে। আজ সে টায়ার্ড, সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে।
মুখে ক্রীম ঘষে বিছানায় উঠতেই বিপ্লব আলো নিভিয়ে ঘন হয়ে এল। দৈনন্দিন শরীর খেলা। অবন্তিকার ক্লান্ত লাগে। আজ সন্ধেবেলা অ্যালবিনোর খবরটা শোনার পর থেকে মাথাটা ভারি হয়ে আছে। কানের পাশে চুলের মধ্যে আঙ্গুল চালাতে গিয়ে বিপ্লব জলের স্পর্শ পেল। চমকে উঠে বসে আলো জ্বালিয়ে দিল, ‘একী, তুমি কাঁদছ?’
অবন্তিকা মুখ ফিরিয়ে চোখের জল লুকোল। বিপ্লব আবার ডাকল, ‘অবন...।’
অবন্তিকা বিপ্লবের দিকে ফিরল, ‘তোমায় কোনোদিন বলিনি... বিয়ের আগে আমার একজনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল।’
বিপ্লব চুপ করে বসে রইল, যেন শুনতে পায়নি। অবন্তিকা বিপ্লবের গায়ে নাড়া দিয়ে ডাকল, ‘শুনছ? তোমার সঙ্গে বিয়ের আগে আমার একজনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল।’
বিপ্লব শুধু বলল, ‘জানি।’
‘তুমি জানতে? কে বলেছে তোমায়?’
‘পুরোন কাসুন্দি ঘেঁটে কী লাভ? এসব কথা জানানোর লোকের অভাব হয় না।’
‘না, তবু, বল কে...।’
‘যার কথা বলছ, সেই ভদ্রলোকই জানিয়েছিলেন, আমাদের বিয়ের ঠিক পরে পরেই, বেনামী চিঠি দিয়ে।’ একটু থেমে জিজ্ঞেস করল, ‘আজ কি খুব মনে পড়ছে তার কথা? সন্ধে থেকে মুখ ভার করে বসে আছ।’
অবন্তিকা ঘাড় নাড়ল, ‘না তো, তার মুখটাও মনে নেই।’
‘তবে কাঁদছিলে কেন?’
‘জানি না, খুব কষ্ট হচ্ছিল বুকের মধ্যে। মনে হচ্ছিল আমি যদি এখন মরে যাই তুমিও আমার মুখটা মনে করতে পারবে না। কখনও ভালো করে তাকিয়ে দেখো না তো আমার দিকে।’
বিপ্লব মুখে কিছু বলল না। আলো নিভিয়ে দিয়ে আবার অবন্তিকাকে বুকের মধ্যে টানল। মনে মনে বলল, অন্ধকারই ভালো, যদি কোনোদিন ভুল লোক ভেবে ভালোবেসে ফেল। প্রেমে মানুষ সঙ্গীর ফিস ফিস করে বলা কথা এমনকি না বলা কথাও শুনতে পায়। অবন্তিকা কিন্তু বিপ্লবের কথা শুনতে পেল না। কারণ সে তখন মনে মনে অ্যালবিনোর সঙ্গে কথা বলছিল। তাকে বোঝাচ্ছিল, দেখো, তোমার আর এই সব সম্পর্কের ঝুট-ঝামেলার মধ্যে নাক গলিয়ে কাজ নেই। বিষয়টা জটিল। আর তুমি তো এখন আর চিঠি দিতে আসতে পারবে না। আমি গয়নার বাক্স আবার আলমারিতে ঢুকিয়ে রেখে দিয়েছি। কয়েকটা মাত্র চিঠিই আর ওতে রাখা আছে। সেগুলো কাল দুপুরবেলা ছিঁড়ে উড়িয়ে দেব।

সবে চোখটা বুজে এসেছিল অবন্তিকার। কলিং বেল বাজল। এই ভর দুপুরে আবার কে বিরক্ত করতে এল? উঠে এসে পীপহোলে চোখ রেখে কাউকে দেখতে পেল না। অনেক সময় ফ্ল্যাটবাড়ির বাচ্চারা বদমাইশি করে বেল বাজিয়ে পালিয়ে যায়। অবন্তিকা ফিরে যাচ্ছিল। আবার বাজল বেল। অবন্তিকা চট করে দরজা খুলল। ধরতে পারলে বাচ্চাগুলোকে দু ঘা দেবে। দেখল সামনে অ্যালবিনো দাঁড়িয়ে আছে।
ভূত দেখার মত চমকে উঠল অবন্তিকা। অ্যালবিনো, তুমি বেঁচে আছে! ওরা তোমায় মারতে পারেনি? অবন্তিকা পা টলে পড়ে যাচ্ছিল। অ্যালবিনো তাকে ধরে ফেলল। অ্যালবিনোর হাত পেশীবহুল। সে অবন্তিকাকে অবলীলায় পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। পা দিয়ে সদর দরজা বন্ধ করে ঘরের ভেতর ঢুকে লিভিংরুমের সোফায় শুইয়ে দিল। টেবিলের ওপর রাখা জলের বোতল খুলে আঁজলায় জল নিয়ে চোখে মুখে ছিটিয়ে দিল। অবন্তিকা উঠে বসল। অ্যালবিনো সামনে দাঁড়িয়ে। অবন্তিকা হাত ধরে টেনে তাকে পাশে বসাল। বলল, ‘আমি ভেবেছিলাম তুমি মরে গেছ। আর কোনোদিন আসবে না।’
অ্যালবিনো বলল, ‘আমি নয়। যে ছেলেটাকে পুলিস মেরেছে সে আমার দাদা। একই ক্যুরিয়ার কোম্পানিতে কাজ করত।’
বলতে বলতে তার চোখে জল এল। বলল, ‘আমিও বেশিক্ষণ থাকতে পারব না। আমাকেও পুলিস হন্যে হয়ে খুঁজছে। নেহাত তোমার সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয়নি। তাই ঝুঁকি নিয়েও এলাম।’
অবন্তিকা বলল, ‘তোমার সঙ্গে যাব বলে কবে থেকে বসে আছি। দাঁড়াও স্যুটকেস আর ব্যাগটা নিয়ে আসি।’
অবন্তিকা বেডরুমে ঢুকে ঘরে পরার ম্যাক্সিটা ছেড়ে একটা সালোয়ার কামিজ পরে নিল। মুখে অল্প প্রসাধনের প্রলেপ লাগাল। চুলটা এখনও শুকোয়নি, মোটা দাঁড়ার চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে খোলা চুল পিঠের ওপর ছেড়ে রাখল। আলমারির নিচে থেকে গুছিয়ে রাখা স্যুটকেস আর হ্যান্ডব্যাগটা নিয়ে লিভিংরুমে এসে বলল, ‘চল।’
অ্যালবিনো বলল, ‘গয়নার বাক্সটা নিয়েছ?’
অবন্তিকা জিভ কাটল। ওটা তো আলাদা করে তুলে রেখেছিলাম। দাঁড়াও নিয়ে আসি। আলমারির লকার খুলে গয়নার বাক্সটা বার করতে করতে অবন্তিকার মনে হল অ্যালবিনো গয়নার বাক্সর কথা কীভাবে জানল। কখনও বলেছিল হয়তো অবন্তিকা, খেয়াল নেই। লিভিংরুমে ফিরে আসতেই অ্যালবিনো বলল, ‘আমার হাতে দাও, দেখি।’
অবন্তিকার একটু লজ্জা লাগল। চিঠিগুলো কোনোদিন কাউকে দেখায়নি। তবু দিল। অ্যালবিনোর কাছে কীসের সঙ্কোচ? কাঠের ওপর সোনার জলের কারুকাজ করা বেশ লম্বা চওড়া বাক্স। অ্যালবিনো সেটা খুলে চিঠির গোছাটা বার করে মেঝেতে ছড়িয়ে দিল। তারপর খালি বাক্সটা উলটে পালটে দেখে অবাক হয়ে বলল, ‘এর মধ্যে গয়না কই?’
অবন্তিকাও কম অবাক হল না, বলল, ‘এর মধ্যে গয়না কেন থাকবে? গয়না তো সব ব্যাঙ্কের লকারে।’
অ্যালবিনো চোখ লাল করে অবন্তিকার দিকে তাকাল। নিঃশ্বাসের নিচে অকথ্য একটা গালাগাল দিয়ে বলল, ‘আমার সঙ্গে ছেনালি করছিস? দাঁড়া তোকে মজা দেখাচ্ছি।’
ঠাস করে একটা চড় কষাল অবন্তিকার গালে। ঠোঁটে হাত দিয়ে অবন্তিকার ভিজে ভিজে লাগল। গজদাঁতে ধাক্কা লেগে ঠোঁট কেটে রক্ত পড়ছে। হাত ঝাঁকাতেই ম্যাজিকের মত অ্যালবিনোর মুঠোর মধ্যে একটা ছুরি উঠে এল। ছুরিটা গলার কাছে ধরে অবন্তিকার বাঁ হাতটা মুচড়ে পিছন দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে অ্যালবিনো বলল, ‘কোথায় গয়না লুকিয়ে রেখেছিস বল, নাহলে...।’
অবন্তিকার মনে হল তার হাতটা ভেঙে গেল। অবন্তিকা যন্ত্রণায় চিৎকার করে বলল, ‘আহ, ছাড়ো! আমি সত্যি বলছি। এই কানের দুল দুটো ছাড়া আর কোনো গয়না বাড়িতে নেই। এই নাও খুলে দিচ্ছি।’
অবন্তিকা একটা কানের দুল খুলে দিতে দিতে অ্যালবিনোর ত্বর সইল না। সে টান মেরে অবন্তিকার অন্য কান থেকে দুল ছিঁড়ে নিয়ে পকেটে ঢোকাল। অবন্তিকার কানের লতি কেটে ঘাড়ের ওপর রক্ত গড়িয়ে পড়ল। চোখে জল এল। অ্যালবিনো অবন্তিকাকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে গিয়ে সোফার ওপর পেড়ে ফেলল। পকেট থেকে চওড়া প্যাকিং টেপ বার করে হাত দুটো সোফার হাতলের সঙ্গে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বাঁধল। অবন্তিকা ব্যথায় কাতরাচ্ছিল। জোরে চিৎকার করার মত শক্তিও আর নেই। চিৎকার করলেই বা এই শুনশান দুপুরে শুনছে কে?
সোফার পাশে দাঁড়িয়ে অবন্তিকার দিকে চেয়ে দাঁত বার করে হাসল অ্যালবিনো। তার মাথার পিছনে আলো। এখন আর তাকে অত ফর্সা লাগছে না। মুখের ওপর ঘন ছায়া, নাকি চোখে জল বলে অবন্তিকার দেখতে অসুবিধে হচ্ছে? অ্যালবিনো ঝুঁকে পড়ে ছুরির ভোঁতা দিকটা অবন্তিকার গালের ওপর বোলাল। ঠাণ্ডা স্টিলের ছোঁয়ায় অবন্তিকা শিউরে উঠল। অ্যালবিনো বলল, ‘ম্যাডাম, তোমার গা তো ভারি মসৃণ! কী সুন্দর তোমার ত্বকের কালার, টেক্সচার! খুব ছুঁতে ইচ্ছে করছে, একটু ছোঁবো?’
অবন্তিকা ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় মিনতি জানাল, ‘ছেড়ে দাও প্লীজ, আমায় ছেড়ে দাও!’
অ্যালবিনো অনুরোধে কান দিল না। অবন্তিকার শরীরের ওপর নিজের শরীর নামাল। অবন্তিকার বুকে চাপ পড়ছে, দম বন্ধ হয়ে আসছে। কান ঝাঁ ঝাঁ করছে। অ্যালবিনোর মুখ তার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ছে। তার মধ্যেই শুনল কলিং বেল বাজছে।
সদর দরজায় হাতের ধাক্কা পড়ছে, জোরে জোরে। কেউ চিৎকার করে তার নাম ধরে ডাকছে। আচমকা শরীরের ওপর থেকে ভার সরে গেল। অবন্তিকা দেখল অ্যালবিনো সন্ত্রস্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। তার চোখে মুখে ভয়। সদর দরজার বাইরে চেঁচামেচি হচ্ছে। সে পালিয়ে যাবার বিকল্প রাস্তা খুঁজছে।
বিপ্লব এসে পড়েছিল সময় মত। তাই দরজা ভেঙ্গে ঢোকার দরকার পড়েনি। চাবি খুলে ঢুকে বিপ্লব অবন্তিকার কাছে দৌড়ে এল। তাকে সোফার থেকে মুক্ত করে বুকের মধ্যে নিলো। অবন্তিকা বিপ্লবকে জড়িয়ে ধরে ভিজে পাখির মত কাঁপতে থাকল। একটু সুস্থ হতে জানল, পাশের বিল্ডিঙের সদ্য দাড়ি ওঠা ছেলেটা লোক ডেকে এনেছে। বারান্দার দরজাটা খোলা ছিল। অ্যালবিনো বা অবন্তিকা কেউই সেটা খেয়াল করেনি। ভাগ্যিস করেনি। ছেলেটা দেখে ফেলেছিল অবন্তিকার লিভিংরুমে কী নাটক চলছে। পায়রাদের বকম বকম ছাপিয়ে অবন্তিকার চিৎকারও শুনতে পেয়েছিল।
অবন্তিকা ভাবল, নিত্যদিনের মত আজও ছেলেটা নিশ্চয়ই হাপিত্যেশ করে জানলায় দাঁড়িয়ে ছিল। চাতক যেমন বৃষ্টির আশায় আকাশের দিকে চেয়ে থাকে। ছেলেটা লাজুক মুখে তখনো সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। সবাই তার উপস্থিত বুদ্ধির প্রশংসা করছিল। বিপ্লব তাকে হাত ধরে পাশে বসাল, সোফায়। বলল, ‘ভাই তুমি না থাকলে কী যে হত!’
অবন্তিকা বিপ্লবকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কোত্থেকে খবর পেলে? কে বলল?’
বিপ্লব বলল, ‘তিওয়ারি...।’
বিল্ডিঙের সেক্রেটারি তিওয়ারি বিপ্লবের বন্ধু। সে খবর পেয়েই বিপ্লবকে ফোন করে দিয়েছিল। পুলিশকেও। বিপ্লবের অফিস খুব দূরে নয়। ট্যাক্সিতে মিনিট দশেক। সে উড়তে উড়তে এসে পৌঁছেছে। অ্যালবিনো বারান্দার পাইপ বেয়ে নিচে নেমে পালানোর তালে ছিল। পুলিশ নিচেও মোতায়েন ছিল। সে ধরা পড়েছে। পুলিশ তার ঘেটি ধরে লক আপে পুরেছে। জুয়েলারি শপ লুঠের দলে সেও ছিল।
সবাই চলে যেতে অবন্তিকা উঠল। বিপ্লব বারণ করল, ‘আর একটু রেস্ট নাও। শরীরের ওপর দিয়ে ধকল গেছে।’
অবন্তিকা শুনল না। চিঠিগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে ছিল। অনেকে তার ওপর মাড়িয়ে গেছে। জুতোর ছাপ লেগে আছে। সেগুলো কুড়িয়ে নিয়ে কিচেনের ডাস্টবিনে ফেলে এল। স্যুটকেস আর ব্যাগটাও বেডরুমে নিয়ে গিয়ে রাখল। বিপ্লব দেখল, কিছু বলল না। ভাবল বোধ হয় অ্যালবিনো তার মধ্যে দামী জিনিষপত্র ভরেছিল, চুরি করে নিয়ে যাবে বলে। বিপ্লব উঠে টয়লেট থেকে ডেটল নিয়ে এল। অবন্তিকার কাছে এসে তুলো দিয়ে রক্ত মুছে কানের লতিতে ওষুধ লাগিয়ে দিল। বলল, ‘কোনো ভালো সার্জেনকে দেখাতে হবে। প্লাস্টিক সার্জারি দরকার মনে হচ্ছে। তোমাকে আগেই সাবধান করা উচিত ছিল আমার। কাগজে পড়েছিলাম, ক্যুরিয়ারের নাম করে একটা দল লোক জোর করে ঘরে ঢুকে চুরি-চামারি করছে।’
যেন কিছুই হয়নি, অবন্তিকা বলল, ‘এতক্ষনে ছেলে স্কুল থেকে ফিরে আসে... আজ এত দেরি হচ্ছে কেন? যাই, ওর জন্য কিছু খাবার বানাই।’
‘আজকে ছাড়ো। বাইরে থেকে কিছু আনিয়ে নেব।’ বিপ্লব অবন্তিকার হাত ধরে পাশে বসাল। বলল, ‘সারাদিন বাড়িতে একা থাক। আমার ভয় হয়। আজকাল যা দিনকাল পড়েছে।’
‘কেন? বাইরে বেরোলে বুঝি ভয় নেই?’
‘না তা নয়। তবে কী, বাইরে পথচলতি লোকজন থাকে। দরকার পড়লে চেঁচিয়ে ডাকতেও পারবে। তাছাড়া নিজেকে এনগেজ রাখার জন্যও তো বাইরে গিয়ে কিছু একটা করতে পার।’
‘কী করব?’
‘গান শেখো আবার। আগে তো শিখতে। যখন তোমায় দেখতে গিয়েছিলাম, গান শুনিয়েছিলে। কোন গানটা গেয়েছিলে মনে আছে?’
‘সে তো বিয়ের আগে তিনখানা মাত্র গান তুলেছিলাম, একটা নজরুল গীতি, একটা রবীন্দ্রসংগীত আর একটা মীরার ভজন। কালো মেয়ের গুণের খোঁজ নিত সবাই। যখনই কেউ মেয়ে দেখতে আসত ওইগুলোই শোনাতাম, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। তোমরা যেদিন এসেছিলে কোন গানটা গেয়েছিলাম মনে নেই। “সাজিয়াছো যোগী” কি?’
বিপ্লব একটু ভেবে বলল, ‘ওই যে ওই গানটা, রূপে তোমায়... ।’
অবন্তিকার শরীর আর দিচ্ছিল না। চোখ ভেঙে আসছিল। সে সোফায় হেলান দিয়ে বসে চোখ বুজে গুন গুন করে গাইল, ‘আমি রূপে তোমায় ভোলাব না... ভালবাসায়...।’
দরজায় বেল বাজল । অবন্তিকা চোখে আতঙ্ক নিয়ে সোজা হয়ে বসল। আবার কে এল? বেলটা বাজতেই থাকল বার বার। ছেলে দুষ্টুমি করে বেলের স্যুইচটা চেপে ধরে আছে। ঘরে ঢোকার দেরি সহ্য হচ্ছে না। অবন্তিকা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সায়ন্তন স্কুল থেকে ফিরল। উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই সায়ন্তন ঝড়ের মত ঘরে ঢুকে এল। মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘মা মা আজ ম্যাথসের টেস্টে টেন আউট অফ টেন পেয়েছি। কাল রাতে যে অঙ্কগুলো দেখিয়ে দিলে একজামে সেগুলোই এসেছিল।’
অবন্তিকা সায়ন্তনকে বলল, ‘আচ্ছা আচ্ছা হয়েছে। এবার মুখ হাত ধুয়ে আয়। আজ আর খেলতে যেতে হবে না। বাবা কী খাবার আনাবে বলছে, সবাই মিলে বসে খাব।’
অনেকদিন কোথাও পিকনিকে যাওয়া হয়নি। বাবা আজ তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরেছে। সায়ন্তন বাবার সঙ্গে পিকনিকের প্ল্যান বানাতে বসে পড়ল। জুয়েলারি বক্সটা তখনও সামনে টেবিলে পড়ে ছিল। সেটা অভ্যাসবশত আলমারির লকারে ঢুকিয়ে রাখার আগে অবন্তিকা একবার খুলে দেখল। ভিতরটা খাঁ খাঁ করছে। অবন্তিকার চোখ উপচে জল এল। আর কোনোদিন কেউ তাকে চিঠি লিখবে না। এমনিতেও আজকাল চিঠি লেখা উঠেই গেছে বলতে গেলে। মানুষ ধান্ধা ছাড়া চিঠি লেখা বন্ধ করে দিয়েছে। ক্যুরিয়ারগুলো কেবলই ভুল চিঠি ডেলিভারি দেয়।
বাক্সটায় অনেকগুলো খোপ আছে। আলমারি বন্ধ করে অবন্তিকা বাক্সটা কিচেনে রেখে এল। খোপগুলোয় আলাদা আলাদা মশলা ভরে রাখা যাবে। সংসারের কাজে লাগবে। থাক পড়ে কিচেন প্ল্যাটফর্মে, মৌরি-মেথির গন্ধ মেখে। অবন্তিকার কী দায় পড়েছে? বাক্সটার দিকে তাকিয়েও দেখবে না।
যতদিন না আবার কোনো স্বপ্নের ক্যুরিয়ার এসে দরজায় দাঁড়ায়। মাঝ-দুপুরের কলিং বেল বেজে ওঠে... টিং-টং!
যাই...!

ফেসবুক মন্তব্য