সায়াহ্নবেলার সিল্যুয়েটে পরিবর্তমান সমাজ

অঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়

সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠলে বাঁ হাতে রান্নাঘর, তারপর বড়সড় একটা ঢাকা বারান্দা, দুবেলা যেখানে মেঝেতে পিঁড়ি পেতে বসে খাওয়া হয়। বারান্দার উল্টোদিকে পর পর ঘর। প্রথমটা ইন্দুবালার। ঘরে ঢুকতেই আয়নাওয়ালা পুরনো আমলের একটা চেস্ট অফ ড্রয়ার্স চোখে পড়ে, তার পাশে গোল শ্বেতপাথরের টেবিল, উল্টোদিকে আলনায় কুঁচিয়ে রাখা শাড়ি, গরাদওয়ালা লম্বা জানলার পাশ ঘেঁষে খান দুই থান ইটের ওপর উঁচু করে বসানো খাট, খাটের নিচে অজস্র সম্পদ - ট্রাঙ্ক, স্যুটকেস, বেতের মোড়া, দইয়ের ভাঁড়, সংসারের চালডাল রাখার টিন। আর আছে আচারের বয়াম, ঝুড়ি ভর্তি আলু-আম-কচুর শাক আর মেঝেতে গড়াগড়ি দেওয়া খান কয়েক ঝুনো নারকোল। বড় বৌ ভাঁড়ার থেকে সংসারের রসদ মেপে নিয়ে ঠাকুরকে দেবার জন্য আসে, ইন্দুবালা খাটে বসে নজর রাখে। নীলরঙা খালি ক্যাপ্সটানের কৌটোয় চাল মাপে বড় বৌ। - আজ সাড়ে সাত কৌটো নিলে যে বৌমা? - ওমা, আপনাকে আশু ঠাকুরপো বলেনি? ওর অফিসের কার ছেলে আজ আসানসোল থেকে আসবে, কী যেন পরীক্ষা দিতে, এখানেই উঠবে, দুপুরে খাবে। - অ! আশুটা আজকাল বড় ভুলো হয়ে যাচ্ছে। বোঝা গেল বাড়ি ফিরলে আজ আশুর এঘরে একটু বেশি সময় দিতে হবে।
ইজিচেয়ারে বসে কাগজ পড়ছে প্রিয়তোষ, মেজ বৌ মাথা নিচু করে এসে দাঁড়ায়। বাবা, আজ লেকে যাবেন না? -হ্যাঁ, কেন? সে তো বিকেল পাঁচটায়। - না মানে, রাজুর টিউশন মাস্টারকে টাকাটা আজই দেবার কথা। এদিকে ও তো ট্যুরে, পরশু ফিরবে। পারবেন একটু ফেরার পথে ওখানে যেতে?
দুপুরবেলা মিঠি পা টিপে টিপে ছাতে যাচ্ছে, চয়নদা ঠিক এই সময়টা সাইকেল করে কলেজ থেকে ফেরে, ইন্দুবালা খাটে বসে হাঁক পাড়ে, কে যায় রে ওখান দিয়ে? ব্যস, এক ছুটে নিজের ঘরে ফিরে আসে আর ঠাম্মিকে আপ্রাণ গাল পাড়ে। উঃ বুড়ির চোখ এড়িয়ে কোথাও এক পা যাবার যো আছে?
পুজোর পর ছোট বৌর সদ্য বিয়ে হওয়া বোন কণিকা এল নতুন জামাইকে নিয়ে। আগে ইন্দুবালাকে প্রণাম করতে ঢোকে। থাক থাক সুখে থাকো। খুঁটিয়ে আলাপ চলে সোজা কথায় ইন্টারভিউ, বসে বসে জেরার দায়ে গলদঘর্ম হয় বেচারা নতুন জামাই, ওখানেই চা জলখাবার, অবশেষে দিদির ঘরে যাবার ছাড়পত্র, স্বস্তির হাঁফ ছাড়া। বাপ রে! তোর শাশুড়ি পুলিশে কাজ নিলে ভাল করতেন!
এগুলো পঞ্চাশ-ষাটের দশকের কলকাতার চেনা ছবি। ঘরে ঘরে তখনও যৌথপরিবার। বাচ্চারা জন্ম থেকে দেখছে সংসারে কিছু বুড়োবুড়ি থাকে। তারা বেড়াতে নিয়ে যায়, রামায়ণ-মহাভারতের গল্প বলে, খাইয়ে দেয়, ছড়া গেয়ে ঘুম পাড়ায়। বাবা এদের সামনে মাথা নিচু করে কথা বলে, মা এদের সেবাযত্ন করে আর ছোটরা জানে বিপদে পড়লে এদের কাছে নিঃশর্ত স্নেহের আশ্রয় বাঁধা। সকালবেলা মা যখন কাজে ব্যস্ত বা সন্ধেবেলা বাবামা সিনেমায় গেলে এদের ঘরগুলোই সাময়িকভাবে একেকটা ক্রেশ হয়ে ওঠে। এদের প্রধান কাজ ছিল বাচ্চাদের দেখাশোনার কঠিন দায়িত্ব পালন ও সেইসঙ্গে রোজকার কিছু সাংসারিক গৃহকর্ম। এছাড়া সংসার এবং পাড়াপড়শীর যাবতীয় খবর সংগ্রহ ক’রে নিজেদের এবং অপরের মনোরঞ্জনের খোরাক জোগানো এবং প্রায়শ অন্যের ব্যাপারে নাক গলিয়ে সংসারে কলহ ও অশান্তি সৃষ্টি করার ভূমিকাতেও এদের দেখা গেছে। তা সত্ত্বেও এই মানুষগুলির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কারণ এরা ছিলো সেদিনকার সংসারের তৃতীয় নয়ন বা আজকের ভাযায়, সিসি ক্যমেরা। আয়া সেন্টার আর সিকিউরিটি কোম্পানির পেছনে হাজার হাজার টাকা ঢেলেও যে নিরাপত্তা ও নিশ্চিন্ততার অভাবে প্রতিটি সংসার আজ তাড়িত, এই মানুষগুলি তাদের উঁচু খাটের ওয়াচপোস্ট বা ইজিচেয়ারের চেকপোস্ট থেকে নিঃস্বার্থে গোটা পরিবারকে অবিরাম সিরিউরিটি পরিষেবা সরবরাহ করে যেতেন। আজ যখন পরিবারে বুড়োবুড়িদের মূল্য কমতে কমতে শূন্যে ঠেকেছে, তখন নানা বিপন্ন মুহূর্তে এদের অমূল্য উপস্থিতির কথা মনে না এসে পারেনা।
বীজবপন আরও আগে হয়ে গেলেও ছবিটা বদলাতে থাকে আশির দশক থেকে। সেসময়কার বাচ্চারা আর স্থিরভাবে জানেনা যে বাড়িতে কোনও ঠাকুমা-ঠাকুর্দা দাদু-দিদাকে থাকতেই হবে। একান্নবর্তী পরিবারের বিড়ম্বনা নিয়ে ঘরে ঘরে বিতর্ক চলে, নিউক্লিয়ার ফ্যামেলির পক্ষে ভুরি ভুরি ভোট পড়ে, ওদিকে হাম অওর হামারা দো-র কল্যাণে সন্তান সংখ্যা কমতে থাকে। মানুষ আত্মকেন্দ্রিক, বিলাসপ্রিয় ও পণ্যমুখী হয়ে ওঠে। মেট্রোপলিটন সমাজ তার সনাতন জীবনযাত্রা তথা মূল্যবোধগুলিকে অচল বলে বাতিল করতে থাকে। ছেলে আর বাবার সঙ্গে মাথা নিচু করে কথা বলে না, বৌমা আর শ্বশুরশাশুড়ির যত্ন নিতে দায়বদ্ধ থাকে না, মেয়ে বাবার সম্পত্তির ভাগ নিতে চায় কিন্তু দায়িত্ব নয়। ফলস্বরূপ পরিবারে বুড়োবুড়িদের স্থান অকুলান হতে থাকে আর তাদের জীবনযাত্রার মান নামতে ও সম্মান কমতে থাকে। সত্যজিং রায়ের “সীমাবদ্ধ”তে এই সময়টা ধরা পড়ে। যেখানে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছেলের কাছে মধ্যবিত্ত বাবা লজ্জার উৎস, আধুনিক বিত্তশীল জীবনযাত্রার অন্তরায়। ছবির এই বিষয়টা সেসময় অনেক আলোচনা ও বিতর্ক উসকে দিয়েছিলো। কিন্তু সমাজের জাড্যধর্মে মনুষ্যত্ববোধের চেতনা জোরকদমে পাল্টাতে থাকে। ছোট পরিবার নিজের সংকীর্ণ সুখের বৃত্তে আসক্ত ও আবদ্ধ হয় এবং সন্তানের উপার্জনে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অধিকার ক্রমশঃ লুপ্ত হয়। অশক্ত পিতামাতাকে নিজের কাছে রাখা বা তাদের আর্থিক দায়দায়িত্ব বহন করাকে সন্তান আর তার কর্তব্য বলে মনে করে না। কে জন্ম দিতে বলেছিল? তোমাদের নিজেদের স্বার্থে আমাকে জন্ম দিয়েছ! মনুষ্য ধর্মের এই অবক্ষয়ে সমাজে বিকৃতি দেখা দিতে বাধ্য, তাই শোনা যেতে থাকে সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া, ঠকিয়ে নেওয়া, হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা বা আরও বেশি হৃদয়হীনতার ক্ষেত্রে বাড়ি থেকে বিতাড়ণ, অনাদরে মৃত্যু বা খুনের ঘটনা। নিপীড়ন, বঞ্চনা, লোভ চিরকাল ছিল বলেই অভিধানে শব্দগুলির উপস্থিতি কিন্তু এগুলি যখন ধিক্কৃত না হয়ে স্বাভাবিক মনুষ্যধর্ম বলে সমাজে স্বীকৃতি পায়, তখনই মনুষ্য ধর্ম বিপন্ন হয়। সমাজ বাস্তবতার এই প্রেক্ষিতে বরং বৃদ্ধাশ্রমকে কাম্য বিকল্প বলে মনে হয়। যেখানে সরকার, সমাজ বা পরিবারের তরফ থেকে বৃদ্ধবৃদ্ধাদের রক্ষণাবেক্ষণের উপযুক্ত পরিকাঠামোর এমন নিদারুণ অভাব, সেখানে কেরিয়ারের তাগিদে দূরে থাকা ছেলেমেয়েদের হাতে বাবামাকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখতে বৃদ্ধাশ্রম ছাড়া অন্য উপায় কি? কর্তব্যের দায় অস্বীকার করতে যখন বৃদ্ধাশ্রমকে ব্যবহার করা হয়, সেটা অবশ্য নিন্দার অপেক্ষা রাখে।
লক্ষণীয়, ষাট-সত্তর বছর আগে ছেলে বাবা-মার দেখাশোনা না করলে সমাজ তীব্র সমালোচনা করলেও বাবামাকে দেখছে বলে কেউ বাহবা দিতে আসত না। ওটা সন্তানের কর্তব্য বলেই বিবেচিত হতো! আজ চারপাশে বৃদ্ধ বাবামাকে অবহেলা করার নজির এত বেশি যে সেটাই নিয়মে দাঁড়িয়েছে, তার অন্যথা দেখলে প্রশংসার বান ছোটে। উচ্ছ্বসিত তারিফ শোনা যায়, বাবাকে নিজের কাছে রেখেছে, কত স্যাকরেফাইস করছে ছেলেটি! শাশুড়ির কী সেবা করে বৌমা, একেবারে অকল্পনীয়! ভদ্রমহিলার ছেলে নেই বটে কিন্তু মেয়ে যেভাবে মায়ের দেখাশোনা করছে বলার না!
শঙ্কা জাগে। আজ থেকে ষাট-সত্তর বছর বাদে কি তবে এমন দিন আসছে যখন মা সন্তানকে লালনপালন করছে দেখলে লোকে তাজ্জব হয়ে বলবে - ওঃ, বাচ্চাটাকে কী যত্নই না করে তার মা, কোলে নেয়, বুকের দুধ খাওয়ায়, রাত জাগে, নাওয়ায়, খাওয়ায় স-ব নিজে করে, কোনও ক্লান্তি নেই! ধন্য, ধন্য!
আগামি দিনে কি মানুষ মানুষের ধর্ম পালন করার জন্য তারিফ কুড়োবে?

ফেসবুক মন্তব্য