প্লিজ, আমাদের একটু সময় দাও

পারমিতা মুখোপাধ্যায়

‘চক্কর দে টক্কর......।‘
বাড়ির ছাদ ফাটানো একটা চিৎকারের সাথে সাথে খ্যাঁচ...টরররররর আওয়াজ!
‘সরে যাও সরে যাও এখন বেবলেড ম্যাচ হচ্ছে। আরে দ্যাখো দ্যাখো, একটা বেবলেড জখমী হয়েছে। এইবার ড্র্যা-গু-ন......। টরনেডো এ্যাটাক...।‘

কি মনে হচ্ছে? দুর্বোধ্য লাগছে? মনে হচ্ছে কোন্ সিনেমার ডায়লগ রে বাবা! না না সেসব কিছুই নয়। গ্রীষ্মের ছুটি পড়ে গেছে। এখন বাড়িতে বাড়িতে যে ‘হরিড হেনরি’র মত খুদেগুলো রয়েছে, তাদের বেশিরভাগেরই হাতে এখন আমাদের ছোটবেলাকার লাট্টুর নব্য সংস্করণ বেবলেড। সেই বেবলেড ম্যাচেরই একটা ছোট্ট উদাহরণ দিলাম।

টেলিভিশন, মোবাইল, ইন্টারনেটের দৌলতে আজকের ছোটদের কাছে কোন কিছুই আর অধরা থাকছে না। বেবলেড ম্যাচ, পোকেমন এসবই তারা কার্টুনে দ্যাখে আর তারপর বাড়িতে জবরদস্ত আবদার চলতে থাকে কিনে দাও বেবলেড কিংবা পোকেবল যার মধ্যে পোকেমনের বিকশিত রূপগুলোর মডেল পাওয়া যায়। আজকাল যেকোন খুদেকে পোকেমনের বিকশিত রূপগুলো সম্পর্কে জিগ্যেস করে দ্যাখা যাক, সব ওদের ঠোঁটস্থ। স্কুলের জেনারেল নলেজের বই মুখস্থ করাতে যেখানে দিনকে রাত, রাতকে দিন করতে হয়।

খুদেরা নতুন কোন বন্ধুর সাথে আলাপ হলে তাকে প্রথমে পোকেমনের কোনো মডেলের বিকশিত রূপগুলো জিগ্যেস করে। তাতে সে পাস করলে তবে জাতে উঠল। কি দিনকাল পড়ল! উঁহু বানিয়ে বলছি না, এ অভিজ্ঞতা হয়েছে তাই বলছি।

হয়তো কোন খুদেকে জিগ্যেস করলেন, বল তো পিকাচুর বিকশিত রূপগুলো কি? সে সঙ্গে সঙ্গে তরতর করে বলে যাবে পিচু, পিকাচু, রাইচু, মেগা রাইচু...। এবার বল তো চারিজার্ড এর বিকশিত রূপ! এবারও সে গড়্গড় করে বলে যাবে চারমেণ্ডর, চারমিলিওন, চারিজার্ড, মেগা চারিজার্ড, মেগা চারিজার্ড এক্স, মেগা চারিজার্ড ওয়াই।

তারপরই হয়তো জিগ্যেস করলেন, এবার বল তো সোনা এইট নাইন জা কত কিংবা আমাদের বডিতে অরগ্যানিক সিস্টেমগুলো কি কি? তাহলেই আপনি কিন্তু ওদের কাছে চরম নীরস একজন ‘আঙ্কল’ বা ‘আন্টি’ বলে গণ্য হবেন।

আসলে আমরাও তো ছোটবেলায় এমনি ছিলাম। আমাদের গল্পের চরিত্রদের মধ্যে মিশে থাকতেই আমরা বেশি পছন্দ করতাম। কেউ পড়ার কথা জিগ্যেস করলেই সরে যেতাম। এখন দিন বদলেছে। ছোটদের কল্পনা আর খেলার জগৎটাও ওরা নিজেদের মত করেই গড়ে নিচ্ছে। শুধু এক্ষেত্রে ওদের দরকার বড়দের একটু সাহচর্য।

ছোটবেলাটা তো খেলারই বয়স। ওরা তো খেলবেই। তবে এখন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে চলতে খেলার ধরণগুলোও অন্যরকম হয়ে গেছে। আমাদের সময়ের মত সীমিত উপকরণে লাট্টু, পিট্টু, ডাংগুলি, ঘেরা রোলিং, কবাডি এসব খেলার চল প্রায় উঠেই গেছে। এখন ছোটদের জীবনে প্রাচুর্য আছে। মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা যা চায় তাই পেয়ে যায় কিন্তু ওদের অভাবটা যেখানে তা হল খেলার সাথীর অভাব। এখন নিউক্লিয়ার পরিবারে দাদু ঠাম্মা বা দাদু দিদার সঙ্গ ওরা পায় না। বেশিরভাগ পরিবারেই ‘হাম দো হামারা এক’ বা ক্কচিৎ কদাচিৎ ‘দো’। বাড়িতে হয়তো বাবা মা দুজনেই কাজে বেরিয়ে যান। সন্তানেরা হয় ক্রেশে নাহয় কাজের মাসী বা দিদির কাছেই সারাদিন কাটায়। এইভাবে একা একা থাকতে থাকতে ওদের মনের মধ্যে একটা অস্থিরতা তৈরি হতে থাকে আর ওরাও ক্রমশঃ আসক্ত হয়ে পড়ে ইন্টারনেটের ভার্চুয়াল জগতে।

ছোটদের সঙ্গে তাই আমাদের ছোটদের মত করে মিশতে হবে। ওদের জন্য প্রতিদিন সময় নির্দিষ্ট করে রাখতে হবে। নিজেদের উন্নতির রেখাচিত্রটা না হয় একটু খাটোই হল। নিজেদের ভার্চুয়াল জগতে ঘোরাঘুরি না হয় একটু কমই হল। ছোটদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেও তো আমাদের এটুকু ত্যাগ স্বীকার করা উচিত। আসুন না, আমরা ওদের নিজের মত করে খেলতে দিই আর ওদের খেলার জগতটাকে নিজেদের বানিয়ে নিই। ওদের পোকেমন, ডোরেমন, বেবলেড, বার্বিদের দুনিয়ায় আমরাও নাহয় ঢুকে পড়ি। ওদের উৎসাহ দিই খেলতে আর নিজেরাও খেলি ওদের সাথে। খেলার ছলেই না হয় ওরা নতুন নতুন জগতের দরজা খুলে ফেলুক আমাদের সাথেই। তাহলে দেখবেন ওদের আর একাকিত্বের বোঝা বইতে হবে না এই শিশু বয়স থেকেই আর আমরাও বুঝতে পারব, আমাদের বাচ্চারা কি পছন্দ করে বা ওরা কোনো কিছুতে আসক্ত হয়ে পড়ছে কি না।

ছোটদের কল্পনার জগতে বিচরণ করতে উৎসাহিত করতে হবে। সেই কল্পনা যেন অবশ্যই গঠনমূলক হয়। সামান্য কিছু উপকরণ দিয়ে কত যে সুন্দর মডেল বা খেলার জিনিস তৈরি করা যায়, তা ওদের শেখাতে হবে। ওদের মাঝে মাঝে শিক্ষামূলক কোন ভ্রমণেও নিয়ে যাওয়া দরকার। ছোটদের জন্য নানা রকমের গেম, ওয়ার্কশপ, নাটক, নাচগানের মাধ্যমে আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ওদের মধ্যেও সঞ্চারিত করতে হবে। এই গ্রীষ্মের ছুটিটায় আসুন না আমরা ছোটদের সাথে একটু সময় কাটাই। যারা আমাদের ভবিষ্যৎ তাদের যদি আমরা আমাদের কাজে সামিল করতে না পারি তবে বৃথাই আমাদের কাজ। আজ এ পর্যন্তই থাক, পরে আবার যদি সুযোগ পাওয়া যায়, এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে যে কিভাবে আমরা ছোটদের মনের সাথী হতে পারব। সকলে ভাল থাকবেন, ছোটদের ভাল রাখবেন।


ফেসবুক মন্তব্য