বেশভূষায় বিবর্তন ও প্রয়োজনীয়তা

গোরা চক্রবর্তী

(প্রতি সংখ্যার এই বিভাগে থাকবে মুম্বাইয়ের বিশিষ্ট কোনো বাঙালির সচিত্র পরিচয় ও তাঁর নিজের লেখা বা তাঁর সম্বন্ধে অন্যের লেখা। এই সংখ্যায় আছেন শ্রী গোরা চক্রবর্তী )


শীতপ্রধান দেশে শৈত্য অনুভূতি থেকে দেহকে রক্ষা করতে মানুষ জামাকাপড় পরে। মরুপ্রধান দেশগুলিতে যেমন আরব দেশগুলিতে আবহাওয়ার গরম অনুভূতি থেকে দেহকে রক্ষা করতে জোব্বা পরতে হয়। কিন্তু ভারতের মত মূলত নাতিশীতোষ্ণ দেশে জামাকাপড় পরার অর্থ কি? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে দেখা যায় যে শীত অথবা গরম আবহাওয়া থেকে দেহকে রক্ষা করা ছাড়াও অন্য প্রয়োজনেও আমরা জামাকাপড় পরে থাকি। একটা গল্পের কথা মনে পড়ছে। আদম এবং ইভকে সৃষ্টি করার পর ঈশ্বর তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য নানান পরামর্শ দিতেন। আদম এবং ইভ যেখানে বসবাস করছিল, সেখানে জ্ঞানবৃক্ষ বলে একটি গাছ ছিল। সেই গাছের ফল ছিল খুব সুন্দর এবং সুগন্ধে ভরপুর। ঈশ্বর তাদের ওই গাছের ফল খেতে বারণ করেছিলেন। কিন্তু কেন তা বলে দেন নি। আদম এবং ইভ লক্ষ্য করলো যে বাঁদর এবং পাখিরা মনের আনন্দে সেই সব ফল খাচ্ছে। কিন্তু তাদের কোনরকম ক্ষতি হচ্ছে না। আদম এবং ইভের লোভ হয় এই ফলটি খাওয়ার। এদিকে বহুদিন ঈশ্বরের দেখা নেই যে তাঁর কাছে ঐ ফল খাওয়ার অনুমতি চাইবে। লোভ সামলাতে না পেরে একদিন সন্ধ্যায় আদম এবং ইভ দুজনায় যুক্তি করে পেট ভরে ঐ জ্ঞানবৃক্ষের ফল খেয়ে পরম সুখে তারা ঘুমিয়ে পড়ে। পরদিন সকালে ঈশ্বর এসে তাদের ডাকছেন। তারা আর ঈশ্বরের সামনে আসে না। অনেক্ষণ পর গাছের বড় বড় পাতা দিয়ে তাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে ঈশ্বরের সামনে এসে মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। ঈশ্বর তাদের দেখে হাসিমুখে বললেন, “বুঝতে পারছি তোমরা জ্ঞানবৃক্ষের ফল খেয়েছ। তোমাদের জ্ঞানের বিকাশ এই লজ্জা দিয়ে শুরু হল। এখন থেকে তোমরা তোমাদেরকে নিজেরাই রক্ষা করবে।" জামাকাপড় পরার সূত্রপাত নাকি এভাবেই হয়-- লজ্জাবোধের উন্মেষে।

গত শতাব্দীর পঞ্চাশ দশক থেকে আমি এই বাঙালি সমাজকে দেখতে শুরু করি। তখন আমার ছেলেবেলা। গ্রাম বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে থাকতাম। গরীব ঘরের মহিলারা তখন শুধুমাত্র শাড়িতে নিজেদের লজ্জা নিবারণ করতেন। সম্ভ্রান্ত গৃহে মহিলারা সেমিজ পরে তার ওপর শাড়ি জড়াতেন। উৎসব ও পার্বণে মহিলারা তখন ফুলহাতা ব্লাউজ ও সায়ার ওপর শাড়ি পরতেন। গ্রীষ্মপ্রধান দেশে ব্লাউজের হাতা খাটো হতে থাকে। প্রথমে থ্রীকোয়ার্টার, পরে ক্রমান্বয়ে হাফহাতা হয়ে কোয়ার্টার হাতায় এসে ব্লাউজের হাতার দৈর্ঘ্য থেমে যায়। আনেকদিন ব্লাউজের হাতার দৈর্ঘ্য এমনটা চলার পর কিছু প্রগতিশীল মহিলা সত্তরের দশকে স্লীভলেস ব্লাউজ পরতে আরম্ভ করেন। এ পর্যন্ত যা চলেছে প্রয়োজনের খাতিরে সমাজে শালীনতা বজায় রেখে মহিলারা ব্লাউজ ও শাড়ি পরেছেন এবং এখনও পরছেন। আমার অগ্রজ লেখক রমাপদ চৌধুরী তাঁর ‘হারানো খাতা’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “আমার কৈশোরে বন্ধুদের মা-মাসিকে স্লিভ্লেস সেমিজ কিংবা ব্লাউজ পরতে দেখেছি, যারা আদৌ অতি আধুনিক ছিলেন তাদেরও। অথচ এই স্লিভ্লেস ব্লাউজ নতুন করে যখন ফিরে এলো তখন ঠাট্টা কুড়িয়েছে। হিসেব কষে বুঝতে পারি তাঁদের বয়স তখন চল্লিশের নিচেই, হয়তো পঁয়ত্রিশ। ব্রাহ্মণবাড়ির অল্পবয়সী বিধবারাও অন্তর্বাস পরতে পেতো না, যদিও থান কাপড়খানি তারা এমন ভাবেই পরত যে শোভনতা বজায় থাকত। কিন্তু বিধবাদের সেমিজ ব্লাউজ সায়া পরতে না দেওয়ার মধ্যে কি শুধু সংসারের খরচ বাঁচানোর তাগিদ, নাকি গুরু পুরোহিতের কোন বিকৃত রুচি। যতদূর মনে পড়ে তিরিশের দশক থেকে রীতিমত পরিবর্তন আসতে শুরু করে। স্বাধীনতা আন্দোলনে মেয়েদের বাইরে বেরিয়ে আসার জন্য তা সম্ভব হয়েছিল কি না জানি না। স্বচ্ছল শিক্ষিত পরিবারের কমবয়সি বিধবারাও সাদা সায়া ব্লাউজ পরতে শুরু করেছিল, থান কাপড়ের বদলে নরুন পাড় শাড়ি। কিন্তু রঙিন শাড়ি? অসম্ভব।" আমিও লেখকের সাথে সহমত,তাই এই উদ্ধৃতিটি দিলাম।

গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে দেখা গেল কুর্তার সাথে বাঙালি মহিলারা লুঙ্গি পরছেন। সমাজে এবং পত্রপত্রিকায় উঠলো গেল গেল রব। কেন বাবা! লুঙ্গি মহিলাদের জন্য অশালীন হবে কেন? মানছি সাধারণত পুরুষরা লুঙ্গি পরে থাকেন। কিন্তু মহিলারা পুরুষের বেশ পরবে – সে আবার কী? মেয়েদের জন্য লুঙ্গির ফ্যাশন কিন্তু বেশী দিন চলে নি। দু তিন বছর পরেই তা পরিত্যক্ত হয়। হাজার হোক সমাজটা তো পুরুষ শাসিত।

ছোটো মেয়েরা তখনকার দিনে হাঁটু ঝুলের ঢিলেঢালা ফ্রক পরতো। তারা মা বাবার অনুশাসনে ফ্রক এবং সালোয়ার কামিজ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে। ঐ মেয়েরা কৈশোর অতিক্রম করলে নিজেদের আকর্ষনীয় করে তোলার একটা অনুভব করে। এটি তাদের স্বভাবিক স্পৃহা। আমার শৈশবে দেখেছি এই মেয়েদের শাড়ি পড়ার প্রবণতা। পূজা পার্বণে মায়ের শাড়ি পরে “আমি পল্লবিত হয়েছি” দেখাতে চায়। তৎকালে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে মেয়েদের জটলা কম হতো এবং সেখানে সংখ্যা লঘু হওয়ায় তারা মার্জিত রুচির শাড়ি অথবা সালোয়ার কামিজ পরতো। কিন্তু ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যা উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং বর্তমানে তারা ছেলেদের সংখ্যার প্রায় সমান সমান। বেশীরভাগ মেয়েরা শাড়ি, সালোয়ার কামিজ ইত্যাদি মার্জিত রুচির পোষাক পরে থাকে। কিছু প্রগতিশীল ছাত্রী ছেলেদের মতোন প্যান্ট শার্টও পরে। এটাও কিন্তু মার্জিত রূচির পোষাক। মুম্বাই শহরে সম্প্রতি ছাত্রী সম্প্রদায় এবং কার্যরত মহিলাদের জিন্সের প্যান্ট এবং টি-শার্ট পরতে দেখা যায়। মেয়েদের জন্য এই পোষাক আধুনিক হয়েও অত্যন্ত মার্জিত রুচির পোষাক। “আপ রুচি খানা, পর রুচি পরনা” বলে একটি প্রবাদ আছে। প্রবাদটির অর্থ হল “নিজের পছন্দ মত খাবার খাবে, অন্যের দৃষ্টিতে যা ভালো দেখায় সে ভাবে বেশ-ভূষা করবে।"

বাল্যকালে গ্রামে দেখেছি ছেলেরা ইজের অথবা হাফপ্যান্ট পরছে। আমিও পরেছি। বর্তমানেও ছেলেরা একটা বয়স পর্যন্ত হাফপ্যান্ট পরে। তবে স্কুলের গন্ডী পেরোনোর পর কোন ছেলে আর হাফপ্যান্ট পরে না। সে সময় গ্রামে পুরুষদের দেখেছি সর্বত্র লুঙ্গি পরে খালি গায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অবশ্য সম্ভ্রান্ত পুরুষরা হয় ধুতি নয় পাজামা পরে তার সাথে পাঞ্জাবি পরিধান করে সমাজে বিচরণ করতেন। অবশ্য তাঁরাও বাড়িতে লুঙ্গি পরে খালি গায়ে অথবা নিমা পরে থাকতেন। পুরুষদের আর একটা ফ্যাশান তখন লক্ষ্য করতাম। সেটা হল শার্ট ধুতির তলায় গুঁজে পরা। এ ফ্যাশানটা ইংরেজ আমলে বাবু অর্থাৎ কেরানী সম্প্রদায় করতো, বর্তমানে কেউ করে না। ধুতির ওপর কলার সংযুক্ত সার্ট আশির দশকেও দেখেছি। সঙ্গীত শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এই পোষাক পরতেন।

ফুলপ্যান্টের অনেক বিবর্তন হয়েছে। বাল্যকালে দেখেছি বড়দের ঢলঢলে ফুলপ্যান্ট পরতে। গ্যালিস দেয়া প্যান্ট পরতেও দেখতাম। এখন মনে হয় বর্ধিত বয়সে ওরকম গ্যালিস দেয়া প্যান্ট নিশ্চয়ই আরামপ্রদ। বর্তমানে এর রেয়াজ নেই। আমার কলেজ জীবনে ফ্যাশান ছিল ‘ড্রেন-পাইপ’ প্যান্ট। একসময় কলকাতার পুলিশ ড্রেন-পাইপ প্যান্ট পরিহিত কোন বালক দেখলে থানায় ধরে নিয়ে যেত। থানায় পরীক্ষা করা হতো প্যান্ট এবং পায়ের ফাঁক দিয়ে কোকাকোলার বোতল ঢুকছে কি না! তা ঢুকলে থানায় লিখিত মুচলেখা দিয়ে মুক্তি মিলতো। ষাটের দশকের ছেলেদের এই ফ্যাশান হাল আমলের মেয়েদের আধুনিকতার ফ্যাশান হয়েছে। ঐ সময়কার প্যান্টের তলার দিকে একটা ফোল্ড থাকতো। বর্তমানে তা পরিত্যক্ত। গত ষাটের দশকে উদয় হল হিপ্পি কালচার। তখন অনেক আমেরিকান ছেলেমেয়েরা জীবনের মূল্যবোধের খোঁজে দেশ বিদেশ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ত। সাধারণত সীমিত টাকা-পয়সা নিয়েই তারা বের হতো। এই ছেলেমেয়েরা আমেরিকার শীতপ্রধান অঞ্চলে না থেকে যেখানে যখন গরমকাল চলে সেখানে ভ্রমণ করতে থাকে। অর্থের ব্যয়ভার কমাবার জন্য যত্রতত্র সস্তার খাবার খেতো এবং হট্টমন্দিরে নিশিযাপন করতো। এই ছেলেমেয়েদের বলা হতো হিপ্পি সম্প্রদায়। জামাকাপড় তাদের থাকতো সীমিত। এক জামাকাপড়ে তারা প্রলম্বিত সময় কাটিয়ে দিত। জামা কাপড় কাচা প্রায় হতোই না। জীর্ণ হয়ে প্যান্টের তলার দিক লত্পত্ করতো। এক সময় প্যান্টের তলার দিক ছিঁড়ে ফেলে দিত। ফল হলো বার্মুডা নামক প্যান্টের জন্ম, যার পায়ের দৈর্ঘ্য ঠিক হাঁটুর নিচ অবধি। পোষাকের জীর্ণ-দীর্ণ অবস্থা দেখে ডিজাইনার সম্প্রদায় উৎসাহিত হয়ে অনেক রিসার্চ করে তাপ্পী দেয়া জীর্ণ পোষাক বাজারে চালু করে। বর্তমানে অনেক চিত্র তারকা এবং সেলিব্রিটি সম্প্রদায়কেও এই পোষাক পরতে দেখা যায়। সমাজে সাধারণ ছেলেমেয়েদেরকেও এমন পোষাক পরতে দেখা যায়। এটা হলো আধুনিক কালের ফ্যাশান। আধুনিকতা নয়। ভারতের মতো নাতিশীতোষ্ণ দেশেও ষাটের দশকে আমেরিকা থেকে আগত অনেক হিপ্পি সমাগম দেখা যেতো। আমাদের দেশে হিপ্পি কালচার চালু হয় নি। কিন্তু তাদের পরিধেয় পোষাকের আদল আমেরিকার মত আমাদের দেশেও চালু হয়েছে গত প্রায় তিন দশক ধরে।

সান্গ্লাস ব্যবহার করে অনেকে দিনের বেলায় অত্যধিক সূর্য কিরণের ঝলকানি প্রতিরোধ করেন। অনেক সময় ডাক্তারের পরামর্শ মেনে (যেমন ক্যাটারাক্ট অপারেশানের পর) অনেকে কালো চশমা পরে থাকেন। কালো চশমা পরার মজা হল, পরিহিত ব্যক্তি কোন দিকে দৃষ্টি আবদ্ধ করছে তা কেউ বুঝতে পারে না। সমাজের অধিনিয়ম হল চোখে চোখ রেখে কথা বলা এবং এতে শালীনতা বজায় থাকে। কিন্তু আলাপচারিতার সময় কেউ কালো চশমা পরে থাকলে শালীনতার সীমা নিশ্চয় লঙ্ঘিত হয়। আর রাতে এমনিতেই কেউ যদি কালো চশমা পরে থাকে তবে মনে হয় না তা শালীনতার পর্যায়ে পড়ে। প্রয়াত কংগ্রেস নেতা অতুল্য ঘোষ মহাশয় সর্বদা কালো চশমা পরে থাকতেন। ওঁনার একটি চোখ পাথর দিয়ে বাঁধানো ছিল। এই হীনমন্যতা ঢাকার জন্য তিনি কালো চশমা পরতেন। ক্রিকেটার এবং টেনিস খেলোয়াররা খেলার সময় আলোর ঝলকানি থেকে চোখ বাঁচাতে এবং বলের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখতে বিশেষ ধরণের টুপি ব্যবহার করে। অনেকে আজকাল দিনের বেলাতে অনুরূপ টুপি পরে থাকেন। কারণ অনুসন্ধানে জানতে পারা যায় যে উক্ত ব্যক্তি সূর্য কিরণ থেকে নিজের মাথা বাঁচাচ্ছেন। অনেক সময় রাতের বেলাতেও অনেকে অনুরূপ টুপি পরে থাকেন। কিন্তু কেন? হ্যাঁ, শীতকালে এই টুপি পরলে মাথার তালুতে শীত লাগা নিবারণ করা যায়। তবে এটাও সত্য যে কেউ যদি টুপি পরে থাকেন তবে চট করে তাকে সনাক্ত করা যায় না। সুতরাং কেউ যদি রাস্তাঘাটে নিজের পরিচয় খানিকটা গোপন রাখতে চান, তা হলে টুপি পরা একটা সহজ উপায়।

গয়না ব্যবহার সমাজে শৈশব থেকে মেয়েদেরকেই করতে দেখে আমরা অভ্যস্ত ছিলাম। বলা হয় মেয়েদের অঙ্গে গয়না তাদের শ্রী বৃদ্ধি করে। রামায়ণ ও মহাভারতের রাজন্যবর্গ, সম্রাট ও বাদশাহদের চিত্রে তাঁদের গয়না পরিহিত দেখা যায়। কানেও তাঁদের দুল রয়েছে। অতএব পুরাকালে পুরুষরাও তাঁদের শ্রী বৃদ্ধির জন্য গয়না পরতো। হাল আমলে বিত্তবান শ্রেণীর অনেক ছেলেদেরকে সোনার হার পরতে দেখা যায়। এমন কি অনেক পুরুষ কর্ণ ছেদন করে দুল পরতে শুরু করেছে। হিন্দি ও বাংলা সিনেমার অনেক নাম করা নায়ক কানে দুল পরে থাকেন। মনে হয় পুরুষদের এই অলঙ্করণ হয় অধুনালব্ধ বিত্তবানের সঙ্কেত অথবা হাল আমলের ফ্যাশান। অনেক মহিলা বর্তমানে হাতে এবং গলায় কোন অলঙ্কার পরেন না। তাঁদের যুক্তি যে, “আমি মহিলা হয়েছি বলে হাতে চুড়ি এবং গলায় হার পরতে হবে কেন?” এই নিবন্ধকার মনে করেন যে, কেউ মহিলা হন অথবা পুরুষ হন, তাঁদের অলঙ্করণ ব্যাপারটা নিজস্ব অভিরুচির ওপর ন্যস্ত করাই সমীচীন হবে। কারণ এতে শালীনতার সীমা লঙ্ঘিত হয় না।

এই নিবন্ধে আমাদের সমাজে পোষাক পরা নিয়ে খানিকটা আলোচনা করা হয়েছে। সৃষ্টির সেই আদিম কাল থেকেই আদম এবং ইভ জ্ঞানবৃক্ষের ফল খাওয়ার পর অনুভব করে লজ্জানিবারণ প্রথা। সে প্রথা বিশ্বের প্রতিটি দেশে ও সমাজে একটি স্বীকৃত প্রথা। তাই আজ সমাজে যূথবদ্ধ জীবন যাপন করার সময় শালীনতা বজায় রাখতে উপযুক্ত জামাকাপড় পরা একটি অপরিহার্য পালনীয় দিক। তবে হ্যাঁ, উপরোক্ত কারণ ব্যাতীতও পোষাকের অন্যান্য অনেক প্রয়োজন রয়েছে।
জামাকাপড় পরা মানব জাতির একটি বৈশিষ্ট। অন্য কোন জীব জামাকাপড় পরে না। জামাকাপড় পরা লজ্জানিবারণ ছাড়াও নিজেকে সাজাতে সাহায্য করে। আর কারো বেশভূষা দিয়েই প্রকাশ পায় কোন ব্যক্তি নারী না পুরুষ। পোষাক অনেক সময় ধর্ম (যেমন সাধু-সন্তগণ সাধারণত গেরুয়া বস্ত্র পরিধান করেন।), বৃত্তি (যেমন উকিলরা বিচারালয়ে সাদা সার্ট-প্যান্ট এবং কালো কোট পরে থাকেন), কোন ব্যক্তির সামাজিক স্থিতি (যেমন পৈতে গলায় কোন ব্যক্তি হিন্দু ব্রাহ্মণ বলে চেনা যায়), কোন দলীয় পরিচিতি (যেমন কংগ্রেস রাজনৈতিক দলের সদস্যগণ গান্ধিটুপি পরে থাকেন), কোন কারণ বিশেষে পরা হয় (যেমন পিতা অথবা মাতার মৃত্যুর পর অশৌচ কালে ছেলেদের কোরাধুতি পরা), ইত্যাদি অনেক উদাহরণ দেয়া যায়। পরিচিতির অভাবে পোষাক কোন ব্যক্তি সম্বন্ধে অনেক তথ্য দিয়ে থাকে। যেমন পোষাক দেখে তার লিঙ্গ, বয়স, প্রাদেশিক নাগরিকত্ব, আর্থিক অবস্থান, সামাজিক অবস্থান, মেজাজ, চালচলন, ব্যক্তিত্ব, স্বার্থ, ব্যক্তির মূল্যবোধ ইত্যাদির খানিকটা মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে। কোন ব্যক্তির পোষাক দেখে তার সম্বন্ধে নানান ধারণা পোষণ করা হয়। এই ধারণা অনেক সময়ই ক্ষণস্থায়ী হয়। কারণ উক্ত ব্যক্তির সাথে মেলা মেশার পর হয়তো পোষাক দেখে প্রাথমিক ধারণার কোন সাযুজ্য পাওয়া যায় না। পোষাকের সাহায্যে অনেকে নিজেকে গোপন রাখে। কোন ব্যক্তি সমাজে কোন অপরাধ করার পর কোন ধর্মক্ষেত্রে গিয়ে সাধু বেশে থেকে নিজের পরিচয় গোপন করে। পোষাক পরার সামাজিক অবস্থান সর্বদা পূর্বসত্র থেকে বিকশিত হয়। যেমন ধরা যাক কেউ জগিং স্যুট পরে শ্মশান যাত্রী হল। ব্যাপারটা বেমানান এবং এই ধারণা পূর্বসত্র থেকেই এসেছে। অতএব কোথায় এবং কখন কোন পোষাক পরা হবে, সমাজে তার একটা স্বীকৃত রূপ রয়েছে। সে রূপ অনুযায়ী সমাজে পোষাক পরা হয়ে থাকে। বেশভূষা এবং পোষাক নিয়ে শুধুমাত্র একটা আলোচনার সূত্রপাত হল। কে কি পোষাক অথবা জামাকাপড় পরবে সেটা নিজস্ব অভিরুচি। এ সম্বন্ধে নিবন্ধকারের কোন নিজস্ব মতামত নেই। এই অভিমত নিয়ে নিবন্ধ শেষ হল।

গোরা চক্রবর্তী



জন্মঃ সেপ্টেম্বর ২০, ১৯৪৬

শ্রী গোরা চক্রবর্তী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনীয়ারিং-এর স্নাতক এবং আই আই টি খরগপুরের পাওয়ার সিস্টেম ইঞ্জিনীয়ারিং-এ এম টেক। ১৯৬৭ সালে বি-এ-আর-সি-তে যোগদান সূত্রে মুম্বাই আগমন এবং ২০০৬ সালে কর্মনিবৃত্তির পর নবীমুম্বাই-এর বাসীন্দা হয়ে যান। তিনি পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একজন নক্সা এবং সুরক্ষা বিষয়ের বিশেষজ্ঞ। কর্মনিবৃত্তির পর তিন বছর তিনি ‘টাটা কন্‌সাল্টিং ইঞ্জিনীয়ার্স’-এ ‘ফুল টাইম কন্‌সালট্যান্ট’ রূপে কাজ করেন। বর্তমানে তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, দেরাদুন পেট্রোলিয়াম বিশ্ববিদ্যালয় এবং জয়পুরের মোদি টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউটের এম্‌টেক পাঠ্যক্রমের একজন ‘ভিসিটিং প্রফেসার’ রূপে নিযুক্ত আছেন।

গত নব্বইয়ের দশক থেকে তিনি প্রথমে বাংলায় বিজ্ঞান প্রবন্ধ লিখতে আরম্ভ করেন। ঐ সব প্রবন্ধ বিভিন্ন বাংলা পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উপর তাঁর একটি বই (২০০৪) বাংলায় কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। দিল্লির এক প্রকাশকের অনুপ্রেরণায় বইটির হিন্দি সংস্করন (২০০৫) প্রকাশিত হয়। কলকাতার প্যাপীরাস প্রকাশনী তাঁর একটি ছোট গল্পের সংকলন ১৯১৪ সালে প্রকাশ করে। লেখকরূপে তিনি সর্বভারতীয় স্তরে নিম্নলিখিত সম্মান পেয়েছেন।
১) ২০০৫ সালে আঞ্চলিক ভাষায় বিজ্ঞান লেখার জন্য তিনি ‘ইন্ডিয়ান নিউক্লীয়ার সোসাইটি’-র ‘সায়েন্স কমিউনিকেশান পুরষ্কার তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিংহের হাত থেকে গ্রহণ করেন।
২) ২০০৬ সালে তাঁকে ‘ভারতীয় ডিপার্টমেন্ট অফ্‌ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজী’ হিন্দিতে ‘নাভিকীয় ঊর্জা সে বিদ্যুৎ উৎপাদন’ বই লেখার জন্য ‘মেঘনাদসাহা’ পুরষ্কারে ভূষিত করে।
৩) ২০০৬ সালে ‘নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন’ তাদের গোয়ালিয়র বার্ষিক অধিবেশনে বাংলা বিজ্ঞান ভাষায় অবদানের জন্য ‘সুরেন্দ্রনাথ স্মৃতি পুরষ্কার’ তৎকালীন রক্ষামন্ত্রী শ্রী প্রনব মুখোপাধ্যায়ের হাত দিয়ে প্রদান করে।
8) ২০১২ সালে ‘নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন’ তাদের নাগপুর বার্ষিক অধিবেশনে বাংলা কথা সাহিত্যে অবদানের জন্য তাঁকে ‘কেদারনাথ বন্দোপাধ্যায় স্মৃতি’ পুরষ্কার প্রদান করে।

ফেসবুক মন্তব্য