শৈত্যে

অনিরুদ্ধ সেন



(“Love keeps the cold out better than a cloak” – লংফেলো।)

বেশ কিছুটা পাহাড়ি পথ ভেঙে তিনি অবশেষে সরকারি ডাক বাংলোয় পৌঁছোলেন। দীপ্তি শর্মা, দাপুটে আই-এ-এস অফিসার। এই পাণ্ডববর্জ িত অঞ্চলে এসেছেন এক কম্পানি à¦‡à¦¨à¦¸à§à¦ªà§‡à¦•à¦¶à¦¨à ‡à¦° কাজে। পার্টির থেকে অবশ্য তাঁকে আতিথেয়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এ ধরণের অফার তিনি কখনও গ্রহণ করেন না, এখানেও করেননি। তাঁর পি-এ রাকেশ তবুও বোঝাবার চেষ্টা করেছিল, “ম্যাডাম, জায়গাটা প্রায় জনমানবহীন, লোকালয় বলতে ঐ কম্পানি আর তার আশপাশ। কাজেই অন্তত একবার আপনি নীতি ভেঙে ওদের à¦…à§à¦¯à¦¾à¦•à§‹à¦®à§‹à¦¡à §‡à¦¶à¦¨ নিতে রাজি হয়ে যান। আপনি নয় তার জন্য পে করবেন। বিকল্পও তো কিছু নেই।”
“আছে”, মিজ্‌ দীপ্তি স্মার্টফোঠে ব্রাউজ করতে করতে বলেছিলেন, “একটা সরকারি ডাকবাংলো। কম্পানি সাইট থেকে দেখাচ্ছে দশ কিলোমিটারॠ¤ একটা গাড়ি করে নেব, ব্যস।”
“কিন্তু পাহাড়-à¦œà¦™à§à¦—à ²à§‡à¦° মধ্যে ডাকবাংলো, ব্যবস্থাপত ্র কী আছে সন্দেহ। আপনার মতো একজন অফিসার ওখানে –”
“সে নয় ফোন করে জেনে নেওয়া যাবে। আর মনে রাখবেন, আমি রুপোর চামচ মুখে নিয়ে জন্মাইনি। চাকরির সূত্রেও অনেক কঠিন জায়গায় à¦ªà§‹à¦¸à§à¦Ÿà¦¿à¦‚à§Ÿà§‡à ° অভ্যাস হয়ে গেছে। আপনি স্রেফ খোঁজ নিয়ে বুকিংটা করে দিন আর দয়া করে আমি কবে যাচ্ছি সেটা চাউর করবেন না। পার্টিকে শুধু বলা আছে, সামনের সপ্তাহে যে কোনও দিন যেতে পারি। আর হ্যাঁ, স্টেশন থেকে আমার জন্য একটা গাড়িও বুক করবেন। সেটা দু’দিন আমার সঙ্গেই থাকবে।”
অগত্যা! খোঁজখবর নিয়ে রাকেশ যা জেনেছিল তা অবশ্য খুব ভরসা জাগায় না। তবে ম্যাডাম যখন গোঁ ধরেছেন –
“অজায়গায়, বেজায়গায় যাচ্ছ, সাবধানে যেও।” বলেছিলেন কর্তা মনীষ, “চল্লিশ ছাড়িয়েও তুমি যা জিনিস, এনি ডে রেপড হয়ে যেতে পারো।”
“আস্তে স্যার, ছেলেমেয়ে শুনছে।” তাঁকে থামিয়ে কোমরের জিনিসটা দেখিয়ে আত্মবিশ্বঠসী ভঙ্গীতে বলেছিলেন দীপ্তি, “ভয় নেই, এটায় বারোটা লোড করা আছে।”

প্রথম ধাক্কাটা এল ডাক বাংলো থেকে মাইল খানেক দূরে। পাথর পড়ে রাস্তা ভাঙা, গাড়ি আর এগোবে না। ড্রাইভার কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “ম্যাডাম, কী করব?”
“উড়ে চলো।” ধমক খেয়ে বেচারা ভেবড়ে গেছে দেখে দীপ্তি এবার মিষ্টি হেসে বললেন, “বাড়ি চলে যাও। কাল সকাল ন’টায় আবার ঠিক এখানে এসে গাড়ি লাগাবে, আমি চলে আসব।”
ড্রাইভার ব্যস্ত হয়ে বলেছিল, “ম্যাডাম, ডাক বাংলা এক মিল দূরে। আমি সামানটা নিয়ে যাই?”
তার কাঁধ চাপড়ে দীপ্তি বললেন, “ম্যাডামেঠ° নিজের মাল বওয়ার অভ্যেস আছে।”
ডাক বাংলোটা চলনসই। যা জেনেছিলেন, তাতে খুব একটা আশাও অবশ্য করেননি। একজন চৌকিদার দৌড়ে এসে হাত থেকে মাল নিয়ে নিল, “চলুন ম্যাডাম, আপনার ঘরে নিয়ে যাচ্ছি।”
যেতে যেতে দীপ্তি জিগ্যেস করলেন, “আর কেউ আছে ডাকবাংলোয়?â €
“হ্যাঁ, ম্যাডাম।” বলল কুণ্ঠিত চৌকিদার, “সিরেফ একজন। এক চুনাও অফসর আজ সকালে সরকারি চিট্‌ঠি নিয়ে এসে উঠেছে।”
“বুডঢা?”
“না, জোয়ান লেড়কা।”
দীপ্তির ভ্রু কুঞ্চিত হল। তার মানে আজ সারা রাত ডাক বাংলোয় তাকে এই ‘জোয়ান লেড়কা’র সাথে কাটাতে হবে। কেমন কে জানে! ভয় অবশ্য তিনি পান না। তবে একা মহিলা পেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করলে সামান্য দাওয়াই দিতে হবে। অকারণ হাঙ্গামা তাঁর পছন্দ নয়।
সে অবশ্য আওয়াজ পেয়েই বেরিয়ে এল। বছর পঁচিশ-তিরিঠের একটি ছেলে। হাতজোড় করে বলল, “নমস্তে, আমি অঙ্কিত জোশি, মুম্বই থেকে এসেছি। এখানে এসে পড়ে বোধহয় আপনার একটু অসুবিধে করলাম। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমার কিছু করার ছিল না। পরশু এখানে একটা নির্বাচন আছে, মানে বাই-ইলেকশন ¥¤ আমি এক সরকারি দপ্তরের অফিসার। শেষ মুহূর্তে আমাকে ডিউটি দিল। বাকি টিম আগেই এসে গেছে। তাদের সাথে যোগাযোগ করা গেল না, তাই দপ্তর থেকে এখানে একটা রুম বুক করে আমায় পাঠিয়ে দিল। অবশ্য একটা রাতের মামলা। আশা করি কালই শহরে গিয়ে ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিতে পারব।”
ছেলেটিকে দেখে নিরীহই মনে হয়। দীপ্তি জিগ্যেস করলেন, “এলেন কীভাবে?”
“কেন, গাড়িতে।”
“বাংলো অবধি এল?”
“হ্যাঁ। কেন?”
“সরি, ইতিমধ্যে পাথর পড়ে পথ ভেঙে গেছে। গাড়ি বাংলো অবধি আসছে না।”
ছেলেটি একটু নার্ভাসভাব ে বলল, “এ মা, আমি যে কাল সকালে ওকে এখানে আসতে বললাম? এখানে তো মোবাইলেও টাওয়ার পাওয়া যায় না যে বলে দেব।”
দীপ্তি একটু হেসে বললেন, “সেসব দেখা যাবে ‘খন, আজকের রাতটা তো কাটুক।”
অঙ্কিত এবার একটু কিন্তু-à¦•à¦¿à¦¨à à¦¤à§ করে বলল, “একা মহিলা – আপনার ভয় করে না?”
কার মনে কী আছে কে জানে – প্রথম আলাপেই বেড়াল মেরে রাখা যাক। দীপ্তি মৃদু হেসে বললেন, “আমার কাছে একটা বারো ঘোড়ার লাইসেন্সড রিভলভার আছে।”
সম্ভ্রম মিশ্রিত দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকাতে তাকাতে অঙ্কিত নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।

ঘরগুলি চলনসই, তবে পুরনো, জরাজীর্ণ। জানালা খুললে প্রচুর হাওয়া আসে। ঘরে লাইট, পাখা ছাড়া একদিকে একটা রুম হিটার। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। দীপ্তি চৌকিদারকে জিগ্যেস করলেন, “ডিনার পাওয়া যাবে?”
“হ্যাঁ, ম্যাডাম। আপনাদের খানা পাকাচ্ছি, একটু পরই দিয়ে যাচ্ছি। তা, ম্যাডামও কি ঐ সাবের মতো শাকাহারি?”
“শাক, মাস – মানুষ ছাড়া ম্যাডামের সবকিছুই চলে। আমি ঘরে রেস্ট নিচ্ছি, খানা তৈরি হলে দিয়ে যেও। আর হ্যাঁ, রুম হিটার দেখলাম, এখানে কি ঠাণ্ডা পড়ে?”
“তা একটু পড়ে। পাহাড় তো, রাতে ঠাণ্ডা হবেই। জাড়ের মওসমও এসে গেল। আর ম্যাডাম –”
চৌকিদারকে আর্জির ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দীপ্তি বললেন, “হ্যাঁ, বলো।”
“আপনাদের খাবারটা দিয়ে আমি একটু বেরোব। এই ধরুন, দু-এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসব। কিছু কাঠকুটো এনে রাখতে হবে। আর কালকের নাস্তার জোগানও।”
“কাঠ দিয়ে কী হবে?”
“মাঝে মাঝে রাতে কারেন্ট চলে যায়। তখন ঐ কাঠকুটো জ্বালিয়ে ঘর গরম রাখতে হয়।”
“এত রাতে এখানে ওসব কোথায় পাবে?”
“এখানে পাহাড়ি পথ দিয়ে কিছুটা নামলে আমাদের গাঁও, সেখানেই সব মিলবে।”
একটু পর ডিনার এসে গেল। সাদামাটা খাবার – রুটি, সব্জি, ডাল আর ম্যাডাম সব খান জেনে চৌকিদার একটা অমলেট করে এনেছে। খাবার দিয়ে চৌকিদার বিদায় নিল। চারধার নিঃঝুম। পাশের ঘরে অঙ্কিত বোধহয় আলো জ্বালিয়ে কিছু করছে। একটু পর সে আলোও নিভে গেল। দীপ্তি এত তাড়াতাড়ি ঘুমোন না, একটা নভেলের পাতায় ডুব দিলেন। একটু পরে মনে হল ঠাণ্ডাটা বেশ জাঁকিয়ে পড়ছে। জানালা বন্ধ করে হিটার জ্বালিয়ে দিলেন। ধীরে ধীরে ঘরের তাপমাত্রা কমনীয় হয়ে এল।

কতক্ষণ কেটেছে খেয়াল নেই, হঠাৎ কানে এল এক প্রবল শোঁ-শোঁ শব্দ। ঝড় আসছে? এই সময় ঝড় হয় নাকি? বেশিক্ষণ সংশয়ে থাকতে হল না। অন্ধকারের মধ্যেও জানালার ফাঁক দিয়ে দেখতে পেলেন জঙ্গলে গাছের পাতা সবেগে আলোড়িত হচ্ছে। একটু পরেই এক প্রবল বাতাসের দমকা বাংলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল আর তাঁদের ছোট্ট আশ্রয়স্থলঠা যেন এক সংক্ষুব্ধ বায়ুসমুদ্র ে হাবুডুবু খেতে লাগল।
কিছুটা সময় কাটলে দীপ্তি বুঝতে পারলেন, বাংলো ঝড়ের প্রাথমিক দাপটটা সামলে নিয়েছে। কিন্তু চারদিক ঠাণ্ডা হতে শুরু করেছে। বুঝতে পারলেন, এ হচ্ছে হিমালয়ের তুহিন-শীতল হাওয়া। মাঝে মাঝে যেন মনে হচ্ছে ঘরে বরফের কুচি ঢুকে যাচ্ছে। রুম হিটারটা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে ঘরের তাপমাত্রা সহনীয় স্তরে রাখার জন্য। কিন্তু ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা বাড়ছে।
এমন সময় পরপর দুটো ঘটনা ঘটল, যাকে দুর্ঘটনা বলাই ভালো। প্রথমে ঘরের আলো নিভে গেল। অর্থাৎ ঝড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত। ব্যাপারটার তাৎপর্য মাথায় ঢোকার আগেই হঠাৎ বাতাসের এক প্রবল দমকা আর দীপ্তি দেখলেন তাঁর বন্ধ জানালা খুলে সেখান দিয়ে হু হু করে ঠাণ্ডা হাওয়া ঢুকছে। দৌড়ে গিয়ে ঝোড়ো হাওয়ার দাপটের বিরুদ্ধে জোর করে জানালা বন্ধ করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু না, ছিটকিনি ভেঙে গেছে! জানালাও বেশ উঁচুতে, ঘরে এমন কোনও ফার্নিচার নেই যার ঠেকা দিয়ে বন্ধ করার চেষ্টা করা যেতে পারে।
“শিট, শিট!” ঝড়ে লণ্ডভণ্ড ঘর ছেড়ে দীপ্তি বারান্দায় বেরিয়ে এলেন। বাতাসের তেজ কিছুটা কমেছে, কিন্তু বাইরে কনকনে ঠাণ্ডা। বুঝতে পারলেন, এই শৈত্য একটু পরে তাঁর ঘরকেও গ্রাস করবে। গলা চড়িয়ে ডাকলেন, “চৌকিদার!” কেউ সাড়া দিল না। দীপ্তির মনে পড়ল, চৌকিদার কাঠকুটো আনতে নিচে গেছে। তাহলে নিশ্চয়ই ঝড়ে আটকে পড়েছে। অর্থাৎ চুলা জ্বেলেও ঘর গরম করা যাবে না।
তাঁর গলা শুনে পাশের ঘর থেকে অঙ্কিত বেরিয়ে এসেছে। “কী ঠাণ্ডা রে বাবা, কারেন্টও চলে গেল।” ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে হঠাৎ দীপ্তির দিকে চোখ পড়তে সে বলল, “আপনি এই আবহাওয়ায় বাইরে দাঁড়িয়ে? শিগগিরি ঘরে যান।”
“আর ঘর – আমার ঘর-বার এক হয়ে গেছে।”
“সে কী, কী হয়েছে?”
“জানালা ভেঙে ঘরে হু হু করে ঝড়ের ঠাণ্ডা হাওয়া ঢুকছে। চৌকিদারও নেই, ফ্যাস্তাকঠে পড়ে গেলাম।”
এক মুহূর্ত দ্বিধা করে অঙ্কিত বলল, “কিছু মনে করবেন না ম্যাডাম, এই অবস্থায় শিষ্টাচারৠর সময় নেই – আপনাকে মনে হচ্ছে আপাতত আমার ঘরেই রাত কাটাতে হবে। অন্তত যতক্ষণ ঝড় না থামে। চলুন দেখি, আপনার কী কী লাগেজ আছে।”
“আমার লাগেজ আমি নিজেই টানতে পারি। কিন্তু –”
“কিন্তুর কিছু নেই, ম্যাডাম। অবশ্য আমি লোকটা কেমন, আপনি জানেন না। অন্ধকারে, এক ঘরে। তবে ওই যে আপনার কোমরের বারো ঘোড়াটা –”
“এখন ইয়ার্কি মারার সময়?” দীপ্তি অঙ্কিতের পিঠে স্নেহের চাপড় মেরে বললেন, “চলো।”

ঘর অন্ধকার। অঙ্কিত তার মোবাইল জ্বালিয়ে সেই আলোয় হাতড়ে হাতড়ে এগোচ্ছে। বলল, “আপনি বেডে গিয়ে বসুন। শুয়েও পড়তে পারেন। সোফা-টোফা তো নেই, আমাকে মনে হচ্ছে চেয়ারে বসেই রাত কাটাতে হবে।”
“দ্যাখো, আমি মেয়ে বলেই তোমার শিভালরি করার দরকার নেই। আমিও বসে বা দাঁড়িয়ে রাত কাটাতে পারি, তেমন অভ্যেস আমার আছে। কিন্তু ধরো তোমার এই বদান্যতাটা ও আমি গ্রহণ করলাম, তবুও কি সমস্যা মিটবে?”
“কেন, অসুবিধেটা কী?” অবাক অঙ্কুশ জিগ্যেস করল।
“তুমি বুঝতে পারছ না, এই মুহূর্তে আমাদের মূল শত্রু হচ্ছে শীত। ঘর প্রতি মুহূর্তে ঠাণ্ডা হচ্ছে। তোমার ঘর দক্ষিণমুখৠ€ দেখে হয়তো ঝড়ের মূল ঝাপটাটা পড়ছে না, তবু হিমেল হাওয়া ফাঁকফোকর দিয়ে ঢুকছে। পাওয়ার চলে গেছে, হিটার অচল। জ্বালানির কাঠ আনতে গিয়ে চৌকিদার ঝড়ে আটকে গেছে, তাই চুলোও জ্বালানো যাবে না। এই অবস্থার উন্নতি অন্তত সকালে সূর্য ওঠার আগে হওয়ার আশা নেই। ততক্ষণ আমরা যদি এভাবে বসে থাকি তো সম্ভবত জমেই মরে যাব।”
অঙ্কিতের মাথায় এতক্ষণে ব্যাপারটা ঢুকেছে। “তাহলে কী করব?” সে ভয়ে ভয়ে বলল।
“হতে পারি আমরা শত্রু, নারী ও পুরুষ। কিন্তু এই আপৎকালে বৃহত্তর শত্রু শীতের মোকাবিলায় আমাদের এককাট্টা না হয়ে উপায় নেই।”
“ঠাট্টা করছেন?” অঙ্কিত করুণ স্বরে বলল।
“একদম না। তোমার ঘরে নিশ্চয়ই একটা কম্বল আছে। আমাকেও দিয়েছে। কিন্তু ও ফালতু জিনিস, ওতে হবে না। তোমার স্টকে আর কিছু নেই?”
“ন্‌-না, মানে আমি তো জানি না এত ঠাণ্ডা পড়ে। একটা হালকা সোয়েটার নিয়ে এসেছি।”
“ইউজলেস!” দীপ্তি বিরক্ত হয়ে বললেন, “তোমার বাড়িতে কি কেউ বলার নেই যে কোথাও বেরোলে উপযুক্ত শীতবস্ত্র নিতে হয় আর পাহাড়ে রাতে ঠাণ্ডা পড়ে?”
“ইয়ে, না – মানে আমি তো আনম্যারেড আর মুম্বইয়ে একা থাকি। পাহাড়েও আগে কখনও আসিনি। তাই –”
দীপ্তি এবার তাঁর ব্যাগ আনপ্যাক করায় মন দিলেন আর একটু পরেই টেনে বের করলেন একটা স্লিপিং ব্যাগ।
“ঐ ফালতু সোয়েটার আর কম্বলের ভরসায় বসে থাকলে যে রেটে ঠাণ্ডা পড়ছে তাতে একটু পরেই তোমার হয়ে যাবে। আমার এই নাইলনের জিনিসটা অন্তত কয়েক ঘণ্টা লড়ার সুযোগ দেবে, তারপর ওপরওয়ালার মর্জি।”
“তাহলে আপনি ঢুকে যান আর আমি –”
“সরি মিস্টার – তুমি স্রেফ পুরুষ দেখেই আমি তোমায় শীত-নেকড়ের হাতে ছেড়ে দিতে পারি না। তাছাড়া আমি অকৃতজ্ঞ নই। তুমি ঘরে আশ্রয় দিয়েছ বলেই আমিও এতক্ষণ যুঝতে পারছি।”
“কিন্তু তাহলে –”
“কোনও কিন্তু নয়, চলে এসো। এই ব্যাগটা যথেষ্ট বড়, দুজনের বেশ হয়ে যাবে।”
অঙ্কিত তবুও দ্বিধা করছে দেখে দীপ্তি অন্ধকারে এগিয়ে গিয়ে তার হাত ধরে বললেন, “নিজে নিজে আসবে, না কপালে বারো ঘোড়াটা ঠেকাব?”
“না, ইয়ে – যাচ্ছি।” শুকনো হাসি হেসে অঙ্কিত তাঁর সাথে চলল।

“খুব অস্বস্তি লাগছে?”
“না, মানে তেমন নয়। তাছাড়া, উপায়টাই বা কী?”
দীপ্তি একটু হেসে বললেন, “জানো, যুদ্ধের ফ্রন্টে সভ্য সমাজের অনেক স্বীকৃত রীতিপদ্ধতঠই তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে হয়। আমরাও তেমন এক জীবন-মরণ যুদ্ধে মেতেছি। এখন আমরা নারী-পুরুষ নই, এমনকি মানুষও নই – এ শুধু দুটি জীবদেহ যারা আপ্রাণ চেষ্টা করছে ন্যূনতম উত্তাপটুকৠ কুড়িয়ে স্রেফ টিঁকে থাকতে। আর ভেবো না আমার তোমাকে এখানে ডেকে নেওয়ার কারণ শুধু কৃতজ্ঞতা আর সৌজন্য। এর পেছনে নগ্ন স্বার্থও আছে। এই লড়াইয়ে আমরা সহযোদ্ধা। পরস্পরের দেহের উত্তাপ নেওয়াই এখন আমাদের বেঁচে থাকার সর্বশ্রেষৠঠ সম্ভাবনা।â€
“হ্যাঁ, পড়েছি একজন পূর্ণবয়স্ঠমানুষের দেহ ষাট ওয়াট বাল্বের সমান তাপ বিকিরণ করে।” এতক্ষণে অঙ্কিতের মুখে কথা সরল।
“বুঝেছ যখন তখন দূরে সরে থেকো না, কাছে এসো আর আমাকে জড়িয়ে ধরো। এখন সভ্যতা, সংস্কার, সম্পর্ক সব মিথ্যে। সত্যি শুধু নিষ্ঠুর, আদিম প্রকৃতি আর তার বুকে দুটি আদিম প্রাণীর বেপরোয়া বাঁচার যুদ্ধ।”

“ম্যাডাম, ঠাণ্ডা বাড়ছে, তাই না?”
“হ্যাঁ। ঝড়ও থামেনি। তবে এবার ঐ ম্যাডাম আর আপনি-আজ্ঞে ছাড়ো। আমার নাম দীপ্তি।”
“দীপ্তি, তোমার বাড়িতে কে কে আছে?”
“আমার? দুটি ফুটফুটে ছেলেমেয়ে আর বৌয়ের প্রেমে পাগল এক স্বামী। তবে তাদের মুখ এই মুহূর্তে মনে করার চেষ্টা করছি না।”
“আমরা মরে যাব, তাই না দীপ্তি?”
“হয়তো। তবে এখনও তো বেঁচে আছি?” একটু থেমে দীপ্তি বললেন, “তোমার তো বৌ নেই। কোনও গার্ল ফ্রেন্ড?”
“ইয়ে – মানে, ঠিক –”
“স্বাদ পেয়েছ?”
“না, না!”
“আহ্‌, বেচারা – এসো!”
তাপহীনতার অর্থ মৃত্যু। মৃত্যুশীতঠহাওয়ার তাণ্ডবের নিচে এক পলকা ঠেকার আড়ালে দুই উষ্ণরক্ত প্রাণী শেষ অবধি জীবনযুদ্ধৠর হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিল আরও, আরও নিবিড় নৈকট্য। তারপর এক সময় সব চেষ্টার অবসান হল। সুগভীর আশ্লিষ্ট দুই সহযোদ্ধা চরম অবসন্নতার ক্লান্তিতৠআচ্ছন্ন হয়ে লুটিয়ে পড়ল।

দীপ্তির যখন চেতনা ফিরল, ততক্ষণে ফাঁকফোকর দিয়ে সকালের আলো ঘরে ঢুকতে শুরু করেছে। তাকিয়ে দেখলেন, বিদ্যুৎ সংযোগ চালু হয়েছে। রুম হিটার চলছে, ঘরে কমনীয় উষ্ণতা। মনে হল, বাইরে ঝড় আর বইছে না।
পাশে অঙ্কিত তাকে জড়িয়ে অসহায় শিশুর মতো ঘুমোচ্ছে। আলতো করে টোকা মেরে তাকে ডাকলেন, “অঙ্কিত, ওঠো – সকাল হয়েছে।”
ও ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। চারদিক দেখে সব মনে করতে বোধহয় একটু সময় লাগল। তারপর ওর গালে ফুটে উঠল লজ্জার অরুণিমা।
“আমরা বেঁচে আছি, অঙ্কিত।”
অঙ্কিতের মুখ ধীরে ধীরে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। বলল, “জীবন কী সুন্দর, তাই না?”
“জীবন কী সুন্দর!” এরপর ওরা একত্রে মন্ত্রের মতো উচ্চারণ করল।
একটু পরে যখন চৌকিদার হাঁফাতে হাঁফাতে এসে হাজির হল, ততক্ষণে ওরা দু’জন নিজ নিজ লণ্ডভণ্ড ঘরে কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছে। “ম্যাডাম, সাব, আপনারা ঠিক আছেন? আমি রেডিওয় তুফান আসছে শুনেই ফিরে আসতে গিয়েছিলাম, কিন্তু তার আগেই যা শুরু হল!”
“ঠিক আছে, ঠিক আছে।” দীপ্তি তাকে আশ্বস্ত করে বললেন, “দেখতেই পাচ্ছ, আমরা বেঁচে আছি। তা, এখন কি নাস্তার কিছু ব্যবস্থা করা যাবে, নাকি –”
“না ম্যাডাম, আমি সব নিয়ে এসেছি। এক্ষুণি করে দিচ্ছি।”
স্নান, প্রাতরাশ সেরে বেরোবার আগে দীপ্তি বললেন, “আমার ঘরের একটা জানালার ছিটকিনি ভেঙে গেছে। পারো তো সারিয়ে নিও। নইলে – এই সাব তো ফিরবে না, ওনার ঘরেই আমার থাকার ব্যবস্থা করে দিও।”
“আপনি ভাঙা জানালা নিয়ে, ঐ তুফানের মধ্যে –” চৌকিদারের মুখ হাঁ হয়ে গেল।
মৃদু হেসে দীপ্তি বললেন, “দেখতেই পাচ্ছ, তোমার ম্যাডাম যমের অরুচি।”
তারপর তিনি অঙ্কিতের দিকে ফিরে বললেন, “চলো, মাইলখানেক হাঁটতে হবে। আমার গাড়ি ওখানে অপেক্ষা করবে। আমি তোমাকে শহরে পৌঁছে দেব।”
তারপর তিনি নিজের লাগেজ পিঠে ফেলে অঙ্কিতের একটু বেশি লাগেজ দেখে তার একটা ব্যাগও ছোঁ মেরে কাঁধে নিয়ে হনহনিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। “ম্যাডাম, ম্যাডাম” বলে অঙ্কিত তাঁর সাথে তাল রাখার ব্যর্থ চেষ্টায় পেছন পেছন ছুটল।
যথাস্থানে গিয়ে দেখলেন, দু’টি গাড়ি দাঁড়িয়ে। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে অঙ্কিত তার গাড়িতে উঠে বসল।
“আর কি দেখা হবে?”
“সম্ভবত, না। তবে কে জানে, পৃথিবীটা তো গোল।” দীপ্তি হাসলেন। তারপর দুই গাড়ি দুই লক্ষ্যে চলতে শুরু করল।

ফেসবুক মন্তব্য

Copyrights © 2016 All Rights Reserved by বম্বেDuck and the Authors
Website maintained by SristiSukh CMS
kusumarghya@yahoo.com