বইয়ের পাতা থেকে চলচ্চিত্রের পর্দায়

বলাকা দত্ত

বাংলা সাহিত্যে গোয়েন্দা গল্পের যে অপার রহস্যের ভাণ্ডার তা মূলত উন্মোচিত হতে শুরু করে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে। তারপর থেকে এই গত দু তিন দশক পর্যন্তও তুখোড় সব গোয়েন্দারা দাপটের সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছে বাংলা সাহিত্যের আঙিনায়।

রহস্য রোমাঞ্চের প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরন্তন। তাই বছরের পর বছর ধরে শিল্প সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে রহস্যের বিস্তার। অসংখ্য বাংলা রহস্য গল্প ও তার কেন্দ্রীয় চরিত্রে থাকা গোয়েন্দাদের আগমন ঘটেছে বইয়ের পাতায় এবং পরবর্তীতে সেলুলয়েডের ফিতায়। কিন্তু তারমধ্যে খুব কম চরিত্রই ইতিহাসে অমরত্ব পেয়েছে। গোয়েন্দা চরিত্রের বেশ কিছু কমন গুন লক্ষ্য করা যায় যেমন গোয়েন্দা মানেই সে হবে প্রখর বুদ্ধি সম্পন্ন, শক্তিশালী, উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্ন, পর্যবেক্ষক ক্ষমতার অধিকারী ইত্যাদি। আর এগুলিই আকৃষ্ট করে পাঠককে গোয়েন্দা চরিত্রের প্রতি। গোয়েন্দা কাহিনির আর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, গোয়েন্দা চরিত্রটি একসময় পাঠককে এতটাই আল্পুত ও আচ্ছন্ন করে ফেলে যে লেখকের নামটি তলিয়ে যায়। গোয়েন্দা চরিত্রটিই হয়ে ওঠে পাঠকের নয়নের মনি।

১৮৯২ সালে প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের 'দারোগার দপ্তর' এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ডিটেকটিভ' এই দুটি গল্প দিয়েই বাংলা গোয়েন্দা কাহিনির শুরু। তবে গোয়েন্দা কাহিনির ধারাটি সৃষ্টি করেন পাঁচকড়ি দে (নীল বসনা সুন্দরী, মায়াবী)। আর কিশোর গোয়েন্দা সাহিত্যের ধারা সৃষ্টি হয়ে ওঠে হরিসাধন মুখোপাধ্যায়ের লেখায়। এভাবে প্রেমেন্দ্র মিত্রের পরাশর বর্মা, নীহাররঞ্জন গুপ্তের কিরীটি রায়, কাজী আনোয়ার হোসেনের মাসুদ রানা, শিবরাম চক্রবর্তীর কল্পেকাশি, মনোরঞ্জনের হুঁকাকাশি, বুদ্ধদেব গুহর ঋজু বোস, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের শবর দাসগুপ্ত, সমরেশ বসুর গোগল, ষষ্ঠিপদ চট্টোপাধ্যায়ের পাণ্ডব গোয়েন্দা- এমন আরো বহু গোয়েন্দা উঠে এসেছে বাংলা রহস্য সাহিত্যের আঙিনায়। কিন্তু তাদের মধ্যে কয়েকজনই এখনও দারুন ভাবে জনপ্রিয়। আর তারা শুধু বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ নয়, একের এক চলচ্চিত্রের পর্দায় জীবন্ত হয়ে উঠছে দিন প্রতিদিন।

বাংলা গোয়েন্দা কাহিনির স্বতন্ত্র ধারাটি অনেক বেশি সমৃদ্ধ ও বেগবান হয়ে উঠেছে শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায়ের লেখনীর মাধ্যমে। তাঁরই সৃষ্ট গোয়েন্দা ব্যোমকেশ বক্সী ছাপিয়ে গেছে রচয়িতাকেও। সহজ সাবলীল ভাষার কারণে টানটান উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে গল্পগুলি। লম্বাগড়ন, ঘন ভ্রু, ধারাল নাক - এই গোয়েন্দা নিজেকে সত্যান্বেষী বলতেই বেশি পছন্দ করতেন। সে যাবতীয় জটিল রহস্যের জাল একটার পর একটা খুলে ফেলতো বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল ও শুভবুদ্ধির দ্বারা। ব্যোমকেশের আছে এক আশ্চর্য বিশ্লেষনী দক্ষতা। আর এক জনপ্রিয় বাঙালি গোয়েন্দা চরিত্র হল সত্যজিত রায়ের সৃষ্ট ফেলুদা। শারীরিক শক্তি বা অস্ত্রের পরিবর্তে অসামান্য পর্যবক্ষেণ ক্ষমতা ও বিরল বিশ্লেষনী দক্ষতার মাধ্যমে ফেলুদা রহস্য সমাধান করতে পছন্দ করে। তার ট্রেডমার্ক চারমিনার সিগারেট। এমনই আর এক বাঙালির প্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র হল সুনীল গাঙ্গুলির কাকাবাবু। এগুলি আজও ছোট বড় সকলের কাছে সমানে জনপ্রিয় হলেও গত দু দশক ধরে আমরা আর নতুন কোন গোয়েন্দা চরিত্র পাইনি, যে আমাদের আকৃষ্ট ও আচ্ছন্ন করে রাখতে পেরেছে। এখানেই বাংলা রহস্য সাহিত্যের কিছু দুর্বল দিক ফুটে উঠেছে।

একসময় বাংলা গোয়েন্দা কাহিনি যথেষ্ট প্রাপ্তমনস্ক ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে তা শিশু ও কিশোর পাঠ্য কাহিনিতে মুখ ঢাকল। কিন্তু কেন? এটা ঠিক যে ফেলুদা প্রাপ্তবয়স্করাও সমানভাবে উপভোগ করেন, কিন্তু তবু যেন সেটা ছোটবেলাকে খানিকের জন্য লুকিয়ে ফিরে পাওয়া বৈ আর কিছু নয়। অবশ্য ব্যোমকেশকে বাংলা রহস্য সাহিত্যে একজন প্রাপ্তবয়স্ক গোয়েন্দা বলাই যায়। যদিও কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া বেশিটাই সর্বজনপাঠ্য। অথচ বাংলা সাহিত্যে একটা সময় ছিল যখন ছোটদের কথা ভেবে গোয়েন্দা কাহিনি লেখা হত না। যেমন রেনল্ডস অনুপ্রাণিত আমাদের ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের হরিদাসের গুপ্তকথা সে কালে তিন দশক জুড়ে হু হু করে বিক্রি হয়েছে। যদিও সে বই ছিল নিতান্ত অপাঠ্য ও নিষিদ্ধ। এগুলির স্থান ছিল শোওয়ার ঘরে বালিশের নীচে মলাটের ভিতর। গোয়েন্দা গল্পকে যতই কিশোর পাঠ্য করে তোলার প্রচেষ্টা শুরু হল ততই সেগুলি ছেলেভুলানো ছড়ার সমগোত্রীয় হয়ে পড়ল। পঞ্চাশের দশকে হেমেন্দ্রকুমার রায়ের হাত ধরে কৈশোরক ধারা শুরু হল এবং তা ক্রমে জোলো হতে হতে আজ কেবল কয়েকটি কিশোর পত্রিকার পাতা ভরানোর সাহিত্যে এসে ঠেকেছে।

বাংলা গোয়েন্দা কাহিনির ইতিহাস লিখতে গিয়ে সুকুমার সেন দেখিয়েছেন, যথার্থ ডিটেকটিভ কাহিনি পুলিশি ব্যবস্থা প্রচলনের পরেই লেখা শুরু হয়। কিন্তু ক্রমে বেসরকারি গোয়েন্দাকে সর্বজ্ঞ আর পুলিশকে নিতান্ত অজ্ঞ করে দেখানোর একটা ছক চালু হল। সেই ছক কেটে বাংলা গোয়েন্দা কাহিনি আর কোন দিনই বেরিয়ে আসতে পারল না। বাস্তবের পুলিশও তার একটা বড় কারণ। আর এইভাবে চেনা ছকে বার বার খেলতে গিয়ে বাংলার গোয়েন্দা সাহিত্য ক্রমে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ল।

গত দু দশকে কোন বলিষ্ঠ গোয়েন্দা চরিত্র সৃষ্টি হয়নি। অথচ কেন এত বেশি করে গোয়েন্দা সিনেমা তৈরি হচ্ছে - এই প্রশ্নটি ভাবায় বৈকি! অনেকের মতে গোয়েন্দা গল্প বাঙালির প্রিয় এবং বাঙালি বুদ্ধিমান জাত। তাই তারা বই পড়তে পড়তে বা সিনেমা দেখতে দেখতে নিজেরাই রহস্যের সমাধান করে। তাই এত জনপ্রিয়তা।

আরও একটি মত হল, কলকাতায় আজ যে নতুন নাগরিক সমাজ গড়ে উঠেছে - তার পাপ পতন বা জীবন যাত্রার বিচিত্র ধরন, সেগুলোর সঙ্গে তারা এখনো অপরিচিত। তাই তাদের একটা তৃতীয় চক্ষু দরকার। সেইজন্যই ব্যোমকেশের ছবি আজও মানুষকে আকৃষ্ট করছে।

গোয়েন্দা গল্পকে প্রাপ্তমনস্ক ও অপ্রাপ্তমনস্ক এই বিভাজনের গড্ডলিকায় না ভাসিয়ে সত্যিকারের রহস্য রোমাঞ্চে ভরপুর একটি গোয়েন্দা গল্প এখনও বাঙালি পাঠকের মনে বিস্কোরণ ঘটানোর ক্ষমতা রাখে - ক্রমবর্ধমান গোয়েন্দা চলচ্চিত্রের চাহিদা দেখে তা হলফ করে বলা যায়।

ফেসবুক মন্তব্য