আরোগ্য

মানস চক্রবর্ত্তী



সমস্ত শুনে সে বোল্ল, তোমার কিন্তু অসুখ করেছে, অথবা খুব শিগ্গির অসুখ করবে, অসুখ বোলতে কি বোঝে জানতে চাইলে সে অকপটে স্বীকার কোল্লো যে অসুখ বিষয়ে খুব কিছু জানা নেই তার।
সে আসলে আনমনা হয়ে বিড়বিড় করে নিজের জমানো নানা অনিয়মকে বা নিয়মকে নিয়ে মেতে উঠলো। এবং খুব দ্বিধা নিয়েই তার মাসিক হওয়া বা দু দুবার অন্তঃসত্তা হওয়া অসুখ কিনা তা আলোচনায় আনার কথা বোল্ল। দুবারই পেট খসিয়ে সে পোথমে তার পরিবারকে পরে আমাকে বাঁচিয়েছে। সে এসব বলছিলো আর ফুঁপিয়ে কাঁদছিলো।

এর মধ্যে থেকে একটা অসুখের স্বাভাবিক ধারণা তার ঘরে আটকে যায়।

আস্তে আস্তে সে কিছুটা ধাতস্ত হয়ে বোল্লো, এই যে আমার কান্না দেখেও তুমি এতোটা নির্লিপ্ত তা আসলেই একটা অসুখ। কান যখন কান্না শুনতে পায়না তা চোখে দেখতে না পাওয়ার থেকেও কঠিন অসুখ!

কান্নায় গা মুজড়োনো এক আমোদ কানে ঢুকে গেলে অসুখ চোখের ন্যাবা তুল্য হয় কিনা জানতে নানান গোলমাল এসে যায়। সে মৌখিক চুক্তি করতে চায়, এ সব জিজ্ঞাসা গুলোর সমাধান সম্ভব যেকোন আচরণ মেনে নেবে আর আমার বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের আশ্রয় হবে বোলে।

আমি পোথমে তাকে আলতো ছুঁয়ে ধীরে তার কপাল ছুঁই তার ভুরুতে আঙুল বুলিয়ে এঁকে দিই যে অব্দি ভুরুর লোম ছাড়িয়ে আরও কিছুটা। এভাবে কয়েকবার আঁকতে সে আমার কোমড় জড়িয়ে নেয় আর বলে, বুজেচি আরও ঘন আর লম্বা ভুরু হোলে ভালো লাগতো। কী তাইতো! আমি দু ভুরুর মধ্যিখান থেকে তার ঈষৎ চওড়া নাক আঁকি... নাকের ফুটো... সে বলে, তোমার আঙুলের সিগারেটের পোড়া গন্ধ... আর জোরে শ্বাস টানে... নাকের পাটায় ঘাম জমতে চায়, আমি মুছে দিই আর খেয়াল করি আমার কোমরে তার হাত আরও চেপে বসছে। তার বন্ধ চোখের পাতায় আঙুল বুলিয়ে বুলিয়ে আঁকি এবং বন্ধ চোখে সে বলে... কী অপূর্ব এই দুকুর এই খাটিয়া সর্বস্ব নদীর পাড় এই নোনা জলের গন্ধ এই তিরতিরে হাওয়া। তার এই দেখতে পাওয়া আমার কান্না ডাকে... আমি ফুঁপিয়ে উঠি। সে খেয়াল করে না, অনর্গল বলতেই থাকে যা যা দেখছে বন্ধ চোখে।

খুব যত্ন করে তার কান ছুঁই। সেখানে আঁকতে থাকি দুরূহ জ্যামিতি। মোলায়েম ছোঁয়ায় তার শ্যামলা রঙ সরতে থাকে। আর আধো বোজা গলায় সে যা বলে আমি শুনতে পাইনা। না শোনার অসুখে আমি আর সে কাঁপতেই থাকি।

আমি কাঁদছিলাম তা সে যখন বোঝে তখন তার ঠোঁট আঁকছি। আমার কাঁপা কাঁপা আঙুলের অসমান চাপে একবারই সে লহমায় চোখ খোলে আবার বন্ধ হয়ে যায় তার চোখ। আমার আঙুলে দাঁত বসিয়ে দেয়... আরো জোরে আরও জোরে আর তার কালচে ঠোঁট টুকটুকে হয়ে ওঠে। সে বলে, তুমি কাঁদছ!

রাত শেষের মুখে; এবার চুক্তি মতো সে ঘুমতে যাবে। এই মজুরিতে এতক্ষণ আমার সঙ্গে সে অসুখ নিয়ে যে গবেষণা করেছে তা অনেক বেশী।

জানলা খুলে দিই। তার বাঁ পাশে কাৎ মুখটাতে অচেনা আলো। তিন ধাপ চুলের কিছুটা ঢেকেছে কপাল। ওড়নার মতো একটা সূক্ষ্ম আবরণ গলা থেকে হাঁটু পর্যন্ত। দুপাশে ঈষৎ নেমে যাওয়া বুকের ঢাল আর শক্ত হয়ে থাকা বোঁটা... স্পষ্ট। আমি কি ছোঁব তাকে? সে কি কোনও সুখস্বপ্ন দেখছে এখন! বুকের বিশেষ গড়ন কি স্বপ্নের চলাচলের চিহ্ন! বাঁ হাত ভাঁজ করে চোখের ওপর আড়াল করা আর ডান হাত আমার দিকে ছড়ানো।

সে এখন কি স্বপ্ন দেখছে! তার প্রেমিক তাকে নিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে উঁচু পাহাড়ে উঠছে আর তার বুক চেপে বসে আছে প্রেমিকের পিঠে... না কি একটু আগে আমার স্পর্শ এখনও তাকে মথিত করছে... অথবা তার পুরনো বন্ধু যার নাম অলোক অথবা আকাশ কিম্বা ধীমান যাদের সে কামনা করতো তারা কেউ আদর করছে। যে বৃত্তের মধ্যেই সে এখন থাকুক না কেন কেন্দ্র মুখী এক বল্ তাকে আরাম দিচ্ছে ঘুমের মধ্যে তাই ঠোঁটে একটা হাসি খেলছে আর বুকটা শক্ত বোঁটা নিয়ে ঘনঘন ওঠা নামা করছে।

তার নাভীর গভীর বাগানের ওপর ওড়নাটা একটা ভাঁজ হয়েছে যেন বাগানের ভেতরে কেউ ঝুলে পড়া ডাল তুলে ধরেছে যাতে সহজেই পথ দেখা যায়।

নাভীর বাগান থেকে সরু হয়ে আসা পথ কখন যে হারিয়ে গেছে একটা শ্যামলা নদীতে আর আমিও প্রচন্ড হাঁফাচ্ছি এই দীর্ঘ জার্নিতে। অথচ বেশ মনে হচ্ছে আমার অসুখ নেমে গেছে... এই হাঁফিয়ে যাওয়ায় সুখ হচ্ছে... একটা নৌকো যেন বয়ে যেতে চাইছে নদীতে সুখের সাগরে তার ডাক পড়েছে।

সে চোখ খুল্লো আর হাতদুখানা বাড়িয়ে দিলো... আমাকে ডাকলো চোখে আর হাতের মুদ্রায়। আমি তাকে তার চুক্তির কথা মনে করালাম, বোল্লাম, তুমি এখন ঘুমবে। কিন্তু সে এরজন্যে বাড়তি কিছু নেবে না বোল্লো, সে আমাকে তার নদীর দিকে টানতে লাগলো আর নৌকোর ওপর তুলে এত জোরে কঁকিয়ে উঠলো যে আমি তার মুখ চেপে ধরলাম... এভাবেই আমি আমার অসুখের এক অবাস্তব সমাধান নিয়ে তার মধ্যে, তার দেহের মধ্যে, তার অস্পষ্টতার মধ্যে ক্রমে আবছা হয়ে গেলাম।

জানলা দিয়ে একটা নাগাড়ে শিসের মতো শব্দ আসছিলো আর কিছুর গন্ধ। সে ঘুম ছেড়ে আমার দিকে ফেরালো তার নজর... তারপর নিবিড় ভাবে জড়িয়ে ধরলো যেন খোঁয়ারি ভাঙার ছল। কেউ শোনার নেই আমাদের কথা, কেউ দেখারও নেই, তবু যতটা নিচু গলায় বলা যায় তেমনি ফিসফিস করে বোল্ল, তোমার অসুখ সেরে যাবে নিশ্চয়। বোলতে বোলতে সে ফুঁপিয়ে উঠলো...

তার হাতের মধ্যে যতই বিষ্ফারিত হয় আমার শিশ্ন আমিও যেন ততই নিজেকে ছেড়ে দিই তার মনের কাছে। আমি কি এক অকারণে বাইরে ঢেউ খুঁজি। সে আমার হাত টেনে নামিয়ে দেয় তার পদ্মবনের পাড়ে। সে আমাকে ব্যস্ত করে সে আমাকে ত্রস্ত করে। তার হাতের গতি বাড়ে আর আমি তার আধবোজা চোখে নামিয়ে দিই আমার অসমাপ্ত কান্না।

অবশেষে অর্ধশয়ান থেকে আমার গলা জড়িয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে, ফিস্ফিস করে বলে তুমি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছ। বলে, দ্যাখো প্রথম দিনটা থেকে কেমন বদলে গেছে আজকের দিনটা। বলে, খেয়াল করো তুমি কেমন নিজেকে ভালোবাসতে শিখে গেছ।

ততক্ষণে আমরা হয়ে গেছি। জানলা ভেঙে আমি আকাশের প্রত্যক্ষ দর্শক আমি আর সে আমার চোখের মনির আর্শিতে দেখছে প্রতিফলিত আকাশ। আমার চোখ ক্রমশ বিশ্বস্ত হয়ে উঠছে। আমার হাত খেলছে আর তার নখে নখে আলপনা রচছে আমার পিঠে। তার বুকের উড়ন্ত ঘু ঘু দুটো আমার পাঁজরে দাঁড় পেয়ে হৃদয় ঠুকরে যাচ্ছে অবিরাম... আমি তার লালায় দ্রবীভূত তখন।

আজই শেষ? আমি জিগ্যেস করতে পারছি না। সে শেষ করতে দেয় না। অনর্গল কাঁদে। আমার অসুখ আমার কথা সে তার ঠোঁট আর জিভ দিয়ে চেটে নেয়। আমার মাথা নামিয়ে দেয় মধুবনে, আমি আমি জিভ দিয়ে স্রোত রচনা করি... সাঁতারের শব্দ হয়... সে হাসে... চুড়ি ভাঙার ধ্বনি শুনি যেন।

অসুখ সেরে আমি নিঃস্ব হয়ে যাই।

ফেসবুক মন্তব্য