ঋতু বদল

ইন্দ্রনীল বক্সী



১।।
“সাবধানে থাকিস মা... আর রজতদাকে কদিন একটু চোখে চোখে রাখিস, এসময়ে একদম একা ছাড়তে নেই জানিস তো!” তানিয়া নিঃশব্দে সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ে। মিতামাসি শেষজন, যিনি এখন তাদের বাড়ি ছেড়ে যাচ্ছেন, এ কদিন তাদের ৬ নম্বর পীর পুকুর লেনের দোতলা বাড়িটি গম গম করেছে আত্মীয় অনাত্মীয় পরিচিতজনেদের উপস্থিতিতে, সর্বক্ষণ একটা গুঞ্জন ভেসে বেড়িয়েছে একতলার হল ঘর থেকে ছাদের চিলেকোঠা অবধি। বুল্টি, ওদের একমাত্র পোষ্য ল্যাব্রাডরটিও আট ঘরের ওদের বেশ বড় বাড়িতে কোথায় যে চুপটি করে বসে থেকেছে খুঁজতে মাঝে মধ্যে বেশ বেগ পেতে হয়েছে তানিয়াকে। বেশ কয়েকবার জোরে ডাকার পর খাওয়ার সময়ে লেজ নাড়তে নাড়তে এসেছে এবং নাম মাত্র খেয়ে আবার অদৃশ্য হয়ে গেছে। প্রথম দুটো দিন তো কেউ এক দানা খাওয়াতে পারেনি বুল্টিকে, প্রিয় মানুষের শোক শুধু যে তার মানুষ আত্মীয়দের ছুঁয়েই থাকে এমন নয়, বুল্টি বরাবরই মায়ের ন্যাওটা ছিলো । এখন কতটা সে বুঝছে মায়ের অনুপস্থিতি সেই জানে! এতগুলো মানুষ কখনও সে একসাথে এবাড়িতে দেখেনি, কিছুটা সেটাও কারন এতগুলো ঘরের কোনো এক কোনে নিভৃতে লুকিয়ে থাকার। দাদুর করা একতলার উপর কেন যে বাবা আবার দোতলা তুলতে গেল! তানিয়ে ভেবে পায় না... কে থাকে! কজনই বা ছিলো!

শুনেছে এক সময় ৮-১০টা পাত পড়ত ওদের বাড়িতে, সে অনেকদিন আগের গল্প। জন্মে থেকে দাদুকেই দেখেছে, তানিয়া, ওর দাদা কিংশুক বাবা আর মা এই ছিলো পাঁচ জনের পরিবার। দাদু বহু আগেই গত হয়েছেন, এবার মা...

নাঃ দাদা কিংশুক শেষ দেখা দেখতে পারেনি মাকে, সেও কি পারত! চেনা এজেন্ট খুব দ্রুত টিকিটের ব্যাবস্থা না করে দিলে এতদুর থেকে সময় মতো এসে পৌঁছতেই পারত না! তাও সোজা বার্নিং ঘাটে চলে গেছিল। ক্রিয়া কর্ম যা করার সেই করেছে, দুদিনের জন্য এসেই আবার ফিরে যেতে হয়েছে কিংশুককে নিউজিল্যান্ড। যাওয়ার আগে অপরাধী মুখে দাদাসুলভ কিছু জরুরী কথা বলে যাওয়া ছাড়া আর কিছু করতে পারেনি সে। আজ নিয়ম ভঙ্গের পরেরদিন সবাই চলে গেছে... শেষ মিতা মাসি পর্যন্ত। মিতা মাসি সেই প্রথমদিন থেকেই ওর সঙ্গে সঙ্গে ছিলো। আজ থেকে বাড়িতে বাবা, তানিয়া আর বিল্টু... বাবা বিশেষ কান্নাকাটি না করলেও গুম মেরে রয়েছে, এভাবে ঘটে যাওয়া ঘটনার আকস্মিকতা বাবার মতো জলি, মিশুকে মানুষকেও যে পেড়ে ফেলেছে তা বেশ বুঝতে পারছে তানিয়া। মৃত্যু অনিবার্য, কিন্তু এরকম আচমকা সৃষ্টি হওয়া শূন্যতা মানুষ মানিয়ে নেয়, মেনে নিতে বহু সময় লাগে।

তানিয়ার ফোনের পর্দার আলোটা আবার জ্বলে উঠল, নিশ্চয়ই পুনম! আবার জিজ্ঞেস করবে কবে জয়েন করছে তানিয়া। সকাল থেকে তিনবার ফোন করেছে, প্রোজেক্ট ম্যানেজার চাপ দিচ্ছে। আরও দুটো ফোন এসেছে একটা রাকেশের তার মধ্যে... “ কব লৌট রহি হো?...” একই প্রশ্ন! এখন স্টেডি বলে কিছু হয়না, রাকেশ তানিয়ার সাম্প্রতিক অনুরাগ, বিজিতের সঙ্গে লিভ ইন জমেনি বেশীদিন, মাত্র ছমাস। এসব বাবা বা মা কিছুই জানে না সেভাবে, জানতেও চায়নি কোনোদিন, মা কিছু আঁচ করে থাকলেও বাবা কোনোদিনই ছেলে মেয়ে বড় হয়ে যাওয়ার পর তাদের ব্যক্তিগত জীবনে সাধ্যমতো নাক না গলানোর চেষ্টা করে গেছেন। এমনটাই তাদের পারিবারিক গঠন।

“বাবা চলে এসো খেতে দিয়েছি... ”

তানিয়া ডাক দিয়েও একবার স্টাডিরুমের দিকে এগিয়ে যায়। বাবা সাধারনত এখানে থাকেন এসময়ে, এখনও আছেন তবে অন্যদিনের মতো আর্ম চেয়ারে বসে হাতে বই নিয়ে নয়, একটা শূন্য দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রয়েছেন বিরাট বুক সেলফটার দিকে।

“এবার কাজ বাড়ল বুঝলি বাবলি... এসবের তো অভ্যাস নেই, চিরকাল তো অনিমাই এসব করেছে! ... কি ধূলো জমেছে দেখ সেলফে!”

“হুম... আমি বলি কি সকালে কাজের মাসি পাপিয়াদিকে দিয়েও তো করাতে পারো!”

“না না ... ধুর ওদের দিয়ে এসব করানো যায় নাকি! ...ও হয়ে যাবে ... চল।”

“সুগারের ওষুধটা খেয়েছো?”

“এইরে! একদম ভুলে গেছি... আসলে... ” জিভ কেটে ম্লান হেসে বলে উঠলেন বাবা।

১২ বছরের ডায়াবিটিক বাবার রাতে দুটো রুটি, সামান্য তরকারি ও দুধ বরাদ্দ। তানিয়া টেবলে সাজিয়ে রেখেই গেছিল। বেশ বুঝতে পারছে বাবার সিস্টেম ভালো রকম নড়ে গেছে। বাবাকে নিয়ে স্বাভাবিক দুশচিন্তায় আবার তানিয়ার মাথাটা ভারি হয়ে আসে।

“কিরে! খেয়েছিস?... রজতদা খেয়েছে?” ফোনের ওপারে মিতা মাসি, মিতা মাসি মায়ের একমাত্র ও ঘনিষ্ট বান্ধবী। ব্যাঙ্কে চাকরী করেন, একাই থাকেন। বিয়ে একটা হয়েছিলো, টেকেনি। ছোটো থেকেই তানিয়া মিতা মাসিকে দেখেছে মায়ের এবং তাদের পরিবারের একজন ঘনিষ্ট পারিবারিক বন্ধু হিসেবেই। যেকোনো অনুষ্ঠানেই তার সক্রীয় উপস্থিতি অনিবার্য। ৪৭-৪৮ এর মিতা মাসি খুব কথা বলতে ভালোবাসেন, মায়ের উলটো, মায়েরও তো ওরকমই বয়স হয়েছিলো... চলে যাওয়ার বয়স তো হয়নি!

“হ্যাঁগো খাইয়েছি... নিজেও খেয়েছি... আচ্ছা শোনো না ক্যাটারারের ছেলেটার নাম্বারটা আছে তোমার কাছে?...আমার কাছে ছিলো, কিন্তু কোথায় যে সেভ করেছি! কিছুতেই পাচ্ছি না... যাওয়ার আগে পেমেন্টটা ক্লিয়ার করে যেতে হবে তো! বাবার জন্য আর ঝামেলা রাখব না...”

“ আছে... তোকে এসএমএস করে দিচ্ছি... তুই কবে যাবি?”

“পরশু”

“পরশুই!... কদিন আর... ”

“নাগো... অফিস থেকে রোজ ফোন আসছে, গিয়ে ব্যাপক ঝাড় খেতে হবে... ”

“আরে বাবা তুই কি ছুটি কাটাতে এসেছিস! এরা পারেও... ”

“ওসব চলে না মাসি কর্পোরেটে!... এতদিন ছুটি দিয়েছে স্পেশাল কেস বলেই”

“তুই চলে গেলে কি হবে রে! রজতদা... ”

“সামলে নেবে... সামলাতেই হবে”

আরও দু এক কথার পর ফোন রেখে দেয় তানিয়া, একটা ঘুমের রেশ নেমে আসছে, এ কদিন খুব ঝক্কি গেলো ওর নিজেরও... মিতা মাসিকে তো বলে দিল বাবা ঠিক সামলে নেবে! কিন্তু ও তো নিজেই ঠিক নিশ্চিত নয়! খাওয়া দাওয়া ছাড়াও মানুষের সবচেয়ে প্রয়োজনীয়, বিশেষ করে বাবার মতো মানুষের, যে সঙ্গ, কথা বলার লোক... এত বড় বাড়িতে কি করবে একা! এসব নানা হিজিবিজি ভাবতে ভাবতে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল তানিয়া একসময়।

২।।
সময় গড়িয়ে যায় সময়ের নিয়মে। তানিয়া ব্যাস্ত তার পেশার দুনিয়াতে, দাদা কিংশুক এর মাঝে কয়েকবার এসে ঘুরে গেছে। বাবাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিলো, বেশ জোরাজুরি করেও রাজি করাতে পারেনি। বাবার ওই এক কথা, এই বয়সে চেনা শহর, পৈত্রিক বাড়ি ছেড়ে তিনি কোথাও গিয়ে থাকতে চান না। তবে কিছুদিন ছেলের কাছে কাটিয়ে আসতে নিমরাজী হয়েছেন, ঠিক হয়েছে আগামী বছর নাগাদ ব্যাপারটা নিয়ে পরিকল্পনা করা হবে।

তানিয়ার নবতম পুরুষ সঙ্গী রাকেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও কিছুটা গভীর হয়েছে। ওরা ঠিক করেছে কিছুদিন লিভ ইন করার পর ওদের সম্পর্কের ভবিষৎ কি হবে ঠিক করবে। তানিয়া সাধ্য মতো বাবার খোঁজ খবর রাখার চেষ্টা করে ফোনে, স্কাইপে, ভিডিও কলের মাধ্যমে। প্রতিদিনই প্রায় ফোন করে খোঁজ নেয় বাবা ওষুধ খেলো কিনা, বুল্টির খবরাখবরও। মা চলে যাওয়ার পর থেকে বুল্টিরও নানা উপসর্গ দেখা দিয়েছে, প্রায়ই অসুস্থতার খবর পায় তানিয়া। সৌভাগ্যবশত পাড়াতেই এক ভেটানা্রি ডাক্তার থাকেন, প্রয়োজনে বাবা তাঁকেই ডেকে নেন। অফিসের অফ আওয়ারে কখনও কখনও তানিয়া কফির কাপ হাতে ভাবতে থাকে কি করছে এখন বাবা! অত বড় বাড়িটাতে এই মুহুর্তে শুধু বাবা আর তার একমাত্র সঙ্গী বুল্টি, যাবতীয় অনুভুতি নিয়ে সে উপস্থিত থাকলেও সে অবলা। বাবার সঠিক সঙ্গ দিতে পারা তার সাধ্যের অতীত। স্বস্তির কথা বাবার মর্নিং ওয়াকের অভ্যাস রয়েছে, কিছু মানুষের সাথে কথা বার্তা হয়েই থাকে সে সময়, কিন্তু বাদ বাকি দিন অফিসে কেজো গল্প আর বাড়ি ফিরে অপার নিস্তব্ধতা ছাড়া আর কিছু নেই!... অফিসই বা আর কদিন! তারপর? ...বেশ একটা অপরাধবোধ ঘিরে ধরে তানিয়াকে এসময়গুলো। কিন্তু কি করার আছে! ওর যা কাজ তাতে ফিরে গিয়ে কোথাও সেরকম কাজের সুযোগ নেই, তাছাড়া বাবাকে বললেই তখনি নাকচ করবে। ব্যাক্তিগত জীবনেও তো অনেকটাই এগিয়ে গেছে তানিয়া, এবার যেন থিতু হয়ে বসতে ইচ্ছে করছে!

রাতে বিছানায় এপাশ ওপাশ করার সময় ফোনটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতেই পিং...

হোয়াটাস্যাপে বৃষ্টি, তানিয়ার ছোটোবেলার পাড়ার বান্ধবী ...

“কি রে কি করছিস...”

“এই তো ল্যাদ খাচ্ছি ...তুই?”

“আমিও...”

“কাকু কাকিমা কেমন?”

“ভালোই......আর কাকু?”

“ঠিক আছে ...তোর সাথে দেখা হয়না!”

“হয় তো...কম”

“একাই থাকে তো ...চিন্তা হয় রে”

“হুম...বাট...”

“কি!”

“একটু সঙ্গ আজকাল পায় কাকু...”

“কিরকম!”

“কেন! তোর মিতা মাসি...প্রায়ই আসেন তো”

“হুম...”

“ও কে ...বাই” বৃষ্টি অফলাইন হয়ে যায়। যেন এটুকু খবরই দেওয়ার ছিলো! কিন্তু এ তো তেমন আশ্চর্য খবর কিছু নয়। তানিয়া তো জানে মিতা মাসি মাঝে মধ্যেই ওদের বাড়ি আসে, বাবার সঙ্গে দেখা করে যায়, কিন্তু বৃষ্টির টেক্সটে কি যেন অন্য একটা সুর বাজছিলো কেন মনে হচ্ছে তানিয়ার!

এখন সাড়ে নটা বাবাকে একবার ফোন করাই যায়। বাবাকে ফোন করে তানিয়া, বেশ কিছুক্ষন রিং হওয়ার পর কেটে যায়। আবার রিং করে... এবারে বাবা ধরেন।

“হ্যালো... প্রথমবার ধরলে না যে!”

“হ্যাঁ রে নিচে ছিলাম, ফোনটা ওপরের ঘরেই ফেলে গেছিলাম যে”

“ও... ফোন তো তুমি কাছছাড়া করোনা খুব একটা, সেরকমই কথা আছে... ”

“হ্যাঁরে বাবা... আর রাত দুপুরে ধমকাস না” ওপারে বাবার মৃদু হাসির শব্দ শুনতে পায় তানিয়া

“খেয়েছো?”

“না এই বসব ... আজ বেশ মোগালাই খাবার বুঝলি...“

“মানে!”

“আরে, মিতা এসেছিলো তো! প্রচুর আড্ডা হলো, ওকে দরজা অবধি এগিয়ে দিতেই নিচে গেছিলাম... বারণ করি তাও মাঝে মধ্যেই এসব করে নিয়ে আসে... ”

“ভালই তো... জম্পেস ডিনার, কাল দুপাক বেশী হাঁটবে... ”

“হা হা হা হা হা... ” অনেক অনেক দিন পর তানিয়া বাবার এরকম প্রাণখোলা হাসি শুনল ...

৩।।
বিগত কদিন তানিয়ার চিন্তা ভাবনায় কিছু টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। ও নিজেই ভালো টের পাচ্ছে তা, একদিন দাদা কিংশুকও ফোন করেছিলো, নানা কথার মাঝে জানালো মিতা মাসি আর বাবাকে একসঙ্গে দু একদিন বাজারে দেখেছে ওর বন্ধুরা, একদিন কফি শপেও! এই নিয়ে ইয়ার্কির ছলে কিছু রসালো ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যও করেছে...

“আমাদের দেশটা কবে বদলাবে বলত বাবলি! দুজন মধ্য বয়স্ক মানুষ মেলামেশা করছে তাই নিয়ে এদের কতো কৌতুহল!... এখানে এসব নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না” তানিয়া কিছু বলে উঠতে পারে না, কেমন একটা অবসাদ ঘিরে ধরে। মায়ের মুখটা ভেসে উঠে ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যায়।

এরপর একদিন তানিয়া ফোন করে বসে মিতা মাসিকে ...

“হ্যালো... মিতা মাসি!”

“হ্যাঁ ...বল এতদিন পর কি মনে করে!”

“শোনো না... আগামী রবিবারের ফ্লাইটে আমি যাচ্ছি... দাদাও নামছে শনিবার রাতেই, তুমি আসবে...”

“সে তো ভালো কথা কতদিন পর তোরা এক জায়াগায় হবি... কিন্তু আমি! আমি কি করব?”

“অবশ্যই আসবে কিন্তু!... না না বরং আমরাই যাবো তোমার ফ্ল্যাটে... খুব জরুরী কথা আছে”

ফোন রেখে দেয় তানিয়া। আপনা থেকেই একটা মৃদু হাসির প্রলেপ জেগে ওঠে ওর মুখে... উঠে গিয়ে জানালাটা খুলে দেয় দক্ষিণের, একটা তিরতিরে মিষ্টি হাওয়া ঘরে ঢুকে পড়ে... এ শহরে এখন ঋতু পরিবর্তনের সময়।


ফেসবুক মন্তব্য