পথের মানুষ, পথের ডাক

উদয়ন ভট্টাচার্য

এক তরুণী অপেরা গ্লাসে চোখ রেখে একের পর এক বন্ধ জানলার খড়খড়ি খুলে সামনের রাস্তা দিয়ে ঘুঙুরের ঝুমঝুম আওয়াজ তুলে এক ফেরিয়ালার চলে যাওয়া দেখছেন, সেলুলয়েডে এই দৃশ্য সাদা-কালোয় অমর করে এঁকে গেছেন সত্যজিত রায় তাঁর চারুলতা সিনেমায়। চারুর একাকীত্বের, চার দেওয়ালের বাইরের জগৎ ও পথের মানুষ, পথের ডাকের প্রতি চারুর স্বাভাবিক আগ্রহের সে ছিল এক অসাধারণ দৃশ্যায়ন।

কোনো বিষন্ন গোধূলির নির্জন মুহূর্তে আমার আন্ধেরির ফ্লাটের সামনের পথ থেকে যখন ভেসে আসে কোনো অচেনা ডাক, কোনো অচেনা আওয়াজ, আমি এখনও জানলা দিয়ে পরম আগ্রহে মুখ বাড়িয়ে দেখি সেই পথের মানুষকে, মন দিয়ে শুনি সেই পথের আওয়াজ। আসলে এই সব মানুষ, এই সব আওয়াজই পথ থেকে ঘরের মধ্যে ছুঁড়ে দেয় এক অচেনা অজানা জগতের রহস্যঘন ইশারা যা আমাদের উৎসুক করে তোলে। আমাদের প্রত্যেকের বুকের মধ্যে থেকেই তাই অপেরা গ্লাস হাতে নিয়ে এক চারুলতা উঁকি মেরে যায় মাঝে মধ্যে।

বিখ্যাত প্রাবন্ধিক রাধাপ্রসাদ গুপ্ত লিখেছিলেন 'কলকাতার ফেরিওয়ালার ডাক এবং রাস্তার আওয়াজ' নামে এক দীর্ঘ প্রবন্ধ। সে লেখা পড়তে পড়তে মনে হল জীবনের এই সায়াহ্নে পৌঁছে আজ আমার বুকেও তো অক্ষয় জলছবির মতো সঞ্চিত হয়েছে অগনিত পথের মানুষের মুখ, পথের মানুষের ডাক। তাদের কথাই না হয় আজ আমিও কিছু বলে যাই এখানে।

আজ সকাল বেলায় জানলার ধারে বসে চা খেতে খেতে যখন এ লেখা লিখছি, শুনতে পাচ্ছি পথ থেকে ভেসে আসছে ডাক, 'নারিয়েল পানি'। রোজই এ সময়ে শুনতে পাই এই ডাক। এরপরেই, একটু বেলা বাড়লে প্যাঁক-প্যাঁক করে হাতে সাইকেলের হর্ণ বাজিয়ে মাথায় অ্যালমোনিয়ামের গামলায় ইডলি নিয়ে আসবে অন্য আরেকজন। ইনি আসেন হেঁটে। এবং প্রায় এর পেছন পেছনেই, ক্রিং-ক্রিং সাইকেলের ঘন্টি বাজাতে বাজাতে ক্যারিয়ারে কল লাগানো স্টিলের পাত্রে গরম চা বসিয়ে নিয়ে আসে চা ওয়ালা। জানলা দিয়ে দেখতে পাই আসেপাশের বহুতলগুলো থেকে সুরক্ষাকর্মীরা এসে প্লাস্টিকের কাপে চা খাচ্ছে, পাশের ইঞ্জীনিয়ারিং কলেজের ছাত্রাও ভীড় করে এর থেকেই চা কিনে দিচ্ছে বোধহয় দিনের প্রথম চায়ের কাপে চুমুক।

আমার ছোটোবেলায় ভোরবেলা বাড়ির সামনের হাইড্রেন্ট থেকে হোস পাইপে আসা গঙ্গাজল দিয়ে রাস্তা ধোয়ার ফটফট আওয়াজে ঘুম ভেঙে যেত। কোনো কোনো অঞ্চলে অবশ্য ভিস্তি চামড়ার থলে ভরা জলেও রাস্তা ধোয়া হত। তারপর একটু বেলা হলেই কপালে তিলককাটা ভিখারী খঞ্জনী বাজিয়ে "রাই জাগো রাই জাগো" গান গেয়ে দরজায় এসে দাঁড়াতো। কখনো কখনো তাদের সঙ্গে থাকতো গেরুয়া পরা বৈষ্ণবীও।

মনে আছে, একসময় ধবধবে সাদা ধুতি পাঞ্জাবী পরা এক ভদ্রলোক পাড়ার প্রতি দরজায় এসে নীচু গলায় বলতেন, "আমায় দুটি চাল দেবেন? আমার চারটি সন্তান না খেয়ে রয়েছে।" পরে জানা গিয়েছিল ভদ্রলোক ছিলেন অবিবাহিত। এমনি আরেকজন মানুষের স্মৃতিও এখনো অম্লান। মোটা সোটা শুধুমাত্র কৌপিন পরা একজন মানুষ বেত দিয়ে নিজের পিঠে সপাং সপাং মেরে , 'হাবে হাবে, বাগবাজারের রসগোল্লা খাবে' বলে চিৎকার করে ভিক্ষা করত। পোঁটলা হাতে বেদেনী ডাক ছেড়ে যেত, "বাত ভাল করবে, দাঁতের পোকা বের করবে!" এদেরই কেউ কেউ ডুগডুগি বাজিয়ে পুতুলের নাচ দেখাতো অথবা বাঁশি বাজিয়ে সাপ খেলা।

ছোটোবেলার অনুষঙ্গে মনের ভিতর ভীড় করে আসে কত যে স্মৃতি! শুধু মানুষ বা আওয়াজই নয়, আরো অনেক কিছু। এই যেমন মনে পড়ে যাচ্ছে, কিউটিকিউরা পাউডার, আফগান স্নো, কান্তা সেন্টের কথা। মনে আছে একজন মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাঁক পাড়লেই, বড়ির মহিলারা এসব পুরোনো শিশি-কৌটো নিয়ে দরজায় এসে দাঁড়াো। এই সবের খালি কৌটো শিশির বদলে সেই মানুষটি একটা বাটি বা খেলনা দিত গৃহস্থকে।

একটু যখন বড় হয়েছি, তরুণ অবস্থা, এক শীতের সকালে কোনো কারণে বাড়ির দরজায় একা দাঁড়িয়ে আছি, একজন ছোটোখাটো, গোলগাল চেহারার মধ্যবয়স্কা ধবধবে মহিলা আমার কাছে এগিয়ে এসে জানতে চেয়েছিলেন, "এটা কি বামুন বাড়ি? আমি ঘটক দিদি। এ'বাড়িতে কি বে-র যুগ্যি পাত্র আছে?" সেই শীতের সকালের মিঠে রোদ কি হঠাৎ বাসন্তী হয়ে উঠেছিল? এত বছর বাদে সে কথা আর মনে না থাকলেও বিয়ের ব্যাপারটায় যে সে সময় অল্পবয়সীরা বেশ লজ্জা পেতাম, সে কথা বিলক্ষণ মনে আছে।

সে সময় পাড়ায় পাড়ায় মোটা গলায় হাঁক পেড়ে ঘুরে বেড়াত কাবুলিওয়ালা। চিনা সিল্কের কাপড় বোঁচকা বেঁধে কাঁধে নিয়ে বিক্রি করে বেড়াত চিনাম্যান। আর কাশ্মীরি শালওয়ালারা শীতের আগে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করত শাল, সিল্কের শাড়ি ও কার্পেট।

তখনও মধ্যবিত্ত বাড়িতে গ্যাস ঢোকে নি, রান্না হতো মাটি দিয়ে তৈরি কয়লার উনুনে। সেই উনুন নিকাবার মাটি পর্যন্ত ঝুড়িতে করে মাথায় নিয়ে ফেরিওয়ালা বিক্রি করতে আসতো। বিশাল ঝুড়িতে করে ঘুঁটে সাজিয়ে 'ঘুঁটে চাই গো মা, ঘুঁটে' হেঁকে যেত ঘুঁটেওয়ালি।

দুপুরের রোদ গড়াতে না গড়াতেই হাজির হতো নানান রকম খাওয়ার জিনিষ নিয়ে ফেরিয়ালারা। যেমন বিচিত্র ছিল সে সব মানুষেরা, তেমনি বিচিত্র ছিল তাদের খরিদ্দার ডাকার আওয়াজ। 'ঘুগনি-আলুরদম', হেঁকে একজন আসত বিকেলের দিকে। বড় বিস্কুটের খালি টিনের গায়ে আংটা লাগিয়ে তাতে কাপড় বেঁধে গলায় ঝোলানো। সেই টিনের মধ্যে আবার দুটো আলাদা খালি ডালডার কৌটোয় থাকতো ঘুগনি আর আলুর দম। শালপাতার টুকরোয় মুড়ে বিক্রি করতো সেই সুস্বাদু খাবার। ঐরকম ভাবেই গলায় বড় বিস্কুটের খালি টিনে মুড়ি আর তার গা ঘিরে লাগানো অনেকগুলো ছোট কৌটোয় মশলা নিয়ে একজন বিক্রি করতে আসতো ঝালমুড়ি। মাথায় বিরাট ভরা থালা আর কাঁধে বাঁশের স্ট্যান্ড নিয়ে ফেরিওয়ালা আসতো আলুকাবলি ও ফুচকা বেচতে। মাথায় টিনের বাক্স নিয়ে একজন ঠিক সন্ধ্যার মুখে হেঁকে ষেত, কেক পেস্ট্রি প্যাটিস। এ সব পথে পথে ঘুরে বিক্রি হওয়া মুখরোচক খাবার দিয়ে দিব্যি বিকেলের জলখাবারটা সেরে ফেলা যেত।
আর এই প্রসঙ্গেই মনে পড়ছে মোড়ে মোড়ে তখন ছিল তেলেভাজার দোকান। বড় লোহার কড়াইয়ে ভাজা হত আলুর চপ, বেগুনি, ফুলুরি আর পেঁয়াজি। মা-কাকিমারা বিকেলে গা ধুয়ে চুল বেঁধে আঁচলের খুঁট থেকে পয়সা বের করে আমাদের দিলেই আমরা একছুটে পাড়ার মোড়ের দোকান থেকে এনে দিতাম তেলেভাজা। মনে আছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে বাগবাজারের মোড়ে এক তেলেভাজার দোকান ছোটো ছোটো গোল গুলির মত ভেজিটেবল চপ বানিয়ে তার নাম দিয়েছিল লড়াইয়ের চপ। আর বিধান সরণিতে রঙমহল থিয়েটারের উল্টোদিকের 'নেতাজির তেলেভাজা' বলে একটা দোকান ছিল। তেইশে জানুয়ারি, নেতাজির জন্মদিনে বিনি পয়সায় তারা তেলেভাজা বিলি করত। এখনও কি করে? কী জানি!

বিধান সরণি বলতেই মনে পড়ে গেল হাতিবাগান থেকে প্রায় শ্যামবাজার পর্যন্ত রাস্তার দুদিকের হকার্স এবং তাদের খরিদ্দার ডাকার বিচিত্র পদ্ধতি। বিশেষ করে পুজোর আগে এবং চৈত্র সেলের সময় সরগরম হয়ে থাকতো পথ। একটু কান পেতে শুনলেই বোঝা যেত এই পথের মানুষদেরও ছিল নিজস্ব অভিনব সব মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি।

আজকাল তো যে কোনো বড় শহরেই কমে গেছে পথের এই সব ফেরিওয়ালা, বেদে-বেদেনী, ঘটকদিদি, পুতুল নাচ দেখানো মানুষগুলো। হারিয়ে যাচ্ছে পথের সে সব হাঁক-ডাক আওয়াজ। মল-ডিপার্টমেন্টাল স্টোর্সের নবসংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে মানুষ। তবু এসব একেবারেই কি গেছে? বোধহয় না। মফস্বলের শহরগুলোর কথা না হয় বাদই দিলাম, এই মুম্বাই শহরেও দেখতে পাই অন্যরকমের পথের মানুষদের। তারা হয়তো মাথায় করে আর তাদের পণ্য নিয়ে ঘোরে না, ঘোরে ভ্যান গাড়ি বোঝাই মালপত্র নিয়ে, ঐ রকমই হাঁক দিয়ে দিয়ে। কখনো ডাক ছাড়ে, গোবি-ফ্লাওয়ার-ভিন্ডি-ক রেলা-বাইগন"। কখনো বা ''নারিয়েল পানি"। কখনো কার্পেট। এখানকার পথে মাঝে মাঝে এক মহিলাকে দেখতে পাই হলুদ-সিঁদুর দিয়ে সাজানো হৃষ্টপুষ্ট এক গরুকে নিয়ে আবাসনের সামনে দাঁড়াতে। মানুষ টাকা দিয়ে ঐ মহিলার থেকেই ঘাস কিনে গরুটার খাইয়ে পুণ্য অর্জন করে।

সেই কবেই রবীন্দ্রনাথ লিখে গেছেন, "বাসনওয়ালা থালা বাজায়, সুর করে ওই হাঁক দিয়ে যায়...", এই থালা বাজিয়ে বাসন বিক্রিটা কিন্তু সেই ছেলেবেলার কলকাতায় যেমন দেখেছি, এই বুড়োবেলার মুম্বাইতেও তেমন দেখতে পাই। শুধু বাসন গুলো কাঁসা পেতল অ্যালমোনিয়াম কলাই করা থেকে পালটে গেছে স্টিলে। তবু মাঝে মাঝে দেখি থালা পিটিয়ে মাথায় স্টিলের বাসন নিয়ে কখনো কখনো কোনো কোনো বাসনওয়ালি চলে যায় আমাদের আবাসনের সামনে থেকে। পুরানো জামা কাপড়ের বিনিময়ে তারা দিয়ে যায় সেই স্টিলের ঘটিটা-বাটিটা। কোনো কোনো দুপুরে আমার মতো মানুষের স্মৃতি কাতরতা বাড়িয়ে দিয়ে গুলমোহরে ঢাকা আমাদের জুহু-ভারসোভার নির্জন পথের মনেকেমনকরা নিস্তব্ধতা মথিত করে আজও বেজে ওঠে বাসনওয়ালির ঢং ঢং। আমাদের বুকের ভেতরটাও ভাসিয়ে দিয়ে সেই আওয়াজ যেন দুলে দুলে বাজতেই থাকে-- ঢং ঢং ঢং...

ফেসবুক মন্তব্য