প্রসঙ্গঃ পুস্তক আলোচনা

মিতিল চক্রবর্তী

স্বনামধন্যা লেখিকা যশোধরা রায়চৌধুরীর স্মৃতিবিজড়িত লেখা “শ্রীশ্রী অন্নপূর্ণা ভান্ডার’ পড়ে নস্ট্যালজিক হাওয়ায় ভাসলাম। পুজোর ছুটির মজা শেষ হতে না হতেই লেখিকার জবানিতে ‘দুয়ারে প্রস্তুত পরীক্ষাগাড়ির ঘন্টা নাড়তো পরীক্ষার অপদেবতা। ‘ছোটবেলায় ছিল সাদাকালো জীবন। সাদাকালো ফটো, সাদাকালো সিনেমা, আলো আর লোডশেডিং ইত্যাদি। পাশের বাড়িতেই প্রথম টি.ভি এল। এই থাকা না থাকাও তো একরকমের সাদাকালো। এ প্রসঙ্গে মনে পড়লো ওনিডা টি.ভির বিজ্ঞাপন - Neighbour’s Envy,Owner’s Pride। ভাইফোঁটার কেনা উপহারের সঙ্গে কটি ভাই কটি বোনের হিসেব কখনোই মিলতো না। দাদার কোন বন্ধু হয়তো লাইনে বসে যেতে বাধ্য হত। এই সাদা কালো জীবন ছিল সাদাসিধে, হয়তো আজকের রঙিন জীবনের হাতছানির থেকে অনেক বেশি নির্মল আনন্দে ভরপুর।

ছোটবেলায় শীত এলে মায়েরা সোয়েটার বুনতো, এখন কারোর সময় নেই। ছাতে শুকানোর সময় সোয়েটারের নীচে ইঁট বেঁধে দৈর্ঘ্যে বাড়ানোর চেষ্টার বর্ণনা বিস্মিত করলো। গোলাপী মিক্সচারের সঙ্গে উধাও সেই সব কম্পাউন্ডারও কারণ শ দুই টাকার ওষুধ না লিখে দিলে ডাক্তারেরও মান থাকে না আর পেশেন্ট পার্টিও খুশি হন না। প্রেমিকের হাতচিঠি, চিরকুটের রোমাঞ্চও আজ আর নেই। লেখিকার ডাকবাক্সে আসতো বান্ধবীর প্রেমিকের চিঠি। প্রতিশ্রুতির খেলাপ করে একবার তা পড়ে ফেলায় অবধারিত বন্ধু বিচ্ছেদ। ছাতের অন্ধকারে জীবনের প্রথম চুমুটি ঘটে না আর। এখন সবই পাবলিক। সারাদিন রেডিওযাপনের কারণেই জগন্নাথ বসুর মত সুপুরুষ কন্ঠ অচেনা প্রেমিক হয়ে রয়েছিল। মায়ের শাসনে হিন্দি গান চালানো নিষিদ্ধ ছিল। অন্য বাড়ির রেডিও থেকে ভেসে আসা রাহুল দেব বর্মণ, আশা ভোঁসলে, চুরা লিয়া হ্যায় ছিল চুরি করে খাবার খাওয়ার মতই সুস্বাদু। এখন ছোট্ট পকেট রেডিওর বদলে সবার হাতে হাতে মোবাইল ফোন। তাই এখন আর শোনাই যায় না সেই উদগ্রীব প্রশ্ন – দাদা কত হল? কটা উইকেট পড়ল? পড়ার বিষয়ের মধ্যে ইতিহাস, ভূগোল জঘন্য লাগতো। প্রিয় ছিল বিজ্ঞান,বাংলা,ইংরেজি। পাঠ্য বইয়ের তলায় রেখে শরদিন্দু, সমরেশ, সুনীল গাঙ্গুলি পড়ার অভ্যেস হয়েছিল ক্লাস সেভেন থেকেই। দিদিমার ছিল ঊষা সেলাইকল, মায়ের সিঙ্গার মেশিন আর লেখিকা চাকরি পেয়ে কিনেছিলেন সিঙ্গারের ফ্যাশন মেকার যা দিয়ে ২৫ রকম ডিজাইন করা যায়। সেলাই বোধহয় ছিল মায়ের অ্যান্টি ডিপ্রেসান্ট। দিদিমা শোভা ঘোষ বিয়ের পর পড়তে যেতেন বেথুন কলেজে দুদিকের জানলা বন্ধ ঘোড়ার গাড়িতে উনিশশো বিশের দশকে। একটি বিশেষ সময়ের লাগাম টেনে রাখা নিয়ন্ত্রিত নারী স্বাধীনতার চিত্ররূপ ফুটে উঠেছে। দিদিমার মুখস্থ ছিল অসংখ্য সংস্কৃত শ্লোক।

মার্জারপ্রিয় ভবানীপুরের বাড়ি ‘বেড়ালের বাড়ি’ নামেই খ্যাত। ছিল ৩৫ টি বেড়াল আর পাখির কিচির মিচির। সুন্দরী নামের একটি কুকুরও ছিল। মা না হলেও মাতৃহারা বিড়াল শিশুরা তার বুক চুষে মাতৃত্বের স্বাদ দিয়েছিল। শৈশবে জ্ঞানচক্ষু উন্মীলনের আগেই বাবাকে চিরতরে হারানোর যন্ত্রণা লাঘব করতে টিনেজে মনের মধ্যে নিজস্ব বোধ দিয়ে লেখিকা তাঁকে গড়ে তুলেছিলেন লফটে রাখা বাবার অসংখ্য বই থেকে। মাকে কখনো সাদা শাড়ি ছাড়া পড়তে দেখেন নি। নেমন্তন্ন বাড়িতে নিরামিষ খেলেও বাড়িতে গোপনে মাছ,মাংস খেতেন যা দেখে রাগ হত কন্যার। মনে হত ‘গোপনীয়তা কেন?’ আশির দশকে জীবনে এসেছে ম্যাগি টু মিনিট নুডলস যাকে দুষ্টু বন্ধুরা বলত ‘মাগি নুড’। সেই কারণে তাতে মেশানো হত গাজর, বিন, বাঁধাকপি। আশির দশক ছিল নেলসন ম্যান্ডেলা, ভূপেন হাজারিকা, ব্যাটলশিপ পোটেমকিন নিয়ে উত্তাল হওয়ার দশক যখন লেখিকা প্রেসিডেন্সিতে পাঠরত। মা অরুন্ধতী ছিলেন গায়িকা ও চিত্রশিল্পী। দিদিমা শোভা ঘোষ ফরাসি, এস্রাজ, সেতার চর্চা করা আধুনিকা। দিদিমাই ভালোবাসা, স্নেহ, আদর, যত্ন, সম্মান, আত্মসম্মান, প্রকৃত মনুষ্যত্বর চেতনা রোপণ করে দিয়েছিলেন নাতনির অন্তরে। এক জামাইয়ের মৃত্যু, এক পুত্রবধূর মৃত্যু, সন্তানদের প্রবাসজীবন শেষ বয়সের একাকিত্ব নিয়েও ছিলেন জীবন রসে টইটম্বুর। দাদু দেবপ্রসাদ ছিলেন মিশ্র গণিতে ঈষান স্কলার, বহুভাষাবিদ, রিপন কলেজের অধ্যাপক। খুবই রাশভারি। তাঁর গলা ঝাড়ার শব্দ, খড়মের খটখট ত্রাসের সৃষ্টি করত। মনে পড়লো বাংলা চলচ্চিত্রের হাউসকোট পড়া থরহরিকম্প করে দেওয়া অভিনেতা কমল মিত্রর কথা। দিদিমা, দাদু, মা সকলেই কালের নিয়মে আজ অতীত। সহকর্মিণী অনিন্দিতার একটি সার্জারি করতে গিয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যুও লেখিকাকে বিপর্যস্ত করেছিল। মনে হয়েছিল সবাই একটা সরু রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছি যার একদিকে খাড়া পাহাড়, অন্যদিকে খাদ। একজন টুপ করে খাদে পড়ে গেল।

যে দিন খুব কাজ করতে ইচ্ছে করে সেই দিনটাই লেখিকার চোখে বসন্ত। তাঁর ভাষায় ‘পর্ণমোচীদের জেগে ওঠার দিন। ‘দিশি ভ্যালেন্টাইন দিবস সরস্বতী পুজো থেকে দোল পর্যন্ত থাকে বসন্ত আর কিপ্টে বাবা জ্যাঠার সঙ্গে মার্চের ১৫ তারিখের আগেই ফ্যান চালানো নিয়ে মতান্তর। অফিস টাইমের ভিড়ে এক মহিলাকে দেখা গেল ড্রাইভ করছেন ঠোঁটে সিগারেট। স্মোকিং ইনজুরিয়াস হলেও এটা একটা স্টেটমেন্ট মনে হল লেখিকার। কুল কনফিডেন্সের চিত্র। হয়তো বসের কাছে মিইয়ে আসবে তেজ তবু এই মুহূর্তে সে স্বয়ংসম্পূর্ণা। বসন্ত সম্পর্কে একটি স্বতন্ত্র অভিব্যক্তি পেলাম যখন লেখেন ‘প্রেমিক প্রেমিকাদের জন্য প্রেম জিন্দাবাদ তো যুগে যুগে বসন্তকাল দিয়েইছি আমরা। এবারের বসন্তকালটা একটু অল্টারনেটিভ হোক। একলা কিন্তু সুখী, নিজের মত করে বেঁচে থেকে খুব ভালো থাকা মেয়ে, এবং ছেলেদের জন্যও তো উতসর্গ করা যায়।

‘শ্রীশ্রী অন্নপূর্ণার ভান্ডার অর্থাৎ মা,দিদিমার ভান্ডার পরিপূর্ণ ছিল কারণ তাঁদের দর্শনে ফেলে দেওয়ার কোন গল্প ছিল না। পুরনো উল,বাসি পাঁউরুটি যেমন কাজে লাগানো হত তেমনি পুরনো শাড়ি দিয়ে তৈরি হত পর্দা। মাদার ডেয়ারির প্যাকেট জুড়ে জুড়ে তৈরি হত বাজারের থলে। গাছের সালোক্সসংশ্লেষের মত শিকড় থেকে উঠে আসা মা, দিদিমার আদর্শ ও জীবনবোধের সঙ্গে নিজস্বতা মিশিয়ে এক যোগ্য উত্তরসূরী পাঠকের রসনা তৃপ্ত করে এবং ক্ষুধা বাড়ায় এমন খাদ্য তৈরিতে সর্বার্থে সফল।
(শ্রীশ্রী অন্নপূর্ণার ভান্ডার, যশোধরা রায়চৌধুরী, প্রকাশক- ছোঁয়া, মূল্য-১৬০ টাকা)

ফেসবুক মন্তব্য