অয়নপথ

কণিষ্ক ভট্টাচার্য



এক
বড়োলোক পাড়ার গরিব প্রতিবেশীর মতো সেই গলি। উৎসব কিংবা শোকে দেখা হলে, সৌজন্যের বাইরে যার সঙ্গে আর প্রতিদিনের সংযোগ থাকে না। এই পথে গাড়ির ঢুকে পড়া আসলে তেমন বিশেষ পরিস্থিতির সম্পর্ক। যেই দুই গাড়িচলা রাস্তাকে জুড়ে রেখেছে এই অ্যাসফল্ট, সেই রাস্তায় জ্যাম-জট না হলে এদিকে নজর পড়ে না তেমন। গরিব আত্মীয়ের বাড়ি বড়োলোক অতিথি এলে যেমন ব্যস্ততা পড়ে যায় আপ্যায়নের অথচ তার পরিসর থাকে না, তেমনই অবস্থা হয় রাস্তার দুই মুখ দিয়ে গাড়ি ঢুকলে। সচেতন ভাবে আতিথেয়তার কাপের হ্যান্ডেল বা নিজের শাড়ির বেগুনি কুচির দিয়ে তাকায় অতিথি, কোথায় নোংরা রয়েছে বা কোথাও যেন ঘষা না লাগে। দেখে নেয়। বাকি সারাবছর ধরে জানা যায় যে, উদাসীনতা এক রকমের স্বাধীনতা যা প্যান-অপটিকনকেও ব্যর্থ করে দেয়।

দুই
মর্গে মৃতদেহের পায়ের বুড়ো আঙুলে যেমন স্লিপ ঝোলানো থাকে তেমনই বিপজ্জনক বাড়ির নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়েছে কর্পোরেশন। তবু তার নিচের রোয়াকে ফাটলের গাছের চারা আর কালুর চারটে চোখ-না-ফোটা ঘুমন্ত বাচ্চার পাশে কয়েকটা ছেলে বসে থাকে। সন্ধে যখন ক্যাসিওপিয়ার ডাবলিউ আর সপ্তর্ষিমণ্ডলের প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে আকাশের উত্তরের খোঁজে বের হয় কোচিং ক্লাসে তখন ওরাও বেরিয়ে পড়ে দরজার ল্যাচ টেনে, সিমেন্টের বাগানের ফুলের টবের পাশ দিয়ে, গ্রিলের গেটের লক তুলে, ফ্ল্যাটের একতলায় সিকিউরিটি কাকুর নীল প্লাস্টিকের চেয়ার সরিয়ে। কালু ওদের ভয় পায় না, সন্তানের নিরাপত্তার জন্য চিন্তিত হয়ে ওঠে না। কালু জানে ওরা এসে পাশাপাশি বসে থাকবে। যদি না সে পাগলি এসে আগে থেকে বসে থাকে। যদি না বড়ো রাস্তায় জ্যাম হয় আর কোনও গাড়ি ঢুকে পড়ে গলিতে। তা নাহলে উঠবে না কেউ। কোনও কথা বলবে না নিজেদের মধ্যে। স্তব্ধ বাড়িটার গায়ে যেমন কর্পোরেশনের স্ট্রিট ল্যাম্পের আলো পড়ে তেমনই ওদের মুখ জুড়ে কেবল ছড়িয়ে থাকবে প্রত্যেকের নিজস্ব অ্যান্ড্রয়েড স্ক্রিনের আলো।

তিন
আবার মেয়েটার ছবিটা স্ক্রিনে বড়ো করে ছেলেটা। সকালে যখন ওদের মাল্টিপারপাস স্কুলের উলটো পারে রেঞ্জার সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তখন আবার সেই গন্ধটা পেয়েছে ছেলেটা। ওদের সঙ্গে কোচিং-এ যে মেয়েরা পড়ে তাদের কারও গা থেকে এই গন্ধটা আসে না। এটা কোনও তেল-সাবান-শ্যাম্পু-ডিও -পারফিউমের গন্ধ নয়। সেই গন্ধগুলো ও চেনে। কোনোটা মায়ের গায়ের থেকে আসে, কোনোটা দিদির ওড়না থেকে, কোনোটা কোচিং এর মেয়েগুলোর টপ থেকে। এই গন্ধটা কারোর মত নয়। এটা ওই মেয়েটারই গন্ধ। যেন আকাশি রঙের মতো একটা ছড়ানো গন্ধ। ছেলেটার দিকে লক্ষ না করে একেবারে ওর গা ঘেঁষে মেয়েটা রাস্তা পার হয়ে স্কুলে ঢুকে যায়। এখন তিন তলায় ওদের ক্লাস। ছেলেটা জানে। উলটো দিকের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে ছেলেটা। মেয়েটা ক্লাসে গিয়ে জানলার কাছের বেঞ্চে ব্যাগ রাখে। জানলা দিয়ে এক ঝলক তাকায় রাস্তার দিকে। আবার যেন সেই নেশা লাগানো গন্ধটা ভেসে এসে লাগে ওর নাকে। তারপরে মেয়েটা সরে গিয়েছিল জানলা থেকে। স্ক্রিনটা অনেকক্ষণ টাচ করা হয়নি। আলো নিভে গেছে স্ক্রিনের। অন্ধকার নেমে এসেছে চারপাশে। কর্পোরেশনের স্ট্রিট ল্যাম্পের আলোর কাছে ঘুরঘুর করছে কয়েকটা পোকা। পোড়ো বাড়িটার ছাদে হঠাৎ পায়রা ডাকল। এত্ত বড়ো একটা চাঁদ উঠেছে আজ আকাশে। পূর্ণিমা আজ! পিং করে একটা নোটিফিকেশন আসে হঠাৎ। ছেলেটা প্যাটার্ন লক অন করে। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এসেছে একটা। আবার সেই গন্ধের ঝাপট আসছে।

চার
সবুজ পুতুলটার হাতটা ছিঁড়ে ভেতর থেকে তুলো বেরিয়ে এসেছিল বলে টুলটা টেনে ওপরের তাক থেকে মায়ের সুচসুতোর বাক্সটা নামিয়েছিল ও। স্কুলের ক্র্যাফটের জন্য ছুরি কাঁচি ব্যবহার করলেও সুচসুতো আগে ব্যবহার করেনি। মা স্কুলে বেরিয়ে গেছে সকালে। তখনও ও ঘুম থেকে ওঠেনি। যেদিন ওঠে সেদিন ওপর থেকে টাটা করে মাকে। বাবার অফিস দেরিতে। ওকে পুলকারে তুলে দিয়ে বাবা অফিসে যায়। তখন সাড়ে দশটা। মায়ের আসতে আসতে আড়াইটা। এই চার ঘণ্টা ওর একার রাজত্ব ফ্ল্যাটে। ওর যতদিন ইন্টারসেশন ভ্যাকেশন থাকে মার ততদিন থাকে না। ওকে একাই থাকতে হয় তখন। বাবা দুএকদিন অন্তর একটা করে গল্পের বই দিয়ে যায় পড়ার জন্য। কিন্তু ভালো লাগে না সবসময়। বাবার আরেকটা ফোন ওর জন্য বাড়িতেই থাকে ও থাকলে। একবার বাবা একবার মা ফোন করে ঠিকঠাক আছে কিনা জানতে। সবুজ পুতুলটা সেলাই করার পরে বাক্সটা রাখতে উঠেছিল ও তখনই বেজে উঠল ফোনটা। তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে উলটে গেল টুলটা। একটা অচেনা নাম্বার। অচেনা নাম্বার ওর ধরার নয়। মা এসে দেখল নিজেই নিজের হাঁটুতে বরফ লাগাচ্ছে মেয়েটা। বড়ো হয়ে গেছে। এবার ক্লাস ফাইভ হবে। ‘তোর আঙুলে কী ফুঁটলো রে, রক্ত জমে আছে কেন?’ সবুজ পুতুলটা জানলায় বসে ঠোঁটে সেই জোড়া লাগানো হাতটা চাপা দিয়ে মেয়েটাকে বলে, ‘বোলো না, বোলো না।’

পাঁচ
তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়বে ভেবেছিল সে। তবে শুয়ে পড়লেও তার ঘুম আসে না। বিছানায় এপাশ ওপাশ করে। ও ঘরে খালি পায়রার ওড়ার চটপট আওয়াজ পায় সে! যেহেতু এটা কোনও ভুতের গল্প নয় তাই গা শিরশিরে কিছুই ঘটবে না পাশের ঘরে। সে ওঠে। ফ্রিজের থেকে জলের বোতল বের করে জল খায়। বেসিনে গিয়ে কানের পিঠে জল দেয়। ফ্যানের রেগুলেটর পুরো বাড়িয়ে দিয়ে আবার এসে শোয়। ঘুম আসে না তবু। আবার ওঠে সে। বারান্দায় গিয়ে একটা সিগারেট ধরায়। স্ট্রিট লাইটের আলোর নিচে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে কালু। ওর বাচ্চাগুলো কেউ ওর গায়ে উঠে ঘুমোচ্ছে, কেউ গায়ের সঙ্গে লেগে। ক্যারমের স্ট্রাইকারের মতো গ্রিলের ফাঁক দিয়ে সিগারেটটা ছুঁড়ে দেয় ওদের দিকে। কেন দেয় সে নিজেও জানে না। হলুদ আগুন পাক খেতে খেতে নামে। সে বোঝে ঘুম আর আসবে না। আলো জ্বালায়। বই পড়ে সে খানিকক্ষণ বসে। আলো নেভায়। ছাদে গিয়ে হনহন করে হাঁটে নিজেকে আরও একটু ক্লান্ত করার জন্য। এভাবেই উত্তরায়ণের নক্ষত্র দক্ষিণায়নে পাড়ি দেয়। সে যায় চিকিৎসকের কাছে। তিনি বলেন, রিটায়ারমেন্টের পর এমন সিমটমস ন্যাচারাল। কোনও কাজে ব্যস্ত থাকার কথা বলেন। হালকা সিডেটিভ দেন। রোজ রাতে ঘুমনোর আগে একটা করে। ব্যাঙ্কের সুদ কমছে দিনদিন। পেনশনের টাকা তুলে প্রেশার-সুগার, একমাসের যাবতীয় ওষুধ একসঙ্গে কিনে রাখে সে। প্রথম রাতে একটা খেয়ে ঘুম আসে না। পরের রাতে বাকি ঊনত্রিশটা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

ছয়
ছাদঘরের জানলার গরাদ ধরে বসে থাকত সে। মাঝেমাঝে চিৎকার করত গরমকালের কমলারঙের দুপুরবেলা। ‘খুলে দে, খুলে দে।’ ছাদে পায়রার জন্য গম ছড়িয়ে দেওয়া হত। আকাশে পাক খেয়ে খেয়ে উড়ে উড়ে এসে নামত ওরা গম খেতে। সে বসে বসে দেখত। বয়েস বেড়েছে তার, শরীর বেড়েছে তবু মন বাড়েনি। পা বেয়ে ঋতুরক্ত নামলেও বোধ হয়নি ওর। মা দিন মনে করে রাখত। আবার প্রকৃতির নিয়মে সেই দিন এপাশ ওপাশও হত। কবে কোন গেরোবাজ দরজার শিকল খুলে ঢুকে পড়েছিল ওই ঘরে কেউ জানে না। একবার, দুবার সেই রক্ত এলো না। মা জিগেস করল, ‘কে? কে? তুই আমাকে বল।’ সে আঙুল তুলে পায়রাটাকে দেখালো। পায়রাটা তখন গম ভুলে ওর দিকেই তাকিয়েছিল এক চোখে। ঠাস ঠাস করে চড় মারল মা। ঠোঁটের কোন ফেটে গেল ওর। চোখ দিয়ে জল নামছে গাল বেয়ে। জল এসে রক্ত ছুঁলো। ‘বল তুই কে? কী করেছিলি তুই?’ কাঁদতে কাঁদতে সে গরাদের মধ্যে দিয়ে দুইহাত বাড়িয়ে দিল। হেঁচকি তুলতে তুলতে ডাকল, ‘পাখি আয়। পাখি আয়।’ প্রথমে ওকে কোথায় পাঠিয়ে দেওয়া হল। তারপর বাকি সবাই চলে গেল পাড়া ছেড়ে। ওর নাকি একটা মেয়ে হয়েছিল ওরই মতো। সে নাকি কোনও কথা বলে না।

সাত
চুপ করে থাকতে থাকতে সে একদিন কথা বলতে ভুলে যাবে। তারপর একদিন নিজেও ভুলে যাবে নিজের কথা। বাকি সবাই সারাদিন ধরে দশখানা বিষয় নিয়ে একশোখানা কথা বলবে। সবাই ভাববে, এই তো, কথা বলে বেশ অনেক কিছু হচ্ছে। খুশি খুশি মন নিয়ে ঘুমতে যাবে সবাই। ঘুম থেকে উঠে আরও কথা বলবে অনেক। তাদের মনে থাকবে না যে ঘুমের মধ্যেও কেবলই কথা বলে গেছে তারা। সে কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য কেউ এমন ছিল না যে শুনেছে সেই কথা। কারণ পাশে যে ঘুমচ্ছিল সেও অনর্গল কথা বলে গেছে। তারপর একদিন যুদ্ধ হবে খুব। অনেকে আরও অনেক কথা বলবে পক্ষে বিপক্ষে। বৃষ্টির মতো ছড়িয়ে পড়বে ভয়-রাগ-ঘৃণা-সাহস। তার কিছুদিনের মধ্যেই দুখানা ভীষণ বোমায় নষ্ট হয়ে যাবে বায়ুমণ্ডল। আকাশ লাল হয়ে যাবে। পাঠক বোধহয় আন্দাজ করতে পারছেন এরপর আর কথা বলার কোনও মানে থাকে না। যারা বেঁচে থাকবে এর পরেও, তারা সেদিন নিতান্ত অসহায় হয়েই পড়তে শুরু করবে পরস্পরকে। পরস্পরের হাত পা মাথা জানু ঘিলু হৃদয় লিঙ্গ পড়তে থাকবে সকলে। আর পড়তে পড়তে একদিন আবিষ্কার করবে, একজন মানুষ বহুদিন আগে একেবারে চুপ করে গিয়েছিল। সে অসহায় ছিল নাকি ভবিষ্যতদ্রষ্টা সে বিষয়ে তারা অবশ্য কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারবে না।

ফেসবুক মন্তব্য