সাদারুমাল

উত্তম বিশ্বাস



ইন্টার্ভিউ লাইনে দাঁড়ালেই আজকাল ঘুম পায় ঋষির। পেছন থেকে অদৃশ্য আত্মার মতো দ্বিগুণ উৎসাহে চাপড় মারে উদ্দালক। তবু যেন নার্ভাসনেস কাটিয়ে উঠতে পারে না ঋষি। বোকাবোকা ভাব নিয়ে চেয়ে থাকে ঠিকাদার উদ্দালকের মুখের দিকে।
“তুই পারবি।” বলিষ্ঠ ঊরুর ওপর চাপড় মেরে আবারো উত্তেজনা খুঁচিয়ে দিল উদ্দালক। ঋষি বুকের ছাতি ফুলিয়ে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলল, “কিন্তু—।”
--“কোনও কিন্তু নয়। মাত্র ঘণ্টাখানেক ইন্টারভিউ। আঠায় একবার আটকে ফেলতে পারলেই কেল্লাফতে। তোকে তখন আর পায় কে!”
--“ভালোবাসা না হলে এসব করা যায়!”
--“ন্যাকা ষষ্টি! এই আঠা ভাঙায় আজকাল আয় কত জানিস? শোন, ম্যানম্যান করবি না। তোর ফিগারটা মারাত্মক! লুকটাও দারুণ। অফারটা পেয়েছিস, লুফে নে; না হলে পরে পস্তাবি।”
--“কিন্তু সঞ্চয় ফুরিয়ে গেলে?” হাতে আরও কিছুটা সেদ্ধ ডিমের ফালি পুরে দিয়ে উদ্দালক সাহস জোগাল, “আরে বস, অত ঘাবড়ালে হয়! এসব জিনিস হাতে রেখে খরচ করতে হয়। গাঁ গ্রামে কলপোতা দেখেছিস কোনকালে? রাতে নিয়ম করে কাঁঠালিকলা খা, সব দুশ্চিন্তা রিমুভ হয়ে যাবে দেখিস। কাল চিনার পার্কে আয়, ঠিক সন্ধ্যা সাতটা।”


--“চুমু খাওয়ার অভ্যাস আছে?”
--“হ্যাঁ!”
--“কে সে? যদি চোখ বেঁধে দিই, ঠোঁট চুষে বলতে পারবে কে তোমার ভালোবাসার পাত্রী?” ঋষি শক্ত হয়ে বসার চেষ্টা করল। একটি ছিপছিপে শ্যামাঙ্গী পাতলা কাঁচের গ্লাসে মদ রেখে গেল।
--“বলত কালো মেয়েদের কষ্ট কিসের সঙ্গে তুলনীয়?” কথাগুলো জিজ্ঞাসা করতে করতে ভদ্রমহিলা একটি গ্লাস তুলে নিয়ে চুমুক দিলেন। ঋষির দিকে চাইতেই সেও বাকি গ্লাসটি তুলে নিয়ে চুমুক দিতে যাবে, অমনি ভদ্রমহিলা চুকচুক করে বললেন, “উঁহু! এটা ইন্টারভিউ টেবিল। পারমিশান নিয়েছ?”
--“সরি!” ঋষি বোধহয় বেশিই লজ্জা দেখিয়ে ফেলল। এবার ভদ্রমহিলা নিজের কোমর থেকে একখানি সাদা রুমাল, ঋষির চোখের সামনে মেলে ধরে জিজ্ঞাসা করলেন, “দেখ ত রঙ বদলাচ্ছে?” ঋষি পুরুষসুলভ গাম্ভীর্য বজায় রেখে জবাব দিল, “না!”
--“এইবার গ্লাস তোলো। চুমুক দাও।--- দ্যাখ ত এবার কোনো রঙ----?” ঋষি বিভোর হয়ে চেয়ে রইল নীলনয়নার দিকে।


রাত পোহালেই দোলপূর্ণিমা। শহরের প্রতিটি স্ট্রীটলাইট যেন চাঁদের সাথে পাল্লা দিয়ে সমানে আলো ঢেলে দিচ্ছে। ফুটপাথের আবিরের পশারগুলো সেইসাথে আরো আবেশ ছড়িয়ে দিচ্ছিল। একটি সাদারুমাল হাতে দাঁড়িয়ে আছে ঋষি। আবিরের দোকানগুলি যেদিকে ঠিক তার উল্টোদিকে ল্যাম্পপোস্টের গা ঘেঁষে। কালো কাঁচে ঢাকা একটি গাড়ি এসে থামল। গেট খুলে যেতেই ঋষির ভেতর থেকে কে যেন ধাক্কা দিয়ে বলতে লাগল, “পার্টি পেয়ে গেছিস ওঠ! সোজা হয়ে বস। সিটবেল্ট বেঁধে নে। এখানেও ঘামছিস? বোকা চো---!” ঋষি দেখতে পেল ড্রাইভ করছেন মাঝবয়সী এক ভদ্রমহিলা। পিঠের ওপর ছড়িয়ে পড়া চুল থেকে অদ্ভুত এক মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে। ঠিক যেন ঋষিদের ছাদ-টবে ফোটা বেলফুলের মতো। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ির মধ্যে থেকে এই প্রথম কথা এল ঋষির উদ্দেশ্যে,--“ঘুম পাচ্ছে? এই লাইনে আজই কি প্রথম?” ঋষির জিভে আঠা জড়িয়ে এল। জীবনে প্রথম কাঁচের মধ্যে আটকা পড়েছে সে! এক্কেবারে বোকা মাছির মতো। ঋষির মাথার মধ্যে চক্কর দিয়ে উঠল, “এই মাঝবয়সী মহিলার সাথে---! কী কপাল আমার ছিঃ! আমি পারব না। কোথায় যাচ্ছি তবে আমি? ক্যান এলাম? এঁর সামনেই আমাকে জামা খুলতে হবে? বেশ্যাবৃত্তির পথেও কি একটা রুচির অপশান খোলা থাকে না? একজন মাঝবয়সী মহিলার সাথে--- আমি পারব না!” চুলের গন্ধ যেন আরও তীব্র হয়ে নেশার মতো হুহু করে বয়ে আসতে লাগল ঋষির দিকে। কখন যেন ঋষি ঘুমিয়ে পড়ল। গাড়ি কতক্ষণ ছুটল মনে নেই, মিষ্টি এক সঙ্গীতের ধ্বনিতে ঋষির তন্দ্রা কেটে গেল। গাড়ি থামল এসে একটি গাছের নীচে। থালাভরা আবির নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জনা পাঁচেক সুন্দরী। কোনরকম ভূমিকা না করেই, ঋষিকে আদ্যোপান্ত আবিরে রাঙিয়ে দিল ওরা। এরপর আরো দু’পা এগোতেই একভাণ্ড তরল গুলাল, জ্যোস্নায় তার রঙ মালুম করা না গেলেও অনুভবে বোঝা যায় দুগ্ধজাতীয় কিছু একটা হবে--- ওরা মাথায় ঢেলে দিয়ে ঋষিকে স্নান করাল। এরপর পাঁচজন পথপ্রদর্শক এসে ওকে সম্ভাষণ জানাল। গা মাথা, পোষাক পরিচ্ছদ ভিজে অবস্থায় মোহাবিষ্টের মতো ওদেরকে অনুসরণ করে এগিয়ে চলল ঋষি। গভীর জঙ্গলের কাঁটাঝোপ চিরে কাঠুরিয়ারা যেমন পথ রচনা করে, তেমই সরু গলি-পথ। আরও খানিকটা এগোতেই ঋষি স্তম্ভিত হয়ে গেল।

একটা মন্দির। অপূর্ব ধুপের সুরভী আর খোলকরতালে মুখরিত এর ভেতরকার প্রসারিত প্রাঙ্গণ। এতক্ষণ যিনি ড্রাইভ করে ঋষিকে নিয়ে এলেন, তিনি সবার থেকে উঁচু আসনে, আবিরের পাহাড়ের ওপর বসা।
--“নাচতে পার?” ধ্যানমগ্ন পাষাণ হতে চকিত প্রশ্ন ছুটে এলে যেমন মনে হয়, ঠিক তেমনি ভাবে সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল ঋষি।
--“না!” মুহূর্তের মধ্যেই মেয়েদের পায়ে আবিরের ঘূর্ণি উঠল। ঋষির চোখের পাতা বেয়ে কিছুক্ষণের জন্যে অন্ধকার নেমে এল।
পল্লব থেকে আবির সরিয়ে লাললাল চোখ মেলে ঋষি দেখল,-- যারা পাষাণের বেদীতে বসে আছে, এরা সবাই তার পূর্বপরিচিত।– কেউ কেউ অতিপরিচিত, কেউ কেউ নিকট আত্মীয়া!—এও কি সম্ভব? ঘৃণায় গুলিয়ে উঠল ঋষির মন।
--“তুমি কোথায় এসেছ জান?” ঋষি চারদেওয়ালে চোখ বুলিয়ে বলল , “না!”
--“মূর্খ! এটা মন্দির! দেখছ না সারে সারে দেবী ধ্যানস্থ হয়ে আছে। থরে থরে নৈবেদ্য সাজানো আছে!-- নাচো। ওদের ঘুম ভাঙাও। বহুকালের অপবাদ মাথায় নিয়ে ওরা পাষাণ হয়ে আছে,-- ওদের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করো, পারবে? নাচো!” ঋষির হাহাকারে ফেটে পড়ল দোলপূর্ণিমার আকাশ। --“আমি পারব না আমি পারব না।”
--“পারতে তোমাকে হবেই। নইলে এই পাপের পঙ্কে আমরাই তোমাকে চুবিয়ে মারব!”
--“আমাকে ছেড়ে দাও। আমি এ কাজ করতে চাই না। আমাকে ছেড়ে দাও!”
অভিশপ্ত মন্দিরের চারদেওয়াল থেকে রাক্ষুসি আত্মার আঁতুড় ফেড়ে অট্টহাসি বাঁধভাঙা বন্যার মতো ভেসে এল, “পালাবে কোথায়? নাচো। নাচো। দেবী বলে আজ আমাদের মেনে নিতেই হবে নটরাজ! আবিরে আবিরে আজ তোমায় অন্ধ করে দেব! রঙীন করে দেব তোমার উত্তরীয়” ঋষির হাতের রুমালখানি হাওয়ায় উড়তে উড়তে যেন উত্তরীয় হয়ে যাচ্ছে। ঋষি ছুটে চলেছে। জীবনকে বাজি রেখে হলেও সাদারুমালটা তাকে রক্ষা করতেই হবে।

ডোরবেলের আওয়াজে ঋষির ঘোর কেটে যায়। দেখে সেই ছিপছিপে শ্যামাঙ্গী টেবিলের কাগজপত্র সরাতে সরাতে ঋষিকে উদ্দেশ্য করে বলছে, “লাইফে আর কিছু অপশান রাখেন নি? আইমিন আর কোনো গ্রেট অ্যাম্বিশান? সরি! আপনাদের মতো মানুষ দেখলে সত্যিই করুণা হয়!

ফেসবুক মন্তব্য