সেদিন চৈত্রমাস

উত্তম দত্ত

প্রস্তাবটা এসেছিল তার কাছ থেকেই। খড়িনদীর উৎস-সন্ধানে পায়ে হেঁটে আমরা গ্রামের পর গ্রাম পার হয়ে যাব। এই সেই নদী যার বুকে তালপাতার নৌকো ভাসালে মাঝরাতে তার ঘুম ভেঙে যায়। রাত্রির দেবতারা তাকে ইশারায় ডেকে নিয়ে যায় শুনশান নদীটির ঘাটে। বাঁশি থামিয়ে বুনো মহিষের পিঠ থেকে নেমে আসে সবুজ ঈশ্বর। তার দুটো পা-ই কাটা। বাতাসে ভর দিয়ে সে ভেসে বেড়ায় এ নদীর চরলগ্ন ঘাসের জঙ্গলে। কেউ তাকে কখনো ঘুমোতে দেখেনি। নির্ঘুম ঈশ্বরের দীর্ঘতম হাত জল থেকে তুলে নেয় উনিশ যোজন দূর থেকে ভেসে আসা বালকের নৌকালিপি। যত্ন করে বেঁধে দেয় তার আঁচলে।
এইসব মুহূর্তে মনে পড়ে পোস্টকার্ডে লেখা তার প্রাগৈতিহাসিক অতনু-প্রস্তাব ঃ

"চলো যাই সে নদীর উৎসমুখে। নগ্ন হব গাহনের বেলা। ওষ্ঠ ছোঁয়াব তোমার গোপন বাঁশিতে। প্রথম দেখাব তোমাকে দরজা-খোলা ব্যক্তিগত নদী... আমার ডিম্ববর্তী স্বপ্ন তোমার শুক্রাচার্যের হাত ধরে নিরিবিলি ভেসে যাবে সবুজ দিগন্তরেখায় --- কৃষকের পদতল ছুঁয়ে।"

সে ছিল এক ভয়ঙ্কর নিদাঘের দিন। মাঠের ফসল মাঠেই মরে পড়ে আছে, যেন মন্বন্তরে ঘুমিয়ে আছে সারি সারি বিবর্ণ মৃতদেহ। ডোমপাড়া, বাগদিপাড়া, বাউরি-সদগোপ- আগুরিপাড়া আর সাঁওতাল পল্লী পার হয়ে যেতে যেতে হংসমিথুনের কামরাঙা চোখে ছায়া ফেলে বিষণ্ণ নিশ্চল বাতাসে উড়ে যাওয়া রামাই পণ্ডিতের শূন্যপুরাণের পাণ্ডুবর্ণ পৃষ্ঠা। প্রপিতামহের মতো সুপ্রাচীন বটগাছের নীচে পোড়ামাটির লাল ঘোড়া কপালে মনখারাপ রঙের সিঁদুর নিয়ে রোদে পোড়া মাঠের দিকে অপলক চেয়ে আছে। যূপকাষ্ঠে লেগে আছে সাদা হাঁসের পালক, ঘন মেরুন রক্তের রেখা। এক ফোঁটা বৃষ্টি দাও, একবার কাঁদো হে আকাশ, উদাসীন ধর্মের দেবতা।..... লাউসেন, লাউসেন, তুমিও কি অন্ধ হয়ে গেলে গণিকার মোহিনী মুদ্রায়... নয়ানীর যৌন ইশারায়?

আমার দুপায়ে লাল ধুলো। তোমার দু চোখে মীনকেতন। তবু সহসা অবান্তর মনে হয় বিরহের মন্দাক্রান্তা শ্লোক, রামগিরি পর্বতের যাবতীয় দীর্ঘশাস। উঠোনের এক কোণে মাছি উড়ছে একটি কৃষ্ণবর্ণ শিশুর মৃতদেহ ঘিরে। কয়েকটি বিষণ্ণ মানুষ মাটি খুঁড়ছে এক মনে, শিশুটির শরীরের মাপে।

থমকে দাঁড়াই এই নিথর মুহূর্তের পাশে। পুত্রশোক মাটির হাঁড়িতে ঢেকে রেখে রঞ্জাবতী পিঁড়ি পেতে দেয় আমাদের। চোখ মোছে আঁচলের খুটে।... 'একটু জল দেবে রঞ্জাবতী?'
আমাদের জল এনে দেয় রঞ্জাবতীর শিরা-ওঠা শীর্ণ হাত। চোখের জলের চেয়েও দামি সেই জল।

তারপর কী এক মস্ত অপরাধীর মতো মাথা নীচু করে বলে:
'ঘরেতে আমানি নাই, কী দিব তুদিগে?'

আরও কিছু তপ্ত পথ, আরও কিছু অভুক্ত মানুষের মৃত চোখ আর শুকনো নদীর স্তনরেখা পার হয়ে অবশেষে অকুস্থল খুঁজে পায় আমাদের উৎস-সন্ধানী অর্ধনাগরিক চোখ।

জলহীন সেই গর্ভগৃহ। মরা নদীর সূতিকাগৃহে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে কয়েকটি কুষ্ঠরোগী। বেঁচে আছে কিনা কে জানে! বৃষ্টি দাও হে পূষণ। মুছে দাও এই নশ্বর শরীরের দাহ।

কিছু দূরে ফলবতী মেঘের জন্য ভাঙা সুরে গান গাইছে দৃষ্টিহীন বাগদি রমণী। পুত্র দাও হে ঈশ্বর, ধর্মের দেবতা, বৃষ্টিময় আলো দাও জন্মান্ধ জরায়ুর দেশে। ওগো শিশুর মাথার মতো গোলাকৃতি শিলাখন্ড, ওগো অপার্থিব বৃশ্চিক-মহিমা, ওগো চতুষ্কোণ দেবতার মুখ, আর কতো সহিষ্ণুতা শুষে নেবে মানুষের?

সেই নিরুদ্ধার অবসাদের গর্ভগৃহে দাঁড়িয়ে সেদিন নিদারুণ অর্থহীন মনে হয়েছিল দূর থেকে ভেসে আসা গোধূলির কামাতুর ঘুঘুর আহ্বান। পৃথিবীর চরমতম অশ্লীল অভিসার-লিপি চৈত্রের বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে বাড়ি ফিরে এসে লিখেছিলাম সেদিন রাতে ঃ

'নদীর উৎস-মুখে দাঁড়িয়ে তুমি দেখলে ভারতবর্ষের একদিক। নদীর উৎসমুখে দাঁড়িয়ে আমি দেখলাম তোমাকে। তোমার চোখের জলে ভিজে উঠছে ভৈরবী স্বদেশ।... কীভাবে নগ্ন হব এই দুঃসময়ে?'

ফেসবুক মন্তব্য