ফেসবুক কবিতা: নিঝুম রাতের এক মন্ময় সংবেদ

পল্লব গাঙ্গুলি

কবিতা আর কবিতা! সারা ফেসবুক জুড়ে অনভূতির এত বর্ণমালা! শব্দের ক্লান্তিহীন বর্ষণ! ভাবনার অন্তহীন স্রোতধারা! রঙ! রঙ! রঙ ! কখনও রঙ থেকে এক অনন্য অনুভূতির স্বপ্ন উড়ান! কখনও অসংজ্ঞেয় সব বোধের চিত্রল কোলাজ আর কোলাজের বহূপ্রসূ রঙে বর্ণালীর আশ্বাস! কখনও দূরাধিগম্য অভিসারী গতির ঐক্যায়নে আপাতবিচ্ছিন্ন কোলাজ-সমবায় বাঙময়! কখনও পাঠকের বিপন্নতায় ঐক্যসূত্রের অসীমীয় অভিসারীত্বে দুর্মর আশাবাদ! এতসব সার্থক উৎপ্রেক্ষা!! কত দুর্লভ ইন্দ্রিয়-রূপান্তর (Synesthesia)! আদিতে চোখের আরাম! অন্তবর্তীতে প্রাণের সুখ! অন্তে জীবনের জয়গানে শান্তির আশ্বাস!
সবইতো শুধুই “শব্দের লীলা” নয়। বেশ কিছুতো নৈশঃব্দ্যেরও গান। কিছুতো জীবনেরও কথা বলে। বাতাসের সংলাপ, আলোর স্বরলিপি, নির্ঝরের স্বপ্ন ও তো আছে। সবইতো খন্ডিত, চেষ্টিত কষ্টকল্পিত নয়। নয় সজ্জিত উদ্যানের ‘বহূমূল্য’ অনিঃশেষ ফোয়ারা! কিছুতে কি গাঙচিলের পেলব উড়ান, ভাঁটির টানের বৈঠাগান, বৃষ্টি-উত্তর শেষবিকেলের রামধনু আর অস্তরাগের মেঘছবি নেই? আছে নিশ্চয়ই। অাজ সেরকমই একটা গল্প ভাগ করে নিই অাপনাদের সঙ্গে।

এক মাঝরাতের উড়ানে একজন প্রাতঃস্মরণীয় ও প্রণম্য কবি ও কয়েকজন ফেসবুক কবিবন্ধু সঙ্গ দিয়েছিলেন অামায়। মানে অামিই অনাহূত উঠে পড়েছিলাম তা্ঁদের শব্দ-নৈঃশব্দ্যের খেয়ায়। সে রাতে অামার অভিসার ছিল শুধুই 'অনিশ্চয়তা'। শোনাই অাপনাদের সে অভিসারের গল্প?
অাচ্ছা, তার অাগে বলুন, ‘সম্ভাবনার শিল্প’ কথাটার ভুলভাল প্রয়োগে কখনও কষ্ট হয়েছে আপনার? কবিতার জন্য? কখনো মনে হয়নি কোন সমাজ-রাজনৈতিক পরিসর নয়, বরং ক্ষয় ও বিকারের বিপ্রতীপে এক ধূপছায়া অালো মেখে কবিতার নির্বাধ উড়ানেই নিমগ্ন যত হওয়া না হওয়ার স্বপ্নকথা?
শব্দের হৃৎস্পন্দন, কান্না অথবা শব্দের করুণ মুখ এক অনির্বচনীয় আনন্দ দেয় আমাদের। দেয় না? কিন্তু সমস্ত বিন্যাস ও বয়ন, ভাষা ও সংকেতকে গৌণ করে কবিতা যখন এক অবুঝ কিশোরীর মত খেয়ালিপনা সারা গায়ে মেখে নেয় তখনই বুঝি শুরু হয় কবিতার শব্দাতীত উড়ান। পৃথিবীর সব নিশ্চয়তাকে দূরে ঠেলেই তো কবিতা তখন বহূমাত্রিক হয়। একরৈখিকতা তো সে জগতে নির্বাসিত।
ধরুন, কবি তৈমুর খানের কবিতা।
"যদিও অাজ শূন্য জল, শূভ্র মেঘ সবাই চলে গেছে
পায়ের চিহ্ন পড়ে অাছে দিগন্তের পথে
ধূলো ওড়া রোদ্দুরের আগুনে তা কাঁপে"
দ্বিতীয় পংক্তিতে এক অনিবার্য অাবেশী শূন্যতা অামাদের জড়িয়ে ধরে। কিন্তু জল কেন শূন্য? Transferred epithet র আলোকিত বৌদ্ধিকতা এই মন্ময় মুহূর্তে দূরেই থাক। বরং মেঘ বলতে জীবনের যে অমিত সম্ভাবনা তা যেন মরমী অন্বয়ের উদ্দেশে রওনা হয়। "পায়ের চিহ্ন" এর দগদগে নিশ্চয়তাকে ম্লান করে। দিগন্ত ছুঁয়ে সে এক অনিশ্চিত যাত্রা! "রোদের আগুনে" র কম্পনে সে ই অনিশ্চিত দোদুল্যমান তা!
আবার ধরুন উল্টোটা। নিরুদ্দেশের পথে অবসন্ন হতে হতে শব্দ প্রাণ ফিরে পেলো এইমাত্র। তখন নিঃসীম আকাশে শব্দের নির্বাধ স্বপ্নময়তা। সঙ্গে সম্ভাবনার কথাবীজ।
অথবা ফিরুন অাপনার চেনা প্রিয় কবির বিখ্যাত পংক্তিতে--- "তখন পাতা-ঝরা অরণ্যে দেখতে পাই
তোমার রহস্যময় হাসি—
তুমি জানো, সন্ধেবেলার আকাশে খেলা করে সাদা পায়রা
তারাও অন্ধকারে মুছে যায়, যেমন চোখের জ্যোতি—এবং পৃথিবীতে
এত দুঃখ
মানুষের দুঃখই শুধু তার জণ্মকালও ছাড়িয়ে যায়।"
নিঃস্ব অরণ্যই কি কবিতার নিশ্চিন্ত আশ্রয়? হবেও বা! নিশ্চিত কে বলবে? সন্ধের আকাশে তখন দুঃখের অধিকার। আসন্ন অন্ধকার ই কবিতার স্নিগ্ধ চন্দ্রাতপ। অথবা অন্যরকমও হতে পারে। দূরাগত জ্যোতি রহস্যে মুড়ে ফেলে নিজেকে। দূরের আপেক্ষিকে অন্ধকারে সমর্পিত হলে নেতি নয়,জয় হয় দুঃখের। এক স্বর্গীয় দুঃখবোধকে ছুঁয়ে ফেলে কবিতা।
সাধারণতঃ, কবি রুদ্র গোস্বামীর কবিতা এক অাঁচল ভালোবাসার গন্ধে আতুর এক স্বপ্নমাখা সুখের স্পর্শে মুগ্ধ করে রাখে অামাদের।
কিন্তু এই কবিতায় দেখুন শব্দের অন্তবর্তী পরিসরে কীভাবে নৈঃশব্দ্য বাঙ্ময় হয়ে খুঁজে নিচ্ছে নিজস্ব নির্জনতা! সমস্ত স্থিরবাক প্রত্যয়কে নির্বাসনে পাঠিয়ে!
"অথচ প্রত্যেকদিন এই ক্ষতবিক্ষত
শূন্যতার ভিতর
অামি
ফোঁটায় ফোঁটায় ছড়িয়ে পড়তে দেখি
আমার নিজের শরীর"
প্রতিভাসের অাপাতসরল বিবৃতিতে নিশ্চয়ই এক জোনাকির মায়ালোক। কিন্তু চলুন, অন্তঃস্বরে কান পাতি একটু। অনিশ্চয়তার গহনঅার্তির এক লাবডুব শুনছেন তো? প্রতিটা ফোঁটায় সংহত শূন্যতা! একইসঙ্গে এক অপার বিচ্ছিন্নতার প্রতিশ্রুতি! দুটো ফোঁটার অন্তবর্তীতেই যে নিঃসীম শূন্যতা তা ছুঁয়েই কবি সত্ত্বালগ্ন শরীরকে ছড়িয়ে দিতে চান এক মরমী অনিশ্চয়তার গভীরে।

অথবা ধরুন বাচিক শিল্পে অতি-উচ্চারিত দুটো লাইন—
"হিরণ্ময়,ওকে বলো, আমি এই সন্ধ্যা একটু গাঢ় হলে
নদীতে আচমন সেরে যজ্ঞে বসবো
হিরণ্ময়, ওকে বলো, আমি এই সন্ধ্যা একটু গাঢ় হলে
আগুনে ঘিয়ের ছিটে দিয়ে তুলবো প্রলয় নিনাদ—"
চেনা পথ ছেড়ে চলুন না অন্য খেয়াতে উঠে পড়ি? মনস্তত্ত্বে জটিলতা বাড়ে। এক স্বর্ণপ্রভ ‘দ্বিতীয় সত্ত্বা’য় কবির অমোঘ স্বীকারোক্তি। নিশ্চিত আশ্রয়েই তাঁর এক অতলান্ত দুঃখবোধ।
প্রগাঢ় অন্ধকারকে সাক্ষী রেখে নিরুচ্চার আত্মবিশ্বাস ও মুখর হয়ে ওঠে। নিজেকে নিরঙ্কুশ করতে শব্দের দামামা ওঠে।

‌শব্দবয়ানের নির্মোক উন্মোচন করে অন্তঃস্বরের স্পন্দন স্পর্শ করতে পারলে কবি রণদেব দাশগুপ্তের কবিতাতেও একটা নৈঃশব্দ্যের পরিসর আপনাকে ছুঁয়ে যাবে। আর ঐ নৈঃশব্দ্যই অযুত সম্ভাবনার ধাত্রী। তাই সেখানেও অনিশ্চয়তায় সংপৃক্ত এক প্রগাঢ় অন্তর্কথন।
“আপাতত ঝাপসা থাকি নদী কুয়াশায় ভোর রাতে
_ রহস্যের অচেনা নৌকায়, বৃন্তহীন পংক্তির মতো”
‌— বোধি ও হৃদয়ের এক অন্তর্দীপ্ত অন্বয়! অনিশ্চয়তার 'কুয়াশা' মেখে নিরালম্ব অস্তিত্বের অন্তর্গত স্বরই যেন উঠে অাসে। 'বৃন্তহীন পংক্তির মতো' তে নিশ্চয়তা ও অনিশ্চয়তার মাঝে এক নিরবয়ব দোলাচল। 'ঝাপসা' থাকার ইচ্ছায় নিরাসক্তির অঙ্গীকার যতটা 'নদী' ও 'নৌকা' র অনুষঙ্গে যাত্রার প্রতিশ্রুতি তার থেকে যেন বেশী। অার এই মায়াবী ঘেরাটোপেই এক গহনডুবের অপ্রতিরোধ্য অার্তি। না?
এবারে চলুন, পরাভাষার অন্তরঙ্গতায় ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করি অনিশ্চয়তার নতুন বিনির্মাণ। কবি কিঙ্কর চক্রবর্তীর শব্দরণন ---
"খিলখিলে সময় থেকে একটু তোকে নিয়ে যাবো দূরে
বাকলের দিন খুলে কাণ্ডের ভেতরে গূঢ় পথ
শেকড়ের কানাকানি ;মাটি আর জলের অক্ষরে
যেখানে কবিতা জন্ম; তোর সেই পথে উঁকি মেরে- - -"
রূপকীয় দ্যোতনার কথা থাক। মনে হয় না যে এ অার্তি অাসলে অাত্মলীন সত্ত্বার নিভৃত স্বগতকথন? এক নিভৃত অাত্মগত দ্বিরালাপে নির্মোক থেকে গহীন সত্ত্বায় পৌঁছনোর শব্দসোপান? কিন্তু তা তো হলো। অনিশ্চয়তার অনুষঙ্গ কোথায়?
'একটু' 'দূরে' তে অনির্দিষ্টের বাহ্যিক একটা স্পর্শতো অাছেই। 'গূঢ় পথ' এ রুদ্ধ অন্তর্বস্তুের প্রতি এক ঐন্দ্রজালিক হাতছানি! 'শেকড়ের কানাকানি' তে তারই মায়াময় বিস্তার! রূপ থেকে সত্ত্বায় ফেরার এই যাত্রা নিশ্চিত। কিন্তু শব্দ ও তার অর্থের বিন্যাসের মধ্যেই অন্তর্লীন অনিশ্চয়তার পুনর্নির্মাণ।
কবিতাকে বড় উদাসীন দেখাচ্ছে। সম্পূর্ণ অনিকেত। অবয়বহীন এক অনন্ত সম্ভাবনা। না? সবাই তাকে ছুঁতে চাইছে। সে যে কারও নয় পুরোপুরি। এক অনন্ত পথের দিকে সে নির্ণিমেষ তাকিয়ে। নিরুুদ্দেশের পথেই তাঁর অনিশ্চিত অভিসার। সঙ্গী হতে পারলে তবেই তাঁকে ছুঁতে পারা যায়। তাই না?
কৃতজ্ঞতা জানবেন বন্ধু। অাপনিও যে সঙ্গ দিলেন অামায় এতক্ষণ। মধ্যরাতের নৈঃশব্দ্যকে সাক্ষী রেখে। শব্দের লাবডুব শুনতে শুনতে।
বোধের বিন্যাস অার পুনর্বিন্যাসে শব্দের সঙ্গে এই প্রগাঢ় দ্বিরালাপের কোন শেষ নেই। তাই মন্ময় উড়ানের কোন নৈর্বক্তিক পরম্পরাও থাকে না। নান্দনিক ও সৃজন-নৈতিক কারণে তা থাকা উচিতও নয়। তাই পাঠকের বোধ কবির সৃজন সংবেদের প্রতিনিধিত্ব করে না। সমাপতন হলে অালাদা কথা। অন্তত ঘোষিত দায় তাঁর নেই।
এক প্রাতঃস্মরণীয় কবির সঙ্গে এ প্রজন্মের চারজন কবিকে স্পর্শ করতে চেয়েছিলাম অামরা। কিন্তু একটা শব্দকেও নিরাশ্রয় মনে হয়েছে অাপনার? বোধের উদ্ভাসন অথবা শব্দবিন্যাসের অাঙ্গিক-- প্রজন্মান্তরে শব্দের খেয়ায় কোথাও কি কোন ছন্দপতন মনে হয়েছে? অামার কিন্তু মনে হয়নি। অাপনার?

ফেসবুক মন্তব্য