পাঠপ্রতিক্রিয়া : কাব্যগ্রন্থ

শ্রী সুতীর্থ

" ব্রেইলে লেখা বিভ্রান্তিসমূহ " কবি : শাশ্বতী সান্যাল, তবুও প্রয়াস প্রকাশনী

উৎসর্গ পত্র : " এই শান্ত অবসরে তোমাকে উৎসর্গ করে লেখা যায় কয়েক লাইন" - মনে হলো কবি বর্তমানে লেখার টেবিলে "শান্ত অবসরে" বসে তাঁর অতীতের রেখে আসা জীবন-যাপনের দিকে সৃষ্টির আলো ফেলছেন আর সেখান থেকে চয়ন করে আনছেন ব্যক্তিগত ক্ষত ও বেদনার এক একটি কুসুম।

কবির অতীত ব্যক্তি জীবনে যে সমস্ত ঘটনা সৃষ্টিকারী ব্যক্তি মানুষ তাঁদের নিজস্ব প্রেম ও রিরংসা নিয়ে কবি মানসকে ক্ষতবিক্ষত করেছেন, কবির অন্তর্জগতে পৌঁছে দিয়েছেন বলবার কথামালা (যেখান থেকে তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন : *" কবিতা আসলে এক আর্তচিৎকারের নাম"* ), মনে হয় উৎসর্গ পত্রে তাঁরাই ধরা পড়েছেন " তুমি"-র আধারে।

তাহলে কি বলা যাবে এ কাব্যগ্রন্থ কেবল কবির যাপিত সময়ের অতীত কথন? - মনে হয় তা বলা যাবে না।কেননা মাঝে মাঝে কবির লেখার টেবিলের পাশে খোলা জানালায় উঁকি দিয়ে যাচ্ছে উপস্থিত বর্তমান, কবি তাকেও উপেক্ষা করতে পারছেন না,* " শ্মশান বন্ধুর সংখ্যা বাড়ে প্রতিদিন.."* আর আমাদের মনে উঠে আসছে তরুণ কবিদের অসময়ে চলে যাওয়ার তীব্র বিস্বাদ।

এই কাব্যগ্রন্থটির বেশ কিছু কবিতায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ব্যক্তি মানুষের প্রেম সংকট। প্রেমিক ও প্রেমিকা এই দুজনের মধ্যে সম্পর্কের জটিলতা , কোনো একপক্ষের শরীর সর্বস্ব আগ্রাসী মনোভাব এই জটিলতা সৃষ্টির জন্য দায়ী। এই বিষয়ে কবি তাসলিমা নাসরিনের কবিতাকে মনে করিয়ে দেয় সেই দুধকলা দিয়ে কালসাপ পোষার চিত্রকল্প। নাম কবিতার ১নং অংশে পাচ্ছি এমনই পংক্তি :
*" দরজা খুলতেই একটা নিতান্ত গোবেচারা 'ম্যাও' সেজে ঢুকেছিল../ এখন ভাতের দাবি আগলে থাকে,/ পেরোতে গেলেই চোখ আঁচড়ে দেয় / ডিপ ইনজুরি।"*

কিংবা "মন ভাসান পালা" কবিতার ৬ নং অংশে পাচ্ছি :
*" পংক্তির শরীরে ঘোরে বাস্তুসাপ। কবিদেহে জ্বর"*।

এমন চিত্রকল্প রয়েছে "ডিপ্রেশনের ডায়েরি" কবিতায়ও :
*" এই গলি,এই একতলা বাড়ি
বিড়ালের কান্না আর থাবার আওয়াজে ভরে আছে.. "*

অন্যভাবে প্রেম সম্পর্কে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সেটা হলো তৃতীয় ব্যক্তির আগমনে। তৃতীয় ব্যক্তির কারণে তৈরি হওয়া প্রেম সংকটে লড়াই জারি রেখেছেন প্রেমিকা। কিন্তু তবু ভালোবাসার মানুষ ঘিরে তৈরি হয়েছে সংশয়। তৃতীয় ব্যক্তির সঙ্গে জয় পরাজয়ের খেলায় ব্যক্তি সত্তার রক্তক্ষরণের ইতিবৃত্ত রচিত হয়েছে :
" হটো!তফাৎ যাও!" বলে সেই কষ্টের স্মৃতিকে সরাতে চাইছেন, কিন্তু তিনি ব্যর্থ, "ছায়াগুলো বড়ো হয় । আমি ক্রমে ছোট হয়ে আসি..।" কিংবা " গোপন অসুখ আর ত্রিভুজ চিহ্নগুলি কিছুতেই ছাড়াতে পারি না। " ( কবিতা : "মধ্যবর্তিনী" ) প্রসঙ্গত ভাবনার দিক থেকে রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের "মধ্যবর্তিনী" ছোট গল্পটিকে মনে করিয়ে দেয় কবিতাটি।

প্রেম সম্পর্কে ঘোষিত হয়েছে আরো দুটো অভিমত। কবি "মাথুর" কবিতায় দেখিয়েছেন প্রেমের এক সৌম মূর্তি : *" ছড়িয়ে রয়েছে প্রেম। দাবি তুলে নিয়েছি আমার।" * দাবি তুলে নেবার পরও প্রেমের এই ছড়িয়ে থাকা, অনুভূতি ও বিশ্বাসের গভীরতারই নিদর্শন।

প্রেম সম্পর্কিত অন্য বক্তব্যে তিনি পাপী দেহকে স্বীকার করে নিয়েছেন এবং জানিয়েছেন এই ক্ষতবিক্ষত জীবনেই প্রেমকে অনুভব করে নিতে হয় :
*" নির্জলা নাভির পাপ ছিঁড়ে খায় পদ্মের সুবাস / মধুগন্ধ ভরে পাপীদেহে / রসুল বাঁচিয়ে রেখো আমাদের, সুখে ও সন্দেহে .." (কবিতা : "কনফেশন বক্স")

কিংবা, "মাঝেমধ্যে বৃষ্টি নামে। দু-ফর্মা জীবন ভিজে যায়।" (কবিতা: ডিপ্রেশনের ডায়েরি)

কবি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যক্তি সত্তার মোড়ক ভেঙে নেমে এসেছেন গ্রামের এক নিরন্ন পরিবারে, যেখানে অন্নহীন সন্তানের মুখে আমানি যোগাতে লড়াই করেন এক নারী -
*" স্নান সেরে যে মেয়েটি চুল খুলে উনুন নিকোয়
খুঁজে আনে বুনো ওল। মেটে আলু পুড়িয়ে আমানি
তুলে দেয় রোগা হাতে অন্নহীন সন্তানের মুখে,
ডাকের প্রতিমা নয়, তাকে আমি দেবী বলে জানি। " * (কবিতা : পুজোসংখ্যা)

নিরন্ন মানুষের কথা আরো এসেছে তাঁর লেখায় : "পথ নাটিকার কোনো ছেঁড়া বিজ্ঞাপন নিয়ে খেলা করছে ভিখারির তৃতীয় সন্তান " (কবিতা : নির্বাচিত শীতকাল)

সাম্যবাদকে যারা কেবল বক্তৃতার বিষয় করেই সস্তা জনপ্রিয়তা পেতে চান, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠ চড়ান এই কবি :

*" রাগ করবেন না মশাই। আপনি তো জানেনই সমাজতান্ত্রিক গ্রহে সুষমবন্টন এক হাস্যকর চতুষ্পদ, যখন তখন যার লেজ মুচড়ে ঠাট্টা করা যায়।" *(ডাস্টবিনের কবিতা)

আধুনিক সময়ের মানবিক অবনমনের ছবিও ধরা পড়ে তাঁর লেখায়:

*"দূরের বারান্দা থেকে ডাক দিচ্ছে অন্যের নারীকে
তাদের মিলনদৃশ্যে নিজেকে দেখব,এই ভয়ে চোখ বুজে থাকি...

গোলার্ধে রাত বাড়ে। দিন ছোট হয় "* ( কবিতা : অশ্বজাতক )

আঙ্গিকগত দিক থেকে বলতে হয় কবি স্বতন্ত্র কাব্যভাষা তৈরি করে ফেলেছেন ইতিমধ্যেই।বিশেষত তাঁর শব্দচয়নের দিকটা বেশ অভিনব বলে মনে হলো। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় , "ডাকের-প্রতিমা", "মুহূর্ত-আরক", " ডিপ ইনজুরি" , " অবিন্যস্ত সূর্য ঘড়ি", "গোলা পায়রা" প্রভৃতি। ছন্দের হাত পাকা থাকলেও অন্ত মিলের ঝংকৃত লেখার দিকে তিনি বেশি এগোননি। " দেবীপুরাণ " কবিতার মতো দুটো একটি ছাড়া। বাকি লেখা গুলোতে কবির অনুভবময়তা চিত্রকল্প ও গভীর চলনে স্বতন্ত্র কাব্যভাষা তৈরি করেছে বলে মনে হলো।

কবিকে বিচার করবে সময়।আমরা বিচারক নই। বন্ধু ও সহযাত্রীও বটে। তাই স্বপ্ন দেখি, তাঁর সৃজনশীলতা আমাদের সাহিত্যকে আরো সমৃদ্ধ করবে। পাশে রয়েছি আপনার। আমার সমসময়ে আপনাকে পেয়ে আমি ব্যক্তিগত ভাবে গর্বিত। আশ্চর্য ব্রেইল ঋতু আপনার শহরে ফিরে ফিরে আসুক- এটাই প্রার্থনা।

ফেসবুক মন্তব্য