ডুবে আছি কবিতায়, মৃত্যুহীনতায় (কমলেশ পালের কবিতা নিয়ে একটি আলোচনা)

গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়

যাচ্ছিলাম বনগাঁ, সড়কপথে-এক কবিতা-আয়োজনে। সময় প্রাক-শারদীয়ার অক্টোবর। দীর্ঘ পথ। যাত্রী আমরা ক’জন, মধ্যমণি কমলেশদা। কমলেশদার শরীরে গতরাত্রে-কমে-আসা জ্বরের প্রকোপ-পেরোনো কমজোর সুস্থতা-বোধ, বা তার অভাব। পথ-মধ্যে অনিবার্য চা-বিরতি; আমাদের মন অশান্ত - সময়ে পৌঁছনোর তাড়া আছে, কমলেশদার সুস্থতা নিয়ে চিন্তা আছে, আর আছে নির্লিপ্ত দোকানির পাঁচ-কাপ চা তৈরীর উদাস আয়োজন। দোকান-সমীপ কমলেশদার মুখে বক্ররেখার আধিক্য কি! তটস্থ আমাদের চমকে দিয়ে কমলেশদা বললেন,‘চারপাশটা কি সুন্দর সবুজ হয়ে আছে!’ অনুষঙ্গ-অনিবার্যতায় বেজে উঠল কমলেশদারই লাইন “আবার নদীটি প’রে সবুজ মাধুরী হয়ে বসে থেকো তুমি।” এই ব্যক্তিগত স্মৃতি-টুকরো চয়নের প্রয়োজন মনে হল শুধু এই কারণে যে এরপর আমরা শ্রী কমলেশ পালের যে কবিতাপথে সহযাত্রী হব তার এক মৌলিক অভিজ্ঞান, আমার মতে, এই ‘সবুজ মাধুরী’র অন্বেষণ।

“তোমার নাবিক এসে মোহনায় জাল পেতে রাখে।
আমি তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছি তাকেঃ
এ জল আমার
আমার দুঃখের জলে আমারি তো পূর্ণ অধিকার!” (‘জলসীমা’, ‘সেই মুখ সেই আর্তনাদ’)


এভাবেই পরিক্রমণ শুরু। কবির জন্ম বরিশালে, ১৯৩৫ সালে। নদীর কল্লোলমাখা বাংলাদেশের জলমাটি যাঁর শৈশবের লালনভূমি, জল তাঁর চিত্রকল্পের মধ্যে দিয়ে বইবে আজীবন, তা তো অনিবার্য। আরও কিছু কথা রেখে যেতে চাই এখানে। ‘সেই মুখ, সেই আর্তনাদ’ কমলেশ পালের প্রথম কাব্যগ্রন্থ, প্রকাশকাল ১৯৮৫। সন্নিবিষ্ট কবিতাগুলি রচিত ১৯৮৫ সালে। কবি মধ্য-চল্লিশে। তাহলে তার আগে? শ্যামল জন্মভূমির প্রশ্রয়ে, মায়ের শিল্প-মনষ্কতার পুষ্টিতে, চর্যাপদ, মঙ্গলকাব্য, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দের মিলিত প্রবাহে লালিত হচ্ছিল যে মন, সেখানে কবিতার মৌন গুঞ্জরণ নিশ্চয়ই চলছিল; কিন্তু তার প্রকাশ? কবির নিজের কথায়, “তরুণ বয়সে লিখতাম রবীন্দ্রনাথকে অনুসরণ করে। পরবর্তীতে বুঝতে পারলাম সেটা লেখা আমার উচিত না। লেখা ছেড়েই দিয়েছিলাম।“ অর্থাৎ কবিতার চিরায়ত স্রোতের ধার ধরে হাঁটছিলেন কবি। কিভাবে এল নিজেকে ভাসিয়ে দেবার ক্ষণ?

আবার তাঁর কথাতেই ফিরি — “৪২ বছর বয়সে ১৯৭৬ সালে চাকরিতে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরী হয় যে, প্রায় আত্মহত্যা করবার মত অবস্থা। সেই সময় আমি কবিতাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচার একটা চেষ্টা করছিলাম।” তাহলে কবিতা এল আত্মপ্রকাশের নান্দনিক বিলাস হয়ে নয়, সেই উথালপাথাল সময়ের রাজনৈতিক–সামাজিক পুনর্বিন্যাসের কাব্যিক সাক্ষ্য হয়ে নয়, ‘বাঁচার’ পথ হয়ে। আর কেমন অনিবার্যভাবে সেই হেমন্ত-মুহুর্তে যেনবা কবির হাত ধরলেন জীবনানন্দ –
“আক্রমণ হবে ভেবে কেটে গেছে চল্লিশ বছর
গুপ্তচর দেয়নিকো শত্রুর খবর
নির্জন মোহনা-কূলে ঘুমিয়ে পড়েছি তারপর”। (,,)


এখন কবি মাটির কঠিন ছেড়ে চাঁদের জাহাজে দুঃখজল অতিক্রম করতে চাইছেন। ক্রমশ দেখব কবি সর্বস্ব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন সেই স্রোতে। এরপর এক তীব্র সাঁতার, ডুব-দেওয়া ভেসে-ওঠা – ব্যাকুল এক অন্বেষণের পর কবি ফিরবেন মাটিরই কাছে; কেননা তিনি তো তখন জানেন যে-মাটি কঠিন তমসা হয়ে থাকে, সেই মাটিই তো বীজ-বুকে বসে থাকে মহীরুহ হবে বলে, সেই মাটির গভীর উচ্ছাসই তো নদী হয়ে ভেসে যায় নিজেরই বুকেরই উপর দিয়ে—
“এ কোথায় আমি পৌঁছে গিয়েছি ভুলে
আকাশ কোথায়? এ যে চেনা মৃত্তিকা
রোগা নদীটিকে হিজল জড়িয়ে আছে
মৃদু চেয়ে আছে অবাক গন্ধরাজ
আমার তো ছিল মেঘের বাড়িতে যাওয়া
উজিয়ে উঠেছি প্রাচীন মৃত্তিকায়” (‘উজানযাত্রা’, ‘পাঁজর পুরাণ’)


দীর্ঘ এই অন্বেষণের অর্জন নিয়ে কমলেশ পালের কবিতা পৌঁছবে উপলব্ধির আত্মভূমিতে। অন্বেষণ বহুবিচিত্র – বিষয়-ভাবনায়, শব্দব্যবহারে, চিত্রকল্পে, ছন্দময়তায়। কবিতা যেমন নির্মিতি-পথ বদলায়, তেমনই অবিরাম কবিতা-প্রয়াসের মধ্য দিয়ে নির্মিত হতে থাকেন কবি নিজেও। আমরা দেখব কেমন মূলগতভাবে, কিছুটা হলেও, একই রকম বিষয়-ভাবনা সময়ের ব্যবধানে ফিরে আসছে অন্যতর নির্মাণ-সজ্জায়। পাশাপাশি রাখা যাক ‘অরণ্যের গোপন কন্ট্যুর’ যা গ্রন্থিত ‘সেই মুখ সেই আর্তনাদ’-এ এবং ‘অরণ্য-নক্কাশী’ যা রয়েছে ‘বম্বেduck’-এর বর্তমান সংখ্যায়।
“দুপুরে গাছের নীচে ছায়া পেতে শুয়ে আছে বন।
আমাদের বিলাস-বীক্ষণ তাকে নিয়ে।” (‘অরণ্য-নক্কাশী’)


অরণ্য বিস্তীর্ণ বাইরে, কবির অধিকার শুধু ‘বিলাস-বীক্ষণ’। কবি দেখছেন তার ‘অসংবৃত বেশবাস’, ‘গোপন কন্ট্যুর কিছু, বস্তিদেশ, রোমাঞ্চিত ভূমি’। আর এই গোপন, অবাঞ্ছিত অবলোকনে ক্ষুব্ধ অরন্যের প্রাণ। ঝিঁঝির স্বরে, হাওয়ার মর্মরে, বৃক্ষ্লতাদের অরব ভাষায় ‘তীব্র তিরষ্কার’ ভেসে আসে শুধু। তাই ফিরে আসা—
“অরণ্যের অসামান্য অধিকার দেখে
আবার যন্ত্রের দিকে দ্রুতপায়ে ফিরে যেতে থাকি।
হরিৎ গ্যালারি জুড়ে হেসে ওঠে পাখি
পাথরে জলের হাসি আমাদের উপহাস করে।” (,,)


যন্ত্রমুখর যাপন-জীবনে অভ্যস্ত কবির এই অরণ্য-বিলাস ছিল নেহাৎই অনধিকার প্রবেশ। জলের সুর কিংবা পাখির হাসির সহজ শুধু উপহাস করে পলায়নপর কবিকে। এবার আসা যাক ‘অরণ্য-নক্কাশী’র দুটি লাইনে —
“অরণ্যের বরাত নিয়ে ফ্যাসাদে পড়েছি।
মানুষকে গাছ করতে হবে...”


অরণ্য এখন ভিতরে। তার নীরব, সহজ অধিকারে স্থিত কবির ভাষ্যও তাই আয়োজনহীন, সরল। কিন্তু এই অধিকার এক দায়ও বটে — মানুষকে গাছ করার, পৃথিবীকে ‘সবুজ মাধুরী’ করার দায়। আবার পাশাপাশি রাখি অন্য দুটি কবিতা – প্রথমটি ‘সেই মুখ সেই আর্তনাদ’ কাব্যগ্রন্থের, পরেরটি ‘অন্ধের ওয়াকিঙ স্টিক’ (প্রকাশ ২০১৬)- এর।
অভিমান

দুটিতে জেটির কাছে বসে আছে,
দুখী ও দ্বিমুখী।
মাঝে টান, মৃদু অভিমান
আলুথালু নদীটির মতো

দুটি হাত আলগোছে দু-পাড় জড়ায়
দুটি তীর দূরে ঠেলে রাখে—
ছাড়েনা, জোড়ে না
যেন, ঐ দুটি মানুষ প্রমান।

ভিতরে ইথার কাঁপে
ভেসে যায় ভাটিয়ালি গান।


দেখছি অভিমানের, হয়ত-বা বেদনার পলি জমছে অস্তিত্বের তটভূমিতে। অন্তরছন্দ, যা কবির সব কবিতায় থাকে, আছে; সঙ্গে আছে অন্ত্যমিলের আভাস, ‘মৃদু অভিমান’-এর মতই প্রায়। এবার পড়ি ‘হৃদি আলাপন’ –
কিছু না। কেবল
কিছুক্ষণ চুপচাপ ব’সে থেকে থেকে
দুজনে নীরবে উঠে বিপরীতে হেঁটে মিশে যাওয়া...

দুটি চুপ বেলা-বালিয়াড়ি...
চরাচর অন্ধকার... আর ঢেউ... আর ঢেউ... জল...

এর চে’ মুখর কোন হৃদি-আলাপন
স্মরণে আসে না।


‘চরাচর অন্ধকার... আর ঢেউ... আর ঢেউ... জল...’— এখানে যে অনিঃশেষ লাগছে কবিতার গহনে, তার উদ্ভাসে দুঃখ আগের অভিমান-আলোড়ন পেরিয়ে ‘কিছু না’ হয়ে উঠছে। নীরবতা অনাসক্তি অতিক্রম করে হয়ে উঠছে ‘হৃদি-আলাপন’। ভাষ্যও যেন সজ্জা ছেড়ে, নিজেকে ছেনে হয়ত-বা, ভাস্কর্য্যের মত সরল হয়ে উঠল। মনে পড়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের দুটি লাইন –“ফুলের মত সহজ হয়ে আসে/ তোমায় কিছু বলার মত ভাষা”। ‘তোমায়’ বলার ভাষাই তো নিজেকে খোঁজার ভাষা।

এই যে কবিতা রহস্য-বাঁক নিচ্ছে, অনিঃশেষ এসে ছুঁচ্ছে কবিতার হৃদয়, এ-কি তবে কবির পরিণততর বয়সের অর্জন? পড়া যাক আরেকটি কবিতা। এটি গ্রন্থিত ‘সেই মুখ সেই আর্তনাদ’-এ, যা কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ।
“ ‘পা বাড়ালেই যাওয়া
এবং
হাত বাড়ালেই হাওয়া’
বলতে বলতে লোকটা গেল দূরে।
কনকচাঁপার কুঞ্জ থেকে বুলবুলি যায় উড়ে।” (‘বিলয়-বিন্দু’)


এই তো সেই রহস্য-টান। পথের সন্ন্যাসী যেন হৃদয়-তন্ত্রীতে পূরবীর সুর তুলছেন। মিহি, বৈরাগ্য-গেরুয়া ধুলো হয়ে ভিতরে উড়ছে মৃত্যুর বিষাদ। এরপর কবিতা যাচ্ছে এক অবাক নির্মাণের দিকে—
“ঘর-বারান্দা অবাক হোলো আহাম্মকের মতো
একটু আগেই লোকটা ছিল তাদের কুক্ষিগত
একটু আগেই মুঠোর মধ্যে আঁকড়ে ধরে মাটি
গড়তে ছিল স্বপ্ন থেকে মূর্তি পরিপাটি।
হঠাৎ কি তার হল?” (,,)


মূর্তি-গড়ার মগ্নতাও তো এক বাঁধন, রূপের বাঁধন। সে বাঁধন ছিন্ন করেই তো অরূপের দিকে যাওয়া যায়। কিন্তু তারপর —
“আকাশ তাকে ডাকছিল কি?—‘অরূপ দরজা খোলো!’
বাতাস তাকে ডাকছিল কি?—‘অরূপ দরজা খোলো?’
লোকটাকে কি নিরুদ্দেশে ফুসলে নিল কেউ?

সামনে খোয়াই, দিগন্তে ধায় রাঙ্গামাটির ঢেউ।
ভাসছে...ডুবছে...সরে যাচ্ছে
ছোট্ট হতে... হতে...
বিন্দু হয়ে বিলীন হচ্ছে সিন্ধু-খরস্রোতে” (,,)


অন্য কোনও কবির স্বরাভাষ মিশল কি নির্মাণে? মন-কেমন চিত্রমর্মিতা সত্ত্বেও, ছন্দসজ্জায় একটু কি ব্যাহত হল অরূপযাত্রা?

এই বিলয়-ঘোর কবির বহু কবিতার উৎসে লেগে আছে। আমরা দুটি কবিতার নির্মাণ-খেলা দেখব। প্রথমটি ‘ওষ্ঠে লেগে রব’, কমলেশ পালের ‘নির্বাচিত কবিতা’র ‘অগ্রন্থিত কবিতা’ অংশের অন্তর্ভুক্ত। ‘ডানায় আকাশ’(প্রকাশ ১৯৯৬) এবং ‘পাঁজর পুরাণ’(প্রকাশ ১৯৯৮)-এর মধ্যবর্তী সময়কালে রচিত এই কবিতা।
“নাহয় এভাবে নয়, যেভাবে সেভাবে থেকে যাব।
মৃত্যুর তোয়ালে মুছে দিক –
আমি ঠিক জীবনের ওষ্ঠে লেগে রব
মৃত্তিকার স্বাদ হয়ে, চুম্বনের অনুভূতি হয়ে।”


এখানে কিন্তু বিন্দুতে বিলীন হওয়া নয়, ফুরিয়ে যাওয়া নয়, জীবনে লগ্ন হয়ে থাকার প্রত্যয়। শরীরে নয়—শরীরে তো মৃত্যুর অধিকার—মৃত্তিকার স্বাদ হয়ে, চুম্বনের ইন্দ্রিয়ময়তায় নয়, ‘চুম্বনের অনুভূতি’ হয়ে, বোধের অনন্তে মিশে যাওয়া। আসা যাক ২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘অন্ধের ওয়াকিঙ স্টিক’-এর কবিতা ‘উৎপাটিত গাছ’-এ –
“এবার ঠেলে জলে ফেলবে, বৃক্ষ যাবে ভেসে
অনন্ত-টান একলা ক’রে নে’ যাবে নিঃশেষে
ভ্রূক্ষেপই নেই টানের দিকে, ব্যাকুল শাখায় ফুল
নারীর খোঁপায় যাবার জন্য রঙের হুলুস্থুল”


বিলয়-টান এখন আরও তীব্র, প্রখর। কিন্তু সে-টান যাকে একলা করে ভাসিয়ে নিতে চাইছে, সে-তো বৃক্ষ – মাটির গভীরে প্রোথিত। মৃত্তিকার স্বাদই তো ফুল হয়ে ফুটে আছে তার ব্যাকুল শাখায়। বিসর্জন যতই অমোঘ হোক, রঙের উল্লাস তার হৃদয়ে। সেই-যে মূর্তি-গড়ার পরিপাটি বাঁধন ছেড়ে ছোট্ট হতে হতে বিলীন হচ্ছিল যে মানুষ, সে এখন জানে মূর্তরূপের মধ্যেই তো অরূপ-রঙ আছে – তাই তার ডালে ডালে এখন শুধু ফুল-ফোটানর আবহমান খেলা। কবি ও কবিতা এখন যেন-বা মুখোমুখি বসে আছে চৈতন্য-রঙীন চরাচরে, মৃত্যু সেখানে এক বিবর্ণ পরাজয়।

কবিতা কী ভাবতে গেলে W. H. Auden-এর আপাত-সরল এক পর্যবেক্ষণ বেশ প্রণিধানযোগ্য মনে হয় — কবিতা হল ‘ম্যাজিক’। এই জাদু, রহস্য-গভীরতা কমলেশ পালের অধিকাংশ কবিতায়। কিন্তু তার বুনট, নির্মান, তার গহন — সে-তো বিস্তীর্ণ হয়ে আছে ক্রমপরিবর্তনশীল এক পথচলা জুড়ে। বহুভাবে, বহু-মুহূর্তে নিজেকে ছড়িয়ে দিয়ে আবার নিজেকেই আহরণে—
“...কবিতা এক ম্যাজিক আয়না
সামনে দাঁড়ালে তার ফুটে ওঠে প্রতিচ্ছবি অমল আত্মার –
আমি যা ধরতে গিয়ে ভাঙি চুরমার।

প্রতিটি ভগ্নাংশ জুড়ি খুঁটে খুঁটে আমিই আবার।
প্রচণ্ড ঝড়ের পর টুকিটাকি গুছনোর মতো
সম্পূর্ণ দেখবো বলে শুদ্ধ করে নিজেকে সাজাই” (‘চৌকিদার’, ‘ডানায় আকাশ’)


এ-এক অদ্ভুত খেলা। যখন আমি প্রতিচ্ছবি দেখি, ছায়া দেখি ‘অমল আত্মার’, ইচ্ছে করে তা আঁকড়ে ধরতে। ছায়া চুরমার হয়ে ছড়িয়ে যায় আপন অলীকে। পড়ে থাকে বিচূর্ণিত, ছায়াহীন ‘আমি’— আমার অযুত ভগ্নাংশ-কণিকা। প্রতিটি কণিকাই তো আমি — ক্ষণমাত্র, মুহূর্ত-উদ্‌যাপিত। বহু-আমি। এক আমি অনীহা-প্রবণ –‘বাগানের গাছগুলো থেকে পরিচর্যা গুটিয়ে নিয়েছি’(‘বয়সের বাগান’); আবার সেই আমিই (একই কবিতায়) কেশর-ওড়ানো পংক্তি হয়, ‘ঘোড়ায় স্বপ্ন-সওয়ার’ হয়ে অনীহা পেরিয়ে যায়, কেননা – ‘এখনও বাগানে কিছু অগ্নিবর্ণ অহঙ্কার ফোটে’। এক-আমি ভুলঝড়ে প্রমত্ত ব্যাধের মত ছুটে যায় –
“ইচ্ছার পিছনে ইচ্ছে ছুটে যাচ্ছে ঝড়ের মতন।
ট্রিগারে আঙুল রেখে তার পিছে ছুটে যাচ্ছি আমি।”(বাড়ি ফিরে যাব’ ‘সেই মুখ সেই আর্তনাদ’)


অন্য আরেক আমি জীবনের গভীর গুপ্তচরকে চেনে, যে গুপ্তচর হন্তারকের থেকেও বেশী ভয়ংকর, কৃতঘ্ন—

“ঘাতক দেখেছি আমি, কখনও দেখিনি গুপ্তচর
ঘাতক বাইরে ছিল, গুপ্তচর রক্তের ভিতর” (‘রক্তের গভীরে’, ‘অবিশ্রাম রক্তের প্রপাত’)


এই সব আমির সংগৃহীত, সংশ্লেষিত নির্যাসই তো সেই ‘আমি’ যে বলতে পারে –
“ধুলো ধুয়ে, ক্ষত অস্ত্র নাশকতা ধুয়ে
বাহুল্যের চিৎকার নিভিয়ে
বসেছি নিজের কাছে।”(‘জয়জয়ন্তী’ অগ্রন্থিত কবিতা)


নিজের কাছে বসা সেই একলা মানুষ জেগে ওঠে তার গভীর সৃজনে, আপন সৃজনে – “অন্ধকার বেজে ওঠে জয়জয়ন্তীতে”। এক ধ্যান-সমাধি, নিরাসক্তি ভেঙে জেগে ওঠা, বেজে ওঠাই তার জননীর জন্মাদেশ –
“ধ্যানের সমাধি স্পর্ধা নিজ হাতে ভাঙেন জননী।”


সমাধির নিষ্কাম ভেঙে প্রবাহের প্রতিকূলে, অন্ধকারে, বেজে ওঠাই তো কবিতার জাদু – নিজের প্রতিচ্ছবিকে গুঁড়িয়ে অমল আত্মাকে, নিজেকে, পুনর্নিমাণের সূর্যাস্ত-অহঙ্কার।

মনে রাখতে হবে, সে-সময়ে আমাদের জন্মভূমি, বঙ্গভূমি, আলোড়িত হয়ে উঠেছে নানা সুদূরপ্রসারী ঘটনাপ্রবাহে। দেশভাগ-পেরোনো মাটির বুকে অনেক রক্তের অমোচনীয় সন্তাপ, মন্বন্তর-পেরোনো সময়ে লালসা ও মৃত্যুর যুগনদ্ধ ক্রূরতা, সর্বোপরি দুনিয়া-কাঁপানো শ্রেণীহীন সমাজের স্বপ্নস্রোতের উথালপাথাল ঢেউ – বাংলা কবিতায় প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন করে খুঁজে নেওয়ার বিপুল ভাঙ্গা-গড়া প্রয়াস। বিশেষ করে বামপন্থী আন্দোলনের ও তার দ্বারা প্রভাবিত/ নিয়ন্ত্রিত কাব্যচেতনার বিস্তার-সংকোচন। সমসাময়িক বহু প্রথিতযশা কবি সেই সমাজ-তথা-শিল্প আন্দোলনের ছাঁচে নির্মাণ করছেন আপন-আপন কবিতাভাষা। বিষয়-বস্তু তথা কবিতা-ভাবনার যেন বা স্বাভাবিক দায় ছিল সেই সমাজ-আন্দোলনের রক্তনিশান হয়ে ওঠার। ব্যক্তিগত অনুভূতিময়তা যতখানি ব্যক্তিগত, যতটা রূপকাশ্রয়ী, ততটাই প্রতিক্রিয়াশীল, ব্রাত্য। জীবনচর্যায় আমূল বামপন্থী কমলেশ পাল এখন কি করবেন? রহস্য-নির্মাণ নাকি বস্তুত্ব-সংশ্লেষ? পুশ্‌কিন নাকি মায়াকোভ্‌স্কি? চাঁদের জাহাজ কি তত্ত্বের পসারী হবে এখন! দ্বিধার টান লাগছে দেখি কবির দিগন্ত-যাত্রায় – অন্য-এক ভিতর স্বর প্রায় নির্দেশ হয়ে উঠছে –
“ফিরে যাও
তোমাকে সবার সঙ্গে যাতে হবে কঠিন উজানে”
(‘ফিরে যাও’, ‘অবিশ্রাম রক্তের প্রপাত’)


কমলেশ পাল বলছেন, ‘সত্তরের দশকে, সেই অশান্ত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পেলাম বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে, মণিভূষন ভট্টাচার্য্যকে, অমিতাভ দাশগুপ্তকে।।... তাঁদের কবিতা মানুষের যন্ত্রনার দিকে তাকাতে বলেছে। আমার কবিতা সেসব কথায় শিহরিত হয়েছে, কিন্তু নাড়া বাঁধে নি।’ কবিতা তবে কি বলবে, কেমন হবে? এ-তো এক অস্তিত্ব-সংকট, প্রখর এক নির্বাচনের দহন। অবিশ্রাম রক্তের প্রপাতে দীর্ণ কবি স্বভূমি খুঁজে পেলেন সেই ‘প্রাচীন মৃত্তিকায়’—
“এক রাতে স্বপ্নে মা আমার খুলে দিল শূন্যের বাঁধন।
‘বুকে আয়। তুইও এই মাটির লবণ’ –
বলে সে জড়াল বুকে,
মাটির বিপুল স্তন গুঁজে দিল মুখে।...”(চৌকিদার’, ‘ডানায় আকাশ’)


এই জন্মঋণের উদ্‌যাপন হবে তাঁর কবিতা। স্থিতি-পোষিত শৌখীন কারুবাসনা হয়ে শুকিয়ে যাবে না, আবার সামগ্রিক জাগরণের, সংগ্রামের হাওয়া-নিশান হয়েও থাকবে না। একইসাথে তা হবে ইস্পাত এবং ভালবাসা –
“পারো তো ধানের বুকে দুধ ক’রে পাঠিও আশ্বিনে—
ইস্পাত অবশ্য দিয়ো, সঙ্গে দিয়ো হৃদয় প্রতুল।”(‘চিঠি’, ‘ডানায় আকাশ’)


বজ্রনির্ঘোষে নয়, অক্ষয় মমতা হয়ে কবিতা ঝরে পড়বে ‘সুখের পরে, দুখের পরে’ –
“কুসুম কুসুম গন্ধ আসে, মা
কাদের ঘরে ভাত হচ্ছে, ভাত হচ্ছে, মা?”
(‘ঘোড়সোয়ার’, ‘অবিশ্রাম রক্তের প্রপাত’)


কবি বলছেন, “কবিতার কথা বলতে তো সেই মানুষেরই কথা। মানুষের কথা-র মানে তো জগৎ সংসারের কথা। কতো কতো দুঃখ-সুখ, রক্তপিচ্ছিল মাটির উপর দিয়ে মশাল-বাহকদের যাত্রা অন্ধকার পশ্চাৎপট হটাতে হটাতে। তার চারপাশে গেরস্থালি, শিশুটি মায়ের কোলে স্তনমুখে ঘুমিয়ে রয়েছে, মজাপুকুরে তিনটি করুণ শালুক ফুটে আছে।” অর্থাৎ কবিতা, একইসাথে, অন্ধকার পথে মশাল-যাত্রা হবে, এবং হবে ফুলফোটানোর রহস্য-উর্বর মাটি –
“মাটি যেন আমাদের বিপিন বৈরাগী
ঘরের দেয়াল গাঁথে, ছায়াপথে কাঁদে একতারা।”
(‘মাটি যেন বিপিন বৈরাগী’,‘ডানায় আকাশ’)


সে হবে ঘরের দেয়াল গাঁথার মাটি — বিপিন বৈরাগী, এবং ঐ মাটিরই বাঁশী থেকে ওঠা ছায়াপথ-অবধি প্রসারিত অনন্ত-ভৈরবী — ভালবাসা।

বলাই বাহুল্য, এই ভালবাসা জীবনের বহুতর প্রকাশের অন্বয়। এর মধ্যে আছে ক্ষরণ, মৃত্যু এবং মাধুরী; আছে ‘বাতাস বাতাস কিছু গন্ধ মদিরতা’ যা আমাদের ভঙ্গিমা-সর্বস্ব, মৃগয়া-উল্লাসে মত্ত জীবনের করতল ছোঁয়, কিন্তু অধিকার-মুঠোয় ধরা দেয় না –
“কিছু কথা, কিছু শারীরিক
মেদ-মদ্য-প্রবণতা, অস্থির ভঙ্গিমা
কিছু ফুল, লোমশ জিঘাংসা কিছু, তীক্ষ্ণ ব্যবহার
তোমার মৃগয়া নিয়ে তুমি জেগে আছ।

হৃদয় কখন এসে ব্রজরজ মেখে গেছে কপালে তোমার
তুমি তার কিছুই জান না।” (‘জেগে আছ সন্ন্যাসী ডাকাত’,’সেই মুখ সেই আর্তনাদ’)


এই ‘তুমি’ জানতে পারে নি হৃদয়ের অভিসার, কেননা সে ‘হৃদয় গাঁথবে বলে’ জেগে ছিল ‘ত্রিশূলের মতো’। এই ‘তুমি’, সে-ও তো ‘আমি’ – আমার মধ্যের ‘না-আমি’। এই না-আমি ছড়িয়ে থাকে জীবনের ভুল-উদ্‌যাপনে, এমনকি কবিতার ভুল-আয়োজনেও –
“এই-যে উপরে এত শব্দের জমক –
চিত্র-ছন্দ-উপমার অগুরু ও ফুলের চীৎকার –
চাদরের নীচে কিন্তু বোধশূন্য হলুদ বেদনা
নির্বাক কবিতা মরে আছে।” (‘প্রচ্ছদ’,‘ডানায় আকাশ’)


কবিকে তো পেরোতে হবে এই ‘না-আমি’-পথ, বোধশূন্য হলুদ বেদনা মাখা মৃতকল্প কবিতা। এই উত্তরণের একমাত্র ভিতর-পথ নির্মাণ করে ভালবাসা, মমতা। ব্যক্তিময়তা, শরীর, তার মৃত্যু। সে-শুধু মৃত্যু-কুটিলতার প্রতিস্পর্ধী এক চিরায়মান গল্প। সাগরজলে একদা ভাসানো মুগ্ধ কথামালা আজ কবিকে ক্ষুব্ধ করে তোলে, কেননা সেই সাগরজলে এখন ‘এক লক্ষ মানুষের শব ভেসে আছে’(‘সাগর তোমার জলে’, ‘সেই মুখ সেই আর্তনাদ’)। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশে বিধ্বংসী বন্যার উপরে লেখা এই কবিতা এরপর হয়ে ওঠে জীবনের হার-না-মানা মর্মরতা –
“তবে জেনে রাখ
মানুষ আবার এসে মুছে যাওয়া মাটিতে দাঁড়াবে।
আবার তাদের ঘর-গৃহস্থালি হবে।
তোমার ভ্রূকুটি ভুলে টিয়ারঙ ক্ষেতের কিনারে
মানুষের ভালবাসা গল্প করে যাবে।”


মুগ্ধ উচ্ছ্বাস নয়, ভালবাসা মাটিরঙ গল্প হবে, টিয়ারঙ ক্ষেতের সবুজ প্রত্যয় হবে। উচ্ছ্বাস-মগ্ন, বা ব্যথার মাথুর হয়ে থাকা ভালবাসার আবাহন থেকে কবি সরে আসেন বারবার –
“তোমার দুয়ারে বসে সারাদিন খঞ্জনি বাজাব
একথা ভেব না। ভেব না, আবহকাল
গেয়ে যাব ব্যথার মাথুর”(‘অন্য মাধুকরী’, ‘অবিশ্রাম রক্তের প্রপাত’)


কেননা জীবনের প্রতিটি দহন মুহূর্ত, প্রতিটি স্পন্দনের প্রতি নিষ্ঠ থাকা কবির দায় –
“কাঠের করঙ্ক ছাড়া দৃপ্ত ধনুর্বাণ
এই হা্ত জানে।” (,,)


এই বাণ জীবনের অসাড় আয়োজনকে ভেদ করে, মাধুকরী-মায়া হয়ে ঝরে পড়বে পাংশু প্রাঙ্গনে –
“কাছাকাছি কিছু পাংশু প্রাঙ্গনের কাছে
আছে কিছু অন্য শ্রোতা, অন্য গান, অন্য মাধুকরী।”(,,)


এই দোটানা কবিতাকে এগিয়ে নিয়ে চলে পরিণতির পথে। গুপ্তচর মৃত্যুকে কবি দেখেন নানান সাজে, নানান আয়োজনে। বস্তুতপক্ষে জীবনের মতোই আবহমান মৃত্যুও। ইতিহাসের পাতায় পাতায় তার রক্ত-নিঃশ্বাস। আবার এই সর্বভুক মৃত্যুর লালসা, ছলনাকে অতিক্রম করেই তো বেজে চলে জীবনের অন্তরঙ্গ স্বরলিপি। মহাকাব্যের পৃষ্ঠায় যে ‘রক্তবীর্য-দাগ’ তাকে ধুয়ে দেয় চাঁদের আলো –
“নিঝুম শ্লোকের কোজাগরি।
অলৌকিক নার্সিংহোমের সেবিকারা
জ্যোৎস্না দিয়ে মুছে দেয় রণস্রাব কুরুক্ষেত্র থেকে।
ট্রাম্পেট এখন স্তব্ধ। বিষাদে ফোঁপায় ভায়োলিন"
(‘প্রস্তাব’, ‘অন্ধের ওয়াকিঙ স্টিক’)


কবি দেখেন –
“মহাকাব্য - পৃষ্ঠাগুলি থেকে
সময়ের ডিটারজেন্টে উবে গেছে রক্তবীর্য-দাগ –
আবার কুমারী তারা, আবার নিদাগ ভুর্জপাতা...”(,,)


পৃথিবীর রণক্লান্ত বুকে নেমেছে জ্যোৎস্নাপ্লাবিত মধ্যরাত। এই কোজাগরী নৈঃশব্দের বুকে পূজার আয়োজন(ভুর্জপাতা শব্দটি লক্ষ্যণীয়), প্রকাশের আলোড়ন। আবার এক জন্মের কম্পন। এই তো জীবনের অস্তিত্ব নির্ণয়ের ক্ষণ, কবিতার উন্মেষের ক্ষণ—
“দ্বিধান্বিত ডটপেনঃ ‘কি লিখি এখন কবিবর?’
মধ্যরাত শুনশান... ব্যাস নিরুত্তর।”(,,)


একইসঙ্গে মৃত্যুদীর্ণ ও আলোকনন্দিত এই উদ্ভাস মুহূর্তে কবি কি বলবেন? এখনই তো কবিতাকে তার সন্তান-প্রস্তাব রাখতে হবে। দ্বিধা পেরিয়ে কবিতা হয়ে ওঠে এক স্বপ্নিল পাখি যার ঠোঁটে বীজ, বুকে সবুজ মাধুরী –
“অবগাঢ় নীল থেকে শুধু
একটি স্বপ্নিল পাখি ঠোঁটে করে বীজ
পরমা মাটির গর্ভে সন্তান-প্রস্তাব রেখে দেয়
‘মাটির আঁতুড়ে মাটি, জন্ম দাও সবুজ অপাপ শিশুঘাস
তরবারি প্রসব কোরো না।’”(,,)


এ-তো ভালবাসার কবিতা নয়, ভালবাসা এর সমগ্র, জন্মঋণ। কিন্তু এর লালন তো বেদনাজটিল, যন্ত্রনাময়। কেননা যে জীবন টিয়ারঙ ক্ষেতের সবুজ উচ্ছ্বাস, সেই জীবনই আবার নির্মমতা লাঞ্ছিত অসাড় বিরাগ –
“ধুলিধূসরিত বট জুড়ে ফুটপাত
ডালে ডালে তার বাড়ানো ভিখারি হাত।
নিচে ঝুপড়িতে হাড়-জিরজিরে নারী
কোলে মরে আছে শিশুসন্তান তারই।”(পথের স্বভাব’, ‘অন্ধের ওয়াকিঙ স্টিক’)


এই মৃত্যু-জর্জরতা যে জীবনের স্বাভাবিক এক চিত্র, পথের স্বভাব – ছন্দের সহজ চলন যেন বলছে এ-ছবিতে কোনও হাহাকার নেই – সে পথকে, সে-সৃষ্টিকে তো এলোমেলো করে দিতে ইচ্ছে করে। কবিতা তাই মাঝেমাঝে আশ্রয় চায় এক জাদুবাস্তবতায় –
“এই যে ডাইরির পৃষ্ঠা, এ অসীমে লিখে যাবো উত্তরঈশ্বর –
কালো সূর্য...তেকোনা চাঁদের পাশে সবুজ নেবুলা...’)
(‘উত্তরঈশ্বর’, ‘অন্ধের ওয়াকিঙ স্টিক’)


লক্ষ্যণীয়, ‘ডাইরির পৃষ্ঠা’ অর্থাৎ জীবনের রোজনামচা। এই সৃষ্টি-সাজ, এই আলো, এই চেনা চাঁদ আর কোনও রহস্য বোনে না আমাদের অবশতায়। তাই এখন এই মৃতকল্প ঈশ্বর ও তাঁর নির্মাণ-রঙ ভেঙে ফেলার ‘অসীম’ আয়োজন। পুনর্বার সৃষ্ট হবে পৃথিবী, মানুষের হাতে, কবির হাতে –
“ঈশ্বরের মৃত্যু হলে আমি তার স্টুডিওতে ঢুকে
ফ্রেমহীন অনন্ত ইজেলে কবিতায়
একটিই ছবি লিখে দেবো –
ভালবাসা।”(,,)


ভালবাসা কবিতার নির্মাণ হয়, কবিতা ভালবাসার।

আগেই দেখেছি, কমলেশ পালের শৈশব জুড়ে ছিল গ্রামের শ্যামল। এমনকি কর্মসূত্রেও তাঁকে দীর্ঘদিন কাটাতে হয়েছে প্রত্যন্ত গ্রামে, অরণ্য-গ্রামে। তাই হয়ত তাঁর কবিতা বিচিত্রগামী হলেও – এমনকি নগর-জীবনের ছবি আঁকার সময়েও – তার ভাষ্যে নাগরিক চলন নেই। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন “২৫ বছরের বেশি অরণ্যবাসী ছিলাম। একটা লাভই হয়েছে। নাগরিক সভ্যতার যে আচরণ, তার খসে যাওয়া মানুষকে দেখতে পেয়েছি। হয়ত আমাকেই আমি জানতে পেরেছি। সেটাও একটি দর্পণ। আমার কবিতার মধ্যে এর প্রচণ্ড প্রভাব আছে। কেউ বলছে, আমি গ্রাম্য। তারা সম্ভবত একটু ভুল করেছেন। আমার মধ্যে একটা আনকোরা ভাব আছে। এটা আমার অর্জন।” আনকোরা ভাব, অর্থাৎ সহজীয়া ভাব, নাগরিক ভঙ্গীর বিপরীতে এর চলন। চর্যাপদ, মঙ্গলকাব্য হয়ে বয়ে চলা বাংলা কবিতায় এই সহজীয়া সুরের আবহমান উপস্থিতি। এক প্রাকৃতিক রহস্যময়তা এর স্পন্দন – যে রহস্য থাকে পাথরের পাশে আপনি ফোটা ফুলে, বা গাছের সবুজ জুড়ে লাল...নীল...হলুদ...হলুদ... সহজ উচ্ছ্বাসে। তাই কমলেশ পালের কবিতা যখন প্রকৃতির রূপলিপি খোঁজে তখন তার নির্মাণে লাগে রহস্যের অরূপ মর্মর –
“অরণ্য জোৎস্নায় কেউ রূপের মহিমা ফেলে গেছে।”(‘অরণ্য জোৎস্নায় কেউ’,‘পাঁজর-পুরাণ’)


কবি দেখেন “পাতাগুলি সারাদিন পাখিদের সাথে/সবুজ ভাষায় কথা বলে।” (‘সবুজ সংলাপ’,‘পাঁজর-পুরাণ’)। একদিকে এই অন্তরঙ্গ সংলাপ – সবুজ অরণ্য-গ্রাম, অন্যদিকে শহরে মোহরদাসদের দাসত্ব-জীবন –
“মোহরদাস, ও মোহরদাস, তুমি এবং আমি
রাজার বাক্যে উঠি আর দাদার বাক্যে নামি”(‘মোহরদাস’, ‘পাঁজর-পুরাণ’)


‘তুমি’ মোহরদাস, ‘আমি’ ও তাই। কিন্ত ‘দুইজনা দুই ঘরে’ বন্দী –
“দুই জেলের দুই উল্টো সেল-এ দুজন মোহরদাস
তোমার এবং আমার মধ্যে দেয়াল অবিশ্বাস”


এভাবে মোহরদাসরা সবাই নিজের নিজের খন্ড জীবনে, দেয়াল-তোলা অবিশ্বাসের দাসত্ব জীবনে স্থিত হয়ে থাকে। কিন্তু এই গ্রাম-শহর বিভাজন একমাত্রিক নয় একেবারেই। কবির চোখে, যা কিছু সবুজ, স্বাভাবিক তার বি্প্রতীপ নির্মাণই জীবনের নগর-বিলাস। তাই শহর কখনো কখনো মৃগয়া উল্লাস নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে অরণ্য গহনে —
“কবি দেখছে
অরণ্যময় শিকার প্রবণতা
ঘোড়ার উপর তুর্কী জোয়ান উদ্যত শূল হাতে়…..
বনস্থলী কেঁপে উঠল মৃগীর আর্তনাদেঃ
‘সবুক্তগীন! বর্শা রোকো …. পেটে আমার ছা ....!
অরণ্যময় বাজছে দ্রিদিম দ্রিদিম দামামা।”(‘মৃগয়া’, ‘পাঁজর-পুরাণ’)


এই প্রায়-প্রাগৈতিহাসিক আদিমতা, মৃত্যুর বন্য-উল্লাসই তো শহর-শরীরে –
“শিকার ঘিরে নাচছে শহর ফেনিল মধ্যরাতে
ড্রামে উচ্ছাস ডিস্কো-বেহুঁস মাতাল পার্কাসন-এ
কবি দেখছে
বন্য আলোয় মৃগয়া ফুটপাতে –
ক্ষুধায় বিদ্ধ মরে আছে গর্ভবতী মা!

পদ্যলেখা কবির বুকে রক্তমুখী ঘা।” (,,)


পদ্যবিলাসী হৃদয় রক্তমুখী হয়ে আছড়ে পড়ে কবিতার বুকে। কবিতাই তো তাঁকে নিয়ে যাবে উত্তরণে, প্রতিটি লাঞ্ছনা, প্রতিটি যন্ত্রণার স্পন্দন চেনাতে চেনাতে। কবিতা অসহায়তা অতিক্রম করে প্রতিরোধ হবে, তারপর শুশ্রুষা হবে।

কবি শুনেছেন শোষিত জীবনের দীর্ঘশ্বাস। দীর্ঘশ্বাস-জীর্ণ জীবন আত্মাহুতি চায়। কবি তাই নিজেই টোপ হয়ে পড়ে থাকেন জীবনের শিকার-মাঠে –
“জিভের তোষকে শুয়ে আছি
হিম হয়ে আছি
আইসক্রিম হয়ে গলে যাচ্ছি আমি –
তৃপ্তি হয়ে যাচ্ছি তোমাদের”(‘টোপ’, ‘পাঁজর পুরাণ’)


কিন্তু এই ক্ষয় তো স্থিতাবস্থার কাছে, শোষণের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ নয়; এ এক স্বনির্বাচন, প্রতিরোধ –
“খাবে বলে পচে আছি
ফুলে আছি, ঢোল হয়ে আছি –
খাবে বলে গতরে আতর মেখে টোপ হয়ে আছি।

ভিতরে বিষানো কাঁটা, যম হয়ে আছি তোমাদের।”(,,)


কবি জানেন জীবনের আপাত-স্থিরতার নীচে থাকে টানাপোড়েনের ঘূর্ণিজল। তিনি তো চেনেন পক্ষাগাতগ্রস্ত, উত্তর-চল্লিশ মলি রায়কে, চাওয়া-পাওয়া পেরিয়ে যাওয়া অসাড়তাকে যিনি ঢেকে রাখেন সেলাই-মগ্নতা দিয়ে, বসে থাকেন হুইল চেয়ারে। নিজস্ব চলন-গমনহীন সেই আপাত-বাস্তবতার নীচে থাকে স্বপ্নের সমুদ্র-আলোড়ন –
“বারান্দার হুইল-চেয়ারে
বসে আছে মলি রায় উত্তর-চল্লিশ।
পায়ে পক্ষাঘাত তার, বসে বসে নিরালা ভ্রমণ –
এমব্রয়ডারি ফ্রেমের ভিতরে
স্বপ্ন ও সমুদ্র-ঢেউ, সূচের সাঁতার।

সূচ ডোবে জলতলে, স্বপ্ন নিয়ে ভেসে ওঠে সূচ।
স্বপ্ন এক পুরুষের জ্যামিতিক মুখ;
মাতৃত্ব বাজাবে বলে শরীরের পুষ্পপাত্র থেকে
দুহাতে তুলেছে শঙ্খ তার।

এমব্রয়ডারি ফ্রেমের ভিতরে
উত্তর-চল্লিশ জুড়ে একা ক্লান্ত সূচের সাঁতার।”
(‘এমব্রয়ডারি’, ‘পাঁজর পুরাণ’)


মনে আসছে W.H. Auden-এর একটি বিখ্যাত কবিতা – ‘Miss Gee. A Ballad’। স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত, শারীরিক আকর্ষণহীন Miss Gee ও সেলাই করতেন। আর সাইকেল চড়ে রোজ গীর্জায় যেতেন। দুপাশে ছড়িয়ে থাকত জীবনের সব ফুল-আয়োজন, যেখানে তিনি ব্রাত্য – “She passed by the loving couples/ She turned her head away/ She passed by the loving couples/ And they didn’t ask her to stay”। গীর্জায় তাঁর প্রার্থনা “Lead me not into temptation/ But make me a good girl, please” প্রায় comical হয়ে বাজতে থাকে সেই উষরতায়। এরপর মৃত্যু, এরপর Anatomy ’র টেবিলে উপহাস-কৌতুহল হয়ে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। Miss Gee জীবনের এক নিষ্ঠুর কৌতুক যেন-বা, কবিতার স্বরেও এক নিরাসক্ত মরু-আয়োজন। আর ‘এমব্রয়ডারি’ এক উত্তল লেন্সে সেই জীবন-অবলোকনকে ধরছে, আঁকছে মমতার মায়ারঙে যা আমার মতে জীবনের আপনতম, গভীরতম রঙ। বহুভাবে ব্যক্ত-অব্যক্ত সুখের রঙ, দুঃখের রঙ মিশেই তো এই মায়া তৈরী হয়।

শহরবাসী অনিমেষ বটব্যাল প্রতিষ্ঠার স্বচ্ছলতা দিয়ে নিজের বাড়ি বানিয়েছে। চারটে বেডরুম, ড্রয়িংরুম ইত্যাদি নিয়ে জমকালো সে নির্মাণ। ব্যক্তি বাহির নির্মাণ করে, কবিতা নির্মাণ করে তার ভিতর-উঠোন। কবিতাই তো অনিমেষকে এক উন্মন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাতে পারে – বাইরে জমকালো সে বাড়ির “ভিতরে কতটা আছো তুমি?”(‘ঘরবাড়ি’, পাঁজর পুরাণ’)। কবিতাই তো মমতার আসন পেতে দেয় অনিমেষের নিজেরই ভিতরে –
“এত রুম কারুকাজ, কার্নিশে কার্নিশে এত ঢেউ
বুগানভেলিয়াগুলো রঙ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে –
তোমার পছন্দ রুচি বেশ।
তবু অনিমেষ,
বাহিরে তরঙ্গ আছে থাক
অন্তত তোমার জন্য ভিতরে অথৈটুকু রেখো।”(‘ঘরবাড়ি’, ‘পাঁজর পুরাণ’)


এভাবে ‘মেঘ-জল-ছায়া মেখে, তৃণ মেখে, মহীরূহ মেখে’, ‘বহু ও অনন্য’ হয়ে তবে ‘মাছিজন্ম’-এ আসা যায়। নামকরণের প্রসন্ন কৌতুক — আত্মবিদ্রুপ --, দীনতার আয়োজন পেরিয়ে কবিতাটি হয়ে ওঠে জীবনের হলুদ পাতায় অস্তিত্বের কনীনিকা-প্রতিস্থাপন –
“পরাগ-কলোনীবাসী মানুষ জড়িয়ে ব’সে আছি –
মাছিজন্ম পড়ে আছি মৃত্তিকার পায়ে।
এই ব্রহ্মকমলের কোলে
ব’সে আছি ঈশ্বরইব মলের মাছিটি।”(‘মাছিজন্ম’, ‘পাঁজর পুরাণ’)


সমস্ত মালিন্য ছুঁয়েও ভিতরে পদ্মাসনে বসে থাকা নিমগ্ন কবিই তো তাঁর প্রকৃত কবিতা – দীর্ণ ঈশ্বর। ওই যে বাইরে রক্তক্লেদ-লাঞ্ছিত জীবন, অগণন মৃত্যুর মিছিল- তার বিপরীতে বইতে থাকে কবিতা। কবি দেখেন, যে মাঠ শস্যের সবুজ উল্লাস হওয়ার কথা ছিল, সেই মাঠেই পড়ে থাকে ধর্ষিতা যুবতীর বিবস্ত্র হাহা মৃতদেহ। এ-তো মৃত্যুর ট্রাম্পেট উল্লাস, লোমশ জিঘাংসার কাছে জীবনের শেষ পরাজয়। মৌন আর্তনাদে কেঁপে ওঠে কবিতা –
“ওই তো ধানের ক্ষেতে মালক্ষীর লাশ
ধর্ষিতা বেআবরু পড়ে আছে...
একটুখানি হাহাকার দিয়ে মাকে ঢেকে রেখে যাই”
(ভেঁপু বাজাবে না’, ‘অন্ধের ওয়াকিঙ স্টিক’)


এরপরই আসে সেই আশ্চর্য্য শুশ্রূষার মুহূর্ত। কবিতা এক মৃত্যুঞ্জয়ী আলো হয়ে ওঠে –
“এ বুকে আছাড় মেরে ভেঙে ফেলে হৃদয়-কলশ
সেই অশ্রুজলে আমি কাদা-করে সব সর্বনাশ
গুছিগুছি কোজাগরি রুয়ে রুয়ে যাব...

ঝুলটুল ঝেড়েটেড়ে পৃথিবীকে পৃথিবীর মতো
মানুষকে ধুয়েমুছে মানুষের মতো
গুছিয়েটুছিয়ে রেখে যাব”(,,)


এভাবে কবিতা তার জন্মঋণ শোধ করে বয়ে চলে অনন্তের দিকে।
আরও এক দোটানা খেলা করে চলে কমলেশ পালের কবিতার নির্মাণে – Appearance এবং Reality । এই-যে শহর তার নিষ্প্রাণ বিস্তার নিয়ে পড়ে আছে দিগন্ত আটকে, তারও কি ভিতর-স্পন্দন নেই? ‘কিশলয়হীন’ একা পড়ে থাকা শুধু, অকারণ উড়ে যাওয়া নেই? উড়ালপুল কি ওড়ে না কখনও? অন্তত দিনে তো নয়ই। দিনে শহরের শুধু ব্যস্ত চলাচল-কোলাহল আছে; এবং আছে কঠোর শাসন –
“পুল উড়ে গেলে দিন যানজটে যাবে...
চলাচল হেস্তনেস্ত... ভেবে সম্ভবত
ডানা ভেঙে দিয়ে থাকবে নির্মম ব্যাটন” (গোপন উড়াল’,‘অন্ধের ওয়াকিঙ স্টিক’)


কিন্তু রাতে? –
“নারী ও উড়ালপুল রাতভর কোথায় কোথায়
ওড়ে... চুমু খায়...
নক্ষত্রমেলায় ঘুরে সর্বস্ব হারায়....
ভোরে পাখি সিটি দিলে দুজনে কংক্রীট হয়ে যায়।”(,,)


এই জাদুবাস্তবতার নির্মাণে, শেষের চমকে ঝলমল করছে ‘wit’ যা কবির এক তীক্ষ্ণ অস্ত্র। আর এই বাস্তব বলে যা দেখছি তার মধ্যেই আছে গভীরতর আরেক বাস্তব, এ ত কবির এক নিজস্ব চলনপথই। শুধু কংক্রীট শহরকে খানিক রহস্যময় করে তোলার জন্যই নয়, ফুলের মধ্যে অন্য এক ফুল-ফোটানোর খেলাও চলে এর মধ্যে –
“হয়তো ফুলের কাছে আদপেই বৃক্ষটৃক্ষ নেই।
ফুলের পাগড়ি খুলে ওই উঁচু শাখায় টাঙিয়ে
বৃক্ষেরা ভ্রমনে গেছে শিকড়ের পথ বেয়ে অন্যত্র কোথাও।
অথবা এ ছৌ-নাচ – দড়িবাঁধা ফুলের মুখোশ –
আড়ালে নিতাই চেল, গোপীনাথ, ভুবন মাহাতো, কালো মাঝি।

উপরে যে ফুল ফোটে, সেই ছবি সবটুকু নয়।
হয়তো বৃক্ষের আছে অন্য কোনো গুপ্ত পরিচয়।”
(‘আড়ালে নিতাই চেল’, ‘অবিশ্রাম রক্তের প্রপাত’)


যে-ফুল ফুটে আছে, সে-তো ফুটেই আছে। আর ঐ ‘ফুলের পাগড়ি’ বা ‘দড়িবাঁধা ফুলের মুখোশ’-পরা নিতাই চেলরা কবির সৃষ্ট। এই ফুল-নাচ কবির সৃষ্টি। রূপ শুধু রূপের আভাস। কবি তো যাবেন সেই রূপ-ইশারায়, রহস্যপথে, অরূপের দিকে। তাই খাদের ধারে ঝুঁকে থাকা পাইন গাছ হয়ে ওঠে ঋষি, অনির্বাণ কবিতার আধার –
“পাহাড়ে খাদের ধারে, অতলের দিকে
একটি অতীত পাইন-গাছের কঙ্কাল –
ঋষি ঝুঁকে আছে অতিকায়।
শেষ স্তোত্র পাতা তার কবে যে হাওয়ায়
ভেসে গেছে ঈশ্বর-উদ্দেশে...

তবু
তার কাঠসার
উদগ্র শাখার মহাশূন্যে
জ্বলছে অর্কিডগুচ্ছ... মহানন্দে যেভাবে কবিতা
উলু দিতে দিতে জ্বলে কবির চিতায়।”
(‘অর্কিডগুচ্ছ’, ‘অন্ধের ওয়াকিঙ স্টিক’)


এই উলুধ্বনির পর নামে যে-স্তব্ধতা, কবিতার শেষ গন্তব্য তো তাই; কবিতা তো সেই মৌনের মগ্ন আরতি।

এই পথ-দীর্ঘ সন্ন্যাস-যাত্রার পরই কবিতা বলতে পারে –
“আমার দেবার কিছু নেই।
ধুলো থেকে অনন্ত অবধি
নিজেকে সংগ্রহ করি শুধু।”(‘সংগ্রহ’, ‘রা’, প্রকাশকাল ২০১৫)


এই অনন্ত-সঞ্চয়ের অভিজ্ঞান মূর্ত হয়ে আছে আরও বহু কবিতায়। অনুল্লেখিত হয়ে রয়ে গেল তারা আলোচিত কবিতাগুচ্ছের ভিতর-বাহিরে – অধরা মাধুরী হয়ে, দৃষ্টির ওপারে। আমি শুধু কবিতার স্থিতি-গতি-পরিণতির কয়েকটি মাত্র চিহ্নকাতরতায় বাঁধা রইলাম। দেখতে চাইলাম কিভাবে এক কবিতা অন্য কবিতায় প্রবাহিত হচ্ছে, কিভাবে বহু-প্রবাহের জোয়ার-ভাঁটার অস্থির লাগছে একই কবিতায়; আর বহু ও অনন্য হয়ে কিভাবে কবিতা-জীবন জুড়ে চলছে হয়ত একটিই কবিতার নির্মাণ। তার হৃদয় আনন্দ-ভৈরবী, শরীর একতারা –
“বাউল ধুলার এই দিকহারা মাঠে
বসে আছি একতারা হয়ে।
পাগল গোঁসাই হাওয়া তার ছুঁয়ে দিয়েছে আমার।” (‘বসে আছি একতার হয়ে’, ‘রা’)


এখন কবিতা ম্যাজিক – একই সঙ্গে কিছুনা এবং সবকিছু –
“মুঠো খুলব, মেঘবাদল পায়রা উড়ে যাবে।
টোকা মারবো, কানা কয়েন ঠুন্‌ কোরে
চতুর্দশী চাঁদ হয়ে যাবে।
এক পাতা চ ছ জ ঝ শূন্যের জেনিথে ছুঁড়ে দেবো
নক্ষত্রে আকাশ ভরে যাবে।”(‘মুঠোয় আবদ্ধ কিছু না’, ‘রা’)


এই ম্যাজিক-অধিকার তো ব্যাপ্ত পথক্লেশ অতিক্রমের প্রাপ্তি। এই কবিতা তো নিজের জীবনকে উড়িয়ে দেওয়া মুক্তশ্বাস; একজীবনে বহু অন্ধকার, বহুভাবে ব্যর্থ-প্রয়াস নির্মিত ভুল-আমিকে পেরিয়ে যাওয়ার জীর্ণ ইতিহাস, মোচনের এবং অর্জনের জন্মবৃত্তান্ত –
“নেচেছি চন্ডাল-নাচ ঘুমের ভিতরে সারারাত।
কবিতা ধর্ষণ ক’রে, কবিতা কুপিয়ে
কবিতার ঘরবাড়ি লেলিহানে স্বাহা ক’রে দিয়ে
নিজেরই হ্রেষায় কেঁপে সহসা জেগেছি রুদ্ধশ্বাস।

রাত্রি শেষ।
তাপিত খুনির মতো ঈশ্বর খুঁজছি খোলা ছাদে।
আকাশের ললাট-চন্দন দেখে দেখে
প্রিয়দর্শী হয়ে যাই যেন...
অঙ্গার জুড়িয়ে যায়, কলিঙ্গ নিস্তেজ হয়ে পড়ে।

কোন এক বৈতালিক পাখি
সুর করে স্তুতি গায় ছাদের কার্নিশে...
নিজেকে অশোক লাগে, নিজেকে সম্রাট মনে হয়।”(‘প্রিয়দর্শী’, ‘অন্ধের ওয়াকিঙ স্টিক’)


এক জাদু-রসায়ন এই কবিতার নির্মাণে। কলিঙ্গ ব্যর্থতার পর প্রিয়দর্শীর জন্ম হচ্ছে, ইতিহাসের পুনরাবৃত্ত অন্ধকার অতিক্রম করে ভোর হচ্ছে, কবি হয়ে উঠছেন সম্রাট। অমোঘ এর শব্দ-সাজ – প্রতিটি শব্দ যেন এক-একটি অভিজ্ঞতা হয়ে উঠছে। আপন আপন শব্দসীমা অতিক্রম ক’রে এক অরূপ গল্পের নিঃশ্বাস হয়ে উঠছে। এ এক আশ্চর্য্য খেলা – কবি কবিতা লিখছেন নাকি কবিতা লিখছে কবিকে? নাকি দুজনেই মোটিফ হচ্ছে একে অপরের? কবি তো সম্রাট, রিক্ত ঈশ্বর – যতদূর অবধি ভোরের আলো ঋষভ কোমল হয়ে পড়ে থাকে ততদূর তাঁর সাম্রাজ্য, যতদিন পাখি স্তুতি গাইবে ছাদের কার্নিশে ততদিন তিনি মন্দির।

এখন কবিতার আর কোন কিছু প্রয়োজন নেই। সে এখন প্রকৃত প্রস্তাবেই অনিঃশেষ – কিছু না। শব্দশরীর অতিক্রম করে সে এখন চৈতন্য-শরীর পেয়েছে, অনন্তের সুগন্ধ তার অস্তিত্বের গহনে; সে এখন ‘সেন্টপার্সেন্ট মায়ের লোবান’ –
“ঠিক জ্বলবো।
দুর্নামে চুবিয়ে আবার জ্বালান
দেখবেন ঠিক জ্বলছি, আত্মহত্যা করছি না কিছুতে

পাপ নেই। গর্ভের আনন্দ
এই দেহ মায়ের লোবান।
জ্বালিয়ে দেখুন, ভালো লাগবে
ভাগাড় জীবনটাকে মন্দির মন্দির মনে হবে –
লাইটার ঠেকালে আমি পদ্মযোনি মাতৃগন্ধে
ব্রহ্মাণ্ড পাগল ক’রে দেবো।

আমূল পুড়বো
পুনর্জন্ম ভস্ম থাকবে না।
আমার নির্বাণ হবে, মা বলে গেছেন –
ধূপের নির্বাণ হলে গন্ধ তার বহুক্ষণ থাকে।”
(‘সেন্টপার্সেন্ট মায়ের লোবান’, ‘রা’)


কি শুনছেন, রবীন্দ্রনাথের গান ‘আমার এ ধূপ...’? শুনছেন নিশ্চই আরও কিছু অব্যক্ত গুঞ্জরণ, ব্যথা এবং মাধুরী। চলুন, এবার একটু পিছু হাঁটি। ওই যে খানিক আগে পড়ে এসেছি ‘ওষ্ঠে লেগে রব’ কবিতার চার লাইন, প্রথম চার লাইন, তারই শেষ চার লাইন পড়ি এখন –
“নির্বাণে হব না শেষ, অবশেষ রাখব মাটিতে –
বাতাসে ছড়িয়ে যাব স্বপ্নময় ঘ্রাণ।
মুছে যাও, মৃত্যুর তোয়ালে,
আমি ঠিক জীবনের ওষ্ঠে লেগে রব”


দেখছি কবিতা কিভাবে সেদিনের অলঙ্কার-আয়োজন (‘স্বপ্নময় ঘ্রাণ’ মৃত্যুর তোয়ালে’ ইত্যাদি) ফেলে রেখে এখন চৈতন্যস্পৃষ্ট হয়ে উঠছে; অবশেষ, ভষ্মাবশেষ, হয়ে মাটিতে রয়ে যাবার আতুরতা পেরিয়ে মৃত্যুহীন নির্লিপ্তি হয়ে উঠছে। “জ্বালিয়ে দেখুন, ভালো লাগবে/ ভাগাড় জীবনটাকে মন্দির মন্দির মনে হবে” – এ তো এক আহবান! জ্বালাতে গেলে আমাদের তো আগুন হতে হবে। সেই আগুনে পুড়ে আমরাও তো ঐ গন্ধের অনিঃশেষে মিশে যাব। এবং দেখছি শেষ লাইনে ‘বহুক্ষণ’ শব্দটির অলৌকিক ব্যবহারে ক্ষণ কিভাবে, আপন অধিকারে, অনন্ত হয়ে উঠছে। আর শেষ দু-লাইন পড়তে গিয়ে ঐ যে মুচড়ে উঠছে বুকের ভিতর, ঐ-যে ধোঁয়ার মত পাকিয়ে উঠছে শূন্যতা, সেই শূন্য-মন্দিরের নির্জন বেদীমূলে স্তব হয়ে ঝরে পড়ছে কবিতা।

এমন ম্যাজিক যিনি জানেন তিনিই তো এভাবে বলতে পারেন –
“অমোঘ মৃত্যুকে বলি বিনীত স্পর্ধায়ঃ
কবিতায় ডুবে আছি, ডুবে থাকবো মৃত্যুহীনতায়।”

ফেসবুক মন্তব্য