বসন্ত ভেসে গেল

ঋকপর্ণা ভট্টাচার্য

কতরকম বসন্তই যে আছে! জলবসন্ত ও গুটিবসন্তের কথা নাহয় ছাড়িয়াই দিলাম। উহা তো নিতান্তই শারীরিক সমস্যা। যদিও উহা হইতে আগত মানসিক যন্ত্রণাতেও শরীর তীব্র কাতর হইয়া পড়ে। জানি এ পর্যন্ত পাঠ করিয়াই ফ্রয়েডবাদীরা বলিয়া উঠিবেন--মহাশয়া, আপনি ইহা ব্যতীত অন্য যে বসন্তের কথা আলোচনা করিতে যাইতেছেন, তাহারাও, অনুরূপভাবেই শারীরিক সমস্যা হইতে আগত মানসিক যন্ত্রণা যাহাতে শরীর তীব্র কাতর হইয়া পড়ে এমনকি পরিশেষে মৃত্যু পর্যন্ত আসিতে পারে। স্মরণ করুন মহাশয়া, সেই থিরবিজুলি সাধিকা আরাধিকার কথা---যিনি অদ্যাপি প্রেমের কোহিণূর হইয়া সকল রমণী হৃদয়ের আরাধ্যা এবং সময় বিশেষে ইর্ষার কারণ হইয়া অম্লমধুর আকর্ষণ- বিকর্ষণে প্রভাবিত হইয়া একটি সুস্থিত, দৃঢ় দৃষ্টান্ত হইতে পারিয়াছেন, তাঁহারও প্রেমের শেষ দশায় মৃত্যুই আসিয়াছিলো। সাধে কি আর কবি জানিতে চাহিয়াছেন, সে কেবলই যাতনাময় কিনা! যাহা হৌক, যে প্রসঙ্গে বলিতেছিলাম, বসন্ত কতরকম ও কী কী, সেই বিষয়াভ্যন্তরে প্রবিষ্ট হই।
পঞ্চমরাগে যে বসন্ত আসে, তাহাকে প্রায় প্রাচীনতম বলিয়া ধরিয়া লইলেও হয়, কারণ তাহা নিতান্তই প্রাকৃতিক। যদিও জলবিষুব ও মহাবিষুব যাহা পৃথিবীর নৃত্যরত অবস্থানের ফল তাহাও শরৎ ও বসন্তের কারণ বলিয়া ধরিয়া লওয়া যাইতে পারে। তবে কিনা ইহা গোলার্ধ বিশেষে ভিন্ন বলিয়াই ইহাকে সর্বজনীন প্রাচীনত্ব হইতে রেহাই দেওয়া যাউক। একথা সত্য কোকিল গাহিয়া উঠিবার ঢের আগেই পৃথিবী নৃত্যশীলা ছিলো। তবুও বসন্ত কিনা উপভোগের দ্বারাই স্বীকৃতি পায়, এমনটাই মনে হয়, তাই যে প্রবল প্রাণশূন্যতার দিনগুলিতে পৃথিবী একেলা একেলা নৃত্য পরিবেশন করিতেছিলো, তাহাতে চোখের মাদকতা ছিলো না বলিয়া, স্পর্শের সংযোগ ছিলো না বলিয়া তাহা লইয়া কাব্য হয়নাই। আর কে না জানে বসন্ত স্বীকৃতিনির্ভর! অতএব পঞ্চম সুর বসন্তকে প্রথম স্বীকৃতি দিলো বসন্তপঞ্চমীতে। মিলিল,পঞ্চম বসন্ত। ইহার পর আসিলো মানব। বসন্তের পদমর্যাদা বৃদ্ধি পাইলো। নিমবসন্ত, আলাপ বসন্ত, সংলাপ বসন্ত, প্রলাপ বসন্ত, রোদন ভরা বসন্ত, জাগ্রতবসন্ত এবং ঝরাফুলেরমেলা বসন্ত। এবং এ সব অতিক্রম করিয়া, বুকে মস্তকে শিমূল পলাশ রক্তকরবী ধারণ করিয়া অবশেষে অতি দূষণের যুগে কবিকে বলিতে হইলো --ফুল ফুটুক না ফুটুক,আজ বসন্ত। অর্থাৎ অপুষ্পক বসন্ত। ঝরা পাতা দেখিতে দেখিতেও এই একই অনুভূতি হইতেছিলো। বৃক্ষ নাই। যাহা আছে তাহা বনসাই। যাহা আছে তাহা কৃত্রিম শাদ্বল। কোথায় ঝরিবে বসন্তের পাতা? যে সকল চূর্ণ কুন্তল লক্ষ্য করিয়া তাহারা মরণাত্মক শৈথিল্যের সহিত বাঁধন খুলিয়া দিতো,সেইসব অলক কুন্তল এখন নানাবিধ কাঁটা ও ক্লিপের শাসনে বশংবদ ভৃত্যের ন্যায় শপিং মলের কৃত্রিম বাতাসে "লেডি" হইবার আশ্বাস পাইয়াছে। যুক্ত হইয়াছে ভ্যালেন্টাইন বসন্ত। পেটকাটি, চাঁদিয়াল, খালি-পা যে সকল বসন্তরা ধূলো পায়ে উদাসীন মাঞ্জায় রক্তাক্ত হইতে হইতে এক ডুবে পুষ্করিণী পার হইয়া তুলিয়া আনিতো বসন্তমঞ্জরী লতা, কোনও কোনও ঝামরাচুলো, কোঁচড়ফুলি, ধূলিবিধৌত বাসন্তিকার কর্ণে শোভা পাইবার নিমিত্ত, তাহারা আজ আর বসন্ত নহে। এখন বসন্ত বলিতে শুধু হলুদ শাড়ি পরা বহুবর্ণ তথাপি সীমায়িত আবীর রঞ্জিত কপোলদের আত্মরতি এবং ফটোশিকারীদের গলদঘর্ম উত্তেজনা বোঝায়। রবীন্দ্রবসন্ত এবং ক্লিকবসন্ত যথাক্রমে ইহাদিগের নাম। এ সকল বসন্ত আংটিবসন্তের সহিত গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। গোলাপ বসন্ত, চকোলেট বসন্ত, হাগ বসন্ত, টেডি বসন্ত এবং অবশেষে সেই বহুপ্রতীক্ষিত প্রেমবসন্ত মিলনের দুন্দুভিনিনাদ সহ নানাপ্রকার শপথ ও সমারোহ লইয়া প্রবেশ করেন। এ সকল বসন্তই অতীব জনপ্রিয় এবং প্রখ্যাত। কিন্তু মুশকিল হয় অন্যত্র। কাল বিষয়টি এমনই যে তাহাতে অধুনা ব্যতীত আরো ও বেশ কিছু সময়ের দাবী থাকিয়া যায়। সে সকল অতীতচারী সময় এখনও পুষ্পধন্বা অনঙ্গদেবকে খুঁজিতে থাকেন, পলাশফুলের রঙ দিয়ে রাঙিয়ে নেন শীতকাতর জীর্ণতার ধূসর বাদামীআনা। তাহাদিগের কর্ণে আজও অশান্ত পুরুষ কোকিলের আবাহন ও স্নিগ্ধ অপেক্ষারতা স্ত্রী কুহুর অভিমান এক অনবদ্য ললিতবসন্ত রাগ হইয়া শ্রুত হয়। পৃথিবী সেই তালে আজও নৃত্যশীলা হয় অথবা পৃথিবীর নৃত্যের ছন্দ হইতে কিম্বা তার ঘুঙুর নিষ্ক্রান্ত মূর্চ্ছনায় গেয়ে ওঠে কোকিল, বলা দুষ্কর। শুধু একথা সত্য এই বসন্তে এক অপরূপ ক্লান্তিময় নিদ্রা অবতীর্ণ হন সেইসব পৌরাণিকী আঁখিতে। চশমা সরাইয়া, আঁখিলোর মুছিয়া, দূর হইতে অপেক্ষারত থাকিয়া, হীরেমন পাখিটির কণ্ঠে প্রিয়নামটি শিখাইবার সুফল উপভোগ করিতে করিতে লিখে ফেলাই যাইতে পারে আরো একটি অশথ্থ পাতার উপর নখের আঁচড় আঁকিয়া তাঁহার উদ্দেশ্যে একটি ঠিকানাবিহীন পত্রাবলির সঞ্চয়ন।ইহার নাম পত্রলেখা বসন্ত, ভোকাট্টা ধূলোমাখা ঘুড়ির সহিত ঝামরাচুলের আম্রমঞ্জরী,করবীর কঙ্কন---ইহারা সকলেই জানে সেইসব হারানোবসন্তকে।

ফেসবুক মন্তব্য