দুই পৃথিবী

যুগান্তর মিত্র



বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে। মলিনা গুনগুন করে গাইছে রবীন্দ্রনাথের গান "রাত্রি এসে যেথায় মেশে দিনের পারাবারে / তোমার আমার মিলন হল সেই মোহানার ধারে।"

এই গানটা মলিনার খুব প্রিয়। রাখালেরও প্রিয় গান ছিল। রাখাল কতবার যে এই গানটা শুনেছে মলিনার কণ্ঠে, তার ঠিক নেই। কিন্তু দিনের পারাবারে মিল আর হল কই রাখাল ! আমি যে হেরে গেলাম। একদম হেরে গেলাম। এই জীবনে কি আর কোনোদিন দেখা হবে ? একবার যদি দেখা পাই রাখাল, তোর কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবো রে। তুই আমার জন্য অনেক কষ্ট পেয়েছিস আমি জানি। রাখাল রাখাল আমার রাখাল …

বাইরের অঝোর বৃষ্টির সঙ্গে তালমিলিয়ে মলিনার চোখ থেকেও অশ্রুধারা নেমে আসে।

"সেইখানেতে সাদায় কালোয় মিলে গেছে আঁধার আলোয় / সেইখানেতে ঢেউ ছুটেছে এ পারে ওই পারে।"

এমন সময় মোবাইলের রিং টোন শোনা যায়। "আমার পরান যাহা চায় তুমি তাই, তুমি তাই গো"। এইসময় কে ফোন করল ? যেই করুক, এখন ফোন ধরতে ইচ্ছে করছে না মলিনার। ও এখন ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিধারা দেখছে। গুঁড়ো গুঁড়ো বৃষ্টিজল এসে চোখের পাতা ভিজিয়ে দিচ্ছে। মলিনার কান্নার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে অবলীলায়।

মলিনার স্বামী প্রিয়ব্রত সান্যাল, একটি ওভারসিজ ফুড কোম্পানির প্রোডাকশন ম্যানেজার। ওদের অফিসে দুর্গাপুজোর পর থেকে কাজের চাপ বেড়ে যায়। একটানা জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত এই চাপ থাকে। তাই ফিরতে দেরি হচ্ছে আজকাল। মেয়ে গেছে কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমা দেখতে। এইসময়টা তাই নিজের মতো উপভোগ করতে চায় মলিনা। সেই কারণেই কোনো ফোন ধরতে ইচ্ছে করছে না এখন। হয়তো প্রিয়ব্রত ফোন করে জানতে চাইবে, রাতে বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসব ? এই হয়েছে ওর এক অভ্যেস। মাঝে মাঝেই বাইরের খাবার খেতে হবে। হ্যাঁ বললেও তো নিস্তার নেই ! কী কী আনবে, কতটা আনবে সব আমাকেই বলে দিতে হবে। কতবার বলি এখন আমাদের বয়স হয়েছে, বাইরের খাবারদাবার একটু কম খাওয়া ভালো। কিন্তু কথা শুনলে তো ? আর মেয়েটাও হয়েছে সেইরকমই। বাপ কা বেটি। ভাবে মলিনা।

আবার ফোনটা বেজে ওঠে। দুবার রিং হয়েই কেটে যায়। তারপর আবার বেজে চলে। "আমারও পরান যাহা চায় …" মলিনা এবার ড্রেসিং টেবিলের উপরে রাখা ফোনের কাছে যায়। অচেনা নম্বর। কার ফোন ? কে ফোন করতে পারে এইসময় ? মা তো দাদার ওখানে গেছে। ওদেশ থেকে সাধারণত ভোরে বা গভীর রাতে ফোন করে। তাহলে ? ভাবতে ভাবতেই ফোনটা কেটে যায়। আবার বেজে উঠতেই আর না-ধরে পারে না।

~ আপনি কি মলিনা বন্দ্যোপাধ্যায়, সরি মলিনা সান্যাল বলছেন ?

অচেনা মহিলাকণ্ঠ। কেমন যেন টান আছে কথায়। কিন্তু মলিনা বন্দ্যোপাধ্যায় ? আমার বিয়ের আগের টাইটেল বলল কেন প্রথমে ? তাহলে কি বিয়ের আগের চেনা কেউ ?
~ হ্যাঁ বলছি। আপনি কে বলছেন ?
~ আমি ফুলমণি বাস্কে বলছি দিদি।
~ আমি তো আপনাকে চিনতে …
~ জানি দিদি, আমাকে চিনবেন না। কিন্তু আপনার সঙ্গে আমার খুব দরকার আছে দিদি।
~ খুব দরকার ? কী ব্যাপার বলুন।
~ একটু সময় লাগবে দিদি বলতে। যদি আমি আপনার সঙ্গে দেখা করি তাহলে ভালো হয়।
~ কোথায় দেখা করতে চান ?
~ আপনি চাইলে আমিই আপনার বাড়িতে যেতে পারি দিদি।
~ কিন্তু অচেনা কাউকে …
~ প্লিজ দিদি, না করবেন না। আপনি যেদিন বলবেন সেদিনই দেখা করব। আমার আপনাকে খুব দরকার…
~ বলছি তো …
~ প্লিজ দিদি।
~ আচ্ছা নাছোড়বান্দা তো আপনি !
~ প্লিজ দিদি। আমি রাখালের ব্যাপারে কথা বলতে চাই আপনার সাথে।
~ রাখাল ? কিছুটা থমকে যায় মলিনা।

এইমাত্রই রাখালের কথা ভাবছিলাম। আর এখনই রাখালের ব্যাপারে কেউ কথা বলতে চাইছে ? অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে মলিনা, আপনি কে ?
~ আমি ফুলমণি বাস্কে। ভৈরব বাস্কের স্ত্রী।

এক লহমায় অজস্র ঘটনাপ্রবাহ ঝাঁপিয়ে পড়ল চোখের সামনে। সেই রাখাল। তার স্বপ্নপুরুষ। যাকে সে এ জীবনে পেল না। শুধু কিছু স্মৃতি বহন করে চলেছে গোপনে।

~ রাখালের কী হয়েছে ? রাখালকে নিয়ে কী বলবেন ভাই আপনি ?
~ অনেক কথা দিদি। আপনার রাখালের তেমন কিছু হয়নি। মানে অসুখবিসুখ কিছু নয়। অন্য ব্যাপারে … মানে কীভাবে আপনাকে বলি। আমাকে দিদি তুমি করে বলুন। বা তুই করে। আমি আপনার একটা বোন মনে করুন। দয়া করে একদিন সময় দিন আমাকে। দয়া করুন প্লিজ। কবে যাব বলুন আপনার কাছে ?

আরও কিছুক্ষণ কথা হয় মোবাইলে। আগামী দু-তিনদিন বাদে মেয়ের কলেজ খুলবে। তাই সেই সময় পার করে একটা দিন ঠিক করে নেয়। আসবে সকাল দশটার পরে। অনেক কথা আছে নাকি। দেখা যাক কী বলে।

ফোন রেখে মনটা অভিমানে ভরে ওঠে মলিনার। রথতলা নজরুল মঞ্চে ছন্দম নাট্যসংস্থার নাট্যোৎসবের প্রথম দিনে এবার মলিনার গান ছিল। ক্লাবের সেক্রেটারি প্রিয়ব্রতর খুব কাছের বন্ধু। তার অনুরোধেই গান গাইতে গিয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে রাখাল নাকি ফুলমণিকে নিয়ে এসেছিল। রাখাল আমার গান শুনল, কিন্তু দেখা করল না ? আমি জানতাম না রাখালরা কাছাকাছিই থাকে। দু-তিন কিলোমিটার দূরেই ওর ফ্ল্যাট। ইউবিআইয়ের ডানলপ শাখায় পোস্টিং। ডানলপ থেকে বেলঘরিয়া স্টেশন এত কাছে। প্রায় সাত-আট মাস হল এখানে, কিন্তু কোনোদিন পথেঘাটেও দেখা হয়নি। অবশ্য এদিকে ওর না-আসারই কথা। তবু দেখল আমাকে, কিন্তু নিজে দেখা দিল না ! বসের হার্ট অ্যাটাকের খবর এসেছিল অনুষ্ঠানের মাঝপথে। তাই তড়িঘড়ি চলে গেছে সেদিন। তবু কি একবার অন্তত দেখা দিতে পারত না রাখাল ! ভাবতে ভাবতে দুচোখ জলে ভরে উঠল মলিনার।
.
(২)
.
পড়াশুনায় অসম্ভব ভালো ছিল ভৈরব বাস্কে। প্রথম যেদিন ওকে দেখে মলিনা, তখন ভৈরবের কালো চেহারা আর কোঁকড়ানো চুল দেখে গোঠের রাখাল মনে হয়েছিল তার। মলিনার মা হারমোনিয়াম বাজিয়ে খুব সুন্দর গান গাইতে পারতেন। মার একটা প্রিয় গান ছিল নজরুলের "গোঠের রাখাল বলে দে রে কোথায় বৃন্দাবন।" প্রায়ই এই গানটা গাইতেন।

রঘুনাথপুর কলেজে ক্লাশ শুরু হওয়ার কিছুদিন পরে ভৈরব এসে ভর্তি হয়। আর ক্লাশে প্রথম দেখে গোঠের রাখালের কথাই মনে হয়েছিল মলিনার। রাখালের সঙ্গে মলিনার খুব ভাব হয়ে গেল। সেই ভাব যে আসলে ভালোবাসায় পরিণত হয়ে পড়েছে তা অনেক পরে বুঝতে পেরেছিল দুজনেই।

কলেজ ক্যাম্পাসেই আড্ডা হত। সেখানেই কীভাবে যেন দুজনের মন কাছাকাছি চলে আসে। আদ্রা স্টেশনের এপারে রেলইয়ার্ডের কাছে ঘরভাড়া নিয়ে থাকে ভৈরবরা। আর মলিনারা থাকে স্টেশনের ওপারে চার্চের কাছে। মাঝে মাঝেই দুজনে আলাদা দেখা করত কাছেই এই শিবমন্দিরের পাশে। এইরকমই একদিন জনমানবহীন মন্দিরের সামনে মলিনার হাত চেপে ধরেছিল ভৈরব। মুখে কোনো কথা নেই।

~ কিছু বলবি রাখাল ?

মলিনা খুব চেয়েছিল একবার, অন্তত একবার মুখ ফুটে নিজের ভালোবাসার কথাটাই বলুক রাখাল। কিন্তু কোনো কথা বের হচ্ছিল না ভৈরবের মুখ থেকে। শুধু মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছিল মলিনার দিকে।

~ কী হয়েছে রাখাল ? তোর যা মনে হয় বল। কী বলতে চাস মন খুলে বল না রে।

কোনো জবাব না-দিয়ে ধীরে ধীরে মুঠো খুলে হাত সরিয়ে নিল ভৈরব। তার মুখে তখন লালচে আভা। গাছে গাছে পলাশ আর শিমুল ফুটছে। সেই রঙ যেন তার গালে এসে লেগেছে।

~ তুই আমায় খুব ভালোবাসিস, না রে রাখাল ?

এই একটি কথাতেই ভৈরবের মুখের আগল যেন খুলে গেল। হু হু করে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল কথার পর কথা।

~ খুব খুব খুব। কতটা তোকে বোঝাতে পারব না মন।
~ মন ?
~ হ্যাঁ, আমি তোর নাম দিলাম মন। তুই আমার মন। আমার সব সব সব … বছরের প্রথমেই আমি তোকে পেলাম মন।
~ বছরের প্রথম ?
~ হ্যাঁ রে, তোদের যেমন বৈশাখ বছরের প্রথম, আমাদের তেমনি ফাল্গুন হল বছরের শুরু।
~ তাই নাকি ! জানতাম না রে।

সেদিন আরও কিছুক্ষণ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে কথা বলার পর মলিনা বাড়ি ফিরল যেন উড়ে উড়ে। বুকের মধ্যে হু হু হাওয়া বইছে। আর সেই হাওয়াই যেন তাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে বাড়ির দিকে।

এভাবেই বেশ চলছিল, তাদের ভালোবাসার উঠোন ভরে উঠছিল পলাশে শিমূলে। কিন্তু বসন্তের পরেই আসে শীত। পাতাঝরার কাল। তেমনি করেই ওদের জীবনের পাতাঝরার দিন এসে পড়ল আচমকাই। মলিনার দাদার কাছে কেউ একজন বোনের প্রেমপর্বের কথা জানিয়ে দিল। শুরু হল খোঁজখবর। মলিনা অস্বীকার করতে পারেনি তার ভালোবাসার কথা। আসলে মলিনা তখন কোনোকিছুই লুকোতে পারত না, অস্বীকার করতে শেখেনি। এমনিতে মলিনার বাড়ির লোকেরা খুব-একটা রক্ষণশীল নয়, কিন্তু বামুনের মেয়ে আদিবাসী ছেলেকে বিয়ে করবে তা মেনে নিতে পারেনি কিছুতেই। অনেক পরে, সংসার জীবন তাকে শিখিয়ে দিয়েছে অনেককিছুই লুকোতে হয়, নিজের আর অপরের ভালোর জন্যই।

ততদিনে মলিনার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে। বাংলায় অনার্স ছিল। পরীক্ষা শেষ, আর বাধা রইল না বাড়ির দিক থেকে। তাই সেই সুযোগে আদিসপ্তগ্রামে মলিনার মামাবাড়িতে পাঠিয়ে দিল ওকে। এমএ আর করা হয়ে উঠল না মনিনার। সেখান থেকেই বাড়ির ঠিক করে দেওয়া পাত্র সোমনাথের সঙ্গে বিয়ে।

ভৈরবের বাবা জুতো পালিশ করতেন। ছেলের পড়াশুনার প্রবল ইচ্ছে। বাবার নিজেরও পড়াশোনার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু অর্থের অভাবে পারেননি। তাই সব ছেড়েছুড়ে চলে এলেন আদ্রায়। পারিবারিক সূত্রে এক আত্মীয় এখানে থাকত। তারই ঠিক করা ভাড়াবাড়িতে উঠে এলেন ছেলেকে নিয়ে। বাঁকুড়ায় গ্রামের বাড়িতে থেকেই উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছিল ভৈরব। বাবার ইচ্ছে ছেলে রঘুনাথপুর কলেজে পড়ুক। তাঁর আত্মীয় জানিয়েছিল এই কলেজটা নাকি খুব ভালো। তাই এখানে এসে ভর্তি করালেন ছেলেকে। পরিবারের বাকিরা থেকে গেল তালড্যাংরার বাড়িতে। আদ্রা স্টেশন চত্বরে জুতো পালিশ করেন তিনি। আগেও তাই করতেন। আর ছিল জমিজমা কিছু।

মলিনা চলে গেল কোথায় তা জানতে পারেনি ভৈরব। কিছুদিন মনমাতাল অবস্থায় কাটানোর পর আবার পড়াশোনায় মন দিল। বাবা কত কষ্ট করে পড়াচ্ছেন সেসব ভেবেই সমস্ত যন্ত্রণা মনবন্দি করে পড়াশোনা শুরু করল। বিএসসি পাশ করার পর এমএসসিও পাশ করল বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বর্ধমানে মেসে থাকার সময় মলিনার খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কলকাতার কোথায় বিয়ে হয়েছে তার সন্ধান পায়নি ভৈরব। বন্ধুরাও জানাতে পারেনি মলিনার হদিশ। ভৈরব এমএসসি করার পরপরই চাকরি পেয়ে গেল পুরুলিয়ার ইউবিআই ব্যাঙ্কে।

রাখালের পড়াশোনা আর চাকরি পাওয়ার সব খবরই মলিনা পেয়েছিল বন্ধুদের কাছ থেকে। তবে অনেক পরে। ততদিনে মলিনা জড়িয়ে গেছে সংসারের লতাগুল্মের ভিতর। মেয়ের বয়স তখন প্রায় পাঁচ বছর। ফলে অতীত মলিনার অন্তরমহলে বন্দি হয়ে পড়ে রইল। আর সেভাবে খোঁজখবরও করেনি রাখালের। আজ এতদিন পর সেই রাখালের খোঁজ পেল তারই স্ত্রীর সূত্রে। একথা ভেবেই অবাক হয় মলিনা।

(৩)

ফুলমণি এল দশটার পরে। কৃষ্ণকলি শরীরের উপর চাপিয়েছে ফাগুন রঙের শাড়ি। অপরূপ লাগছিল দেখতে। ফুলমণিকে প্রথম দেখাতেই মলিনার ভালো লেগে গেল। রাখাল তাহলে ভালো বউ পেয়েছে। কথা বলে বুঝল, ফুলমণি শুধু ভালো নয়, অসম্ভব ভালো।

~ জানো দিদি, আমি ক্লাশ এইট পর্যন্ত পড়েছিলাম। বিয়ের পরে তোমার রাখাল আমাকে মাধ্যমিক পাশ করালেন। তারপর উচ্চমাধ্যমিক, বিএ, আর বছর তিনেক আগে বাংলায় এমএ। উনি আমাকে অনেক দিয়েছেন গো। আমায় ভরিয়ে দিয়েছেন। ঘুটেকুড়ানি ছিলাম, আর এখন আমি রাজরাণী বলতে পারো।

~ হ্যাঁ রে ফুল, তুই এভাবে বলিস কেন রে ? তোমার রাখাল ? তোর বলতে লজ্জা করে না ? হা হা হা …

দুজনে হইহই হাসি-মজায় সারাদুপুর জমে গেল। গল্পে গল্পে মলিনা আপনি থেকে তুমি হয়ে গেল আর ফুলমণি তুই হয়ে উঠল অনায়াসে।

~ দিদিকে কেউ আপনি বলে রে পাগলি ?
~ আর বোনকে কেউ তুমি বলে দিদি ? তুই করে বলতে হয়।

হা হা হাসিতে ফ্ল্যাটের দরজা-জানালার পর্দায় হাওয়া এসে দোল খেল। সেদিকে দুজনের নজরই রইল না।

~ আচ্ছা ফুল, আমার রাখাল তোর মতো এমন মণিরত্নটিকে কোথায় খুঁজে পেল বল তো ?

লজ্জায় রাঙা হয়ে গেল ফুলমণির মুখ।

~ কী বলছ দিদি, আমি রত্ন হতে যাব কেন ? আমি ছিলাম কয়লা। আগুনে পুড়ে ছাই হওয়া ছাড়া যার কোনো গুণই ছিল না। তোমার রাখাল আমাকে আজকের ফুলমণি বানিয়েছেন। কীভাবে ভদ্রজনের সাথে কথা বলতে হয়, কীভাবে শহরের আদবকায়দা রপ্ত করতে হয় সব শিখিয়েছেন আমাকে। ওনার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ দিদি।

~ কৃতজ্ঞ বলিস না ফুল। বরের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাতে নেই। ও তো নিজের মানুষ। ও যা করেছে ভালোবেসেই করেছে।

~ না গো দিদি, উনি যা-কিছুই করেছেন সবই আমাকে ওনার পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার জন্য। আর ভালোবাসা বলছ ? উনি আমাকে দরিদ্র পরিবার থেকে এনে রাজপ্রাসাদে বসিয়েছেন। ভালোবাসা কতটা দিয়েছেন জানি না। তবে কাছের মানুষ বানাতে চেয়েছেন। তাতে হয়তো ভালোবাসা থাকে, কিন্তু প্রেমিকের আদর থাকে না দিদি।

~ খুব যে কথার খই ফুটছে দেখছি ! রাখালের মতো প্রেমিক আর আছে নাকি ?
~ উনি তো তোমার প্রেমিক। আমার শুধু মরদ, মানে স্বামী। আর কথা শেখার কথা বলছ ? সেও তোমার রাখালের দান।

~ তোদের বিয়ে কীভাবে হল বললি না তো ? কীভাবে খুঁজে পেল তোর মতো এমন রত্নটিকে ?
~ সে অনেক কথা দিদি। আমাদের বাহা উৎসবে আমাকে দেখে ওনার ভালো লেগে যায়। তারপর বন্ধুদের দিয়ে বাড়িতে খবর পাঠিয়েছিলেন। শেষে কিরিঙ বেহু করে আমাকে বিয়ে করেছেন।

~ কিরিঙ বেহু কী?
~ কিরিঙ বেহু আমাদের একটা প্রথা। আমার বাবাকে দু-বিঘা জমিন আর টাকা দিলেন। এই হল কিরিঙ বেহু। মানে কনেকে কিনে নেওয়া। আমাকে কিনে নিয়ে নিজের মতো করে গড়ে নিয়েছেন উনি।

বারবার ফুলমণি তার কথায় রাখালের প্রেমিক না-হয়ে ওঠার ব্যাপারটাই বড় করে দেখাচ্ছে। রাখাল যেন ফুলমণিকে ভালোবাসার বদলে করুণা করেছে। খুব অস্বস্তি হচ্ছিল মলিনার।

~ আচ্ছা, তুই কি আমাকে কথা শোনাতে এসেছিস ? বারবার তোমার রাখাল বলিস কেন ? আমি ওকে বলে দেবো যেন তোর প্রেমিক হয়ে ওঠে।

আবার গুঁড়ো গুঁড়ো হাসি ছড়িয়ে পড়ে অভিজাত ফ্ল্যাটের মেঝেয়।
~ তোদের ইস্যু কী?
~ হয়নি গো দিদি। আমি খুব চেয়েছিলাম জানো। কিন্তু উনি চাইতেন কিনা জানি না।
এই বিষয়টা মলিনার অস্বস্তি বাড়িয়ে দিল। তাই কথা ঘোরাতে চেষ্টা করে সে।

~ খুব যে দরকারি কথা আছে বলছিলি, এখনো সেকথা বলিসনি মনে আছে ফুল ?

~ হ্যাঁ দিদি, বলব বলেই তো আসা। কিন্তু কীভাবে বলব বুঝে উঠতে পারছি না।

~ দূর পাগলি, এতক্ষণেও মনের দরজা খুলতে পারলি না দিদির কাছে ? যা বলার মন খুলে বলে ফ্যাল।

ফুলমণি যা বলল, তাতে ভালোলাগা আর বিষণ্নতায় ভরে গেল মলিনার হৃদয়। রাখাল আজও তাকে ভালোবাসে। ফুলমণিকে ওদের ভালোবাসার কথা সব বলেছে। এমনকি একদিন কলেজের ফাঁকা ক্লাশরুমে ওদের চুমু খাওয়া পর্যন্ত। সমস্ত শুনে লজ্জা পেলেও ভালোলাগায় ভরে উঠেছিল মলিনার প্রাণ। কিন্তু রাখাল যে প্রায় প্রতিদিন রাতেই একা একা কাঁদে সে খবরে মলিনার ভেতরে বৃষ্টি নেমে এল অঝোরে। থইথই জলে ভরে গেল তার ভিতরঘরের উঠোন।

ছেলে চাকরি পাওয়ার পর বাবাকে আর জুতো সেলাই করতে দেয়নি ভৈরব। তালড্যাংরার গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে। ওদের কুঁড়েঘর দালান হয়েছে। বাবা মারা গেছেন, মারা গেছেন মাও। বোনটার ভালো ঘরে বিয়ে দিয়েছে। মাঝে মাঝে যায় নিজের পৈতৃক বাড়িতে। সেখানে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে পারে না। মনখুলে কথা বলতে পারে না। একদিকে শহুরে পরিবেশের হাতছানি, অন্যদিকে নিজস্ব সংস্কৃতির টানে জেরবার হয়ে গেছে ভৈরব। একা একা কাঁদতে কাঁদতে বলে, আমি দুই পৃথিবীর মাঝে ঝুলে আছি ফুলু। আমাকে যে-কোনো একদিকে যেতে হবে। আমি যে আর পারছি না ! ফুলমণি গরগর করে বলে যায় রাখালের বৃত্তান্ত।

~ ওকে কোনদিকে যেতে বলিস তুই ? তোদের সমাজে নাকি শহুরে সমাজে ?
~ জানি না দিদি। উনি যে আর আমাদের সমাজে ফিরতে পারবেন না মনের দিক থেকে, তা বুঝি। উনি শহরের ভৈরব বাস্কে হয়েই থাকুন।

~ কেন মনে হল রে ও তোদের সমাজের হতে পারবে না?

~ উনি গ্রামের বাড়িতে যেতে চান না আর। আমাদের সমাজের মাদলের বোল, নাচ, আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি সবকিছু থেকে নিজেকে কেমন যেন গুটিয়ে নিয়েছেন। আমার যে বড্ড কষ্ট হয় দিদি ওনার জন্য। তাছাড়া শহরের মলিনা ওনার প্রাণজুড়ে আছে। কতদিন দেখা নেই। তবু উনি তোমাকে ভুলতে পারেননি।

একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস কি লুকালো ফুলমণি ? বোঝার চেষ্টা করে মলিনা।

~ দ্যাখ ফুল, ও যদি সত্যিই আমাকে ভালোবাসে এখনো তাহলেও কি রাখাল দুই পৃথিবীর মাঝে আটকে নেই ? তোকে ও ভালোবাসে না একথা আমি বিশ্বাস করি না। আমি এখন কী করব বল ? ওকে কোন পৃথিবীর দিকে ঠেলে দেবো ? আর আমার সেই সাধ্যই কি আছে রে ?

~ তুমিই পারবে দিদি। ওনাকে বোঝাও। উনি তোমাকেই ভালোবাসেন। ওনার পাশে তুমি কি পারো না সবসময় থাকতে ?

~ আর তুই ?
~ আমি তো কোথাও নেই দিদি। আমার কোনো পৃথিবী নেই।

ঝরঝর করে কেঁদে চলে ফুলমণি বাস্কে। তার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দেয় মলিনা।

~ আমিই কি পেরেছি প্রিয়ব্রতকে সেইভাবে ভালোবাসতে ? যে ভালোবাসা রাখালকে দিয়েছিলাম, সেইরকম উজার করে তো দিতে পারিনি ! আমাদেরও যে আলাদা আলাদা পৃথিবী হয়ে গেছে রে ফুল। আমিও যে দুই পৃথিবীর মাঝে ঝুলে আছি। তুই ফিরে যা। কোনোদিন আর আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখিস না। রাখালের পৃথিবীকে নিজের পৃথিবী করে নিতে পারবি না বোন ? বল পারবি না ? তোকে যে পারতেই হবে। রাখালের সামনে একটামাত্র পৃথিবী মেলে ধরতে পারবি না তুই ? কথা দে আমায় বোন, রাখালকে তুই নিজের মতো ভালোবাসবি। ওর প্রেমিকা হয়ে উঠবি।

~ কিন্তু তোমার রাখাল কি পারবে ?
~ পারতেই হবে। মেয়েরা সব পারে ফুল, সব পারতে হয়। ভালোবাসায় ভুলিয়ে দিতে হয় অতীতের যন্ত্রণা। তোদের পৃথিবীতে আমি আলাদা গ্রহের মতো হয়ে থাকলাম এতদিন নিজের অজান্তে। এবার থেকে মুছে ফেল আমাকে। রাখালকে বলিস তার মন হারিয়ে গেছে। ভিনগ্রহের বাসিন্দা সে। তোর আর আমার আলাদা আলাদা দুটো পৃথিবী থাকুক। আয় একটু আদর করে দিই।

মলিনার উষ্ণ বুকে ফুলমণি বাস্কে নিজস্ব পৃথিবী খুঁজে চলেছে। দমকে দমকে কান্নাধারা ভিজিয়ে দিচ্ছে মলিনার বুক আর ফুলমণির অলকগুচ্ছ।

ফেসবুক মন্তব্য