হিরণ্যগর্ভ

অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়




ছোটবোলা থেকে আমাদের বংশগৌরবের কথা শুনে এসেছি। দুলিঘাটে আমার বড়-দাদামশাইদের কয়েক পুরুষের ভদ্রাসন ও তার সাথে মন্দিরবাটী জেলার উল্লেখযোগ্য তীর্থস্থান। বড়দাদামশাই নাকি একজন বিরাট যোগীপুরুষ ছিলেন।

আজ, এখন আনন্দীও সিধে নিতে নিতে বলছিল, হবে না, কত বড় বংশ। জয় রাধে। বেঁচে থাকো গোপাল। গোপাল মানে আমি। অথচ ও আমার থেকে বড়জোর আট-দশ বছরের বড়।

সিধে মানে এমন কিছু না, এক কুনকে চাল, একটু মুগের ডাল, কটা আলু-বেগুন, কড়ি আর একটা কাঁচা টাকা। উৎবের দিনে বাউল-বোষ্টমরা সিধে পেতেন - সে নিয়ম এখনও বহাল রয়েছে, বহাল রয়েছে সেই সিধে আমাদের বাড়িরই কারো হাত দিয়ে বিলোনোর প্রথা। যেমন এখন পানুমামা সেই কাজটা আমাকেই করতে বললো। গোটা পঞ্চাশ-ষাট সিধে প্রার্থী লাইনে দাঁড়িয়ে। আনন্দীও আছে সেখানে।

আগেকার দিনে, মানে এই কুড়ি বছর আগেও সিধেয় মেয়েদের জন্য শাড়ি, ছেলেদের জন্য ধুতি থাকতো। খরচ উঠে আসতো গ্রামের সম্পন্ন লোকেদের দানে। এখন সেসব ইতিহাস। বদলেছে গ্রাম, বদল হয়েছে সামাজিক অবস্থান। রাজনীতি। প্রায় দেড়শ বছরের পুরাতন এই ভিটে আমাদের পূর্বপুরুষদের এককালের বোলবোলাও ও তারপরের ভাটার টানের সাক্ষী। আমাদের পুরোনো ভিটেয় অনেক বড় বড় লোকের পায়ের ধুলো পড়েছে। এককালের সর্বমান্য গুরুবংশ, প্রচুর ভূ-সম্পত্তি, জনবহুল পরিবার থেকে আজকের অছিপরিষদ নিয়ন্ত্রিত মন্দির ও দেবোত্তর, পোড়ো বাড়ির মত ভিটে, পানুমামার মত পড়ে থাকা দু-একজন বংশধর। বৎসরান্তে এইসব অনু্ষ্ঠানে পানুমামাদের ডাক পড়ে। তখন পানুমামাও মন্দিরে গিয়ে দেওয়ালে বড়-দাদামশাইয়ের বিশাল, পূর্ণাবয়ব তৈলচিত্রের সামনে হাতজোড় করে বসে। পুরোহিত, পঞ্চায়েত প্রধান, জেলাশাসক... এঁদের সঙ্গে। আমাদের চার শরিকের সবার বড় দাদামশাই। ছবিতে পঞ্চাশ বছর বয়সের আশেপাশের চেহারা। খালি গা, তুলসী-মালা, ফোঁটা-তিলকে বেশ মহিমান্বিতই বলা যায়। ছবিটা তাঁর কোনো ভক্তেরই আঁকা শুনেছি। শিল্পী বেশ যত্নসহকারে গুরুর মাথার পিছনে জ্যোতির আভাস দিয়েছেন। আমি তাঁকে দেখিনি, কিন্তু আমার দিদিমা বেশ সুন্দর বাঁকড়ি টানে গল্প করতেন বাবামশায় যখন ধ্যানে বসতেন, তখন আসন ছেড়ে একহাত উঁচুতে... ইত্যাদি ইত্যাদি। শৈশব রূপকথা ভালবাসে।

বড়দাদামশাইকে ঘিরে অবশ্য অলৌকিক কাহিনীর কোনো অভাব ছিল না। কবে তাঁর কৃপাদৃষ্টি পড়ে এলাকার ত্রাস, ডাকাত শান্তিরামের জীবন আমূল পাল্টে গিয়েছে, কবে কোন বিলেত-ফেরত নাস্তিক তাঁকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেও, পরে স্বপ্নাদেশ পেয়ে, তাঁরই পায়ে লুটিয়ে পড়েছে, কার সন্তান তাঁর আশির্বাদে ফিরে এসেছে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে, এইসব গল্পে একটি মানুষকে ঘিরে মীথ তৈরি হয়। বেঁচেও ছিলেন প্রায় আশি-নব্বই বছর। দুলিঘাট রেলস্টেশনের বাইরে বইয়ের স্টলে কোকশাস্ত্র, কিশোরকুমারের হিন্দি গানের বইয়ের পাশে অনাথ-গোঁসাইয়ের মাহাত্ম্যকথাও বিক্রি হতে দেখছি ইদানীং।

আমাদের ছোটবেলায় বাড়িতে তাঁর ভক্তদলের আনাগোনা দেখেছি। আজকের মন্দিরে কষ্টিপাথরের শ্যামসুন্দর, অষ্টধাতুর রাধারাণী আর আমাদের পরিবারে প্রায় দেড়শ বছর ধরে সেবিত হিরণ্যগর্ভ শিলার সাথে বড়দাদামশাইয়ের ছবিরও নিত্যপূজা। অথচ অনাথবন্ধু সাধক থেকে গুরু হয়ে ওঠার আগে পর্যন্ত নিজেই পুজো করতেন। যখন তাঁর মাথার চারিদিকে জ্যোতি দেখা দিল তখন থেকে বেতনভূক পুরোহিতের বন্দোবস্ত। তখনকার মন্দিরঘর আজকে নাটমন্দির, দালান জুড়ে নিয়ে অনাথ-প্রভুর শ্যামসুন্দরবাটি মন্দির হয়ে উঠেছে।

বড়দাদামশাইয়ের নাম নিয়ে ফেললাম কথায় কথায়। আনন্দী জানলে ঠিক গালে হাত দিয়ে বলত, ও মা, কী হবে? এ যে পেল্লাদকুলে দৈত্যি। যেমন ও আজ সকালেই পানুমামার দিকে তাকিয়ে, একটু তাচ্ছিল্য-অবজ্ঞা মেশানো গলায়, হুঁ! বলে চলে এসেছিল। নাকের মঞ্জরী তিলকে, সাদা শাড়ীতে মনে হচ্ছিল আনন্দী যেন একদম সাহিত্যের পাতা থেকে উঠে এল। পানুমামার অবশ্য কোনো হেলদোল নেই। এক কোনায় দাঁড়িয়ে বাঁ-পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে ডান পায়ের নখ খুঁটছে। অবশ্য উৎবের এই ক’দিন গরদের ধুতি, হরিনাম লেখা নামাবলী্‌ ফোঁটাতিলকে পানুমামারও একদম অন্য চেহারা। অনাথপ্রভুর ভিটেয় বসবাসকারী একমাত্র পুরুষ বংশধর বলে কথা। হলই বা সে মন্দির এখন ট্রাস্টের হাতে। প্রথা অনুযায়ী অনাথপ্রভুর উত্তরপুরুষ গিয়ে জোড়হাতে আজ্ঞা চাইবে বার্ষিক উৎবের সূচনা করবার, রাধারাণীর পায়ের থেকে ফুল ঝরে পড়বে, তবে গিয়ে বাইরে বাদ্যি বেজে উঠবে, ভেঁপু বাজিয়ে মেলা শুরু হয়ে যাবে।

তা আনন্দীকে আমি ভেক নেবার পর এই প্রথম দেখছি। ও’র বাবা, মানে হারানদাদুরা কয়েক পুরুষে বৈষ্ণব। হারানদাদু বড়দাদামশাইয়ের কাছে প্রথম দীক্ষিত ভক্তদের একজন। আনন্দীর বিয়ে দিয়েছিলেন নিজের সম্প্রদায়ের মধ্যেই, পনেরো বছরে। আঠেরোর মধ্যেই সেসব মিটিয়ে সাদা সিঁথি নিয়ে ফিরে আসার পর থেকে ও গুরুর বাড়ি আর নিজের বাড়ি, এই নিয়েই আছে। তারপর একদিন হারানদাদু চলে গেলেন, হারান দিদিমাও গেলেন তার দুএক বছরের মধ্যেই, ততদিনে ওদের ভিটেয় ঘুঘুপাখি চরবার বন্দোবস্ত প্রায় পাকা। রাত্রে আনন্দীর ঘরে থাকা দায়। আমার দিদিমা ঠিক করে দিলেন একজন ঝি রোজ রাতে গিয়ে তার কাছে শোবে। তা এসব আমার শোনা কথা। মায়ের কাছে। অনেক পরে।

পুরোনো আনন্দীর, মানে আন্দির সাথে আমার প্রথম দেখা এই সময়েই কোনো গ্রীষ্মের ছুটিতে। আমি দশ-বারো, আন্দি কুড়ি-বাইশ, আমের আচার, চুরণ এইসব দিয়ে খুব সহজে ভাব জমে ওঠে অসমবয়সের বন্ধুত্বে। পানুমামা তখন কলকাতা গিয়েছে পড়তে। হস্টেলে থাকে, ছুটিছাটায় বাড়িতে আসে। আমরা নদীর পার ধরে লোকালয় ছাড়িয়ে অনেকটা দূর হাঁটতে হাঁটতে গেলে দেখি একটু পরে টুকটুক করে সাইকেল-সোয়ার পানুমামা।

আন্দি বলবে, আমরা বেশ দুজন ফ্রেন্ড, অন্য কাউকে চিনি না, কেমন!

নদীর ধার থেকে দুলিঘাটের নির্মীয়মান থার্মাল স্টেশন দেখা যাবে। আমরা নদীর পারে একটু সাফ জায়গা দেখে বসব। আন্দির শাড়ির কোনায় বাঁধা কাগজে মোড়া আমকুষি-নুনমাখা বেরিয়ে আসবে।

কোনোদিন হয়ত আন্দি হিন্দি সিনেমার গান করবে, গেঁয়ো ছড়ার গান, ভুলভাল কথা জুড়ে রবিঠাকুর-নজরুল কি ইয়ারানা ফিলমের সেই গানটা। ছু কর মেরে মনকো।

পানুমামা প্রথমে যথারীতি একটু দূরে বসবে। তারপর যেই আন্দি বলবে, আমচুর চাই তো ইদিকে আসতে হবে, ওমনি পানুমামা সাইকেল একটা কাঠগোলার দেয়ালে ঠোসান দিয়ে রেখে এসে আমার পাশে বসবে।

অন্ধকার হয়ে আসছে দেখলে আন্দি বলবে, আমাদের একটু এগিয়ে দিতে হবে।

পানুমামা টুকটুক করে হাঁটা দেবে আমাদের সাথে, কিন্তু বাড়ির দু-তিনশো গজের মধ্যে আমাদের ছেড়ে দিযেই ফের হাওয়া হয়ে যাবে। মামার সাথে আমার আবার দেখা হবে সেই রাতে, রান্নাঘর, তুতো দাদা-দিদিদের সাথে খেয়ে উঠবার পরে। পানুমামারা খেতে বসবে দালানের লম্বা বারান্দায়, বাড়ির ব্যাটাছেলেদের সেটাই নির্ধারিত খাওয়ার জায়গা। মেয়েরা আর কাচ্চাবাচ্চারা রান্নাঘরে। আঁচানোর সময় হয়ত ভেজা হাতেই মাথায় একটা আলতো চাঁটি, কীরে তোর প্রাণের বন্ধু কি বাড়ি চলে গেছে? আন্দিকে দিদিমা প্রায়দিনই রাতে না খাইয়ে ছাড়তেন না।

মাঝে মাঝে আন্দির সাথে মন্দিরবাটির কাজ করতে যেতাম। সে এক বিতিকিচ্ছির ব্যপার। সেলাই করা কাপড পরা যাবে না। আন্দি তো শাড়িই পরে থাকতো, কিন্তু আমার পক্ষে ধুতি, উত্তরীয় সামলে আধঘন্টায় রাশি রাশি দূর্বা, তুলসী বেছে তামার পুষ্পপাত্রে সাজিয়ে ফেলা কি চাট্টিখানি কথা!

তারপরে আছে মন্দিরে জমা রেখে যাওয়া আরো আট-দশটি নারায়ণশিলার পরিচর্যা। আন্দি তো দশ মিনিটের মধ্যে চন্দন বেটে, চামর সাজিয়ে রেডি। তারপর পড়তো আমার ট্রেনিং নিয়ে, উঁহু, ওরকম না, নারায়ণকে চিৎ-উপুড় করে তুলসীচন্দন দিয়ে বসাও, পৈতেটা পরাও, সাদা ফুল দাও এটসেটরা এটসেটরা।

হিরণ্যগর্ভ শিলার কথা অবশ্য আলাদা। নীল-কালো মসৃণ সুগোল শিলার মাঝ বরাবর একটা সোনালি দাগ, তিলকের মত। আন্দি বলতো নারায়ণ মটুক পরে আছেন। তা এই শিলা আমাদের ভদ্রাসনের চেয়েও পুরোনো। আমার মত অর্বাচীনের হাতে তাঁর স্নান-সজ্জা হবার কথা নয়। তার জন্য নির্দিষ্ট পুরোহিত আছেন। তাঁর জায়গাও একদম শ্যামসুন্দর আর রাধারাণীর মাঝখানে। অন্যান্য শিলার চেয়ে উঁচুতে।

মন্দিরঘর থেকে বেরোনোর সময় জড়ো হওয়া পুণ্যার্থীরা আমাদের দেখিয়ে সসম্ভ্রমে, নিচু গলায় ফিসফিস করতো। গুরুবাড়ির বেড়ালটারও আলাদা ব্যপার।

কিন্তু এইসব তো কুড়ি বছর আগের কথা। তারপর দুলিঘাটের সাথে আমার যোগ প্রায় ছিন্ন হয়ে আসে। দাদু-দিদিমা বেঁচে থাকতে মার কাছে চিঠি আসতো, কল্যাণীয়াসু রানু, এইবারের উৎসবে নিশ্চয় করিয়া আসিও। কাজেকর্মে বাটির লোকেরা না থাকিলে তোমাদের বাবা-জেঠারা সবদিক সামলাইয়া উঠিতে পারেন না, আমাদেরও বয়স হইতেছে, কবে শ্যামসুন্দর কাছে ডাকিয়া লয়েন। ইতি, আঃ মা। আমার মা দুদিন সেই চিঠি নিয়ে ফোলাফোলা লালচোখ নিয়ে থাকবে, তারপর একদিন ঠিক বাবা মাকে তুলে দিয়ে আসবে খড়্গপুরের ট্রেনে। মামারা কেউ মাকে খড়্গপুর খেকে নিয়ে আসবে। আমার বা দিদির যাওয়া হবে না, ইশকুল আছে যে!




কিন্তু কিছু একটা কারণে দিদিমার মৃত্যুর পর মা আর দুলিঘাট যেতেই চায় নি। কথাবার্তায়, ঠারেঠোরে বুঝতাম সেখানে একটা কিছু দুর্যোগ ঘনিয়ে আসছে। মন্দিরে বেশ কিছুকাল অব্যবস্থা চলছিল। দেবত্র সম্পত্তির মধ্যেও রাজনীতির আবর্ত ঢুকে পড়েছিল...সবদিক দিয়ে ট্রাস্টের হাতে তুলে না দিলে সবকিছুই যেত। তবে তা ছাড়াও অন্য কিছু আছে যা আমার মাকে দুলিঘাটের প্রতি বিমুখ করে তুলেছিল। দিদিমার শেষ অসুখের সময়ই মা শেষবারের মত দুলিঘাট যায়।

এইসবের জন্য, আমাদেরও দুলিঘাট যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছিল। শুধু আমরা না, পরিবারের অন্য অনেকেই কেন জানিনা দুলিঘাট-বিমুখ হয়ে উঠলেন। তাছাড়া অন্য মামারা কেউই ঠিক দুলিঘাটে পড়ে থাকেন নি। লেখাপড়া যার যেমনই হোক, চাকরিবাকরি নিয়ে কলকাতায় কি কমপক্ষে মেদিনীপুর সদরে চলে গেছেন। উৎসবের আগে তাঁদের কাছে ছাপানো কার্ড যায়। তাঁরা কখনো কখনো আসেন, অবশ্য এসেই বা কি করবেন, ভিটে বাড়ি অযত্নে অবহেলায় ভেঙে পড়েছে প্রায়, অতবড় বাড়িতে মোটে দুটো তিনটে ঘর এখন বাসযোগ্য রয়েছে। দুলিঘাটে তো আর থাকার মত হোটেল নেই, যেখানে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে এসে ওঠা যায়।

হাতে রইল এক পানুমামা। পড়াশুনায় বেশ ভালোই ছিল। পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট। দাদুদের এই অলৌকিক প্রতিপত্তির প্রতি তার কোনো আগ্রহ ছিল না, বরং খানিকটা তাচ্ছিল্যই দেখেছি। আন্দি হিরণ্যগর্ভ শিলার সোনালি দাগ দেখিয়ে মহিমা-কীর্তন করে বলেছিল, জানো, এই শিলায় সোনা থাকে। মামাকে সেকথা বলতেই মামা শুধরে দিয়েছিল, সোনা নয়, শালগ্রাম আসলে এক অ্যামোনাইট বলে এক প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর জীবাশ্ম যা হিমালয়ের একটা বিশেষ জায়গার শেল পাথরের নুড়ির মধ্যে পাওয়া যায়। সে পাথরে পাইরাইট থাকলে সোনালি দাগ দেখা যেতেই পারে। কিন্তু সোনা থাকে বলে আজ অব্দি কেউ প্রমাণ দিতে পারে নি। আন্দিকে বলেছিল, ছোট ছেলেকে কেন মিথ্যে ঢপ দিস। আন্দি রেগে গিয়ে গিয়ে বলেছিল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুমি সবজান্তা কি না!

যাই হোক, চাকরি নিয়ে কলকাতায় কি আরো দূরে চলে যাওয়া পানুমামার পক্ষে অসম্ভব ছিল না, তবু থেকে গেল সে-ই। কেন? সেকথার কোনো সদুত্তর পাই নি। মা শুধু একবার বলে ফেলেছিল, দিদিমার জন্যই বিগড়ে গিয়েছে পানুমামা। মামারাও কেউ কেউ বলেন, মা-র অত্যধিক আদরেই পানুটা কেমনধারা বিগড়ে গেল।

কিন্তু এ কেমনধারা বিগড়োনো? তাস-পাশা, অন্য নেশা? মদ্যপান? পরদারগমন? সেসবের কোনোটাই তো মনে হচ্ছে না। বরং উৎসবের আগের দিন যখন ঝোঁকের মাথায় হাওড়ায় লোকাল ট্রেনে চেপে বসেছিলাম, তখন মনে একটাই কাঁটা খচখচ করছিলো, গিয়ে থাকার একটা জায়গা জুটবে তো, না কি ফিরতি ট্রেনেই কলকাতা আসতে হবে? তা রাত আটটা নাগাদ যখন গিয়ে পৌঁছলাম, পানুমামা বাড়ির রোয়াকেই বসে ছিল। আমাকে দেখে বললো, আয়, আয়, তা একটা খবর দিয়ে আসতে হয়, আমার তো আজ দুধ-সাবুর বন্দোবস্ত। তোকে কি খেতে দিই ঘুটু? আমার মামাবাড়ির দেওয়া ঘুটু ডাকনামটা আমি নিজেই ভুলে গেছিলাম। যাই হোক, অত রাতে আলুসেদ্ধ ভাত, আর মামার ফলারের জন্য রাখা পাকা কলা দিয়ে ডিনার।

আন্দি এল পরের দিন সাতসকালে। এসেই তরিতরকারি সব আনিয়ে কেটেকুটে দিয়ে গেছে। রান্না করতে বসে ঝির মুখ ভার। পানুমামার রাজত্বে দুধসাবু আর আলুভাতে ভাত রেঁধেই কাজ সারার অভ্যাস তার।

সেদিনই সকাল থেকে উৎসবের শুরু। শ্রাবণের শুক্ল একাদশী। পানুমামা, যার কোনোকালে এইসব দেব-দ্বিজে ভক্তি-টক্তি দেখিনি, সে চান-টান করে রেডি। মন্দিরের লোকজন এসে গেছে, তাকে বেশ ঘটা করেই নিয়ে যাবে। আনন্দি ঝিকে দিয়ে আমাকে বাইরে ডেকে পাঠিয়েছিল তার ঠিক আগেই। বলল, পাথরের থালা-গেলাসে মিষ্টি আর শরবত ঢাকা দিয়ে রাখা আছে। মামাকে খাইয়ে পাঠিও। ওইসব ভড়ং মিটতে একটা-দুটো বেজে যাবে। মনে মনে বললাম, ভড়ং তোমারই বা কী কম! বসন রাঙায়ে কী ভুল করিলি..., যাক্ গে।

উৎসবের সময় আমি সাধারণ দর্শনার্থীদের মধ্যেই বসে থাকলাম, নাটমন্দিরে। বহুদিন বাদে, বেড়ার অন্য পারে। আনন্দীও তাই। মেয়েদের দিকে। পানুমামা যন্ত্রের মত পুরোহিতের নির্দেশে কাজ করছে। সকালের ভোগের জন্য গর্ভগৃহের দরজা বন্ধ হতেই আমি বেরিয়ে আসছি, আনন্দী আমাকে বলল, আমিও সিধেটা নিয়েই আসছি। একটু দাঁড়াও। একটু আগেই বললো ওইসব ভড়ং, আর এখন বলছে সিধে... আমার মেজাজটা একটু বিগড়ে ছিল, মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, হ্যাঁ হ্যাঁ, যাও, ভিক্ষে-শিক্ষে সেরে এসো।

আনন্দী কি অবাক হল? মুখ দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই, শুধু আস্তে আস্তে বলল, সে তো সত্যি, বোষ্টুমীর কি ভিক্ষা ছাড়া চলে? ততক্ষণে ভেতর থেকে একজন কর্মকর্তাগোছের লোক এসে আমাকে বললো, ছোটগোঁসাই আপনাকে ডাকছেন... ভেতরে যেতেই পানুমামা আমাকে বলল, প্রতিবার সিধেটা এঁরা আমার হাত দিয়ে দেওয়ান, তা এ’বছর তো তুই আছিস, তুই কি দিয়ে দিতে পারবি? আমার শরীরটাও ভাল লাগছে না।

আমার রাজি না হয়ে কোনো উপায় ছিল না... সিধে দিতে গিয়ে একটু আগের কথা মনে করে আমার কান অব্দি লাল, কিন্তু আনন্দীর মুখে তখনো দেখি প্রসন্ন কৌতুক... তার সঙ্গী কেউ জিজ্ঞাসা করলেন, ইনি কে বটে? প্রভুবংশের কেউ? আনন্দী পরিচয় দিল, আর তারপরই সেই সব গুণগান।

কিন্ত আমার তখন ওসবে মন ছিল না। ভাবছিলাম অন্য লোকের কান এড়িয়ে কীভাবে মামার শরীর খারাপ করার কথা তাকে জানাবো। আসলে এখানে এসে অবধি মনে হয়েছে আন্দিই যেন মামাকে আগলে রেখেছে।

কিন্তু সে সুযোগ পাওয়া গেল না। সিধে বিতরণ শেষ হবার আগেই আন্দি চলে গিয়েছে। আমি আর মামা আস্তে আস্তে হেঁটেই বাড়ি ফিরলাম। সেদিন আর আন্দির দেখা নেই। রাত্রে ঘুম আসছিল না। আমার কৈশোরের চেনা বাড়িটাকে যেন রাহু গ্রাস করেছে। মোটে দুটো ঘর থাকবার মত আছে। বিছানাপত্রে অব্যবহার ও অবহেলার সোঁদা গন্ধ, বাসনকোসনে কালো ছোপ, দেওয়ালে নোনাধরা দাগ। প্রথম রাতে অনেকদিনের জমা হওয়া গল্পকথা সেসব ভুলিয়ে দিলেও পরের রাতে বেশ কষ্টই হচ্ছিলো। পানুমামা সারাদিনের ধকলের পর অকাতরে ঘুমোলেও, আমার রাতটা কাটলো প্রায় জেগেই।




পরপর দুদিন আনন্দী এল না। ঝি ফেরার। মামা আর আমি অনেকদিন বাদে চালে-ডালে ফুটিয়ে নিলাম। মামা আমিষ একেবারে ছেড়ে দিয়েছে। মাছ পর্যন্ত না। আমার যাবার সময় ঘনিয়ে আসছে অথচ আন্দি আসছে না দেখে রাগ হচ্ছিল। আবার তাকে কটুকথা শোনানোর জন্য একটা অপরাধবোধও কোথাও কাঁটার মত খচখচ করছিলো। সন্ধ্যাবেলা তার বাড়ি যাব বলে বেরিয়ে পড়লাম, একলাই।

আনন্দীদের পুরোনো মেটে-দোতলা খড়ে ছাওয়া বাড়ির শুধু উঁচু দাওয়াটুকু জেগে আছে। তারই মধ্যে যেমন-তেমন করে চারটে দেওয়াল, আর অ্যাসবেসটসের চাল খাড়া করা। দরজা খোলাই ছিল, ‘আন্দি’ বলে ডাক দিয়ে দাওয়ায় উঠতেই তার আওয়াজ পেলাম, থালায় করে মন্ডা আর কটা বাতাসা আর জল নিয়ে এল।

-বসো একটুখানি গোপাল, আমি বাকি জপটা সেরে, ঠাকুরকে শয়ন দিয়েই আসছি।

আনন্দীর পুরোনো ভিটের চওড়া দাওয়ায় পাটিতে বসে অনেক সাপলুডো খেলেছি। হারান দিদিমার হাতে মাখা শসা-কাঁচা আম কুচি- নারকেল কুচি কি তেল-ছাতু দিয়ে মাখা মুড়ি। এই নতুন তোলা, ইঁটের দাঁত-বের করা ঘরের সামনে শুধুই নিকোনো উঠোন, লোহার পাতের নড়বড়ে টুল। সন্ধ্যা হয়ে গেছে, আশেপাশের বাড়ি থেকে শাঁখের আওয়াজ আসছে এখনো। যার যখন সন্ধ্যা হয়।

আন্দি খঞ্জনী বাজিয়ে কি একটা গুনগুন করে গাইছিল... বোধহয় দেবতাকে শয়ন দিচ্ছে। অথচ, আমার মনে আছে কতকাল আগে একদিন রূপনারায়ণের তীরে বসে সে গেয়েছিল, ছুকর্ মেরে মনকো। আত্মনিগ্রহের কি কোথাও কোনো সীমা পরিসীমা নেই!

সে এসে অন্ধকার দাওয়ায় বসলে, কেন জানিনা সেই ক্ষোভ ফের তিক্ততা হয়ে ঝরে পড়ল আমার গলায়,
- বেশ আছো আন্দি। খেয়ে-দেয়ে, কীর্তন গেয়ে। তা বোষ্টুমীর কি বোষ্টমের খোঁজ আছে?

আনন্দীর মুখ অন্ধকারে দেখতে পাচ্ছিলাম না। বোধহয় সেই ভাল। খানিক চুপ করে থেকে সে একটা শ্বাস ফেলে বললো, তোমার কি ধারণা আমি চাইলেই বোষ্টমঠাকুরটি পেয়ে যাই?

- কেন? আটকাচ্ছে কে!

(আমার নির্লজ্জ ব্যবহার মাফ করে দাও আনন্দী, আমাকে আজ জানতেই হবে! সেইসব আম-মাখা, চুরণের দিব্বি!)

- আটকাচ্ছে? ধরো কেউ না, কিন্তু যা আমার নিজের না তা কি আমি চাইলেই আমার হতে পারে কখনো?

- তোমার না হলে ওবাড়ির কাজে-অকাজে এখনো তোমাকে ছুটে যেতে হয় কেন? আত্মীয়-স্বজনরা এত স্ক্যান্ডাল করে কেন? তুমি কি কিছুই দেখতে পাও না!

(আনন্দী কি আমাকে দেখতে পাচ্ছে? হে ভগবান, আমায় অন্ধ করে দাও, বধির করে দাও এখনকার মত। সেই কবে নদীর ধারে কাঠগোলা ছাড়িয়ে হেঁটে আসছিলাম আমি আর আন্দি, পিছনে সাইকেল নিয়ে টুকটুক করে, পানুমামা... কিন্তু সে যে গতজন্মের কথা!)

- তুমি বাংলা করে বল গোপাল, ওটা কি বললে, ওর মানে কি কুচ্ছো? লোকেদের হাসাহাসি?

- ধরো তাই। আর আমাদের মামা-মাসিরা কেউ আর এখানে আসতে চায় না।

- কিন্তু মেয়েজন্ম তো আমার, কুচ্ছোর ভয় তো সবচেয়ে বেশি আমার হওয়ার কথা! আর আমিই বা কি করি বল তো! তোমার মামা সান্নিপাতিক জ্বরে পড়লো, পাড়ার দত্তদের ছোটটা পাসকরা ডাক্তার, এসে দেখেই বললো, গতিক সুবিধের নয়, ওষুদ-পথ্যি ঠিকঠাক না হলে... আমি বললাম তোমাদিকে একবার খপর দি, তা কিছুতে মত করানো গেল না, আমাকে খালি বলে, যা হবার এখনই হোক, বুড়ো বয়স অব্দি অপেক্ষা করে কি হবে!

আমি তাড়াতাড়ি বললাম, সে আমি জানি, মামা আমাকে বলেছে, খুব অসুখ করেছিল গোপাল, ঝি আর আন্দি মিলে না দেখলে এবার...।

বাড়ির অন্যদের কথা শুনে, পানুমামাকে একটু নিস্পৃহ, উদাসীন বলে মনে হয়েছে, কিন্তু আন্দির কথায় আমার মনে হল পানুমামাই কি শুধু দূরে সরে গেছে? নাকি তার নিজের ভাই-বোনেদেরও তার জন্য কোনো সময় নেই? আর পাঁচটা সংসারে যেমন হয়... অথবা তার চেয়েও বেশি? তাহলে আর অনাথপ্রভুর বংশে গর্ব করার মত কি রইলো? কথাটা ভেবে দেখবার মত!

- তাছাড়া তোমরাই তো দুলিঘাটের সাথে সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়েছ। কর্তা মাকেও তো শেষ সময়ে যা করবার ও আর তোমার মা মিলেই করেছে। বুড়ি মা কে ফেলে সে তো একদিনের জন্যও শহরে যেতে চায় নি!

- কিন্তু এখন? কর্তা-মা চলে গেছেন সেও তো দশবছর হল।

- তোমরাই বা কেন পারলে না ওকে আর পাঁচজন ভাইবোনের মত চাকরি-সংসার নিয়ে থাকতে রাজি করাতে... কেন পারলে না তোমাদের কারো কাছে নিয়ে গিয়ে রাখতে?

এর উত্তর আমার জানা নেই। যেটা জানি সেটা বড় তিক্ত সত্য। মামা-মাসীদের ইচ্ছে এখন এই জমি-ভিটে বিক্রি করে টাকা-পয়সা ভাগ করে নেওয়া হোক ভাই বোনেদের মধ্যে।

আনন্দী কি আমার মন পড়তে পারছিলো? আমাকে বলল, গোপাল, তোমার মামাকে নিয়ে যাও এখান থেকে। লেখাপড়া জানে, যা হোক একটা কিছু জুটেই যাবে। এখানেও তো চলে যাচ্ছে। শুধু দেখো, মা-বাপ নেই বলে মানুষটার জন্য হেলাফেলার অবস্থা না হয়। তাকে যেন কেউ টাকা-পয়সার ব্যপারে না ঠকায়।

- আর তুমি?

- এখানেই সতীঘাটের শ্মশানে বাপ-মার মরা মুখে আগুন দিয়েছি গো গোপাল, আমার আর তিনকুলে কেউ নেই যে কাল মরলে মুখে আগুনটুকু জুটবে। তবে চিন্তাও নাই। বোষ্টুমীর আগুন লাগে না শুনেছি। আর আমার কথা ভেবেই বা তুমি কি করবে?

- অত যে বড়মুখ করে বলছ, পানুমামাকে ছেড়ে তুমি থাকতে পারবে?

- তাতে যদি সে ভালো থাকবে, তাহলে নিশ্চয়ই পারব।

বলে বোধহয় সে লজ্জা পেল, নখ দিয়ে আঁকিবুকি কাটে উঠোনে।

- কিন্তু পানুমামা কি চায় সেটা জানো কি?

- হয়ত জানি, কিন্তু তা যে কোনোদিনও হবার নয় গোপাল। আমি তো জানি, আমাদের মাঝখানে কি বাধা। ছোটজাত, পড়াশুনাও করিনি, ইশকুলে পড়তে পড়তেই বিয়ে দিয়েছিল বাবা। তারপর তো সব জানোই। কর্তামার দয়া না থাকলে আমি কি তোমাদের বাড়ির আশ্রয়...

কথাটা থামানো দরকার। মরিয়ার মত প্রশ্ন করে বসলাম, কর্তামা তোমাকে খুব ভাল বাসতেন, তাই না?

- খুব গোপাল, খুব। তাই বোধহয় শেষ সময়ে আমি আর বড়দি মিলে তাঁর সেবা করতে পেয়েছি।

বড়দি মানে আমার মা। বললাম, জানি। কিন্তু এও জানি, তারপর মা দুলিঘাটে আর কখনো আসেন নি। কেন বল তো?

- কর্তামার শেষ কাজের পর দিদি চেয়েছিলেন তোমার মামা তাঁর সঙ্গে যাক। সে গেল না। সে সবচেয়ে ছোটভাই, বড়দিদির কথা অমান্য করলে রাগ-অভিমান তো হতেই পারে।

- কিন্ত পানুমামা একদম অমান্য করলোই বা কেন? কদিন ঘুরে এলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হত?

আনন্দীর কোনো জবাব এল না, একটা শ্বাস পড়লো বোধহয়।

আমি বললাম, তুমি কি দেখতে পাচ্ছো না আন্দি? তুমি যেসব বাধার অজুহাত দিচ্ছো, সেই সব বাধা পানুমামা একটু একটু করে ঘুচিয়ে দিচ্ছে। বংশগৌরব নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। কিন্ত টাকাপয়সা রোজগার করার মত শিক্ষাদীক্ষা তার আছে। ছাত্র পড়িয়ে তার সুনামও হয়েছিল, মা আমাকে বলেছে। একটু চেষ্টা করলে গ্রামের জুনিয়র হাই স্কুলে তার চাকরি হয়ে যেত। যে দলেরই রাজনীতি চলুক, দুলিঘাটে তো অনাথপ্রভুর নামের একটা প্রভাব আছে এখনো।

কিন্তু পানুমামা সেসব দিকেই গেল না। ছেলে পড়ানোও আস্তে আস্তে বন্ধ করে দিচ্ছে। পয়সাকড়িও তার কিছুই সঞ্চয় নেই। বয়সও হচ্ছে, আস্তে আস্তে তোমরা যে দুজনেই একটু একটু করে তলিয়ে যাচ্ছ, এটা কি দেখতে পাও না আন্দি? এরপরে কি? এরপরে কোথায়?

মন্দির থেকে আরতির শব্দ ভেসে আসছে। মেলাতেই বাজি পোড়ানো হচ্ছে মনে হয়, এক-আধটা রকেট বাজির আলো আন্দির দাওয়াকে চমকে দিয়েই মিলিয়ে যাচ্ছে। তার গলার আওয়াজ যেন দূর থেকে আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে এল।

- কর্তামা খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। মারণরোগ ধরা পড়তে দেরি হয়ে গিয়েছিল। বাঁচার ইচ্ছাই চলে গেছিলো তাঁর। এক মাসেই বিছানায় শুয়ে শুয়ে ঘা হয়ে গেছিল পিঠে। বড়দি আর আমি পালা করে রাতে জেগে থাকতাম। তোমার মামা বাইরের ঘরে থাকত, আমরা ডাকলে, এসে তাঁকে পাশ ফিরিয়ে দিত। শেষদিকটায় অনেকসময় চেতন থাকতো না। ঘোরের মধ্যে অনেকসময় আমাদের চিনতেও পারতেন না। কিন্তু এরই মধ্যে একদিন খুব বাড়াবাড়ি চলছে, কিন্তু জ্ঞান আছে তখনও, আমাকে বললেন, আন্দি, আমায় একটা কথা দে মা, আমাদের বংশে কখনো বর্ণসঙ্কর দোষ লাগতে দিবি না।

প্রথমে কর্তামার কথা বুঝতে পারি নি, কিন্তু ততক্ষণে বড়দি গরম জলের ব্যাগ নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছেন, তাঁর হাত থেকে ব্যাগ পড়ে গেল। তখন আমার হুঁশ হল, বললাম, নিশ্চিন্ত থাকো কর্তা মা, সে আমি কখনোই হতে দেব না।

তার কয়েকঘন্টার মধ্যেই বাক্-রোধ হল তাঁর। সেই তাঁর শেষ কথা। বড়দি বলেছিলেন, না ভেবেচিন্তে এ কী প্রিতিজ্ঞে করলি আন্দি! কাজটা সহজ করে দিতে চেয়ে তিনি বলেছিলেন, পানু আমার সঙ্গে চলুক। তা ও কি যাবে? আমার সাথে যে জন্মান্তরের শত্রুতা।

ভাবলাম ভেক নিলে যদি আশা ছাড়ে। তা যে কাজ জীবনে করে নি, তা-ই করলো। মন্দিরের বড় ভটচাজের যোগাড়ে মারা যেতে মন্দিরের বাবুদের গিয়ে ধরলো কাজটার জন্য। হয়েও যেত। আমি তাকে বললাম, তোমার দাদামশাই যে মন্দিরে নিত্য পুজো পান, সেখানে মাইনে নিয়ে ঘন্টা নাড়বে তুমি? তাহলে কাল থেকে আমিও গৌরদাসী আখড়ায় চললাম। ম’লে পর পোস্টকার্ড পাবেখন। তখন খ্যান্ত দেয়। এখনও তো, দেখছোই, কেমন ভড়ং করে বেড়াচ্ছে।

আমার সেলফোনে এক কলীগের ফোন এল। রাখার পর অভ্যাসবশে সময়টা দেখলাম। সাড়ে আট। কাল আমার ফেরা। আর দেরি হলে মামা খুঁজতে বের হবে। উঠে পড়লাম, আসলে আর বলার মত কথাই ছিল না আমার কাছে।

ফেরার পথে মন্দিরতলার দিক দিয়ে এলাম। আরতি শেষ। দেবতা এবারে ঘুমোতে যাবেন। সবার আলাদা আলাদা বন্দোবস্ত। শ্যামসুন্দর, রাধারাণী, বড়দাদামশাই। তাঁর তৈলচিত্রের প্রসন্ন হাসিতে কোনো সান্ত্বনার আভাস পেলাম না। ছোট সিংহাসনে অনড়-ভঙ্গিমায় বসা হিরণ্যগর্ভ শিলা। ষাট কোটি বছরের পুরাতন নীল কালো শেল পাথরে একটুখানি সোনালি দাগ। কিন্তু আমি জানি ও শুধু পাইরাইট। সোনা নয়।

ফেসবুক মন্তব্য