অপরাজেয় জল-দুর্গ

পার্থ প্রতিম চ্যাটার্জী

ষোড়শ শতাব্দীর শুরুর দিকে দিকের ঘটনা, ভারত-ভূখণ্ডের পশ্চিমে, আরব সাগরে অবস্থিত অধুনা আলিবাগের প্রায় ৫০ কিমি দক্ষিণে, উত্তর কোঙ্কণের রাজাপুরী গ্রামের কাছে এক দ্বীপে এসে ভিড়লো এক “হাবশি-সিদ্দি” বাণিজ্যতরী। সেই সময় ওই দ্বীপে "মাধেকোট" নামে পরিচিত কাঠের তৈরী এক দুর্গে বসবাস করতেন স্থানীয় জেলে বা কোলি সম্প্রদায়ের মানুষরা। আগত বাণিজ্যতরীর প্রধান সিদ্দিযোদ্ধা পিরাম খান, কোলি সর্দার রাম পাটিলের কাছে নিজেদের পরিচয় দিলেন ব্যবসায়ী হিসেবে। রাম পাটিল, পিরাম খানদের সেই রাতের জন্য আশ্রয় দিলেন মাধেকোটে আর আশ্রয়ের প্রতিদানে রাতের অন্ধকারে এক আকস্মিক আক্রমণে পরাজিত হলেন রাম পাটিল, পতন হলো মাধেকোটের।

এই দ্বীপের অবস্থানগত কারণের জন্য এর আগেও বহুবার মাধেকোটের অধিকার পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন নিজামশাহী সুলতানরা। সব চেষ্টাই অসফল হয়েছিল। কিন্তু এবার পীরাম খানের নেতৃত্বে জলযুদ্ধে পারদর্শী সিদ্দি যোদ্ধাদের সাহায্যে নিজামশাহের অধিকার স্থাপিত হলো এই দ্বীপে। নিজামশাহী সুলতানরা সিদ্দিদের মাধেকোটের জায়গীরদার নিযুক্ত করলেন। শুরু হলো এই দ্বীপে সিদ্দিদের শাসন।

সুলতানরা বুঝেছিলেন এই কাঠের দুর্গ “মাধেকোট” অপরাজেয় নয়, তাই ১৫৬৭ খ্রিস্টাব্দে বুরহান নিজামশাহের নেতৃত্বে কাঠের দুর্গের বদলে এক পাথরের দুর্গ তৈরির কাজ শুরু হলো। এই নতুন দুর্গের নামকরণ করা হলো “জাজীরে মেহরুব”। আরবি ভাষায় “জাজীরে”-এর অর্থ “দ্বীপ”। পরবর্তীকালে লোকমুখে এই দুর্গ প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছে "জাঞ্জিরা জল-দুর্গ" নামে। জাঞ্জিরার সিদ্দি-জায়গীরদার, মালেক আম্বর ১৭ শতাব্দীর শেষের দিকে এই দুর্গটির নির্মাণ সম্পূর্ণ করেন।



জাঞ্জিরা জল-দুর্গ মধ্যযুগীয় মুসলিম স্থাপত্যের এক অসাধারণ নিদর্শন। রাজাপুরীর মোহনার ৩ কিমি ভিতরে আরব সাগরের মধ্যে ২২ একরের এক দ্বীপের পুরোটা জুড়ে ২.৫ কিমি প্রশস্ত এবং ৪০ ফুট উঁচু প্রাচীরে ঘেরা এই দুর্গ। দুর্গের প্রাচীরের গায়ে আছে ১৯টি মিনার। প্রতিটি মিনারে থেকে এবং দুর্গের প্রাচীর থেকে নজর রাখা যেত নিকটবর্তী সমুদ্রপথ এবং উপকূলের উপর। প্রধান দরজাটি এমনভাবে দুটি মিনারের মধ্যে তৈরি করা হয়েছিল যে কেল্লার প্রায় ১০ মিটার কাছে না গেলে বোঝাই যাবেনা যে দুর্গের প্রবেশপথটি কোথায়। শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত কারার জন্য এই দুর্গে ছিল প্রায় ৫৭২টি কামান, যা বহু বছর ধরে এই দুর্গকে অজেয় করে রেখেছিল। এর মধ্যে "কালাল বাঙাড়ি","চাভারি" এবং "লান্ডা কসম" নামের কামানগুলি এখনো দেখতে পাওয়া যায়। কালাল বাঙাড়ি ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম প্রাচীন কামান যার ওজন প্রায় ২২ টন।


দুর্গের প্রবেশপথ, প্রাচীরের গায়ে কামান


চাভারি তীরের দিকে মুখ করে বসানো কালাল বাঙাড়ি

জাঞ্জিরা ছিল এক স্বয়ংসম্পূর্ণ দুর্গ। চতুর্দিকে সমুদ্রের দ্বারা পরিবেষ্টিত হওয়া সত্ত্বেও দুর্গের ভিতর রয়েছে দুটি মিঠে জলের পুকুর। দুর্গের ভিতর চাষের ব্যবস্থা থাকার ফলে, জল আর খাবারের অভাবের মুখোমুখি হতে হয়নি দুর্গের বাসিন্দাদের। যার ফলে প্রায় ৪০০ বছর ধরে অপরাজিত ছিল এই জল-দুর্গ। যদিও এই দুর্গের অধিকার ছিল মুসলিম শাসকদের হাতে, তা সত্ত্বেও এই দুর্গের ভিতর মুসলিম এবং হিন্দু ধর্মের সমন্বয়ের চিহ্ন দেখা যায়। একদিকে যেমন মুসলিমদের জন্য ছিল মসজিদ সেইরকম অন্যদিকে ছিল হিন্দুধর্মের পূজার জন্য মন্দির।


মিঠে জলের পুকুর, পাশে মশজিদ

জাঞ্জিরা সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র জল-দুর্গ, যাকে শত্রুর আক্রমণ পরাজিত করতে পারেনি। বারংবার চেষ্টা করা সত্ত্বেও পর্তুগিজ, ব্রিটিশ ও মারাঠা যোদ্ধারা কুক্ষিগত করতে পারেননি এই দুর্গ। মারাঠা বীর শিবাজীর ১৩ বারের আক্রমণ অসফল ছিল। শিবাজী পুত্র সম্ভাজিরও এই দুর্গ জয়ের বহু চেষ্টা অসফল হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সম্ভাজি, জাঞ্জিরার ৯ কিমি উত্তরে তৈরী করেন আর এক নতুন দুর্গ যা "পদ্মদুর্গা" বা "কাশাদুর্গ" নামে পরিচিত। সিদ্দিদের জলযুদ্ধে পারদর্শিতার কথা মাথায় রেখে মোগলরা তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন। সম্রাট আওরংজেব, জাঞ্জিরার সিদ্দি শাসকদের জন্য ৪ লক্ষ টাকা বার্ষিক ভাতা অনুদান করেন।


দুর্গের ভিতর সিদ্দি শাসকদের প্রতীক

ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার সময় প্রায় ৩০০০ লোকের বাসস্থান ছিল এই দুর্গে। ১৯৪৮ সালে, সিদ্দিদের প্রতিপত্তি খর্ব হয় এবং এই দুর্গ স্বাধীন ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। ধীরে ধীরে এখানকার লোকজন এই দুর্গ ছেড়ে নিকটবর্তী অঞ্চলে গিয়ে বসবাস করতে শুরু করেন। শুরু হয় জাঞ্জিরার নি:সঙ্গতা।
আজ, পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জাঞ্জিরা জল-দুর্গ এক বিশাল ইতিহাসের একাকীত্বকে বুকে বহন করে পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে।


ফেসবুক মন্তব্য