লিপস্টিক

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়





বিয়েবাড়িতে অনেক জিনিষই টুকটাক হারিয়ে যায়। কিছু পরে খুঁজে পাওয়া যায়, কিছু যায় না। রঞ্জু তাড়াহুড়োয় রাঘবের নতুন চপ্পল পায়ে গলিয়ে ঘরযজ্ঞির মিষ্টি আনতে বেরিয়ে গিয়েছিল। রাঘব বেচারা খুঁজে খুঁজে হয়রাণ। চপ্পলের শোকে বাড়ি মাথায় করে ফেলল। রঞ্জু মিষ্টি নিয়ে ফেরার পর মানদা মাসী নজর করল রঞ্জুর পায়ে রাঘবের চপ্পল। এমনিতে হয়তো চোখে পড়ত না। কিন্তু রঞ্জু বাইরের চপ্পল না ছেড়েই সদ্য নিকোনো মেঝে মাড়িয়ে ভিতরে মিষ্টি রাখতে যাচ্ছিল। এমন অনাসৃষ্টি কাণ্ড দেখলে মানদা মাসীর মাথায় রক্ত উঠে যাবে না? সে খ্যানখেনে গলায় রঞ্জুর সাধারণ বুদ্ধির প্রতি কটাক্ষ এবং রাঘবের হারানো চপ্পলের উদ্ধার সংবাদ ঘোষণা করল। তবে সব হারানো বস্তু কী আর খুঁজে পাওয়া যায়? লালটু সকাল সকাল ম্যাটাডোর থেকে গায়ে হলুদের তত্ত্ব নামাতে নামাতে শাড়িতে প্রথমবার লাবণিকে দেখে দুম করে হৃদয় হারিয়ে ফেলল। লাবণির স্টেডি বয়ফ্রেন্ড আছে, রথের সড়কের কার্তিক, বরোদা ব্যাঙ্কে চাকরি করে। লাবণি প্রতি উইকেন্ডে গঙ্গার ধারে ঘাসের ওপর বসে, কার্তিকের সঙ্গে ভাগাভাগি করে বাদামভাজা খায়। লালটু নিজেও জানে লাবণির কাছ থেকে দিল ওয়াপাস পাবার আশা কম। তবু বিয়েবাড়িতে এমনটা তো হয়েই থাকে, নতুন কিছু নয়। তার জন্য হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশে বিজ্ঞাপন দিয়ে লাভ নেই।

এই যে বাড়ির বড় নাতি সমীর তার সাতাশ বছরের নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা হারাতে চলেছে তা নিয়ে কারো তেমন মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। গত সপ্তাহে ম্যারেজ রেজিস্ট্রারএর সামনে দুই পক্ষের গুরুজনদের সাক্ষী রেখে পরাধীনতার চুক্তিপত্রে সই-সাবুদ হয়ে গেছে। কনের নাম বলাকা। বলাকাদের বাড়ি পাশের পাড়ায়। আজ সন্ধেবেলা বিয়ের সামাজিক অনুষ্ঠান, ফলোড বাই রিসেপশান, তৎ-ফলোড বাই বাসর রাতের বিচিত্রানুষ্ঠান। বলাকার মামাতো, মাসতুতো, খুড়তুতো, পিসতুতো বোনেরা মুখিয়ে আছে কী করে জাম্বুর পা থুড়ি কান টানা যায়। পার্লারে যাবার ফাঁকে ফাঁকে ঘন ঘন মিটিং বসছে স্ট্র্যাটেজি ঠিক করার জন্য। বলাকাদের বাড়ির সামনের খোলা জায়গায় বাঁশ বেঁধে, তেরপল ঢেকে ম্যারাপ পড়েছে। আজকাল দিনক্ষণ দেখে বৃষ্টি আসে না। নিম্নচাপের উপদ্রব লেগেই আছে। ডেকরেটর ভোর ভোর প্লাস্টিকের চেয়ার টেবিল কার্পেট নামিয়ে দিয়ে গেছে। সেগুলো ধুলোর ওপর ডাঁই হয়ে পড়ে আছে। দোতলার বারান্দার গ্রীল থেকে টুনি লাইটের মালা ঝোলানো হয়েছে। ইলেক্ট্রিশিয়ান মদনদা কলারে প্লায়ার গুঁজে, সাগরেদের কাঁধে মই ঝুলিয়ে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। চোখে মুখে চাপা টেনসান। গ্রীষ্মকালে বিয়ে, সন্ধেবেলা কোনো ফ্যান লাইট ব্যাগড়বাঁই করলেই খিস্তি খেতে হবে।

সমীরও কিছুটা টেনসানে আছে। বিয়ের দিন ঠিক হবার পর থেকে বলাকার সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ বন্ধ। বলাকার মা বলে দিয়েছেন – আগে যা ঘোরাঘুরি করেছিস, করেছিস! দয়া করে এই কটা দিন অন্তত ক্ষান্তি দে। তারপর থেকে বলাকা ঘর থেকে প্রায় বেরোচ্ছেই না। বিয়ের শাড়ি-গয়না কেনাকাটার জন্য বেরোলে পাহারা দেবার জন্য দুজন করে অঙ্গরক্ষক সঙ্গে থাকছে। বলাকার ছোট বোন ফুটুন কমন ফ্যাক্টর। তার সঙ্গে পালা করে বলাকার মা, সেজ মাসী বা ছোট কাকীমা। মা মাসী কাকীমাকে ফাঁকি দেওয়া গেলেও ফুটুনের চোখকে ফাঁকি দেওয়া কার্যত অসম্ভব। সে শকুনির দৃষ্টি দিয়ে দিদিকে সর্বদা আগলে রাখছে। সমীর অফিস থেকে তিন সপ্তাহ ছুটি নিয়ে বাড়িতে বসে ভ্যারাণ্ডা ভাজছে। বাড়ি থেকে বেরোতে গেলেই মা জিজ্ঞেস করবে - কোথায় যাচ্ছিস? কেন যাচ্ছিস? বিয়ের আগের ক’টা দিন রোদ্দুরে রোদ্দুরে নাই ঘুরলি! যেন ননীর পুতুল, গলে যাবে। লুকিয়ে বেরোবার উপায় নেই, মায়ের হাজার চোখ। নীলু চেঁচিয়ে উঠবে – ওই দেখো জেঠি, সমুদা আবার বেরোচ্ছে।

বলাকার সঙ্গে যা অল্পস্বল্প কথাবার্তা হচ্ছে, সব সোশ্যাল সাইটে। তাও ক্বচিৎ কদাচিৎ। সমীর বেশি উতলা হলে বলাকা একটা লাভ বা কিস সাইন পাঠিয়ে দিচ্ছে, ব্যাস! বলাকা যে এইভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করবে সমীর স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। সমীরের মনে হচ্ছে বলাকা তাকে ইচ্ছে করে জ্বালাতন করছে। এমনিতে বলাকা যে বাপ-মায়ের নিতান্ত বাধ্য সন্তান তা নয়। বড়দের সামনে ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানে না। কিন্তু একলা হলে তার অন্য মূর্তি। সে পরিচয় সমীর পেয়েছে দীঘার হোটেলে। সমীর বাড়িতে বলেছিল অফিসের কাজে হায়দ্রাবাদ যাচ্ছে। বলাকা দিন তিনেকের জন্যে শান্তিনিকেতনের হোস্টেল থেকে বেমালুম গায়েব হয়ে গিয়েছিল। পোর্টারের পিঠের ওপর হোটেলের ঘরের দরজা বন্ধ হতে না হতেই বলাকা বাঘিনী। সমীরের কান কামড়ে দিয়েছিল। মনে পড়লে এখনও সমীরের কানের লতি জ্বালা জ্বালা করে।

দীঘা থেকে ফিরে আর এক উপদ্রব। সমীর আনপ্যাক করছিল। নীলু এসে বলল, “এ মা, সমুদা, তোমার জামায় কীসের রঙ লেগেছে?”

সমীর চেয়ে দেখল ব্যবহার করা সাদা জামায় অসাবধান লিপস্টিকের দাগ। বলাকা ঠোঁটে গাঢ় রঙ লাগাতে ভালোবাসে। নীলুকেও বলিহারি। মেয়েটার ছোঁক ছোঁক করা স্বভাব আর গেল না। ছোট কাকীমার কোন দূর সম্পর্কের বোনের মেয়ে। বোন অল্প বয়সে মরে যাবার পর কাকীমা নীলুকে নিজের কাছে এনে রেখেছিল। একান্নবর্তী পরিবারে এমন দু-চার জন ছেলেমেয়ে হেসেখেলে মানুষ হয়ে যায়। কেউ কিছু মনে করে না। বরং সহানুভূতি দেখায় – আহা রে! মা-মরা মেয়ে! নীলুর সমস্যাটা ছিল অন্যত্র। ছোট থেকেই নীলুর একটু হাতটানের অভ্যেস। সামনে কেউ না থাকলে চট করে জিনিষ সরিয়ে ফেলে। সাধারণ নিত্য-ব্যবহার্য্য জিনিষপত্র, ঘরের মধ্যে যা অনাদরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে। দামি কিছু নয় কিন্তু দরকারের সময় না পেলে অসুবিধে হয়। সমু একটু বড় হয়ে জেনেছিল এটা একটা মনের অসুখ। রোগটার নাম ক্লেপ্টোম্যানিয়া। অনেকেরই হয়। তাদের স্কুলে একটি ছেলে চুরি করে সাইকেলের বেলের বাটি জমাত। একবার সমীরকে তার সংগ্রহ দেখিয়েছিল। বিভিন্ন মাপ ও আকৃতির চৌষট্টিটা বেলের বাটি। নীলুর স্বভাবের কথা কাকীমাও জানত। কারো কোনো জিনিষ পাওয়া না গেলে নীলুর পিঠে দুম দুম করে দুটো কিল বসিয়ে হারানো সামগ্রী উদ্ধার করে মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে যেত। সমু বলেছিল, “নীলু, নিজের কাজে যা।”

আচ্ছা গায়ে পড়া মেয়ে নীলু! গেল না, দাঁড়িয়ে রইল। নীলুকে দেখলে সবার আগে নজরে পড়ে নীলুর দু-পাটি ঠোঁট। এমন পুরু ঠোঁট সচরাচর চোখে পড়ে না। তাও যদি একটু সুচারু হত, একটা সৌষ্ঠব থাকত! মুখের ওপর কেউ যেন ধ্যাবড়া করে লেপে দিয়েছে। নীলু আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলল। নিজের কাজে যেতে তার বয়েই গেছে। সমীর আনপ্যাকিং স্থগিত রেখে বসে পড়ল। নীলু কাছাকাছি থাকলে সতর্ক থাকতে হয়। অন্যমনস্ক হলে কোনটা কী হাতে করে উঠিয়ে নিয়ে যাবে কে জানে? নীলু সমীরের গা ঘেঁসে বসে আধখোলা স্যুটকেসের ওপর ঝুঁকে পড়ে বলল, “সমুদা, হায়দ্রাবাদে গেলে, আমার জন্যে একটা মুক্তোর মালা আনলে না?”

সমীরের বাহুতে নীলুর বুকের নরম লাগছিল। সে বিরক্ত হয়ে সরে বসল। নীলুর হুঁশ নেই। কাকীমা নিচে থেকে ডাক পাড়ল, “নীলু-উ! কোথায় গেলি রে?”

নীলু গড়িমসি করে সাড়া দিল। অনিচ্ছা সত্বেও উঠে গেল। সমীর লিপস্টিকের দাগ লেগে থাকা জামাটাকে আলাদা করে সরিয়ে রেখেছিল।



সিঁথি থেকে ঝুলে থাকা টিকলির নিচে কপালের ঠিক মাঝখানে গোল লাল টিপ। তার চারদিকে চন্দনের কারুকার্য। দু-সারি চন্দনের ফোঁটা ভুরুর ধনুক, চোখের কাজল, কানের পাশা পার করে নিচে নেমে এসেছে। বলাকা সমীরের পাশে বসে আছে। সমীর দেখছে নোলকের ফুলের পাশে গালের ওপর লাল কলকার নক্সা। পাতলা রক্ত-লাল ঠোঁট। জরি পাড়ের লাল বেনারসিতে বলাকাকে পরির মত লাগছে। সমীরের দেখে দেখে আশ মিটছে না। বলাকা সমীরের কাঁকালে কনুই দিয়ে খোঁচা মারল। ফিসফিস করে বলল, “কী তখন থেকে হ্যাংলার মত তাকিয়ে আছো।”

সমীর থতমত খেয়ে অন্য দিকে চাইল। বলাকার ভাইবোনেরা দুজনকে ঘিরে আছে। নিজেদের মধ্যে ফিসফাস হাসাহাসি চলছে। স্ত্রী-আচারের যোগাড় যন্ত্র শুরু হয়েছে। ফুটকি এক গ্লাস সরবত এনে দিল। বলল বটে আম পোড়ার সরবত কিন্তু সমীরের সন্দেহ হল। চোখ তুলে দেখল নীলু দরজার কাছে দাঁড়িয়ে, পায়ে ডিঙি মেরে কনের বাড়ির আত্মীয় স্বজনের ভিড় টপকে আপ্রাণ চেষ্টা করছে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করার। হাত নেড়ে তাকে সরবত খেতে মানা করছে। সমীর চোখ সরিয়ে নিল, বুঝল জামাই ঠকানোর পুরোন ফন্দি। ফুটকি গম্ভীর ভাবে বলল, “কী হল সমুদা, খাও, সকাল থেকে না খেয়ে আছো। মুখটা শুকিয়ে গেছে। খেয়ে নাও, অখাদ্য কুখাদ্য কিছু দিচ্ছি না।”

সমীর দুর্গা দুর্গা বলে মুখে দিল। হাকুচ তেঁতো, যথারীতি ঘোড়া নিমপাতার সরবত। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও এরা আর আধুনিক হল না। সেই ঘিষিপিটি বদবুদ্ধি। চারদিকে একবার মুখ ঘুরিয়ে পর্যবেক্ষণ করে দেখল সবাই হাসিতে ফেটে পড়ার জন্য অপেক্ষা করে আছে। সমীর মনস্থ করল এদের সেই সুযোগ দেবে না। মুখের রেখা বিন্দুমাত্র না কুঁচকে গ্লাস তুলে আবার চুমুক দিল। অর্ধেক গ্লাস বাকি থাকতেই ফুটকির মায়া হল। সমীরের হাত চেপে ধরল, “ব্যাস, ব্যাস, অনেক হয়েছে।”

বলাকার কাকীমা বোধহয় পরিকল্পনাটা জানতেন। এক প্লেট মিষ্টি আর লেবুর সরবত নিয়ে ঘরে ঢুকে ছেলেমেয়েদের বকলেন, “এবার তোরা শান্তি দে, ছেলেটার ওপর আর অত্যাচার করিস না।”

সমীর অম্লান বদনে নিমপাতার সরবত উদরস্থ করায় সবাই সমীরকে বেশ সমীহর দৃষ্টিতে দেখতে লাগল। তাদের বাকি প্ল্যান ভেস্তে গেল। ভাবল, নাহ, ছেলেটা স্মার্ট আছে! বলাকা একটু আড়াল পেতে জিজ্ঞেস করল, “কী করে খেলে?”

সমীর বলল, “সখি, তোমার জন্য নিমপাতা কোন ছার, সেঁকো বিষও খেতে পারি।”

বলাকা ভেংচি কাটল। আচার অনুষ্ঠান মিটতে মিটতে রাত গড়াল। সারাদিন গুমোট গরম ছিল। বরযাত্রীরা ফিরে যাবে, তখন হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নামল। দূর থেকে যারা এসেছিল তারা আগেই রওনা দিয়েছে। যারা রয়ে গেছে তারা সবাই মোটামুটি লোকাল। নীলু ফিরবে না, বাসর জাগবে। সে বরের ঘরের মাসী, কনের ঘরের পিসী। লাবণিকে বলল, “তুইও থেকে যা।”

লাবণি রাজি হল না। তার মা চিন্তা করবে। বৃষ্টি থামার জন্য খানিক অপেক্ষা করে বেরোল। একটু রাত হলেই মফঃস্বলের রাস্তা নিশুতি হয়ে যায়। তার ওপর বর্ষা। অন্ধকার আকাশ থেকে টিপ টিপ করে জল পড়ছে এখনও। অজস্র জলের কণা লাইট পোস্টের আলোর সামনে বাদলা পোকার মত উড়ে আসছে। লাবণি নতুন শাড়ির মায়া ছেড়ে আঁচলটা মাথার ওপর টেনে নিল। পিছন থেকে কে নাম ধরে ডাকল। ফিরে দেখল লালটু। লাবণি বলল, “লালটুদা, একটু এগিয়ে দেবে? রাস্তায় একটা লোক নেই।”

লালটু সাইকেল ঠেলে লাবণির পাশে পাশে হাঁটছিল। লাবণির বাড়ি বেণেপুকুরের গলিতে। নির্জন হলেও বড় রাস্তায় দু-একটা দলছুট সাইকেল, উটকো মাতাল-বাহন রিক্সা চলছিল। গলির ভিতর বিলকুল শুনশান। বৃষ্টির ছাট এড়ানোর তাগিদে দু-ধারের বাড়ির জানলা বন্ধ। গলির মাঝামাঝি এসে লাবণি বলল, “এসে গেছি, আর একটুখানি। লালটুদা, থ্যাঙ্ক ইউ। তোমাকে আর আসতে হবে না।”

লালটু বলল, “লাবণি, এক মিনিট দাঁড়া।”

সাইকেলটায় স্ট্যান্ড লাগিয়ে লাবণির কাছে গিয়ে তার হাত ধরল লালটু। একটু তুতলিয়ে বলল, “লাবণি, মাইরি বলছি... আমি না তোর প্রেমে পড়ে গেছি...”

লাবণি হকচকিয়ে গিয়ে বলল, “মানে...?”

লালটু বলল, “বিশ্বাস কর, দিন রাত খালি তোর কথা ভাবছি, রাত্তিরে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে তোকে স্বপ্ন দেখছি, মা কালীর দিব্যি...”

লাবণি বলল, “কী পাগলের মত বলছ?”

লালটু মুখখানা করুণ করে বলল, “সত্যিই পাগল হয়ে গেছি। জানি, তোকে কোনোদিন পাব না, তুই কাত্তিককেই বিয়ে করবি... তাও জানিয়ে রাখলাম...”

লাবণি ভাবল একবার বলে, গত সপ্তাহে যখন কার্তিকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল তখন কার্তিক জানিয়ে দিয়েছে, তার বিয়ে অন্যত্র ফিক্স হয়ে গেছে। মেয়ের বাপ সোনার বেণে, দেদার পয়সা। বিয়েতে চল্লিশ ভরি সোনা, নগদ তিন লাখ টাকা, আর এসি মারুতি দেবে বলেছে। মুখে বলল, “আঃ! লালটুদা, কী যে কর না! হাত ছাড়, লাগছে...”

লালটু হাত ছেড়ে দিল। সাইকেলটার স্ট্যান্ড উঠিয়ে লাবণির পাশে এনে বলল, “চল, তোর বাড়ির গেট পর্যন্ত এগিয়ে দি। আর কোনোদিন হয়তো...”

বৃষ্টি ঝেঁপে এল আবার। দুজনে বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে ভিজতে যখন হাঁটছিল বাসর ঘরে তখন অন্তাক্ষরী চলছে। ফুটকি ‘ট’ দিয়ে গান ধরেছে, “টিপ্‌ টিপ্‌ বরষা পানি, পানিমে আগ লাগাই...”

“ই-দিয়ে বল এবার, ই-এক, ই-দুই...”

সারাদিনের খাটাখাটনির পর সবাই ক্লান্ত। বাসর বসল বটে, কিন্তু মাঝ রাত পেরোতে না পেরোতে সবাই ঢুলতে লাগল। মাসী পিসিরা উঠে গেল। পরের দিন সকালে মেয়ে বিদায়ের কাজকর্ম আছে। ছোটরা কেউ কেউ ফরাসের ওপরই ঘুমিয়ে পড়ল। সবার আগে ঘুমোল নীলু। তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বলাকার কাঁধে মাথা রেখে ভোঁস ভোঁস করে নাক ডাকাতে লাগল। বলাকা তার লাল নেলপলিশ লাগানো আঙুলের ডগা দিয়ে নীলুর নারকেল তেলমাখা মাথাটা আলতো করে ঠেলে সরিয়ে দিল। মাথার নিচে অন্য আর একটা তাকিয়া গুঁজে দিল। নীলুর ঘুম ভাঙল না। তার আধখোলা ঠোঁটের পাশ দিয়ে কশ গড়িয়ে তাকিয়া ভিজে যাচ্ছে। সেই কদর্যতার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে সমীর বলাকার হাত ধরে কাছে টানল।



নীলু তার সম্পত্তি জরীপ করছিল, মাসীর ঘরের লাগোয়া বাথরুমের লফটে খালি পিচবোর্ডের বাক্সর আড়ালে একটা প্লাস্টিকের থলির মধ্যে তোলা থাকে। বালতির ওপর চড়ে সেটা নামিয়ে আনতে হয়। বর কনের সঙ্গে একই গাড়িতে ফিরেছে নীলু। ফুটকিও এসেছে, যদি দিদির কিছু দরকার পড়ে। বধূবরণের পর ছেলের বাড়ির বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে, অগ্নিকে সাক্ষী রেখে কুশণ্ডিকা। এক সঙ্গে কুলো ধরে খই ছড়াচ্ছে সমীর আর বলাকা। এই অবসরে গত রাতের আহরণগুলি জায়গা মত তুলে রাখতে এসেছে নীলু। থলিতে ঢুকিয়ে রাখার আগে তাদের দিকে একবার মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে দেখল - চুলের ক্লীপ, অর্ধেক খালি বিদেশী পারফ্যুমের শিশি, আরও দু-একটা টুকিটাকি। থলির জিনিষগুলো নীলুর বড় প্রিয়। প্রাণে ধরে ব্যবহার পর্যন্ত করে না। চান করার সময় কোনো কোনো দিন জিনিষগুলো বার করে বাথরুমের মেঝেতে সাজিয়ে রাখে। তখন নীলুর সঙ্গে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কিউরিও সংগ্রাহকের কোন প্রভেদ থাকে না।

সমীররা খাস ঘটি। বলাকারা দ্বিতীয় প্রজন্মের বাঙাল। ঘটি মতে সিঁদুর-দান হয় ছেলের বাড়িতে। বলাকার মা একটু খুঁত খুঁত করেছিলেন। সিঁদুর-দান হল না, বাসি বিয়ে হল না, সকাল সকাল মেয়েটা মুখে কিছু না দিয়ে বিদায় নিল। কী আর করা! আপাতত সমীর কুনকে দিয়ে বলাকার সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দিল। অনভ্যস্ত হাতের সিঁদুর বলাকার কপাল বেয়ে নাকের ডগায় ছড়িয়ে পড়ল। বলাকা একটু রাগ রাগ করে তাকাল সমীরের দিকে, হচ্ছেটা কী?

ভিডিও তোলা হচ্ছে। ‘বিউটি স্পট’ স্টুডিওর ঝানু ক্যামেরাম্যান মলয় ক্যামেরা থামিয়ে বলল, “একটা ভিজে রুমাল দিয়ে মুখটা মুছিয়ে দিন।”

সমীর ট্রাউজারের পকেট থেকে রুমাল বার করে দিতে গিয়ে হতাশ হল। সে আপাতত ধুতি পরে আছে। ওপরে হাতকাটা বেনিয়ান। ছোট কাকীমা হাঁক দিলেন, “নীলু কোথায় গেলি রে? তোর মেসোর একটা রুমাল ভিজিয়ে আন দেখি।”

সমীরের ছোটকা মানে নীলুর মেসো মারা গেছেন গত বছর। কিন্তু তাঁর পোশাক আসাক মায় রুমাল মোজা পর্যন্ত কাকীমা আলনায় যত্ন করে সাজিয়ে রেখে দেয়। যেন তিনি যে কোনও দিন ফিরে আসতে পারেন। জামাকাপড় যথাস্থানে না পেলে অসন্তুষ্ট হবেন। পুরুত ঠাকুর মন্ত্র থামিয়ে কানে মোবাইল গুঁজলেন। অনেকক্ষণ মোবাইলটা গেঁজের মধ্যে ভাইব্রেট করছিল। বার করে দেখেছেন শাঁসালো ক্লায়েন্ট। বলাকা ইশারায় ফুটকিকে ডেকে স্যুটকেস থেকে মেক-আপ কিট আনতে বলল। আপাতত মিনিট পাঁচেকের রূপচর্চা বিরতি। নীলুকে ডেকে ডেকে পাওয়া গেল না। সে কোন মুল্লুকে গেছে কেউ জানে না। রঞ্জু দৌড়ে গিয়ে একটা গামছা ভিজিয়ে আনল। গামছাটা নতুন, এখনও রঙ ছাড়া শেষ হয়নি। সমীরের মা বালতির জলে ডুবিয়ে রেখেছিলেন, নতুন বৌ ব্যবহার করবে বলে। সেটা দিয়ে মুছতে গিয়ে গামছা আর সিঁদুরের রঙ মিলে বলাকার ফর্সা মুখ টকটকে লাল হয়ে গেল। যেন এইমাত্র হোলি খেলে এসেছে। বলাকা কাঁদোকাঁদো হয়ে মুখে ক্লীনজিং মিল্ক ঘষতে লাগল। ফুটকি পাশে বসে তাকে সান্ত্বনা দিতে দিতে বলল, “দিদি ভাবিস না, মলয়দা অনেক কায়দা জানে, ডিভিডি বানানোর সময় ঠিক ম্যানেজ করে নেবে। দেখবি মুখের রঙ ভ্যানিস।”

এর মধ্যে নীলু এসে পড়ল। ব্যাপার দেখে রাঘবের কানে কানে বলল, “দেখ, নতুন বৌকে একদম রূপী বাঁদরের মত দেখতে লাগছে, না রে?” বলেই ফিক ফিক করে হাসতে লাগল। ছোট কাকীমা শুনতে পেয়ে নীলুর দিকে কটমট করে তাকালেন।

সমীরের ঠাকুমা বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালীন গোপাল সেবায় ব্যস্ত ছিলেন। তাঁর সকালের পুজো শেষ হতে হতে এগারোটা সাড়ে এগারোটা বেজে যায়। তারপর তিনি সামান্য ফলাহার করেন। বিয়ে মিটলে সমীর আর বলাকা গিয়ে তাঁকে প্রণাম করল। ঠাকুমা হাতের প্লেট সরিয়ে রেখে বলাকার থুতনি ধরে আদর করে বললেন, “ও মা, নাত বৌ! তোকে তো অবিকল লক্ষ্মীপিতিমের মত দেখতে রে!” সমীরের মাকে ডেকে আলমারি থেকে নিজের গয়নার বাক্স বার করে একটা সোনার বালা বলাকার হাতে পরিয়ে দিলেন। বললেন, “তাড়াতাড়ি পুঁতির মুখ দেখাস ভাই। কবে আছি, কবে নেই!”

ঠাকুমার ঘর থেকে বেরোতেই সমীরের মা বলাকাকে বাজেয়াপ্ত করে নিলেন। বললেন, আজ কালরাত্রি, দেখাশোনা বন্ধ। সমীর মিনমিন করে প্রতিবাদ জানাতে গিয়েছিল, কালরাত্রি তো রাত্তিরে। দিনের বেলায় কীসের আপত্তি? তাকে কেউ পাত্তা দিল না, এমনকি বলাকাও নয়। বারান্দায় কতগুলো চেয়ার পাতা ছিল। সমীর বিমর্ষ হয়ে গিয়ে বসে পড়ল। রাঘব এসে পাশে বসল। সে আর জি করে মেডিক্যাল পড়ে। বিজ্ঞের মত বলল, “সমুদা, বার্থকন্ট্রোলের ব্যাপারে যদি কোনো কনফিউসান থাকে আমার সঙ্গে আলোচনা করতে পার। জেনেরালি ফার্স্ট এন্ড লাস্ট উইকস আর সেফ। তবে…”

সমীর রাঘবকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “মাথা ধরার ওষুধ আছে তোর কাছে? কাল রাতে ঘুম হয়নি... মাথাটা টিপ টিপ করছে।”

রাঘব অধৈর্য্য হল, “দিচ্ছি, দিচ্ছি… শোনো, প্রথম প্রথম একটু আধটু সমস্যা হতে পারে। মনে রাখবে, ইট ইজ মোর ইন ইয়োর মাইন্ড দ্যান এনিহোয়ার এলস!”

সমীর বুঝতে পারে না, অধিকাংশ বাঙালি যৌনতার প্রসঙ্গ এলেই ইংরিজিতে কেন কথা বলে। তারা বোধহয় মনে করে একমাত্র ইংরিজি বলা মানুষেরাই ঠিকঠাক যৌন সঙ্গম করতে পারে। সমীর রাঘবকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত মেপে নিয়ে বলল, “লাইফে ক’বার করেছিস?”

রাঘব থতমত খেয়ে বলল, “কী?”

“সেক্স?”

রাঘব উঠে গেল, “দাঁড়াও, তোমায় মাথা ধরার ওষুধ এনে দি।”




ভাবছেন শীর্ষনামের সঙ্গে সম্পর্কহীন ‘দিদি তেরা’ টাইপের বিয়ে-সাদির গল্প কেন ফেঁদে বসেছি? আসবে দাদা আসবে, এই গল্পে লিপস্টিকও আসবে, এত তাড়া কীসের? শুধু রিয়েল লাইফে নয় গল্পেও ঘটনা ঘটার নির্দিষ্ট সময় থাকে। গল্প বলে ঘটনা তো আর আকাশ থেকে পড়বে না। মাটি ফুঁড়েই উঠবে। মানে বলছি কী, আমি শুধু আমার নির্ধারিত কাজটুকুই করছি। গল্পের শুরুতে ঘটনার বীজ পুঁতে, সার জল দিয়েছি। তারপর আপনাদের মতন আমিও বসে আছি, কখন অঙ্কুরোদ্গম হয়, চারা গজায়।

বৌভাতের সন্ধেবেলা বলাকার মেক-আপ কিট থেকে লাল লিপস্টিকটা উধাও হয়ে গেল।

এই খবরটার জন্যে হা-পিত্যেশ করে বসে ছিলেন তো? আমি নিশ্চিত, আপনি ঘাড় নেড়ে নিজেকে বলছেন, আগেই অনুমান করেছিলেন, তাই না? সে যাক, এদিকে বৌভাতের বেনারসি লাল-সোনালীর কম্বিনেশান। সোনালী রঙ তো আর ঠোঁটে লাগানো যায় না? অবশ্য সমস্যাটা তেমন কিছু মারাত্মক নয়। এদিক ওদিক করে ম্যানেজ হয়ে গেল। কিন্তু বলাকার খুঁতখুঁতুনি গেল না। ছোট কাকীমা নীলুকে আড়ালে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “হ্যাঁরে নীলু, তুই নিয়েছিস, না? বার করে দে বলছি।”

নীলু বলল, “ওই ঢ্যামনা মাগীর এঁটো লিপস্টিক চুরি করতে আমার ভারি বয়ে গেছে।”

ছোট কাকীমা হিস হিস করে বললেন, “এমনিতে গুণের ঘাট নেই, আবার মুখ খারাপ করছিস। মুখ ভেঙ্গে দেব হতচ্ছাড়ি।”

নীলু রাগ দেখিয়ে দুম দুম করে পা ফেলে চলে গেল। চলে গেল বটে, কিন্তু বেশি দূরে নয়। আধুনিক বিয়েতে কনে সঙের মতন বসে থাকে না। বলাকা সমীরের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে অতিথি আপ্যায়ন করছিল। নিমন্ত্রিতদের সঙ্গে আলাপ করছিল। মলয়ের কাজ বেড়েছে। তাকে ক্যামেরা ঘাড়ে করে বর কনের পিছনে পিছনে ঘুরতে হচ্ছে। তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু সব ফ্রেমেই বর কনের সঙ্গে - নীলু। কত আর অ্যাঙ্গেল বদলে তাকে কাটানো যায়। এমন কি যুগল ফ্রেমেও নীলু ঘুষটে ঘুষটে ঢুকে পড়ছে। মলয় বিরক্ত হয়ে বলল, “নীলু, তুই একটু সরে দাঁড়া।”

নীলু সাময়িক সরে গেল। ব্যুফে খাওয়া, যেমন আজকাল রীতি। অতিথি অভ্যাগতরা পছন্দ মতন প্লেট সাজিয়ে নিচ্ছে। নীলু ফুচকা খেতে খেতে নজর রাখছিল। ফুল দিয়ে স্টেজ সাজানো হয়েছিল। বর কনের বসার জন্য সিংহাসন চেয়ার। মলয় বর কনেকে ফাঁকা পেয়ে তাদের কিছু ইন্টিমেট স্টিল ছবি তুলছে। জায়গা মত ভিডিওতে পাইল করে দেবে। পাক্কা ফিল্ম ডাইরেক্টরের মত নির্দেশ দিচ্ছে, “সমীর বলাকার কোমরে হাত দে, চোখে চোখ রাখ। কাছে যা রে ম্যাড়া, বলাকা তোর নিজের বৌ, পরস্ত্রী নয়।”

স্ট্যান্ডার্ড ডায়ালগ। সব বিয়েতেই মলয় ব্যবহার করে। বর কনে মুডে এসে যায়। নীলু নিঃশ্বাসের নিচে দাঁত চিপে বলল, “ন্যাকামি… গা জ্বলে যায়!"

খাওয়া দাওয়া মিটতে মিটতে এগারোটা সাড়ে এগারোটা বাজল। আজকাল সকলেই স্বাস্থ্য সচেতন, পাখির আহার করে। খাবার বেঁচেছে অনেক। ক্যাটারার ফেরত নিয়ে যাবে না। বাড়িতে যত হাড়ি ডেকচি ছিল সব ভরে ডাইনিং টেবিলে সাজিয়ে রাখা হল। সকালে ফুটিয়ে দেখা হবে, খারাপ না হয়ে গেলে রান্নার পরিশ্রম বাঁচবে। সমীরের বন্ধুরা গেল সব শেষে। ফুলশয্যার ফুল দোলানো খাটে দুজনকে বসিয়ে রেখে। যাবার আগে ফোক্কড় বিষ্ণু হাতের আড়াল করে সমীরের পাঞ্জাবীর পকেটে দুটো চকমকে প্যাকেট ঢুকিয়ে দিয়ে গেল। আস্তে আস্তে বাড়িটা ঝিমিয়ে পড়ছে। সবাই যে যার ঘরে ঢুকে পড়ছে। কথাবার্তার শব্দ কমে আসছে। মেজকা বাইরের আলোগুলো নিভিয়ে সদর দরজায় তালা লাগিয়ে দিল। ঘুম নেমে আসছে পৃথিবীতে। সমীর ঘরের দরজা বন্ধ করে আলো নিভিয়ে বলাকার পাশে এসে বসল। মানুষ যতই আধুনিক হোক এখনো কেউ কেউ বিয়ের মত প্রাচীন প্রথায় আবদ্ধ হয়। এখনো কোনও কোনও ফুলশয্যার রাতে চাঁদ ওঠে। সময় সুযোগ করে মাধবীলতা উঠে আসে দোতলার বারান্দায়। দুটি মানুষ পৃথিবীর আদিমতম সুখ অনুভব করতে করতে ভাবে - আমরাই প্রথম। আহা, ওরা ঘনিষ্ঠ হোক!

*

নীলু তার মোবাইল ফোনে সময় দেখল, রাত দুটো। মেসো মারা যাবার পর থেকে নীলু মাসীর সঙ্গে এক বিছানায় শোয়। আড় হয়ে দেখল মাসী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সে সন্তর্পনে উঠল। মোবাইল ফোনের আলোয় চোখ জ্বেলে তোষকের কোণা তুলে হাত চালাল। লিপস্টিকটা মুঠোর মধ্যে নিয়ে খাট থেকে নামল। নতুন সংগ্রহ যথাস্থানে রাখার জন্য বাথরুমের দিকে এগোচ্ছিল। কী মনে করে থমকে দাঁড়াল। ঘরের দরজা খুলে বাইরে এল। বাইরে টানা বারান্দা চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে। নীলু পা টিপে টিপে হেঁটে সমীরের ঘরের দরজার সামনে পৌঁছল। হাতের সামান্য চাপ দিয়ে দেখল দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। দরজায় কান পেতে শুনল ভারি নিশ্বাস প্রশ্বাসের নিচে চাপা শীৎকারের শব্দ আসছে। নিঃশব্দে সরে এল সেখান থেকে। পায়ের বুড়ো আঙ্গুলে ভর দিয়ে আবার নিজের ঘরে ফিরে গেল। সে যে রাত্তিরে এসে সমুদার ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল, চাঁদের আলো ছাড়া তার আর কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ রইল না। ঢোকার সময় দরজায় শব্দ হয়ে থাকবে অসাবধানে। মাসী ঘুমের মধ্যেই জিজ্ঞেস করল, “কে?"

নীলু স্বর নামিয়ে বলল, “আমি... বাথরুম যাচ্ছি।”

আলো জ্বালিয়ে বাথরুমে ঢুকল নীলু। তার চোখ জ্বলছে। ওয়াশ বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে চোখে জলের ঝাপটা দিল। ওপরের দেওয়াল আয়নায় নিজেকে দেখল। উস্কোখুস্ক চুল, বাসি কাজল, কুৎসিত একটা মুখ। গালে চিবুকে বিন্দু বিন্দু জল লেগে রয়েছে। নীলু নিজেকে ঠিকঠাক সাজাতেও পারে না। ওই জন্যই সমুদা তার দিকে কখনো তাকায় না। নীলু প্যাঁচ ঘুরিয়ে লিপস্টিক খুলে ঠোঁটে ঘষতে লাগল। মনে মনে বলাকাকে বলল - মর মাগী! তুই সমুদাকে নিয়ে নিয়েছিস, আমি তোর ঠোঁটের রঙ। শোধ বোধ পায়ে গোদ। দেখ না, সত্যি সত্যি তোর পায়ে গোদ হবে। পা ফুলে ঢোল হয়ে যাবে। মরবি, তুই মরবি! নীলুর ধ্যাবড়া ঠোঁট রাঙাতে একটু বেশিই লিপস্টিক লাগে। তবু আজ যেন তার ঠোঁটে রঙ ধরছে না, পিছলে পড়ে যাচ্ছে। ঘষতে ঘষতে গোটা লিপস্টিকটাই শেষ হয়ে গেল। নীলু ক্ষোভে দুঃখে সেটাকে বেসিনের পাড়ে চেপে ধরে ধরে ভেঙ্গে দিল। যেমন করে মৃত্যুদণ্ডে সই করার পর মহামান্য ধর্মাবতার ডেস্কের ওপর চেপে ধরে তাঁর কলম ভেঙ্গে ফেলেন।

দরজায় মাসীর হাত বাজছে, “নীলু, নীলু, কী হয়েছে? এতক্ষণ বাথরুমে ঢুকে কী করছিস?”

আঃ! এরা কি একটু শান্তি দেবে না?

“কিছু হয়নি মাসী, বেরোচ্ছি, তুমি শুয়ে পড় গিয়ে।”

মাঝরাতে ঠোঁটে রঙ দেখলে মাসী বাড়ি মাথায় করবে। গামছা দিয়ে মুছলে গামছা থেকে রঙ তোলা এক ঝকমারি! নীলু এখন কী করে? সমুদার দীঘা ফেরত লিপস্টিকের রঙ লাগা শার্টটা লফটে লুকিয়ে রাখা আছে না! সবার অজান্তে নীলু চুপচাপ উঠিয়ে এনেছিল। বালতির ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে নীলু সেটা পেড়ে আনল। জামাটা ভিজিয়ে মুঠো করে নিয়ে ঠোঁটের ওপর ঘষে ঘষে রঙ তুলতে লাগল। জামাটায় এখনও সমুদার গায়ের গন্ধ লেগে আছে। নাক জ্বলছে। সুতি কাপড়ের ঘষ্টানিতে নীলুর ঠোঁটের চারদিক ছড়ে যাচ্ছে। বোতামের আঘাতে ঠোঁটের কোণ ছিঁড়ে গেল, তবু রঙ ওঠে না। সাবান দিয়ে আট দশবার মুখ ধুয়ে নীলু আয়নায় মুখ দেখে। যা রয়ে গেল, থাক গে। সমুদার শার্টটা আর ব্যবহারের যোগ্য নেই। দোমড়ানো মোচড়ানো শার্ট আর ভাঙ্গা লিপস্টিকটা বাথরুমের জানলা খুলে বাইরে অন্ধকারে ছুঁড়ে ফেলে দিল নীলু। নিচে খোলা নর্দমা, কেউ দেখতে যাবে না। আলো নিভিয়ে শান্ত মুখে বেরিয়ে এল। এবার সে মাসীর পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। স্বভাব-চোরদের বোধ-বুদ্ধি কম হয় বলে তাদের ঘুম আসতে দেরি হয় না। আয় আয় ঘুম, নিবিড় শান্তির ঘুম!

ফেসবুক মন্তব্য