দেজাঁ ভিউ (Déjà vu)

অঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়



কি হলো, আজ উঠবে না? নটা বেজে গেল তো!
পর্দা টেনে সরিয়ে দিতে মা চোখদুটো কুঁচকে ঈষৎ ফাঁক করে। করুণ গলায় বলে, ভীষণ মাথা ঘুরছে। টেনে ফেলে দিচ্ছে!
একনজর মার দিকে তাকিয়ে বললাম, ও কিছু না। উঠে পড়ো, মুখটুখ ধোও, ঠিক হয়ে যাবে।
ক্ষীণ গলায় মা বলে, উঠতেই পারছি না!
তবে শুয়ে থাকো। যখন পারবে উঠে চা খেও। আমি যাই, বিরাট একটা কাজ এসেছে।
মা চিঁ চিঁ করে বলতে থাকে, বলছি কাহিল লাগছে, সে কি এমনি এমনি?
আরেকবার ভালো করে নজর করলাম। নাঃ, মাথা ঘোরা মানুষের কোনও লক্ষণ নেই।
তা আমি কি করব বলো মা? আমি তো ডাক্তার নই। আর এত সামান্য কারণে এই সাতসকালে কোনও ডাক্তার বাড়ি আসবেও না। তাই কিছু করার নেই। উঠতে না ইচ্ছে করলে শুয়ে থাকো। ওবেলা নয় ডাক্তারকে ফোন করবো। তবে উঠে একটু চা-জলখাবার খেলে ভালো লাগত।
যাব কি করে অতটা? টেবিল পর্যন্ত?
তবে খাবে কি করে?
এখানে এনে দে।
ছকটা আগেই বুঝেছিলাম। কালও ঠিক এই করেছিলো, মাথা ঘুরে নাকি ঠেলে ফেলে দিচ্ছে। পারেও নাটক করতে! ধরে ধরে বাথরুমে নিয়ে গেছি, বিছানায় জলখাবার দিয়েছি। গরমজল ঘরে এনে গা মুছিয়ে, মাথা ধুইয়ে দিয়েছি। ব্যস তারপর সারা সকাল দিব্যি খাটে পা ছড়িয়ে বসে কাগজ পড়ল, ঠিকে মেয়েটার সঙ্গে গল্প করলো, দুপুরে পরিতৃপ্তি করে খেল, তারপর আমার এক বন্ধু এলো হঠাৎ, আমরা দুজনে গল্প করছি, তার মধ্যে এসে বসে থাকলো, কতবার বললাম, যাও না মা, একটু শুয়ে নাও। গেল না। বিকেলে চা-টা খেল, সারা সন্ধে টিভি দেখল, তারপর যথারীতি রাতের খাবার খেয়ে শুতে গেল। এর মধ্যে মাথা ঘোরার কোনও সীন ছিলো? হঠাৎ আজ সকালে আবার এমন দুরন্ত মাথা ঘোরা কোথা থেকে হাজির হলো? আসল কথা মর্জি হয়েছে টেবিলে গিয়ে খাবে না, বিছানায় বসে খাবে। বাথরুমে গিয়ে স্নান করবে না, ঘরে বসে করিয়ে দিতে হবে। তাই এত কান্ড।
না, এখানে খাবার দেওয়া যাবে না।
রাগের চোটে মা এক ঝটকায় উঠে বসলো। তাই বল্, দেবো না! সে তো বলবিই। এখন অসুস্থ মাকে তো অবহেলা করবিই । আমার শক্তি নেই, আমি এখন অথর্ব ....
মার চোখে রাগ, কিন্তু অসুস্থতার লেশমাত্র নেই।
কিচ্ছু অথর্ব নও মা তুমি! উঠতে পারছ না বিশ্রাম করো, একবেলা না খেলে কিছু হবে না বরং পেটটা রেস্ট পাবে। পরে উঠে মাথায় একটু জল দিও, দেখো ভালো লাগবে। খিদে পাবে।
রাগে গরগর করে মা। জেদ, জেদ, চিরকাল তোর জেদ বেশি! বলছি পারছি না, তবু তুই যা বলবি শুনতে হবে! আমি কি বাচ্চা? নিজেরটা বুঝি না? তোর কথামত চলতে হবে? তোর হুকুম মেনে থাকতে হবে? এত হেনস্থা...এখন আমার গেলেই ভালো, এই বয়সে ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে এত অবহেলা আর সওয়া যায় না...
মার অভিযোগমালার উত্তর না দিয়ে নিজের ঘরে চলে আসি। খানিক বাদে গিয়ে উঁকি মেরে দেখি, ফের শুয়ে পড়েছে! হাসিও পায়! জেদ নাকি আমার! আবার মনটা খচখচও করে। সকাল থেকে চাটুকু পর্যন্ত খেলো না! যদি প্রেশার-টেশার ফল করে, যদি সত্যি মাথা ঘুরে পড়ে যায়?
বেলা দশটায় ঠিকে মেয়েটি এল। আজ দিদা শুয়ে? শরীর খারাপ?
বলি, না, মেজাজ খারাপ।
মা শুয়ে কাজেই মার বিছানাটা করা হলো না। শুধু ঘর ঝাড়মোছ করে চলে যায় ও। আমি আমার ঘরে কাজ করে যাই, মনটা উচাটন হয়ে থাকে। বুড়ো মাকে চাটুকু পর্যন্ত দিলাম না, এ কী পাষাণী মেয়ে!!
এগারোটা নাগাদ খুসখাস আওয়াজে বুঝি, মা উঠেছে। খুট খুট করে আমার ঘরে এসে উপস্থিত। চিঁ চিঁ করে বলে, লিখছিস?
হ্যাঁ, কাজ এসেছে। তোমার শরীর কেমন? চা খাবে?
চায়ের নামে মার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
চলো ব্রেকফাস্ট দিই, তারপর চা খেও।
কাহিল একটা মুখ করে খুট খুট করে হেঁটে টেবিলে গিয়ে বসে। বাটিতে করে দুধ-খই-কলা-বাতাসা দিই, ধীরে ধীরে খায়, তারপর তারিয়ে তারিয়ে চা খেতে থাকে।
মনে মনে আমি পঁচিশ বছর আগের একটা দিনে ফিরে যাই । রন্টু সেদিন কি একটা ক্লাসটেস্টে যেন কম নম্বর পেয়েছিল, খুব লজ্জা। সারা সন্ধে গুম মেরে কাটাল, রাতে ভালো করে খেল না। পরদিন সকালে কিছুতেই উঠবে না, পেটে খুব ব্যথা। আমি তো ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পেরেছিলাম কিন্তু সেকথা বললে তো আর ছেলে মানবে না। অতএব বললাম, ঠিক আছে, ওষুধ খেয়ে শুয়ে থাকো। স্কুলবাসে যেতে হবে না, বাবা পরে গাড়ি করে পৌঁছে দেবে। ও বালিশে মুখ গুঁজে কুঁই কুঁই করে বলল, স্কুলে যেতে পারব না মা! খুব ব্যথা। আমি ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে বললাম, আচ্ছা সে দেখা যাবে। পরের কথা পরে।
সুস্থ শরীরে কাঁহাতক শুয়ে থাকা যায়? তারওপর ওর মিথ্যে ভান করা নিয়ে না উঠল কোনও কথা, না হল কোনও রাগারাগি। পেট ব্যথাও অবশ্য অ্যাটেনশন পেল না আর স্কুল কামাইয়ের কথাটা তো গ্রাহ্যের মধ্যেই আনল না কেউ। অর্থাৎ নাটক পুরো ফেল। আরেকবার চাপাচাপি করতে ব্যাজার মুখে উঠে তৈরি হল, তারপর গুটিগুটি বাবার সঙ্গে স্কুলে। বিকেলে ফিরতে যে কে সেই সিংহ, সকালবেলার মন খারাপ কোথায় উড়ে গেছে! সেদিন নাকি ওর essayটা বেস্ট হয়েছে, মিস সবাইকে পড়ে শুনিয়েছেন! ছেলেকে জড়িয়ে ধরে আদর করে দিই।
মারও একটা আদর প্রাপ্য। এগিয়ে গিয়ে মাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরি।

ফেসবুক মন্তব্য