একটি কাব্যগ্রন্থ ও কিছু নিজস্ব ভাবনারা

রিমি মুৎসুদ্দি

ছেড়েছি সব অসম্ভবের আশা- বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

Just when I thought there wasn’t room enough
for another thought in my head, I had this great idea--
call it a philosophy of life, if you will. Briefly,
it involved living the way philosophers live,
according to a set of principles. OK, but which ones?
-John Ashbery, My Philosophy of Life

কবিতা কি? কবিতা কি একটা দর্শন বা ভাবনা, যা জন্ম নেয় কবির মাথার ভেতর আর সেখান থেকেই একের পর এক নির্মাণ অথবা বিনির্মাণ চলতে থাকে? ফরাসি কবি ইভা বনফোয়া-র ব্যাখ্যায়, কবিতা কোন বস্তুকে বা দৃশ্যকে প্রকৃত বাস্তবতায় ফেরাতে সাহায্য করে। নিউইয়র্ক স্কুল অফ পোয়েট্রি মুভমেন্টের স্রষ্টা কবি ফ্রাঙ্ক ও’হারা কবিতাকে ব্যাখ্যা করছেন এইভাবে- কবিতা হল একান্ত ব্যক্তিগত কিছু পর্যবেক্ষণ, যা মূলত তাঁর চারপাশের বস্তু, দৃশ্য ও মানুষকে দেখার মধ্যে দিয়ে সম্পন্ন হয়।

নব্বই-এর অন্যতম কবি বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ছেড়েছি সব অসম্ভবের আশা’ কাব্যগ্রন্থের প্রতিটা কবিতা যেন এক একটা যোগাযোগের সেতু। এই যোগাযোগ যেন কবির নিজের সাথে নিজের অথবা কবির সাথে পাঠকের। অথবা একাধিক মাধ্যমের নিজেদের মধ্যে কমিউনিকেট করা। একে অন্যকে বলতে চাওয়া হয়তবা এযাবৎ বলে ফেলা সমস্ত কথার মধ্যবর্তী স্পেসের বিমূর্তকরণ। কবি যখন লেখেন অথবা পাঠক পড়ছেন-
অন্যের অস্তিত্বকে মাথায় ধারণ করে
অন্যের যন্ত্রণায় মিশে কদম বাড়াতে বাড়াতে
নিজেকে ভালবেসে মারা গিয়ে
অন্যের ভালবাসায় জন্মাতে জন্মাতে
ঘাসে লেগে থাকা অন্যের রক্তকে
নিজের বলে ভাবার মধ্যে
পাপ নেই, কোনও পাপ নেই।

পাঠক মরে গিয়েও বেঁচে ওঠে। বেঁচে ওঠে নিজেকে ভালবেসে, যে ভালবাসা জন্ম নেয়, যখন তার চারধারে ঘিরে থাকা কুয়াশার মুখ মুছে একটু একটু করে প্রথম সূর্যের আলো তার মাথায় এসে পড়ে। পুরোটাই বিমূর্তকরণ। আবার আচমকা চোখের সামনে দেখা কোন ঘটনা, দুর্ঘটনা অথবা মৃত্যুকে মানুষ যেমন মাঝে মাঝে নিজের করে নেয়। সেরকমই কবির এই অংশগুলো-
‘আমি ঘোড়ায় চড়ি, সাঁতার দিই, চালাতে পারি তির-ধনুক আর তলোয়ার, শিকার পারি, খেলতে পারি দাবা আর লিখতে পারি কবিতাও। কিন্তু এই থকথকে জালিয়ানওয়ালাবাগে মাটির মালসায় দু’ফেরতা মাটি চাপা নাইটহুড আমি আর বইতে পারছি না…’
পাঠকেরও চেতনার গভীরে কোথাও আঘাত করে। স্বস্তি দেয় না। কবির কথাগুলো অথবা প্রতিবাদগুলো পাঠকের নিজস্ব প্রতিবাদ অথবা যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়ায়।

সুদক্ষ নির্মাণশৈলী আবার কোথাও যেন সচেতন বিনির্মাণ, কৃত্রিম অলঙ্কারবর্জিত ভাষার নিপুণতা, ছন্দ ও মাত্রায় অসম্ভব পারদর্শিতা পাঠককে শুধু মুগ্ধই করে না। হাত ধরে নিয়ে যায় অতীত, পুরাণ ও আধুনিকতার সঙ্গমস্থলে। কবির কবিতায় প্রাচ্য ও আধুনিকতা একই সঙ্গে সহাবস্থান করে।

এই কাব্যগ্রন্থের প্রতিটা কবিতা যেন এক একটা কোলাজ, যেন টুকরো ইমেজারি। যে ইমেজারির প্রতিটা অনুষঙ্গে রয়েছে জানলা, দরজা। আর যখন সেই জানলা দিয়ে অবাধ্য বাতাস এসে ঢোকে তা যেন বলতে চায় –
-কালবৈশাখী কি আমরা পিছনে ফেলে এসেছি?
-হয়ত সামনে অপেক্ষা করছে।
-আর উজ্জ্বলতর ভবিষ্যতের সংগ্রাম?
-জারি আছে। ছুঁচ ফুটিয়ে দেওয়া প্রত্যেকটা চোখ থেকে
গড়িয়ে পড়া প্রথম রক্তবিন্দুর আলোয় জারি আছে।
………- দুরাত্রি একদিন, বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

আরো কয়েকটা উদাহরণ দেওয়া যাক-
দাঁড়িয়ে থাকে পাহাড়-চাপা দিন
চাঁদের মতো স্বপ্ন সরে যায়
রোপওয়ে ধরে পৌঁছে যাই আমি
মোহনা থেকে মোহনায়- ছেড়েছি সব অসম্ভবের আশা
আবার একই দীর্ঘকবিতায় কবি বলছেন-
আগুন লাগা ট্রেনের কামরায়
ঝুলতে থাকা তপ্ত চামড়ায়
আঁকব আমি আমার ডিজাইন
রাধাকে ফেলে পালানো শ্যামরায়

প্রতিটা দৃশ্য মনের গভীর থেকে উঠে আসা রঙ ছুঁড়ে ছুঁড়ে আঁকা কোলাজ। যেন জ্যাকসন পোলকের আঁকা Yellow Island অথবা কেনেথ কচ-এর কবিতা Sun Out। যেভাবে ফ্রাঙ্ক ও’হারা, জন অ্যাশবেরি, ওয়ালেস স্টিভেন্স, বারবারা গাস্ট, কেনেথ কচ, অথবা আরও পরের টেড বেরিগান, রন প্যাজেট, এন্যে ওয়াল্ডম্যান, জো ব্রেইনার্ড- এঁদের কবিতার সঙ্গে জ্যাকসন পোলক, লি ক্রাসনার, উইলিয়াম ডি কোনিং-এর এবস্ট্রাক্ট পেয়েন্টিং-এর তুলনা করা হত।

বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই কাব্যগ্রন্থের প্রতিটা কবিতাই যেন রঙ ছুঁড়ে আঁকা এবস্ট্রাক্ট পেন্টিং অথচ তা ধারণ করে আছে পুরাণ থেকে শুরু করে আজকের সমাজ, বহু প্রাচীন যুগ থেকে শুরু হওয়া একটা জার্ণি। যা আধুনিকতা, উত্তর আধুনিকতা পেরিয়ে এসে পৌঁছেছে এমন এক সময়ে যেখানে নৈবৃত্তিকতা এক রূপক, আসলে যা আসলে কঠিন বাস্তবেরই নগ্ন রূপ। আর সেই রুপমুগ্ধতায় আছে প্রেম, আছে বিশ্বাস, আছে ভালবাসা আবার একই সঙ্গে আছে মৃত্যু, আছে অবিশ্বাস, আছে যন্ত্রণা, আছে মুক্তি, আছে স্বপ্ন। কবির কথায়-
বেঁচে থাকছে সেই স্বপ্নটা
যার কাছে আমরা বন্ধক রেখেছিলাম
আমাদের নশ্বর জীবন
আর ছাড়িয়ে আনতে পারিনি।

অথবা কোন একটা দীর্ঘশ্বাস যেন ইতিহাসের পাতা থেকে ফিসফিস করে বলে যায়-
বিদায় নীরবতা, মৌনতার পাপ
লেগেছে আপনার শরীরে তাই
স্নানের শেষে কোনও সূর্যদেবতাকে
সাক্ষী রেখে আমি বলতে চাই
হিংসা চলমান, মৃত্যু ঘটমান,
সকল পরিচিত-আগন্তুক
গড়িয়ে যেতে যেতে তবুও দাঁড়িয়েছে
ছুঁয়েছে ঠোঁট দিয়ে তোমার মুখ …

ফেসবুক মন্তব্য