ট্রেনকার্পিন ও ব্যথাকুসুম

তাপস মাইতি

"আসি তাহলে" বলা হেমন্তের ভোরে হালকা কুয়াশার চাদর মুড়ি দেওয়া স্টেশনে সচল এলইডি ইন্ডিকেটরের লাল আলো পৌনে সাতটার লোকাল এক মিনিটেই প্লাটফর্মে ঢুকছে জানান দিতেই বেল্টটা কষে নিয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে প্লাস পাওয়ারের চশমা দাবাং স্টাইলে ঘাড়ের কলারে গুঁজে ভিড়াক্কার ট্রেনের পাদানিতে এগারো নং জুতো দুটো সলিড গেঁথে দেবার জন্য রেডি। উপচে পড়া চুলের জট নিয়ে চন্দনের টিপ পরা বোষ্টুমি যেমন ভোরের উঠোনে এসে দাঁড়াতো তেমনি কপালে শিশির ভেজা আলো আর উপচে পড়া যাত্রী নিয়ে লোকাল ট্রেনটা এসে দাঁড়াতেই হ্যান্ডেল ধরে জয়-মা বলে কুসুম এক ধাক্কায় নিজেকে ভিড়ের মধ্যে চালান করে দিল। "ভাইসাব আগে চলিয়ে..অওর মারো.. থোড়া আগে" -- এবার ঝাঁক ঝাঁক ধাক্কায় যেন মালিশ হতে থাকে শরীরের পেছন দিকটা। একবার ভিড় কামরায় ঢুকে পড়তে পারলেই সকালের এই এড়ানো-অযোগ্য মালিশ দারুণ উপভোগ করে কুসুম, শরীর ছেড়ে দিয়ে ঝিমোতে থাকে।

আজও একটু থিতু হয়ে ঝিমোচ্ছিল, হটাৎ পাঁচমিশালি পারফিউমের মধ্যে হালকা এমন এক সুগন্ধ ভেসে এল, যেন ভীষণ চেনা! শব্দ-বাজার, হু-হু করা এগজস্টের হাওয়া, এসবের মধ্যেও সেই গন্ধ কোথায় যেন ভাসিয়ে নিয়ে যেতে থাকে ওকে।
নেশাখোরের মতো চোখ খুলে বোঝার চেষ্টা করে কোথা থেকে আসছে এই যাদু! আশেপাশে তাকিয়েই বুঝতে পারলো থুতনির কাছে মাথার চুলে জড়িয়ে আছে স্বপ্ন। সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ, 'আহা! হে স্মৃতি জাগানিয়া সৌরভ, কোথায় ছিলে এত কাল! আজ আর তোমার পিছু ছাড়ছি না। আজ তুমি আমার হটাৎ পাওয়া ধন!' ট্রেনের দুলুনি, প্লাটফর্মে প্লাটফর্মে মানুষের ওঠানামায় 'কেওকার্পিন হেয়ার ভাইটালাইজার' মাথা কখনো বাঁয়ে কখনো ডাঁয়ে, তার সাথে স্বপ্নালু থুতনিটিও আজ গাঁথা।

কুসুম পৌঁছে গেছে কৈশোর যৌবনের মোহনায়। শীতকালে গাছের নারকেলের ঘানির তেল যাতে জমে না যায় আর সুগন্ধি হয় তাই মা তেলের শিশিতে দু-তিন ছিপি হালকা সবজে 'কেওকার্পিন হেয়ার অয়েল' মিশিয়ে দিত। দিনে একবার মাথায় মাখলেই ছত্রিশ ঘন্টার গ্যারান্টি। বালিশ, বিছানা, মাফলার, টুপি, গামছা সবই তখন কেওকার্পিনময়। যে পথ দিয়ে চলবে সে পথে তোমার আগমন বার্তা ধূলা থেকে পাতা সবার নাক ছুঁয়ে থাকবে, তাই বুঝি রাতের নিভৃতচারীরা স্বপ্নময় এই তেল-কে কখনো আপন করে নেয়নি। কুসুম কিন্তু মাথার সাথে গোপনে বাহুমূলেও একটু মেখে নিত। জামা, সোয়েটার সবই তখন খুসবুদার।

বাতাসে খেজুর গুড়ের লোভাতুর ডাক, উঠোনে পাকা ধানের খিদে মেটানো সুবাস সবকিছু ছাপিয়ে মাঝে মাঝেই স্বপ্নমাখা "কেওকার্পিন " ---যৌবনের উচ্ছলতা উদাসীনতার সাথী এ যুগের টিভি বিজ্ঞাপন 'ওয়াইল্ড স্টোন'-এর সন্দিগ্ধ রাগী পিতার 'কুনাল' না হয়ে ওঠার নানা কৌশলের সাথে মিশে রোমান্টিক 'কেওকার্পিন'। কুসুম থুতনি ঠেকিয়ে আরও ঘন হয়ে সেই সুঘ্রাণ নিল আবার, যেন ব্রাউনসুগারে লম্বা এক টান, ঝিম ঝিমে স্বপ্ন!

মায়ের মেশানো শিশিতে কখনো কখনো কুসুম লুকিয়ে আরও এক ছিপি কেওকার্পিন ঢেলে সবজে শিশিটাকে মায়ের চোখ এড়াতে দেয়াল-তাকের পেছনের দিকে ঠেলে দিত। লাল রঙা 'জবাকুসুম'-এর শিশির পাশে। নিরিহ মুখে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকত দুই শিশি। কিন্তু ওর মায়ের নাক-কে এড়াবে কী করে?
মা বলত, আজ কত তেল ঢেলেছিস মাথায়?
--- এই দেখো, তেল যেমন ছিল তেমনই আছে, রোজ যতটা নিই ততটাই তো নিয়েছি।
মা স্থির তাকিয়ে থাকে হালকা জেগে ওঠা ঝাউয়ের পাতার মতো গোঁফের দিকে। মার কাছে ধরা পড়ে বাড়ন্ত ছেলের মাথা থেকে আসা উগ্র সুগন্ধের রহস্য। কেওকার্পিনের সবুজ আপাত নিরিহ সেই শিশি থেকে যেন বাষ্প হয়ে উবে যাচ্ছে তেল, নিচে নেমে গেছে তেলের উপরিস্তর। কুসুম তবু ভাবে সে ধরা পড়েনি, মা মুখে কিছু না বললেও বোঝে ছেলে বড় হয়ে উঠছে। এই কেওকার্পিন-ই মাকে বুঝিয়ে দেয় কুসুমের এবার জীবন-পাঠশালার বিশেষ শিক্ষার প্রয়োজন। এসব মিহি ভাবনা ও ঘন ভিড়ের মধ্যে আর একবার থুতনি ডুবে যায় চুলে।

শোবার ঘরে সাড়ে-পাঁচ ফুট উঁচুতে দেয়াল আলমারির এক ধারে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকতো জবাকুসুম আর কেওকার্পিন। কেওকার্পিনের সাথে ছিল নিত্যদিনের রোমান্টিকতার ছোঁয়া, কিন্তু জবাকুসুমের গায়ে যেন কেমন একটা ওষুধ ওষুধ গন্ধ। কুসুমের সময়টা ঠিক মনে পড়ে না __ সম্ভবতঃ জ্ঞান হবার পর থেকেই মায়ের গা ঘেঁষলে ওই গন্ধ মাঝে মাঝে নাকে এসে লাগত। শান্ত ব্যাক্তিত্বময়ী মায়ের মুখটা তখন কেমন ব্যাথাছায়া মাখা, মাথার চুল জবাকুসুম আর জলে জবজবে। তাই, জবা বললেই কুসুমের মনে ভেসে ওঠে কাকিমাদের উঠোনে বিরাট এক সবুজে লালে ভরা ঝাঁকড়া গাছ, মা কালীর মুখ, পুজোর দিনে মাইকে শোনা "আমার মায়ের পায়ে জবা হয়ে ওঠ না ফুটে মন" বা "বল রে জবা বল কোন সাধনায় পেলি শ্যামা-মায়ের চরণ তল .." আর তারই সঙ্গে এই ওষুধ ওষুধ গন্ধও। ছোট বেলায় কাকিমাদের গাছের জবাফুল ছিঁড়ে ডলে ডলে মায়ের মাথার ওষুধের গন্ধ খুঁজেছে। কিন্তু, কোনো গন্ধই পায়নি। রাগে পাপড়ি গুলো পিষেছে, যেন মায়ের মাথা ধরার পোকা গুলোকে থেঁতলে মারতে চাইছে। শুধু হাতের তালু রক্তরাঙা হয়েছে কিন্তু সেই ওষুধ-ওষুধ গন্ধের উৎসের হদিস মেলেনি। যদিও ওর মা বলত এই গন্ধ ছিল তার মাথা ধরার উপশম, তবু কুসুমের মনে হতো আসলে এটা মাখলেই মায়ের মাথা ধরে, এই গন্ধ দূর করতে পারলেই হাই ব্লাড-প্রেসারের মাথা ধরা আর ওর মায়ের ধারে কাছে ঘেঁষতে পারবে না। কুসুম কোনো দিনই তাই 'জবাকুসুমকে' মাথায় করে রাখেনি। সে এখনো কেওকার্পিনে শিহরিত হয় আর জবাকুসুমে ব্যাথাতুর।
বারো বছরের পুরোনো শিশির তলানিতে ঠেকা জবাকুসুম আজও অন্ধকার সেল্ফে ফুরিয়ে যাবার অপেক্ষায়... কবে তার মালকিন মেখে নেবে মাথাধরা সারাতে। সে আজও জানে না 'এবার আসি তাহলে' বলে আচমকা তার মালকিন কবেই ফিরে গেছে অন্য এক জবাকুসুমের দেশে।

ফেসবুক মন্তব্য