নিজের কথা

শেখর সেন



পরিচয়: "যদি বলি তিনি একাই একটি প্রতিষ্ঠান খুব কি বাড়িয়ে বলা হবে? বোধহয় নয়। তিনি নিজে তাঁর নাটকের বিষয় নির্বাচন করেন, সেই বিষয়ে গবেষণা করেন, হিন্দিতে স্ক্রিপ্ট লেখেন, একাই তাতে অভিনয় করেন, সে নাটকের সঙ্গীতে নিজেই সুর দিয়ে মঞ্চেও নিজেই গান এবং সেই নাটক নিয়ে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ান। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। জনপ্রিয় সে সব নাটক হল তুলসী, কবীর, সুরদাস, বিবেকানন্দ, সাহেব। শুধু নাটকই নয়, পেশাদারী দক্ষতার একজন সুরকার ও সংগীতশিল্পী হিসাবেও তাঁর নাম জড়িয়ে আছে দুশোরও বেশি ভজনের অ্যালবামে। এবং তিনি একজন স্বশিক্ষিত চিত্রশিল্পীও। হ্যাঁ, আমি বলছি দুহাজার পনেরো সালের পদ্মশ্রী অ্যাওয়ার্ড উইনার, সংগীত নাটক অ্যাকাডেমীর চেয়ারপার্সন শ্রী শেখর সেনের কথা।".... অর্ঘ্য দত্ত

---------------------------------------------------------

'তা থেই তাতা থেই, আ থেই তাতা থেই
থেই তা থেই তা থেই, থেই থেই তাৎ তাৎ ধা', ফর্সা বালকটি একে একে আমোদ, পরণ, তোড়া সম্পূর্ণ করে যখন ক্লান্ত পাদুটো থেকে ঘুঙুর জোড়া খুলছে, দরজার কাছে স্মিতমুখে এসে দাঁড়ান বালকটির মা। তিনি নিজে শুধু একজন গোয়ালিয়র ঘরানার সুগায়িকাই নন, সেতারও বাজাতে পারেন দক্ষতার সঙ্গে। বালক পুত্রটির সম্বন্ধে তিনি অত্যন্ত আশাবাদী। এবং সে জন্যই বালকটিকে উচ্চাঙ্গ সংগীত শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গেই নিতে হয় কথক নাচের তালিম, সেতারের সাথে সাথেই শিখতে হয় ভায়োলিন বাদনও। বালকটিও ভালোবেসে শিখতে থাকে, ললিত ও চারু কলার যাবতীয় সূক্ষ্ম অনুষঙ্গ। হবে নাই বা কেন বালকটির জন্মই যে হয়েছিল এক মিউজিক কলেজ ক্যাম্পাসে। রায়পুরে। বালকটির মা হলেন ডঃ শ্রীমতী অনিতা সেন এবং পিতা প্রখ্যাত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিল্পী ডঃ শ্রী অরুণ কুমার সেন। এবং সেদিনের সেই বালকটিই হলাম আমি, শেখর সেন।

মা চাইতেন, স্বপ্ন দেখতেন একদিন আমিও যেন ওঁদের মতোই একজন সর্বাঙ্গীন শিল্পী হয়ে উঠি, সঙ্গীত সাধক হয়ে উঠতে পারি। আমার জন্মদিন এলেই মা আমাকে উপহার দিতেন ভালো ভালো বই। সেই কিশোর বয়সেই তাই আমার পড়া হয়ে গিয়েছিল 'অটোগ্রাফী অভ এ ইয়োগী' বা স্বামী বিবেকানন্দর রচনা। এবং ফলে জীবনের ভালো ও মন্দ দুইয়েরই মুখোমুখি হতে শিখেছিলাম সেই বয়সেই। আমার কিশোর বয়সের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার অনুভব আশ্চর্যজনক ভাবে জীবনে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি উভয়কেই ইতিবাচক ভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে আমাকে অভিজ্ঞ করে তুলেছিল। অনুভব দুটি হল গজল প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ার আনন্দ এবং আকাশবাণী মধ্য প্রদেশ-এ অডিশনে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার বেদনা।

ছোটোবেলা থেকেই গতানুগতিক ধারায় সঙ্গীতকে পেশা করার ব্যাপারে আমার একটা অনীহা তৈরী হচ্ছিল। বুঝতে শিখছিলাম অর্থ উপার্জন না করতে পারলে শিল্পীও যথাযথ সম্মান পায় না। বি.কম পড়তে পড়তেই নিজে গজল কম্পোজ করতে শুরু করি। এবং উনোআশি-আশি সাল নাগাদ বি.কম পাস করেই চলে আসি বম্বে। সুরকার হিসাবে টানা সাত-আট বছর ফিল্মে কাজ করি। যদিও সে সব বেশিরভাগ ছবিই মুক্তির আলো দেখেনি। দেখলে হয়তো আমার জীবনটাই অন্য খাতে বইতো।

সিনেমার জন্য গান তৈরি করছিলাম ঠিকই, কিন্তু বুঝতে পারছিলাম এই কাজ আমাকে সন্তুষ্টি দিচ্ছে না এবং এও বুঝতে পারছিলাম যতদিন না আমার খ্যাতি হবে, নাম হবে ততদিন সঙ্গীতের সমঝদার নয়, সঙ্গীত সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান নেই এমন মানুষও শুধুমাত্র ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে, অর্থের জোরে আমার কাজকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবে। উপলব্ধি করতে পারছিলাম যে আমাকে নতুন কিছু করতে হবে, গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে এমন কিছু অর্থপূর্ণ কাজ করতে হবে যা রসিক মানুষের নজরে পড়বে, যে কাজ মানুষ মনে রাখবে। আমি এই সময় থেকে সাহিত্যপাঠে মন দিই, ভালো ভালো বই সংগ্রহ করে পড়তে শুরু করি। 'শরাব পিতে রহো'-র মতো গজল বা 'রাম রাম'-এর মতো ভজন নয়, চাইছিলাম গান নিয়ে ব্যতিক্রমী কিছু কাজ করতে। এ সময়েই, মানে উনিশশো চুরাশি সালে, হিন্দি ভাষার শ্রদ্ধেয় ও বিদ্রোহী কবি দুশ্যান্ত কুমারের গান নিয়ে মঞ্চে অনুষ্ঠান করি। দর্শকদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া আমাকে আরো এমন অনুষ্ঠান করতে উৎসাহ জোগাতে থাকে। আমি কখনো পাকিস্থানের হিন্দি কবিদের লেখা গান নিয়ে, কখনোবা মধ্যযুগের কাব্য নিয়ে কিংবা 'মিরা সে মহাদেভী তক্'-এর মতো গবেষণাধর্মী অনুষ্ঠান করতে থাকি।

কিন্তু আমি লক্ষ করি যে দর্শকেরা মঞ্চে প্রবল করতালি দিয়ে উৎসাহ দিচ্ছেন তারাই বাইরে এসেই পুরুষ হলে শেয়ার বাজার নিয়ে অথবা মহিলা হলে পোষাক-গহনার আলোচনায় মেতে উঠছেন। বুঝতে পারছিলাম গান দর্শকদের তাৎক্ষণিক বিনোদন দিলেও তাদের মননে কোনো দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রাখতে পারছে না। আমার সৃজনশীল আত্মা যেন তাই অনুষ্ঠান করেও কোনো তৃপ্তি পাচ্ছিল না। আমার মনে হচ্ছিল আমি এমন কিছু করতে চাই যা সমাজকে নিছক বিনোদনই নয়, তার থেকে বেশি কিছু দিতে পারবে। আর এই ভাবনা থেকেই আমার অভিমুখ গান থেকে ঘুরে যায় নাটকের দিকে।

তবে কথাটা বললাম যত সহজে, ব্যাপারটা আদৌ তত সহজে হয়নি। বম্বে আসার পরে টানা প্রায় দশ বছর ফিল্মি গানের সুরকার-গীতিকার হিসাবে কাজ করে, গানের সঙ্গে কাটিয়েও আমি যে শুধু একজন সৃজনশীল শিল্পীর সৃষ্টির আনন্দ থেকেই বঞ্চিত ছিলাম তাই নয়, বঞ্চিত ছিলাম আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য থেকেও। স্বাচ্ছন্দ্য তো দূরের কথা, আমার তখন প্রায় দেউলিয়া অবস্থা। এ শহরে আমার তখন না আছে নিজের বাসস্থান, না নিজের টেলিফোন। তারপর দীর্ঘদিন মঞ্চে অনুষ্ঠান করে, ভজন গান কম্পোজ করে, প্রচুর আধ্যাত্মিক গানের ক্যাসেট-সিডিতে গীতিকার-সুরকার এমনকী শিল্পী হিসাবেও কাজ করে আস্তে আস্তে মুম্বাই শহরে নিজের একটি মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করতে পারি। কিন্তু একটু আগেই যে কথা বলছিলাম, ব্যতিক্রমী কাজের ইচ্ছা আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিল। সারাক্ষণ মনে হতো গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসালে চলবে না, আমাকে এমন কাজ করতে হবে যা মানুষ মনে রাখবে। নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করি। মনে আছে, এইসময় আমি সিদ্ধান্ত নিই টানা দুবছর আমি শুধু হিন্দিতে কথা বলব, পোষাক পরব শুধুই ভারতীয়। বুঝেছিলাম ভালো কিছু শুরু করার আগে মুম্বাই শহরের জীবন যাপনে পাশ্চাত্য সভ্যতার যে তীব্র প্রভাব তা থেকে আমার নিজেকে মুক্ত করতে হবে। নিজের ভাষা, নিজের সংস্কৃতি ভুলিয়ে আত্মবিস্মৃতি ঘটানোর যে মেকলীয় ফাঁদে আমাদের জীবন আটকে ছিল, তার থেকে আমার নিজেকে টেনে বের করতে হবে। আমি সফল হয়েছিলাম। আর এত কিছুর মধ্যেও জারি রেখেছিলাম আমার নিয়মিত গানের রেওয়াজ। তারপর, আমাদের ভারতীয় নাটকের ঐতিহ্য মাথায় রেখে উনিশশো আটানব্বই সালে তুলসীদাসের জীবনী নিয়ে নাটক লিখে মঞ্চস্থ করলাম আমার প্রথম নাটক 'তুলসী'। আমি একাই তার অভিনেতা। আমিই সুরকার ও গায়ক। আমিই পরিচালক। সে নাটক যদিও দর্শকদের ভালো লেগেছিল তবু টিকিট বিক্রি হতো না। পরের পর পকেটের টাকা খরচ করে সেই নাটক নানান জায়গায় করে যেতে থাকলাম। কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম বাণিজ্যিক সাফল্য না এলেও এতদিনে আমি আমার সঠিক পথে খুঁজে পেয়েছি। কিন্তু লোকসান সহ্য করেও এই নাটক করতে করতে আমি আবার প্রায় দেউলিয়া হয়ে পড়ি। এমনই অবস্থা হয় যে আমার সেই কষ্টে করা মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু বিক্রি করে দেওয়া ছাড়া আর রাস্তা ছিল না। আর সেই ফ্ল্যাট বিক্রি করতে গিয়েই ঘটে যায় এক আশ্চর্য ঘটনা।

একদিন আমার ফ্ল্যাট কেনার জন্য একজন সম্ভাব্য ক্রেতাকে নিয়ে এলেন সম্পত্তি কেনাবেচার এক এজেন্ট। তিনি ফ্ল্যাটটি প্রাথমিক ভাবে পছন্দ করে যখন আমার সামনে এসে বসলেন, আমার মুখের দিকে ভাল করে দেখলেন, নাম জানলেন, তিনি কিছুতেই আর আমার বাড়ি কিনতে চাইলেন না। তিনি নাকি মঞ্চে চারবার 'তুলসী' দেখেছেন। তার একটাই কথা, আপনার মত শিল্পীকে গৃহচ্যুত করলে আমি অপরাধবোধেই মারা যাব। সেদিনই আবার মনে হয়েছিল এতদিনে আমি আমার জীবনের সঠিক গন্তব্যের অভিমুখ খুঁজে পেয়েছি। এই নাটকের পথই আমার যথার্থ পথ। এবং এমন অভাবিত স্বীকৃতিই আমার পাথেয়।

ব্যস্ত হয়ে পড়লাম নতুন নাটক প্রস্তুতির কাজে। মঞ্চস্থ করলাম কবীর। দর্শকদের কৃপাধন্য হলো সে নাটক। সেই প্রথম আমার প্রযোজনার সমস্ত ব্যয় উঠে এলো টিকিট বিক্রির মাধ্যমে।



তারপর আর আমাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এমনকি যে মহিলার কথা দিয়ে আমি শুরু করেছিলাম, আমার নমস্য মা, আমার বাবা তাঁরাও যে আমাকে সকল প্রাথমিক অসফলতা কাটিয়ে স্বাবলম্বী ও সফল হতে দেখে গেছেন সেও আমার এক পরম পাওয়া।

এ লেখার লক্ষ্য আমার নিজের সাফল্য বর্ণনা করা নয়, বরং শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নিজের লক্ষ্য স্থির রেখে যদি কোনো তরুণকে তার উদ্দিষ্ট গন্তব্যে এগিয়ে যেতে উদ্দীপ্ত করে তাহলেই এ লেখা, আমার নিজের এত কথা বলা সার্থক হবে।

ফেসবুক মন্তব্য