ল্যাক্টো-বেবী

ঈশিতা ভাদুড়ী

বিদেশে বেড়াতে তো যাই প্রচুর-ই , কিন্তু খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটি কিন্তু আমার আর সোমার খাওয়ার সঙ্গে বেমানানই বেশ। আমরা মাংস খাই না, আমি ঠান্ডা খেলেও সোমা খায় না, ঠান্ডা নাহয় গরম করে খাওয়া যায়, কিন্তু মাংস তো নৈব নৈব চ । শহরে গিয়ে না-হয় দোকানে দেখেশুনে আমাদের খাবার আমরা পছন্দ করে খেতে পারি, কিন্তু ফ্লাইটে তো তা হওয়ার নয়, সেট খাবার ।


অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার সময় আমরা কোলকাতা থেকে প্লেনের টিকিট কাটলাম যখন, তখনই আমাদের খাওয়ার চয়েসটিকে ‘ভেজ’ করে দিয়েছিলাম । কিন্তু আমাদের কাছে ‘ভেজ’-এর সংজ্ঞা যেমন অস্ট্রেলিয়ানদের কাছে কিন্তু তেমন নয় । আমরা মাছ-মাংস না হলেই ‘ভেজ’ বলি , তাদের কাছে ‘ভেজ’এর অর্থ অনেক গভীর। ফলত আমাদের অস্ট্রেলিয়া-সফরে প্রত্যেকটি ফ্লাইটে আমাদের খাওয়ার সমস্যা হল । কোনোবার তারা আমাদের অল্প করে কাজু খেতে দিল যখন অন্যেরা ভরপেট খাবার খাচ্ছে , কোনোবার তারা একটি আপেল দিয়ে ছেড়ে দিল । এতো মহা মুশকিল ! আমরা যতই বোঝাই এয়ারপোর্টের কাউন্টার-অফিসে যে আমরা শুধুমাত্র মাংস-ই খাই না, আর সব খাই, তারা মোটেই বুঝল না সেসব । একেকবার একেকরকম বিপত্তি । শেষমেষ আমরা সিডনি-তে কন্টাস এয়ারলাইন্সের অফিসে গিয়ে অনেক কষ্টে একজন মহিলাকে বোঝাতে পারলাম । তিনি অনেকক্ষন ধরে আমাদের কথা শুনে অনেকক্ষণ আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর বললেন ‘এয়ারলাইন্সের দোষ নেই , এতদিন ভুল চয়েস দিয়ে রেখেছিল আপনাদের এজেন্ট , আপনাদের খাবার তো ভেজ নয় , ল্যাক্টো ’। বোঝো কান্ড , আমাদের খাবার নাকি ল্যাক্টো! ল্যাক্টো তো দুধের শিশুদের জন্যে ! মহিলা বললেন ‘আপনারা নন-ভেজ খান না , আপনারা তো দুধের শিশু-ই’ । এহ বাহ্য!


১৯৯৪ সাল , আমাদের প্রথমবার বিদেশ-ভ্রমণ ছিল । তখন মে মাসের শেষদিক ছিল, বেশ ঠান্ডা । জার্মানিতে রাইন নদীর বুকে লঞ্চে করে বেড়ানো অনবদ্য ছিল । খেয়ে-দেয়েই উঠেছিলাম লঞ্চে , সবাই বিয়ার ইত্যাদি খাচ্ছিল, আমাদেরও ইচ্ছে হল পানীয় কিছু খেতে , কোক কিনলাম, সে ফ্রিজ থেকে বার করে দিল , বাপরে বাপ কী ঠান্ডা ছিল সেই পানীয় ! সোমা তো কখনই কোনো ঠান্ডা জিনিস খায় না , আর আমিও তখন তত সাহসী ছিলাম না বিদেশে গিয়ে শরীর নিয়ে দুঃসাহসীকতা করার মতন , যদি বিদেশ-বিভুঁইএ শরীর বেঁকে বসে তো মুস্কিলের ব্যাপার হবে, ডাক্তার-বদ্যি পয়সা-কড়ি যা-তা কান্ড হবে ! কোকটি যত ঠান্ডা ছিল আর বাইরে যত শীত ছিল , গরম করে খেতে গেলে তাতে আমাদের মাস কাবার হয়ে যেত । প্যান্ট্রির লোকটিকে বললাম , এত ঠান্ডা চাই না, একটু গরম-গোছের পানীয় দাও না ! সে খুব অবাক, সবাই তো ঠান্ডা চায়, সে বলল সবই তো এই টেম্পারেচারের , এর চেয়ে গরম তো কিছু নেই । কি আর করি ! খাওয়ার ইচ্ছে দমন করে তাকে বললাম, ভাই তোমার কোক তুমি রেখে দাও । কিন্তু সে নাছোড় , সে আমাদের খাওয়াবেই । মহা মুস্কিলে পড়লাম । সে তখন বলল, আচ্ছা দাঁড়াও আমি গরম করে দিচ্ছি । সে তারপর পানীয়টি মাইক্রোওয়েভে একটু গরম করে ঠান্ডাটা মেরে দিল এবং হাসতে হাসতে বলল “আই নেভার কুক্‌ড্‌ কোক”। মনে মনে বললাম , এই গাঁইয়াদের সঙ্গে থাকো না আর কিছুদিন , দেখবে আরও কত কী করতে হয় !


তাইওয়ানে কাওশিয়াং শহরের একটি শপিং মলে গিয়ে কাঁচা ডিম কিনেছিলাম এক ডজন । আমরা দুজনেই ডিম খুব ভালোবাসি । হোটেলে সেদ্ধ করে খাওয়ার কোনোই সমস্যা নেই, ঘরে ইলেক্ট্রিক কেটলি আছে, তাতে ম্যাগি বানিয়ে বা ডিম সেদ্ধ করে অনায়াসে খাওয়া যায় । পরের দিন সকালবেলা ব্রেকফাস্টে ডিম সিদ্ধ করে বেশ জমিয়ে খেতে বসলাম । আমি সোমার চেয়ে একটু তাড়াতাড়ি খাই । সেই হিসেবে ডিম খাওয়ার পালাটি আমারই আগে এল । যেই না ডিমটিতে কামড় দিয়েছি ,ব্যস , পুরো অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসার উপক্রম , নুনে পোড়া কী অদ্ভূত একটি বস্তু । দ্বিতীয় কামড় আর দিই নি আমি । আমি খাওয়া-দাওয়া নিয়ে একটু এদিক-ওদিক করলেও সোমার কিন্তু খাওয়ার ব্যাপারে তত ছুঁৎমার্গ নেই , নেহাৎ মাংসটি ডাক্তারের বারণ । সুতরাং বাকি ডিমগুলো ওর কপালেই নাচছে ভাবলাম । এরপর সোমা যেই কামড় দিল সোমার অবস্থা আরও খারাপ, মুখ থেকে থু থু করেও তার শান্তি নেই , কতবার যে সেই মুখ জলে কুলকুচি করলো সে ।


আমরা চিনে গেলাম, কোলকাতা থেকে সোজা কুনমিং । সেখানে আমাদের সময় স্বল্প এবং দ্রষ্টব্য অনেক, তাই বাধ্য হয়ে আমাদের চায়না ট্রাভেল ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিসের সাহায্য নিতে হয়েছিলো । একটি ফুটফুটে ছোট্ট মেয়ে শার্লি আমাদের জন্যে এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করছিলো ওই ভোরবেলায় । সারাদিন নিয়ে নিয়ে ঘুরলো। দুপুরবেলা মধ্যাহ্নভোজে আমাদের চাইনীজ খাদ্য। শার্লি জানতে চাইলো কী খেতে চাই আমরা । কী আর খেতে চাইবো ! আমরা না খাই মাংস , না খাই সাপ-ব্যাঙ । শার্লি কী যে আমাদের খাওয়াবে বুঝে পায় না । যদিও বন্য মাশরুম এবং টোফু এখানকার স্থানীয় সুস্বাদু খাদ্য শার্লি জানালো , কিন্তু আমি তত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে ভরসা পেলাম না । আমরা যত দুঃসাহসী-ই হই না কেন , খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে কিন্তু আমাদের কোনো সাহস-ই নেই , বিশেষত আমার , সেখানে অ্যাডভেঞ্চার করার কোনো শখই নেই । নিরামিষ খেতে চাই শুনে বেগুনের তরকারী পেঁয়াজের তরকারী ইত্যাদি প্রভৃতি পাঁচ রকমের পদ সহকারে ছোট্ট এক বাটি ভাত এলো , সঙ্গে চপস্টিক। চামচের বালাই নেই, নিদেনপক্ষে কাঁটাচামচও নেই , বোঝো কান্ড ! ওই লম্বা লম্বা কাঠি দিয়ে ভাত খাবো কী করে ! অনেক বোঝানোর পর চামচের বদলে গোল বড় বড় দুটো হাতা দিলো তারা । এবং তাই দিয়েই আমাদের খেতে হলো।

কোলকাতায় চাইনীজ খাদ্যের নামে যেরকম মন-প্রাণ লাফিয়ে ওঠে , চিনে চাইনীজ খাদ্যে সেরকম আহ্লাদে আটখানা হওয়ার কোনোই কারণ নেই । ভাতগুলো মোটা মোটা গোল গোল আঠা আঠা মতন, একটা আলাদা স্বাদ । প্লেট দেয় না সঙ্গে । ওই ছোট্ট বাটিতেই ভাত চপস্টিক দিয়ে খেতে হয় । আসলে আমরা যেভাবে অভ্যস্ত ‘চীনে খাদ্য’ কিন্তু তার থেকে সম্পূর্ণই আলাদা ।

চিন-এ আমরা দু-একটি সিল্কের কারখানায় গিয়েছিলাম । সেখানে অনেক কিছুর সঙ্গে সঙ্গে জেনেছিলাম সিল্কের গুটি থেকে পোকা বার করে ভেজে খায় চিনে মানুষেরা, বেশ নাকি সুস্বাদু হয় , দেখতে চায়ের গুঁড়োর মতন , গন্ধটাও চায়েরই মত । পোকাদের মলটিও তারা খায় গরমজলে ভিজিয়ে , সেটি নাকি আবার টেনশন-মুক্তির ওষুধ । সোমার তো খুব আপশোষ আমাকে খাওয়াতে পারে নি বলে । আমাকে খাওয়ালেই যেন আমি বসে বসে পোকাদের মল খেতাম !

ফেসবুক মন্তব্য