আলো

যুগান্তর মিত্র

মৈনাকের কথা

নিঝুম দুপুরে বারান্দায় বসে আছি। বাইরে ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুর। হঠাৎ ঝুমঝুম শব্দ কানে ভেসে আসে। শুকনো পাতার নূপুর পায়ে কেউ কি হেঁটে গেল ? উঠে গিয়ে তন্নতন্ন করে খুঁজি। কাউকেই দেখতে পাই না। আবার চেয়ারে এসে বসি। চোখ বুজে চুপচাপ বসে থাকা আমার চরম বিলাসিতা। সেই ছেলেবেলা থেকেই আমার এভাবে বসে থাকতে ভালো লাগে। বন্ধচোখে মনের গলিপথে অন্ধকার দেখি আর সেই নিকষ অন্ধকারে একটা সরু আলোর রেখা দেখতে পাই। আলোর সুতো ধরে হাঁটতে হাঁটতে এগোতে থাকি। ক্রমশ আলোর কাছাকাছি এসে দেখি এক জ্যোতির্বলয়। স্তূপপাদমূলে বুদ্ধকে পুজো দিয়ে ধীরে হেঁটে চলেছে শ্রীমতি। আপন মনে হেঁটে চলেছে আম্রপালি গাছের ফাঁকে ফাঁকে। আমি তার হেঁটে যাওয়া দেখি। আস্তে আস্তে সেই আলো মিলিয়ে যায়। অন্ধকারে হারিয়ে যায় শ্রীমতি।

চোখ মেলে বাইরের নিঝুম দুপুর দেখি। এবং আবিষ্কার করি আমি একা। মনে পড়ে শ্রীমতির কথা। আমার শৈশবের গোল্লাছুট। আমার নানা খেলার সঙ্গিনী। কৈশোরের উবু হয়ে বসে থাকা বিকেলের এক টুকরো হাসি। আমার মনখারাপের বারান্দায় সুরেলা শিস দেওয়া বুলবুলি পাখি।

এক মায়াবী বিকেলে অস্তগামী সূর্যের নরম আলো ওর গালে এসে পড়ে। চুঁইয়ে চুঁইয়ে গাল বেয়ে নামে। আমি সেদিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকি। অপলক। শ্রীমতি কাচভাঙা হাসি ছুঁড়ে দেয়।

~ কী দেখছিস ওমন করে ?
~ কিছু না। এমনিই দেখছিলাম।
~ কী ?
~ বললাম তো কিচ্ছু না।

শ্রীমতি দূরের আকাশ দেখে আমার দিকে পিছন ফিরে। ওর খোলা পিঠে আলো গড়িয়ে গড়িয়ে নামে। চুল থেকে বিন্দু বিন্দু আলো টপটপ করে ঝরে পড়ে। আমি দেখতে থাকি। দেখতেই থাকি। দু’হাতে সেই আলোর কুচি কুড়িয়ে নিতে থাকি আপনমনে।

~ কী করছিস তুই ? ফুল তোলার মতো কী তুলছিস ? কিছুই তো দেখতে পাচ্ছি না !
~ আলো তুলছি। আলোর কুচি।
~ পাগল একটা !

শ্রীমতি ছুটে চলে যায়। আলোর কুচিগুলোকে আমি উড়িয়ে দিই, ছড়িয়ে দিই হাওয়ায়। প্রজাপতির মতো সেগুলো উড়ে চলে যায়।

প্রায় প্রতিদিনই আলো ছড়িয়ে পড়ে আর আমি কুড়িয়ে নিই, ভাসিয়ে দিই হাওয়ায় হাওয়ায়। জানি শ্রী আমাকে পাগল ভাবে না। মুখে যতই পাগল বলুক, আসলে ও আমাকে ভালোবাসে। আমিও কি শ্রীকে ভালোবাসি ? ঠিক জানি না। বোঝার চেষ্টা করি।

আজ কতদিন পরে শ্রীকে দেখলাম ! কতদিন পরে ওর কথা শুনলাম ! মেয়েটাও খুব মিষ্টি হয়েছে। একেবারে ওর মতো হয়েছে। যেন ছোট্ট শ্রীকে দেখলাম। কিন্তু আমাকে দেখে খুব ভয় পেলো। মা’র গায়ের সঙ্গে সিঁটিয়েছিল সারাক্ষণ। অথচ ওকে ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করছিল খুব। ওকে ছোঁয়া মানে কি ওর মায়ের শৈশব ছুঁয়ে দেখা ? ওই অপাপবিদ্ধ শিশুর মধ্যে কি আমার শ্রীকে পেতাম না ! অন্তত এখনকার শ্রীকে কি একবার অন্তত ছুঁয়ে দেখা যেত না?

তুমি বরাবরই দুর্বল থেকে গেলে মৈনাক। সাহসের অভাবে তোমার ঘুড়ি অন্য লাটাইয়ে উড়ে বেড়ায়। তুমি তার ওড়াউড়ি দেখো। আর উন্মত্ত হাওয়ার লুটোপুটি দেখো। হায় !

শ্রীর আচমকা বিয়ের ঠিক হয়ে গেলো। বিরাট প্যান্ডেল, এলাহি আয়োজন আর আলোর ঝলকানিতে আমার শ্রীর শরীরময় আলো মিশে গেলো। আমি একা হয়ে পড়লাম। আমার জগৎ ছোট্ট হয়ে গেলো। আর তারপর থেকেই নিজের চারপাশে বৃত্ত গড়ে নিলাম। সেখানে কারো প্রবেশাধিকার ছিল না।

শ্রীমতির কথা

মৈনাককে আমি কোনোদিনই সেভাবে বুঝতে পারতাম না। ও আমার দিকে তাকিয়ে কী যেন দেখত। প্রথম প্রথম আমি রোমাঞ্চিত হতাম। সারা শরীরজুড়ে আনন্দ ছলকে উঠত। লক্ষ লক্ষ ঝিঁঝিপোকার ডাক ছড়িয়ে পড়ত আমার সারা শরীরে। কান আর মন অসাড় হয়ে আসত ভালোলাগার আবর্তে।
মৈনাক বলত আমার গাল বেয়ে নাকি আলো গড়িয়ে পড়ে। চুল থেকে নাকি আলোর কুচি ছড়িয়ে পড়ে নীচে। ও ছিল আমার খেলার সঙ্গী। সেই ছোট্টবেলা থেকে। তারপর কিশোরীবেলাতেও মৈনাক আলো জ্বালিয়ে রাখত সারাক্ষণ আমার শরীর আর মনজুড়ে।

একদিন বিকেলে পুবের আকাশে মেঘেদের ভেসে যাওয়া দেখছি। ওমা ! পেছন ফিরে দেখি নীচু হয়ে বসে মৈনাক কী যেন কুড়িয়েই চলেছে আপনমনে। ওর সারা শরীর আলোয় আলোময়। মুখে বিদ্যুতের রেখার মতো হাসি। ভাবখানা এমন, ও যেন ফুল তুলছে। শরতের ভোরবেলায় শিউলি ফুল তুলতাম যেভাবে সাজিতে, অনেকটা সেইরকমই। আমি জিজ্ঞাসা করলাম কী করছিস রে মৈনাক ? কী তুলছিস ওভাবে ? ও বলে কিনা আলোর কুচি তুলছে। আমি তো অবাক। তখনই বুঝে যাই ওর মাথায় একটা গণ্ডগোল দেখা দিয়েছে। এখন তো অনেকেই জানে ওর মাথার গোলমাল আছে। আমিই প্রথম বুঝতে পারি ওর পাগলামিটা। এটা কি আত্মশ্লাঘা ? কারও পাগলামি সবার আগে বুঝতে পারা কি শ্লাঘার বিষয় ! আমি ঠিক জানি না।

ছোটোবেলায় আমরা একসঙ্গে খেলা করেছি, স্কুলে গেছি। ভাবলে আজও হাসি পায়, আবার রোমাঞ্চও লাগে যে আমরা স্কুল থেকে হাতধরাধরি করে ফিরতাম। তখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি। আমাদের দু’বাড়ির লোকজনই হাসাহাসি করত এসব নিয়ে। কলকল করে কত গল্প করতাম আমরা। সব বন্ধুদের মধ্যেও আমরা দুজন আলাদা হয়ে যেতাম। কেন এমন হত বলতে পারব না। তারপর আস্তে আস্তে সময়ের হাত ধরে বড় হলাম আমরা।

আমি যখন অনেকটাই বড় হয়ে গেলাম, সমস্ত শৈশব তছনছ করে একদিন নারীত্বের ঋতুরাগ আমার শরীরে আছড়ে পড়ল, তখনই আমি বুঝতে পারলাম মৈনাককে আমি ভালোবেসে ফেলেছি। কিন্তু মৈনাক ! প্রথমে ভাবতাম ও নিশ্চয়ই আমাকে ভালোবাসে। পরে বুঝলাম ওর মধ্যে ভালোবাসাটাই নেই। ওর মাথা খারাপ। ও একটা আস্ত পাগল। আমার শরীর থেকে আলোর চুঁইয়ে পড়া দেখে, অঙ্গবৈভব দেখতে পায় না। চুল থেকে আলোর কুচি গড়িয়ে পড়া দেখে। সেগুলো কুড়িয়ে নেয়। কিন্তু হৃদয় থেকে ভালোবাসার ছড়িয়ে পড়া দেখতে পায় না। সেগুলো কুড়িয়ে নিতে জানে না। আমিই-বা কী পারলাম ? পেরেছি কি মৈনাককে আমার ভালোবাসার কথা বলতে ? যখন মনে হল একদিন মৈনাককে সরাসরি বলব আমার ভালোলাগার কথা, ভালোবাসার কথা, ঠিক তখনই টের পেলাম ওর মাথায় গোলমাল আছে। আমার ছোটোকাকা বলত, শৈবালদার ছেলেটার মাথায় টুং আছে। যারা খামখেয়ালি, যাদের মাথার গোলমাল আছে, সে যত সামান্যই হোক-না-কেন, ছোটোকাকা সেসবকে বলত টুং।

তারপর একদিন আমার বিয়ের ঠিক হল। অনেক টাকাপয়সা, পেল্লায় বাড়ি দেখে আমার বাবা-মা ব্যবসায়ী ছেলের সঙ্গে আমার বিয়ে দিয়ে দিল। মরণাপন্ন ঠাকুমা নাতজামাই দেখে যাবেন এই অজুহাতের পতাকা উড়িয়ে দিল আমার সামনে। আমার আরও পড়াশুনার ইচ্ছে হারিয়ে গেলো চিরতরে। ধুমধাম করে আমার বিয়ে হল। মৈনাক কিন্তু বিয়েতে এলোই না। ভেবেছিলাম ওকে দেখিয়ে দেবো, দ্যাখ মৈনাক, তুই আলোর গড়িয়ে পড়া দেখিস। আর এই রাজপুত্তুর আমাকে দেখেই নিয়ে যাচ্ছে, এখন আমি নিজেই আলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ব ওর রাজপ্রাসাদে।

সত্যিই রাজপুত্র আমার স্বামী পুলক। অত্যন্ত সুপুরুষ। ধবধবে গায়ের রঙ। মাসছয়েক পুলক আমাকে চোখে হারাত। ওর ভালোবাসা আর আবেগে ভেসে যেতাম আমি। তারপরই বুঝতে পারি পুলক ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। সেইসময় তার সঙ্গীসাথি আর সখিদের প্রতিই ছিল বিশেষ নজর, আমি সেখানে শুধুই আলো। সেই আলোর রোশনাই কুড়িয়ে নেবার মন ছিল না পুলকের।
দু’বছর যেতে-না-যেতেই ফুটফুটে মেয়ে হল আমার। রাজপুত্র পুলকের ভালোবাসার আবেশের অপেক্ষায় থেকে থেকে যখন আমার সমস্ত আকাশ মেঘে ঢেকে যাচ্ছিল, তখনই অদ্রিজা এলো আমার কোলে। আমি আমার মেয়ে অদ্রিজাকে, আমার আত্মজা তুলিকে নিয়েই সমস্ত জগৎ গড়ে তুলতে লাগলাম। আস্তে আস্তে ভুলেই গেলাম মৈনাকের কথা।

আজ অনেকদিন পরে এখানে এসে মৈনাককে দেখতে পেলাম। অটো থেকে নেমে মোড় থেকে হাঁটাপথে বাড়ির দিকে যাচ্ছিলাম। নিজেদের বাড়ির সামনেই ও তখন দাঁড়িয়ে আছে। দেখলাম একটা ঝকঝকে দোতলা বাড়ি। তার পাশে বড্ড বেমানান একটা টিনের চাল-দেওয়া বেড়ার ঘর। তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে সে। দেখে ভালো লাগছিল খুব। মৈনাকদের এখন দোতলা বাড়ি হয়েছে।
আমার দিকে তখন মৈনাকের চোখ। যেন ও জানত আমি আজ আসব এইসময়ে। তারই প্রতীক্ষা করছিল। কাছাকাছি আসতেই চোখ পড়ল মৈনাকের দিকে। সারা মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, কেমন আছিস ? ও অবলীলায় বলল, ভালো থাকার চেষ্টা করছি। আমার সাত বছরের মেয়ের গাল টিপে আদর করে দিল মৈনাক। মেয়ে তো ভয়ে আমাকে আঁকড়ে ধরে রইল। একমুখ দাড়িগোঁফ থাকা লোককে বরাবরই তুলি ভয় পায়।

কথায় কথায় জানতে চাইলাম বিয়ে করিসনি কেন ? ও হা হা করে হেসে উঠল। যেন কী এক অসম্ভব কথা বলে ফেলেছি। তারপর আচমকাই হাসি থামিয়ে দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। অনেক, অনেকক্ষণ। আমার সারা শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছিল।

~ কে বিয়ে করবে আমায় ? তুই তো জানিস আমি পাগল। কোনো মেয়ে কি আমাকে বিয়ে করতে রাজি হবে, বল ?

একথায় কোথায় যেন বিষাদ লুকিয়ে আছে। কিন্তু মৈনাক অবাক করে হো হো হেসে উঠল। আমি বিস্ময়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। জানতে চাইল বর কোথায় ? আসেনি ? আমি বললাম, নারে, আসতে পারেনি। ব্যবসায়ী মানুষ, খুব ব্যস্ত থাকে। আর মনে মনে বললাম, আমার রাজপুত্তুরের অত সময় কোথায় বল ? সারাদিন ব্যবসা আর তার সখাসখি নিয়েই তার সময় কেটে যায় ! কথা ঘোরানোর জন্যই জিজ্ঞাসা করি, মা কেমন আছেন ?

~ মা বোধহয় ভালোই আছে বুঝলি। আমার কাছে থাকে না তো, তাই ঠিকঠাক বলতে পারব না।
~ তোর কাছে থাকে না ? তাহলে কোথায় থাকে ?
~ বাবা মারা গেছে জানিস নিশ্চয়ই ? বাবা চলে যাওয়ার পর আমি আর মা থাকতাম। বাবার পেনশনের টাকা আর আমার আঁকার টিউশনির টাকায় ভালোই চলে যাচ্ছিল। কিন্তু আমি তো পাগল। আমার মাথার গোলমাল আছে। তাই আমার সঙ্গে কি মায়ের থাকা মানায় ? বোন আর ভগ্নিপতি এসে বাড়ির অর্ধেকটা বিক্রি করে দিল। আর মাকে নিয়ে গেলো ওদের কাছে। বছর খানেক হল আমি একাই থাকি এই ঘরে।

~ আর এই দোতলাটা ?
~ যারা আমাদের আধখানা জমিবাড়ি কিনেছে এটা তাদের। আগেরটা ভেঙেচুরে নতুন করে বানিয়েছে। আয় না বিকেলে আমার ছোট্ট ঘরে। একা থাকি আর পাগল বলে ভয় পাস না। হা হা হা …

ওর সঙ্গে কথা বলে আমার সমস্ত তছনছ হয়ে গেল। একদিন আমার চুল থেকে গড়িয়ে পড়া আলোর কুচি কুড়িয়ে নিতিস তুই। আজ আমি নিজেই দেখ কেমন গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছি। আমাকে কুড়িয়ে নে মৈনাক। মনে মনে কথাগুলো বলে আমি মেয়ের হাত ধরে চললাম আমাদের বাড়ির দিকে। একটু দূর থেকে ভেসে এলো মৈনাকের কণ্ঠ, আসিস কিন্তু। অপেক্ষা করব তোর জন্য।

আলোর উৎসব

মৈনাক বসে আছে নিজের ঘরের চৌকিতে। একপাশে গুটিয়ে রাখা বিছানা-বালিশ। মেঝেতে পড়ে আছে রঙ তুলি কাগজ। একচিলতে বারান্দার এক কোণে রান্নাবান্নার সরঞ্জাম। স্টোভ, কালি বসে যাওয়া কড়াই, ছোট্ট একটা হাঁড়ি। কড়াইতে একটা খুন্তি আর হাতা। পাশে আধ বালতি জল। মেঝেয় পড়ে আছে খাওয়ার পরের এঁটো থালা আর গ্লাশ।
মৈনাক বসে বসে একমনে একটা সাদা কাগজে পেন্সিল দিয়ে আঁকিবুকি কাটছে। কোনো নারীমূর্তি ফুটিয়ে তুলতে চাইছে যেন। সেইসময় কৌতূহল আর আবেগ চেপে রাখতে না-পেরে গড়িয়ে যাওয়া বিকেলে মৈনাকের দরজায় উঁকি মারল শ্রীমতি। মৈনাক খেয়াল করেনি। দরজার দিকে পিছন ফিরে বসেছিল তখন। মৈনাকের ঘরে আলতো পায়ের ছোঁয়া পড়ল শ্রীমতির। ধীর পদক্ষেপে তার ঠিক পিছনে এসে দাঁড়াল। তারপর থরথর করে কাঁপতে থাকা হাত রাখল তার কাঁধে।
মৈনাক যেন জানত শ্রীমতি আসবে। সেভাবেই মুখটা ঘুরিয়ে একবার দেখে নিল। তারপর ডান হাত রাখল শ্রীমতির হাতের উপর। শরীরজুড়ে দামামা বেজে উঠল, হাওয়া এসে উড়িয়ে নিয়ে গেলো সমস্ত হিসাবের খাতার পাতা। মৈনাককে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল শ্রীমতি।
“আমার শ্রী। আমার চিরদিনের শ্রী।” আবেগে গলা ধরে এলো মৈনাকের। শ্রীর দু’চোখে জলধারা।

বাইরে তখন ঝুপঝুপ করে সন্ধ্যা পেরিয়ে যাচ্ছে রাতের গভীরে। স্ট্রিট লাইটের আলোর আভাস ছিটকে আসছে মৈনাকের ঘরে। তবু চাপচাপ অন্ধকার এখানে-ওখানে থাবা পেতে বসে আছে।

~ ঘরে আলো জ্বালবি না ?
~ তুই তো আমার আলো। তুই থাকলে আলোর প্রয়োজন কি শ্রী ?
~ পাগল একটা !

শ্রীর খিলখিল হাসি ছড়িয়ে পড়ে ঘরের মেঝেতে। মৈনাক মাটিতে বসে পড়ে। কুড়িয়ে নিতে থাকে মুঠো মুঠো আলো। যে আলো ছড়িয়ে পড়ছে শ্রীর মুখ থেকে, বুক থেকে, চুল থেকে, সারা শরীর থেকে। নীচু হয়ে বসে শ্রীমতি। মৈনাকের দু’কাঁধ ধরে ধীরে ধীরে টেনে তোলে তাকে। তারপর দুই শরীর মিলে যায়।

নিকষ অন্ধকার যেন গিলে নিতে চাইছে সমস্ত চরাচরকে। শুধু মৈনাকের ঘর ভেসে যাচ্ছে অপার্থিব আলোয়। এই ছোট্ট ঘরে আজ আলোর উৎসব। কোথাও দ্রিমি দ্রিমি তালে বেজে চলেছে মাদল। সেই ছন্দে নেচে উঠছে একাকার দুই শরীর।

ফেসবুক মন্তব্য