আজব ব্যামো

অঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়

ফূর্তিবাজ মানুষ আমি, হেসেখেলে জীবনটাকে কাটিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। হিসেব করে চলা ধাতে নেই, বস্তুত হিসেব ব্যাপারটাতেই আমার বিষম আতঙ্ক। ওই ভয়ে অঙ্ক সাবজেক্টটাকে আজীবন এড়িয়ে চলেছি! হ্যাঁ, ইস্কুলে সায়েন্স ছিল বটে। আসলে আমাদের মধ্যবিত্ত ফ্যামেলিতে পড়াশোনায় ভালো হয়েছো কি সায়েন্সের জাঁতাকলে জুড়ে দেবে। তা স্কুলে থাকতে বাবা-মার কথায় সায়েন্স পড়তে বাধ্য হয়েছি, কেঁদে-কঁকিয়ে অঙ্ক কষেছি, লেটার ফেটার নিয়ে পাশও করেছি। কিন্তু কলেজে উঠে বাঘের গোঁ ধরি, আর অঙ্ক না! সে কী অশান্তি বাড়িতে, রীতিমত ধুন্ধুমার! এত ভালো রেজাল্ট, আর কিনা সায়েন্স পড়বে না? মুখ্যু, ঘোর মুখ্যু! বড়দের কথা শোনো, ওসব সৌখিন ইচ্ছে ছাড়ো! আমি জেদী ঘোড়ার মত অনড়। অতঃপর অবাধ্য, দুর্বিনীত, উদ্ধত, বেপরোয়া একগুঁয়ে, ঘাড়ুয়া, ইনসোলেন্ট প্রভৃতি তৎসম তদ্ভব দেশি বিদেশি নানাবিধ বিশেষণে বিভূষিত হওয়া। তথাপি আর্টস নিয়েই কলেজে ভর্তি। বাড়িতে সবাই শোকস্তব্ধ! মেয়েটাকে মানুষ করতে পারলাম না, একেবারে বয়ে গেলো, আর্টসে চলে গেলো!!
জেদী ঘোড়া থেকে হয়ে গেলাম মার্কা মারা কালো ঘোড়া। ছোটরা আমায় দেখে পালিয়ে যায় পাছে আর্টসের ছোঁয়াচ লাগে, পারিবারিক অনুষ্ঠানে আমি ব্যানড কমোডিটি, লজ্জায় বাবামার মাথা হেঁট। বুদ্ধিভ্রষ্ট তো বটেই সেইসঙ্গে স্বাধীনচেতা বলে বদনাম জোটে। আমাদের সংসারে ওই বয়সের মেয়েদের নিজস্ব মতামত থাকা অপরাধ ছিল। কিন্তু যতোই দুর্নাম হোক, অঙ্ক তো কষতে হলো না! সেই আনন্দে লাফাতে লাফাতে কলেজ পাশ, এমএ-টাও। রেজাল্ট যত ভালোই হোক, সায়েন্স তো না অতএব বাবা-মার দুঃখের কাঁটাটা ফুটেই থাকে। অতঃপর চাকরি পর্ব। এখানেও গেড়ো। আমাদের মত মধ্যবিত্ত পরিবারে মেয়েদের জন্য ভদ্রস্থ চাকরি মাত্র দুটো – ব্যাঙ্ক নয়তো শিক্ষকতা। আমি আর্ট কলেজে পড়তে চাইলাম। বাবা বজ্রাহত। কী পাপ করেছিলাম হে ঈশ্বর যে মেয়েটা এমন তৈরি হলো? তবে এয়ারহোস্টেস হই? বাবা এবার ধিক্কার দেবারও ভাষা খুঁজে পেলো না। পরদিনই ব্যাঙ্কিং পরীক্ষার একগাদা বই এনে ধরিয়ে দিলো। নাও, তৈরি হও। বন্ধুরা অনেকে ব্যাঙ্কের পরীক্ষা দিচ্ছিল কিন্তু আমার মন যে ওদিকে টানেই না! এ তো শুধু একটা পরীক্ষায় বসা না, জীবনের মত সংখ্যার সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা! যে নিজের ফোন নম্বর মনে রাখতে পারে না, সে সংখ্যার সঙ্গে সম্পর্ক পাতাবে? যে শব্দের প্রেমে হাবুডুবু সে যোগবিয়োগগুণভাগের সঙ্গে সহবাস করবে? ব্যাঙ্কের চাকরি আউট। আরেকবার বাবামা-র বুক ভাঙলো। হাতে রইলো ওই পেন্সিল.....মানে শিক্ষকতা। শুরু হলো অধ্যাপনা।
তারপর থেকে সুখেদুঃখে অনেকগুলো বছর কেটে গেলো । অনেক উথ্থানপতন, পরিবর্তন-বিবর্তন, অনেক টানাহ্যাঁচড়া ঘটলেও ভাগ্যবলে ধোপার হিসেব ছাড়া আর কোনওরকম সংখ্যাঘটিত বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হয়নি!
বেশ নির্বিঘ্নে দিন কাটছিলো এমন সময় উদয় হলো ক্রেডিট কার্ড, সঙ্গে হুলবিদ্ধ করতে পিন। পিনের যাতণা সইতে না সইতে হাজির কম্পিউটার, অর্থাৎ ক্রনিক যাতণা! ইন্টারনেটের কল্যাণে নেট ব্যাঙ্কিং, ফোন ব্যাঙ্কিং, লিঙ্কড ইন, ফেসবুক, ট্যুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদির বান ডাকলো, আছড়ে পড়লো পাসওয়ার্ডের সুনামি, লন্ডভন্ড হয়ে গেল আমার শান্ত নিস্তরঙ্গ জীবন। এলো অজস্র অ্যাপ এবং অ্যাপ-পিছু খুনে পাসওয়ার্ডরা । গোদের ওপর বিষফোঁড়া লাগাতার সতর্কবাণী, সাবধান! সাবধান! সবজায়গায় এক পাসওয়ার্ড কদাপি নয়! বানানো চাই নতুন নতুন জটিল পাসওয়ার্ড, তাতে এই চাই ওই চাই, নম্বর চাই বর্ণ চাই, উচ্চবর্ণ চাই অধোবর্ণ চাই! চাপের পর চাপ এবং সবচেয়ে বড় চাপ, সেইসব পাসওয়ার্ড মনে রাখা! আমি কি শকুন্তলা দেবী? আমি বলে নিজের মোবাইল নম্বরই মনে রাখতে পারি না.....এতগুলো পাসওয়ার্ড কি করে মনে রাখবো? রোজ পাসওয়ার্ড ভুলি রোজ নতুন পাসওয়ার্ড বানাই, ফের সেটা ভুলে যাই। লোয়ার কেস আপার কেস স্টার ডলার হ্যাশ অ্যান্ড চিহ্নরা ক্রমাগত জায়গা বদল করে, তালগোল পাকায়। বিভ্রান্ত হয়ে প্রতিকার খুঁজি। পুরনোদিনের মতো কি ডায়রিতে লিখে রাখবো? কিন্তু ওটা নিয়ে সবসময় ঘুরবো কি করে? ফোন বা ল্যাপটপে সেভ করাও বিপজ্জনক, যদি খোওয়া যায়? অন্য কারো হাতে পড়ে? তবে তো একেবারে সব্বোনাশের মাথায় পা! একটাই উপায়, যাবতীয় পাসওয়ার্ড একটা ফাইলে রাখো আর সেই ফাইলটায় সুরক্ষাকবচ পরাও কঠিন একটা পাসওয়ার্ডে। কিন্তু সে তো আরেক টেনশন! এই মাস্টার পাসওয়ার্ড যদি কোনওভাবে ভুলে যাই বা হ্যাক্ড হয়??!
চিন্তায় আমার রাতের ঘুম উধাও। পাসওয়ার্ড ছাড়া গতি নেই আর সংখ্যা ছাডা পাসওয়ার্ড নেই! এত যুদ্ধ সংখ্যাদের দূরে রাখতে, সেই সংখ্যাদের হাতে আজ আমি আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। জড়ায়ে আছে বাধা ছাড়ায়ে যেতে চাই ছাড়াতে গেলে ব্যথা বাজে। এ বিপর্যয় থেকে কে উদ্ধার করবে? এই আজব ব্যামো কে নিরাময় করবে?
প্র্যাক্টো ঘেঁটে বেশ নামী ও দামি একজন থেরাপিস্টের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করলাম। ইনি আবার হ্যালো ...মানে হোমিও প্লাস অ্যালো। অনেক দেখেশুনে, গুচ্ছের টেস্টফেস্ট করার পর রায় দিলেন, আপনার পাসওয়ার্ডাইটিস হয়েছে।
সেটা আবার কি?
লাইফস্টাইল ডিজীজ। অনেকক্ষণ অনলাইন থাকেন নিশ্চই?
আমার তো অনলাইনেই কাজ।
ঠিক ধরেছি। আজকাল খুব পাচ্ছি এই কেস!
এর ট্রিটমেন্ট নেই?
অফ কোর্স আছে! কর্ণাটক রিসার্চ সেন্টার রিসেন্টলি এর একটা হার্বাল ওষুধ বের করেছে। খুব ইফেক্টিভ। নো সাইড ইফেক্টস। দু মাসে সেরে যাবে।
নাম কি? কোথায় পাবো?
নেটে গিয়ে পাসওয়ার্ডাইটিস অ্যাপ ডাউনলোড করুন। ওটা একমাত্র অনলাইনেই পাওয়া যায়।

ফেসবুক মন্তব্য