মফঃস্বলের মেঘ-বৃষ্টি-রোদ্দুর

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়


মফঃস্বলের আলোর রঙ শহরের আলোর থেকে বিলকুল আলাদা। বিশেষ করে যখন বিকেল বেলা আকাশ কালো হয়ে বৃষ্টি আসে। অদ্ভুত এক মায়াবী আলোয় চারিদিক ভরে যায়। আকাশে ঘন মেঘের শাসন। তার মধ্যেই রেনি-ডের স্কুল-ছুটি বাচ্চাদের মত এক ঝাঁক রোদ্দুর এসে মন ভালো করে দিয়ে যায়। বৃষ্টি এলেই রকওলা বাড়ির সামনের খোলা নালি দিয়ে জল দৌড়োয়। পাঁউরুটি কিনে ফেরার সময় মাথা বাঁচিয়ে একজন মধ্যবয়স্ক লোক ঝুল বারান্দার নিচে উঠে পড়ে। চুল ভিজলে সর্দি লাগবে, ঘরের মানুষ বকুনি দেবে। তার হাতে খবরে কাগজের ঠোঙায় মুড়ি চানাচুর, বৈকালিক বিনোদন। পিচ রাস্তার ওপর বৃষ্টির ফুল ফোটানো দেখতে দেখতে সে মুড়ি চিবোয়। চানাচুরের শেষ দানাটি পর্যন্ত আঙ্গুল দিয়ে তুলে মুখে পোরে। ঠোঙায় লেগে থাকা বিজ্ঞাপনের মেয়েটির হিম-শীতল হাসির দিকে এক মুহূর্ত চেয়ে দেখে। তারপর ঠোঙাটি তালগোল পাকিয়ে ছুঁড়ে দেয় নালার জলে।

পাকানো ঠোঙার মধ্যে ধর্মগুরুর ইস্তিরি করা গেরুয়া জোব্বা কুঁচকে পচা সফেদা হয়ে যায়। সুযোগ পেয়ে জনদরদী নেতার সঙ্গে মাথাপিছু রুটি-মাংস, পাঁচশ টাকা বরাত দিয়ে ময়দানে ডেকে আনা আমজনতা গা ঘষে নেয়। ফিল্মস্টার অলীক কুমারের সাদা পাতলুনে গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাসের মকবুল জোকারের মুখ ধোয়া রঙ লেগে যায়, যাঃ! অলীক কুমার বিরক্তিতে নাক কোঁচকায়। মকবুলের তাতে বয়ে গেছে! সে পাত্তাই দেয় না। এদিক ওদিক ধাক্কা খেতে খেতে ভেসে যায় রাষ্ট্রনেতা, অভিনেতা, ধর্মগুরু ও দেশের অপামর নাগরিক। নোয়ার নৌকাতেও বোধ হয় এত পশু ধরত না। বৃষ্টি কমে আসছে। পাশের দোকান ঘরগুলোয় আলো জ্বলে উঠছে একটা দুটো। ফুটপাথের খানাখন্দ নাবাল জমিতে আলোর ছায়া পড়ছে। জমে থাকা আলোজল বাঁচিয়ে লোকটি মধ্যবিত্ত সংসারের দিকে পা বাড়ায়।

খোলা জমি, ঝোপঝাড় পাশ কাটিয়ে, পুকুরধারে একটা একতলা বাড়ি, সামনে বারান্দা। গ্রীলের দরজার পাশে দেওয়ালে কলিং বেল। গ্রীলের মধ্যে দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ঠিক তিনবার কলিং বেল বাজাল সম্বিৎ। আচমকা শব্দ শুনে রাণু চমকে উঠল। ছুঁচের মাথায় তার আঙ্গুলে এক বিন্দু রক্ত দুলে উঠল। সুতোর রীলটা হাত লেগে গড়িয়ে গেল মেহগনি টেবিলের নিচে। টানলে সুতো খুলে আসছে, রাণু নিচু হল, কিন্তু খুঁজে পেল না। অন্ধকার হয়ে আসছে। বিকেল ফুরোতে দেরি নেই। জানালার শার্শিতে জামরুল গাছের ছায়া দীর্ঘ হচ্ছে। সেলাইফোঁড় সরিয়ে রেখে, তাড়াতাড়ি করে উঠে গিয়ে স্যুইচ টিপে ঘরের, বারান্দার আলো জ্বেলে দিল রাণু। দরজা খুলে দিতে সম্বিৎ ঘরে ঢুকে হাতের পাঁউরুটিটা ডাইনিং টেবিলে নামিয়ে রাখল। রাণু চায়ের জল বসানোর জন্য রান্নাঘরে ঢুকল। সম্বিৎ পিছন পিছন এসে দাঁড়াল। পাঞ্জাবীর পকেট থেকে বার করে, কিচেন প্ল্যাটফর্মের ওপর একটা কাগজের ঠোঙা নামিয়ে রাখল। বলল, "তোমার জন্য চানাচুর এনেছি।"

রাণু মুখ টিপে হাসল। পাঁউরুটি আনতে গেলে সম্বিৎ ঠিক মনে করে চানাচুর নিয়ে আসে রাণুর জন্যে। রাণু চানাচুর খেতে ভালোবাসে। আজকাল বেশি খেলে অম্বল হয়, গলা জ্বলে। চায়ের সঙ্গে দু এক টুকরো তুলে মুখে দেয়। সম্বিৎকে মুড়ির সঙ্গে আচারের তেল দিয়ে মেখে দেয়। সন্ধ্যেবেলা মুড়ি না খেলে সম্বিতের পোষায় না। তার মুড়ি দিয়ে নাড়ি কাটা। আজ মনে হচ্ছে রশিদের ভেলপুরির স্টল থেকে একপ্রস্থ মুড়ি চানাচুর খেয়ে এসেছে। ঠোঁটের কোণায় একদানা সাদা মুড়ি লেগে রয়েছে। রাণুর মনে হল, আহা! এইসব ছোট ছোট লোভ নিয়ে মানুষটা বেশ চনমনে হয়ে বেঁচে থাকুক। লোভগুলো ফুরিয়ে গেলে মানুষটার হাঁটাচলা বন্ধ হয়ে যাবে।
মৌটুসি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের হোস্টেলে চলে যাবার পর থেকে সম্বিৎ রাণুর সঙ্গে এক বিছানায় শোয়। রাত্তিরে রাণুর গায়ে হাত রেখে না শুলে আজকাল নাকি বাবুর ঘুম আসে না। ভারী হাতের চাপে মাঝেমাঝে রাণুর দম বন্ধ হয়ে আসে। তবু সরিয়ে দেয় না, মায়া হয়। বহুদিন দূরে ঠেলে রেখেছিল। দশ বছর আগে যখন রণজিৎ মারা যায়, রাণু তখন বিয়াল্লিশ, মৌটুসি সাত। বেশি বয়সের সন্তান, ডাক্তার-বদ্যি, তাগা-তাবিজ করে হাল ছেড়ে দিয়েছিল প্রায়। বিয়ের বারো বছর পরে মেয়ে পেটে এল।

রণজিৎ নিজেও কম অবাক হয়নি। মুখে কিছু বলেনি। কিন্তু একটা সন্দেহ ছিলই ভিতরে ভিতরে। কখনও কখনও মেয়ের মুখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকত... রাণু কাঁটা হয়ে যেত। রণজিৎ আসানসোল গিয়েছিল অফিসের কাজে। ফেরার সময় হাইওয়ের ওপর কার এক্সিডেন্টে স্পট ডেড। উনিশ বছরের সম্পর্ক। রাণু কষ্ট পায়নি এমন নয়। মানুষটা সকালে ছিল, সন্ধেবেলা নেই। মনের মধ্যে অনেকখানি হা হা খালি জায়গা। আবার স্বস্তিও পেয়েছিল। স্বীকার করতে খারাপ লাগে, তবু... জবাবদিহি করার দায় থেকে মুক্তি পেয়েছিল।
চায়ে চুমুক দিয়ে সম্বিৎ গম্ভীর গলায় বলল, “ভাবছি তোমায় আর রাণুবৌদি বলে ডাকব না...।”

রাণু বলল, “সেকী? নাম ধরে ডাকবে? তোমার থেকে আমি তিন বছরের বড় না?”

“না, না, নাম ধরে নয়... ধর যদি তোমায় ইষ্টিকুটুম পাখি বলে ডাকি বা ঝরা শিউলিফুল...।”

“থাক, তোমায় আর অত কাব্যি করতে হবে না। আমাদের মালতীর মা’র নাক দিয়ে শিকনি গড়ানো, ছোট মেয়েটার নাম শিউলি। ভেবেচিন্তে নাম বার করলে বটে! শোন, কাল মিঠু আসছে, ওর সামনে সাবধানে কথা বোলো। মেয়ে বড় হয়েছে।”

বাবা মারা যাবার পর মৌটুসি... মিঠু কচি শশালতার মত মাকে আঁকড়ে ধরেছিল। সারাদিন গায়ে গায়ে লেগে থাকত। রাতে ঘুমের মধ্যে চমকে জেগে উঠত। রাণু তাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে শুত। সম্বিতের কাছে আসার কোনো সুযোগ ছিল না। মিঠু যেন মাকে ছোটকার কাছ থেকে আড়াল করে রাখত। রাণুর মাঝেমধ্যে সন্দেহ হত মিঠুও কিছু আঁচ পেয়েছে। পাড়া-প্রতিবেশী আত্মীয়-স্বজন পাঁচ কথা বলা শুরু করেছিল। অবশ্য সে সব আড়ালে। রাণুর বাপের বাড়ির দিকে তেমন কেউ ছিল না। শ্বশুর বাড়ির দিকের আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক চিরকালই আলগা আলগা। রণজিতের মৃত্যুর পর সেগুলোও মরে-হেজে গেল। সম্পর্ক বাঁচিয়ে রাখার জন্য সার-জল দিতে হয়। রাণু সম্বিৎ দুজনেই তাতে খুব উৎসাহ দেখায়নি।

উত্তর কলকাতার ভাড়াবাড়ি ছেড়ে তিনজনে শহরতলীর এই বাড়িটায় চলে এল। এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক স্ত্রীর মৃত্যুর পর আমেরিকায় মেয়ের কাছে চলে যাচ্ছিলেন। সস্তায় পেয়ে সম্বিৎ কিনে নিল। পুরোন নিজস্ব বাড়ি ভেঙে অনেকগুলো ফ্ল্যাটবাড়ি উঠেছে কাছাকাছি। লোকজন নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত, খুব একটা গায়ে পড়া নয়। দিন কেটে যাচ্ছিল। রাণুর এক সময় মনে হত সম্বিতের জীবনটা সে নষ্ট করে দিচ্ছে। কিন্তু মুখ ফুটে অন্য কোনো মেয়েকে বিয়ে করার কথা বলতে পারেনি সম্বিৎকে। ভালবাসার মানুষের ওপর দখল ছেড়ে দেওয়া সহজ নয়। তাছাড়া অন্য স্বার্থও ছিল। যদি সম্বিতের বিয়ের পর এই বাড়িতে কোনো কারণে থাকতে না পারে, মেয়ের হাত ধরে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? সম্বিতের চালচলনে অবশ্য আক্ষেপ বা আফসোস ছিল না। তার চাহিদা কম। সে রাণুর কাছাকাছি থাকতে পারলেই খুশি।

মুশকিল হচ্ছিল মৌটুসিকে নিয়ে। বিশেষ করে এডোলেসেন্সে পা রাখার পর। ছোটকাকে ভালবাসে না এমন নয়। কিন্তু তাকে মায়ের কাছে ঘেঁষতে দেবে না। একটা অদ্ভুত মানসিকতা! মা শুধু আমার একার। তোমার কেউ নয়। শোয়ার ঘর আলাদা, বসার ঘরের ডিভানে সম্বিৎ আর রাণু কখনও পাশাপাশি বসলে, ঠেলে-গুঁজে দুজনের মাঝখানে এসে বসত। কখনও অসাবধানে ছোটকার সামনে রাণুর বুকের কাপড় সরে গেলে কঠিন চোখে তাকাত। যেন রাণু ইচ্ছা করে...।

মৌটুসি পড়াশনোয় ব্রিলিয়ান্ট। টিউশন লাগত না। অঙ্ক-টঙ্ক যা বোঝার ছোটকার কাছেই বুঝে নিত। তখন সে ছোটকার বাধ্য মেয়ে। ছোটকাও অসীম ধৈর্য নিয়ে ম্যাথস ফিজিক্স বুঝিয়ে দিচ্ছে। মোদ্দা ব্যাপার হল, মৌটুসি ছোটকার সঙ্গে চকোলেট ভাগ করে খাবে, কিন্তু মাকে ভাগ করে নেবে না। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজটা ভাল, কিন্তু রেসিডেনশিয়াল। হোস্টেলে থেকে পড়াশুনো করতে হবে বলে মিঠু প্রথমে যেতে চাইছিল না। অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে পাঠাতে হয়েছিল মেয়েকে। প্রথম প্রথম ফোন করে কান্নাকাটি করত। বছর দুয়েক কাটানোর পর এখন অনেকটা ধাতস্থ হয়েছে। সেমেস্টার শেষ, সে কাল ফিরবে। রাণু ভাবল, ওদের শোবার ঘর থেকে সম্বিতের বালিশ চাদর পাশের ঘরে সরিয়ে দিতে হবে। মেয়ের চোখে যেন কিছু অসৈরণ ধরা না পড়ে।

সম্বিৎও জানে মিঠু যতদিন বাড়িতে থাকবে ততদিন খাট বিছানা শোবার ঘর আলাদা। রাণুকে ছোঁয়া যাবেনা। রাণু পাশের ঘরে সম্বিতের বিছানা করে দিচ্ছিল। সম্বিৎ মৃদু আপত্তি জানালো, “আজকে রাত্তিরটা তো একসাথে শুতে পারতাম।"

রাণু ভুরু তুলল, “না, মেয়ে কিছু সন্দেহ করলে আমার লজ্জায় মাথা কাটা যাবে।”

সম্বিৎ বলল, “কতদিন লুকিয়ে রাখবে মেয়ের কাছ থেকে? বড় হয়েছে, ঠিক বুঝবে।"

“ও কোনদিন মেনে নেবে না।”

সম্বিৎ কিছু বলল না, চুপ করে রইল।


ছ’মাস বাড়ির বাইরে থেকেই মৌটুসি অনেক বদলে গেছে। অন্তত রাণুর তাই মনে হল। গাবলু গুবলু গাল ঝরে গিয়ে মুখের মধ্যে একটা শক্ত ভাব এসেছে। গ্রীলের দরজা খুলতেই ‘মা’ বলে বুকের মধ্যে ঝাঁপিয়ে এল বটে কিন্তু পরক্ষণেই মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সম্বিৎ ষ্টেশনে গিয়েছিল মৌটুসিকে নিয়ে আসার জন্য। রিক্সার ভাড়া মিটিয়ে মেয়ের মালপত্র ভিতরে এনে রাখল। মেয়ে মোবাইলে চোখ গেঁথে বসার ঘরের সোফায় বসে রইল। রাণু বলল, “কী রে? জামাকাপড় ছাড়, হাতমুখ ধো... কিছু খেতে দিই। মুখটা তো শুকিয়ে গেছে।”

মৌটুসি বলল, “আঃ! মা! এই তোমার শুরু হল। ট্রেনে ব্রেকফাস্ট খেয়েছি... এখন আর কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না।”

রাণু আর জোর করল না। উল্টো দিকের সোফায় বসে চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগল। অনেক রোগা হয়ে গেছে মেয়ে। চোখের কোল বসে গেছে। চুলগুলো রুখু-সুখু। কোনোমতে পিছনে টেনে একটা হেয়ার ব্যান্ড জড়ানো। মুখটা মায়ায় ভরা, সারা শরীরে তারুণ্যের লাবণ্য। রাণু বলল, “হ্যাঁ রে, সাথে কেউ এল? কোন বন্ধু... এতটা দূরের পথ...।”

মৌটুসি মোবাইল থেকে মুখ না সরিয়েই বলল, “কে আবার আসবে? ও হ্যাঁ, প্রোফেসর মিত্র ছিলেন... একই কোচে... কোলকাতা ফিরছিলেন, ছুটিতে। গল্প করতে করতে চলে এলাম।”

“অন্যান্য বন্ধুরা...?”

“সবাই এদিক ওদিক... পলা আর রিচা কালকের ট্রেন ধরবে... সায়ন ফ্লাইটে... উঃ! দাঁড়াও না মা, একটা ইমেল পাঠিয়ে দিই। তারপর তোমার সব কোশ্চেনের জবাব দেব।”

রাণু উঠে গেল। সকালবেলা বাজার থেকে চিংড়ি মাছ এনেছে সম্বিৎ। মেয়েটা চিংড়ির মালাইকারী খেতে ভালোবাসে। চিংড়িগুলোর মাথা পরিষ্কার করতে হবে, নারকোল বেটে তার থেকে দুধ বার করতে হবে। অনেক কাজ... আজ আশ মিটিয়ে রান্না করবে রাণু।

খানিকক্ষণ পরে ফিরে এসে দেখল মৌটুসি ট্রেনের পোষাকেই বসার ঘরের ডিভানের ওপর শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। সম্বিৎ পাশে সোফার ওপর খবরে কাগজ মুখে দিয়ে বসে আছে। রাণু গজগজ করল, “মেয়েটা কিচ্ছুটি না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল, দেখবে তো?”

সম্বিৎ অসহায় গলায় বলল, “বারণ করেছিলাম, তোমার মেয়ে শুনলে তো!”

অনেক ডাকাডাকিতেও মৌটুসি উঠল না। দুপুর বেলা উঠে কোনোমতে চান খাওয়া সেরে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। যেন ছ’মাসের বাকী থাকা ঘুম এক দিনেই পুষিয়ে নেবে। সন্ধেবেলা এক কাপ বোর্নভিটা বানিয়ে এনে রাণু মৌটুসিকে ডাকল, “মিঠু ওঠ, আর কত ঘুমোবি?”

মৌটুসি উঠে চোখে মুখে জল দিয়ে এসে বসল। রাণু নিজের আর সম্বিতের জন্য চা বানিয়ে আনল। বোর্নভিটায় চুমুক দিয়ে সিরিয়াস সিরিয়াস মুখ করে মৌটুসি বলল, “মা, ছোটকা... তোমাদের সঙ্গে একটা দরকারি কথা আছে।”

সম্বিৎ মুখ তুলে তাকাল। রাণু জিজ্ঞেস করল, “কী কথা?”

মৌটুসি বলল, “আমি একদিন প্রোফেসর মিত্রকে বাড়িতে ডাকতে চাই। তোমাদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব।”

রাণু ভুরু কোঁচাকাল, “প্রোফেসর মিত্র... কেন... হঠাৎ?”

মৌটুসি বলল, “কেন মানুষ কি মানুষকে ডাকে না? তাছাড়া...।”

“তাছাড়া কী?”

মৌটুসির গালে যেন রক্তের ছোঁয়া লাগল, “প্রোফেসর মিত্রকে আমার ভাল লাগে...।”

রাণু আঁতকে উঠল, “ভাল লাগে মানে? কত বয়স ভদ্রলোকের?”

“চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ হবে, জিজ্ঞেস করিনি।”

রাণু অজান্তেই সম্বিতের হাত চেপে ধরল। কাতর গলায় বলল, “এ তুই কী বলছিস মিঠু, তোর তিনগুণ বয়সের একজন লোককে তোর ভাল লাগে...।”

সম্বিৎ রাণুকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “আঃ! বৌদি, দাঁড়াও না, মিঠু কী বলছে না বুঝেই... মিঠু তুই কী বলতে চাস পরিষ্কার করে বল।”

মৌটুসি গোঁজ হয়ে বলল, “পরিষ্কার করে বলার কী আছে? ভাল লাগে, ব্যাস!”

সম্বিৎ বলল, “আহা, ভাল তো লাগতেই পারে, তাতে কী?”

মৌটুসি বলল, “আমি কি বলেছি, তাতে কিছু? আমি শুধু একদিন ওনাকে বাড়িতে ডেকে লাঞ্চ খাওয়াতে চাই।”

রাণু তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “ভদ্রলোকের বৌ বাচ্চা নেই?”

মৌটুসি খোলা জানলার বাইরে অন্ধকারে চোখ রাখল, “ছিল... ওনার ওয়াইফ আর তিন বছরের ছেলে বছর আষ্টেক আগে প্লেন ক্র্যাশে মারা যায়। প্লেনটা নিউ ইয়র্কের বাফেলোর ওপর ভেঙে পড়েছিল। সব প্যাসেঞ্জার আর ক্রু মারা যায়। তারপরই প্রোফেসর মিত্র ইউ এস থেকে দেশে ফিরে আসেন।”

রাণু কেঁদে ফেলল, “তাই বলে তোর ডবল বয়সের একটা লোকের সঙ্গে...।”

মৌটুসি রাগ রাগ মুখ করে বলল, “মা, একটু আগে বললে তিনগুণ, এখন বলছ ডবল। আগে ডিসাইড করে নাও, কোনটা বলবে, তারপর...।”

সম্বিৎ বলল, “সব ব্যাপারে ইয়ার্কি করা ঠিক নয়, মিঠু। আমার কাছে পুরো ব্যাপারটাই হেঁয়ালি লাগছে। তোর সঙ্গে ভদ্রলোকের বন্ধুত্ব হল কী করে?”

“হি ইজ ভেরি কেয়ারিং, ছোটকা। ওনার কোয়ার্টারে গেলে নিজে হাতে চা আর ধনে পাতার কুচি দেওয়া ডিমের ওমলেট বানিয়ে খাওয়ান।”

রাণু ভয়ার্ত গলায় বলল, “তুই ওর বাড়িতেও যাস?”

“না যাওয়ার কী আছে? ফীল্ড থিয়োরী মাথায় ঢুকছিল না কিচ্ছু... একবার বলতেই বাড়িতে ডেকে এমন চমৎকার বুঝিয়ে দিলেন যে নিউমেরিক্যাল সল্ভ করা জলভাত হয়ে গেল। ক্লাসেও যখন লেকচার নেন, সবাই চুপটি করে বসে শোনে... যেমন নলেজ, তেমন গলা... একদম বিগ বি’র মত ব্যারিটোন... মেস্মেরাইজিং! একদিন সন্ধেবেলা বারান্দার অন্ধকারে বসে রবীন্দ্রসংগীত শোনাচ্ছিলেন... কী যেন গানটা... সুন্দর বটে তব অঙ্গদখানি...।”

রাণু বলল, “লোকটা সন্ধেবেলা বারান্দার অন্ধকারে বসে তোকে রবীন্দ্রসংগীত শোনায়?”

“কেন, শোনালে তোমার আপত্তি আছে?”

সম্বিৎ বলল, “আঃ! মিঠু কী হচ্ছে? মায়ের সঙ্গে এভাবে কথা বলে?”

রাণু বলল, “সে তো বলবেই, বড় হয়ে গেছে না... মাকে আর দরকার নেই...।”

মৌটুসি দুম করে বোর্নভিটার কাপটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল। খানিকটা বোর্নভিটা চলকে পড়ল। সম্বিৎ বলল, “আহা! রাগ করিস কেন? নাহয় ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ করে নেব। কবে ডাকবি?”

মৌটুসির মুখে হালকা হাসি ফুটে মিলিয়ে গেল। বলল, “রাগ কোথায় করলাম? বল তো কালকেই ডাকতে পারি। বলছিলেন, নেক্সট উইকে কোথাও যাবার প্রোগ্রাম আছে।”

রাণু কান্না চাপতে চাপতে চায়ের কাপ হাতে তুলে উঠে গেল। মেয়েটা যেন দূরে সরে গেছে। অনেক দূর... ধরা ছোঁয়ার বাইরে। পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত চেনা মিঠু, নাকে কাঁদা মিঠু, মায়ের শাড়ির আঁচল ধরে ঘোরা মিঠু, কখন অজান্তে এক অচেনা যুবতী হয়ে গেছে। স্বকীয় ব্যক্তিত্বর ঘেরাটোপে নিজেকে আড়াল করে নিয়েছে।

রাত্তিরে রাণু আর মৌটুসি একসঙ্গে শুল, যেমন প্রতিবার শোয়, মৌটুসি হোস্টেল থেকে ফিরলে। রাণু বিছানায় এসে দেখল মৌটুসি কোল বালিশ আঁকড়ে চোখ বুজে ফেলেছে। অন্যান্যবার গল্প করতে করতে মা মেয়ে রাত কাবার করে দেয়। মেয়ের গায়ে ঠেলা দিয়ে ডাকল রাণু, “কী রে ঘুমিয়ে পড়লি? সারা দিনই তো পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিস!”

মৌটুসি বলল, “জেগে থাকলে তো তুমি একই কথা বলবে।”

রাণু আহত হল, “নিজের মেয়ের ভাল-মন্দ নিয়ে কথা বলার অধিকার নেই আমার?”

মৌটুসি বলল, “শুয়ে পড়, মা। ভাল-মন্দ বোঝার বয়স আমার হয়েছে।”

রাণু শুয়ে পড়ল, কিন্তু তার পোড়া চোখে ঘুম এল না। মাঝরাতে বিদ্যুৎ চমকে বাজ পড়ে বৃষ্টি এল। মৌটুসি ঘুমের মধ্যে মায়ের কোল ঘেঁসে এল, মাকে জড়িয়ে শুল।


প্রোফেসর মিত্র খড়্গ-নাসা, প্রশস্ত-ললাট, বৃষস্কন্ধ পুরুষ। গলার স্বরটি গমগমে। কথা বলেন যখন মুগ্ধ হয়ে শুনতে হয়। উনি যে সাড়ে তেতাল্লিশ সেটা নিজে থেকে না জানালে বোঝার উপায় ছিল না। যাদবপুর থেকে গ্র্যাজুইয়েশন শুনে সম্বিৎ বলেছিল, যেমন সবাই বলে, “আমাদের নন্টুদার ছেলে সমীরণ, আপনাদের সমসাময়িক হবে, খুব ছাত্র রাজনীতি করত, চেনেন নাকি?”

প্রোফেসর মিত্র বললেন, “চিনি বৈকি, খুব ভাল করে চিনি। ভবানীপুরে থাকে তো? এখনও মাঝে মাঝে ফোন করে, আমাদের থেকে তিন বছরের জুনিয়র ছিল।”

রাণুর হাতের চায়ের ট্রে কেঁপে গেল। প্রোফেসর ভদ্রলোক মিশুকে, কথাবার্তায় বুদ্ধির দীপ্তি। তবু যেন আলাপ জমছে না। বাইরে বৃষ্টি-ধোয়া নীল আকাশ, উজ্জ্বল রোদ্দুর। অথচ ঘরের মধ্যে ছাদের কাছে একটা থমথমে মেঘ ঝুলে আছে। বন বন করে ফ্যান ঘুরছে, কিন্তু মেঘ কাটছে না। মৌটুসিও কেমন আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে। অন্য সময় কথার খই ফোটে। আজ চুপচাপ। প্রোফেসর মিত্র চায়ে চুমুক দিচ্ছেন। সম্বিৎ কেমন অন্যমনস্ক হয়ে বসে আছে। মাঝে মাঝে অসংলগ্ন কথা খুঁজে বার করার চেষ্টা করছে। একমাত্র প্রোফেসর মিত্রকে দেখে মনে হচ্ছে না তেমন কিছু অস্বস্তিতে আছেন। মৌটুসিকে বললেন, “তুমি যে বলেছিলে, তোমার একটা ডল হাউস আছে, সেটা আমায় দেখাবে না?”

মৌটুসি ঠোঁট উলটে বলল, “সে আমি ডিস্ম্যান্টল করে ট্রাঙ্কে ভরে রেখেছি। আমি কি এখনও পুতুল খেলি নাকি?”

প্রোফেসর মিত্র হেসে বললেন, “তা বটে! আচ্ছা, তোমার তো এক সময় পুতুল খেলায় ইন্টারেস্ট ছিল, বল দেখি টেডি বেয়ারএর নাম টেডি কেন?”

“কে না জানে? প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে লোকে টেডি ডাকত। সেই থেকে...।”

“কিন্তু প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে লোকে কেন টেডি ডাকত জানো কি?”

বসার ঘর থেকে টুক টাক কথা হাওয়ায় ভেসে আসছে। মৌরলা মাছ ভেজে তুলতে তুলতে রাণু শুনতে পাচ্ছিল। মন ছিল না রান্নায়। তবু একজন বাইরের লোক খাবে। দু একটা অন্য রকম পদ রেঁধে রেখেছিল। মৌটুসি বলেছিল, সে স্যালাড বানাবে। সকাল বেলা বেরিয়ে কোত্থেকে একগোছা পাতা-মাতা নিয়ে এসেছে। স্যালাড ড্রেসিং কিনে এনেছে। খাবার আগে শশা গাজর টোম্যাটো কাটতে বসল। খেতে বসতে বেশ বেলাই হয়ে গেল।

খাবার টেবিলেও গুমোট কাটল না। প্রোফেসর মিত্রর চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। তিনি মৌরলা মাছ ভাজা চেয়ে খেলেন। কয়েকটা মৌরলা রেখে দিলেন ফুলকপি কিসমিস দেওয়া মুগের ডাল মেখে ভাত খাবার সময় সঙ্গে খাবেন বলে। ভেটকি মাছের সর্ষে ঝাল খাবার সময় একটু ঘরে পাতা টক দই মেখে নিলেন। মৌটুসি অভিযোগ করল তার বানানো সালাড নিচ্ছেন না বলে। প্রোফেসর মিত্র তাকেও নিরাশ করলেন না, দু চামচ সালাড তুলে নিলেন। খাওয়ার শেষে পরিতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে, ভাজা মৌরি চিবোতে চিবোতে প্রোফেসর মিত্র বসার ঘরের সোফায় গিয়ে বসলেন।

টেবিল গুছিয়ে রাণুও এসে বসল। হাজার হোক মানুষটা আলাপ করার জন্যই এত দূর উজিয়ে এসেছে। প্রোফেসর মিত্রই কথা শুরু করলেন, “জানেন বোধ হয় মৌটুসিকে আমি বিশেষ স্নেহ করি।”

মৌটুসি মোবাইলে চোখ নামাল। রাণু ভাবল, সে আর জানি না!

প্রোফেসর মিত্র বললেন, “আমি নিজেই ওকে বলেছিলাম আপনাদের সঙ্গে পরিচয় করতে চাই। আসলে একটা বিষয় নিয়ে আপনাদের সঙ্গে আলোচনা করা ভীষণ জরুরী।”

রাণুর হাত পা ছেড়ে এল। কী জানি কী বলবেন ভদ্রলোক! সামান্য থেমে প্রোফেসর মিত্র বললেন, “আপনারা সম্ভবত জানেন না ইঞ্জিনিয়ারিং জয়েন করার পর মৌটুসি একটা খুব খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। আপনাদের থেকে দূরে গিয়ে ও কিছুতেই পরিপার্শ্বর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছিল না। নতুন জায়গা, নতুন মানুষ, বেচারা ভয়ানক চাপের মধ্যে ছিল। সবার সমস্যা হয় না। কিছু মানুষ থাকে যারা অচেনা জায়গায় গেলে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। অবসাদে আক্রান্ত হয়।”

রাণু মন দিয়ে প্রোফেসর মিত্রর কথা শুনছিল। বলল, “সে কী? আমরা তো কিছুই বুঝতে পারিনি।”
প্রোফেসর মিত্র বললেন, “বোঝার কথাও নয়। আমরা সাধারণত যে কোনও সমস্যার সরল সমাধান খুঁজি। আপনারা ভেবেছিলেন, কিছুদিন গেলেই হোম-সিকনেস কেটে যাবে।”

সম্বিৎ সামান্য ইতস্তত করে বলল, “ঠিক, আমরা তাই ভেবেছিলাম।”

প্রোফেসর মিত্র বললেন, “বেশ কিছুদিন ধরে আমি লক্ষ্য করছিলাম, মৌ নিয়মিত ক্লাস অ্যাটেন্ড করছে না। ওর চোখের নিচে কালি জমছে, রোগা হয়ে যাচ্ছে। এই বয়সের ছেলেমেয়েদের শরীরে এই পরিবর্তনগুলি নিশ্চিত ডিপ্রেশনের লক্ষণ।”

রাণু নজর করলো প্রোফেসর মিত্র মৌটুসিকে মৌ বলে ডাকলেন।

প্রোফেসর মিত্র একটু থেমে রাণুর দিকে ফিরে বললেন, “ওর একটা ধারণা হয়েছিল ও আপনার সন্তান নয়। ওকে আপনারা কোনও অনাথ আশ্রম থেকে নিয়ে এসেছিলেন। না’হলে এইভাবে বাড়ি থেকে দূরে অচেনা অজানা জায়গায় একা একা পাঠিয়ে দিতে পারতেন না।”

মৌটুসি মোবাইল থেকে মুখ তুলছে না। নিমগ্ন হয়ে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দেখছে। যেন কে কী বলছে তাই নিয়ে তার কিছু যায় আসে না। সম্বিৎ আর রাণু পরস্পরের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল। প্রোফেসর মিত্র বললেন, “আমি একদিন ওকে ডেকে কথা বললাম। আসলে এটাও আমার কাজের মধ্যে পড়ে। আমি ডীন, স্টুডেন্টস অ্যাফেয়ার্স। কথা বলা মানে ওর সমস্যাগুলো মন দিয়ে শুনলাম। প্রথমে বলেনি। স্লোলি শী ওপেন্ড আপ।”

প্রোফেসর মিত্র নিশ্বাস নেবার জন্য থামলেন। গলাটা একবার ঝেড়ে নিয়ে বললেন, “এখন বলতে বাধা নেই, নাও শী ইজ কমপ্লিটলি আউট অভ ইট... ও ড্রাস্টিক কিছু স্টেপ নেবার কথা ভাবছিল। আমি ওকে বোঝাই, দেয়ার এগজিস্টস আ সিমপ্লার সল্যুশান।”

রাণু মেয়ের দিকে তাকিয়ে কাতর ভাবে বলল, “মিঠু, তুই আমাদের সঙ্গে একবার কথা বলার প্রয়োজন বোধ করলি না?”

মৌটুসি জবাব দিল না। প্রোফেসর মিত্র বললেন, “তখন ও কথা বলার মত মনের অবস্থায় ছিল না।”
সম্বিৎ বলল, “আপনি ওকে কী সমাধান দিলেন?”

প্রোফেসর মিত্র বললেন, “রাগ করবেন না। আমি ওকে বলি আত্মীয়তা নিয়ে সন্দেহ থাকলে তা নিরশন করার সব থেকে সহজ উপায় হল ডিএনএ টেস্ট।”

সম্বিৎ স্পষ্টতই চমকে উঠল, “ডিএনএ টেস্ট...?”

প্রোফেসর মিত্র বললেন, “জানি কন্সার্ন্ড লোকেদের কন্সেন্ট ছাড়া, তাদের অজান্তে ডিএনএ টেস্ট করা গর্হিত, আনেথিক্যাল। কিন্তু মৌকে ডিপ্রেশন থেকে বার করে আনার জন্য এ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। অন্তত আমার জানা ছিল না। ভেবেছিলাম টেস্ট রিপোর্ট দেখলেই ওর সব সন্দেহ কেটে যাবে। আমার এক বন্ধু হায়দ্রাবাদের একটা ফোরেন্সিক ল্যাবের সঙ্গে যুক্ত আছে যারা এই ধরণের টেস্ট করে। আমিই যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলাম।”

সম্বিৎ অনিশ্চিতভাবে বলল, “কিন্তু ডিএনএ টেস্টের জন্য তো ব্লাড বা সোয়াব স্যাম্পেল লাগে বলে শুনেছি।”

প্রোফেসর মিত্র বললেন, “স্যাম্পেল যোগাড় করা এমন কিছু শক্ত ছিল না। আসলে অনেকেই জানে না যে মাথার চুল বা ইউজড টুথব্রাশ থেকেও ডিএনএ স্যাম্পেল নেওয়া যায়। মৌ আগের বার যখন বাড়ি এসেছিল তখনই নিয়ে গেছে।”

রাণু বলল, “তাই আমি আমাদের পুরোন ব্রাশগুলো খুঁজে পাচ্ছিলাম না।”

প্রোফেসর মিত্র বললেন, “ক’দিন আগেই টেস্ট রিপোর্টটা আমার হাতে এসেছে। দেখার পর ভাবলাম, আপনাদের সঙ্গে কথা বলা দরকার।”

মৌটুসি এতক্ষণে মোবাইল থেকে মুখ তুলল। সম্বিৎ মাথা নিচু করল। রিপোর্টে কী আছে তার জানার আগ্রহ নেই। রাণু মৌটুসির দিকে ফিরে তাকাল। মৌটুসির চোখে কী? ক্রোধ? অবিশ্বাস? ঘৃণা? একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। জবাব চাইছে, কেন মা, কেন...?

প্রোফেসর মিত্র সোফার পাশে নামিয়ে রাখা হাতব্যাগটা খুলে একটা খাম রাণুর দিকে এগিয়ে দিলেন। বললেন, “এর মধ্যে রিপোর্টটা আছে। আপনারা ডিটেলস দেখতে পারেন।”

রাণু খামটা হাতে নিয়ে বুঝে উঠতে পারলো না, সেটা নিয়ে কী করবে। সম্বিৎ বিড়বিড় করে বলল, “আমি আগেই বলেছিলাম, ওকে সব কথা বল।”

দিন শেষ হয়ে আসছে। খোলা জানলায় গোধূলির আকাশ। আশ্চর্য একটা আলো এসে পড়েছে রাণুর মুখের একপাশে। এমন এক মুঠো আলোর জন্য রাষ্ট্রবিপ্লব ঘটে যায়। সম্বিৎ রাণুর হাত চেপে ধরল। আজ আর কোনো লজ্জা নেই, সঙ্কোচ নেই। বলল, “রাণু, তুমি মিঠুকে চেনো না। ও বুঝবে, সব বুঝবে।”

রাণু চুপ করে রইল। প্রোফেসর মিত্র মৃদু হাসলেন। বললেন, “আমারও তাই ধারণা। মৌ বুঝবে। ও ওর বাবাকে খুব মিস করে। সেই জন্যেই বোধ হয় আমার ওপর এত নির্ভর করেছিল।”

মৌটুসির দিকে তাকিয়ে বললেন, “মৌ, আমার কাজ শেষ। এবার আমি উঠব।”

মৌটুসিও উঠল। বলল, “আমি প্রোফেসর মিত্রকে রিক্সায় তুলে দিয়ে আসছি। অনেক কথা আছে। ফিরে এসে তোমাদের সঙ্গে বসব।”

দু’জনে বেরিয়ে যেতে রাণু খামটা খুলল। মেয়ে এসে জবাবদিহি করবে। যে জবাব দিতে হবে না বলে রণজিৎ মারা যাবার পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল, আজ সেই জবাব দেবার সময় এসেছে। এড়িয়ে যাবার উপায় নেই। মেয়ে প্রমাণ হাতে এসে দাঁড়িয়েছে। রিপোর্টটা চোখের সামনে মেলে ধরে পড়তে গিয়ে রাণুর মুখ দিয়ে অস্ফুট একটা আওয়াজ বেরল। সম্বিৎ টেনে নিয়ে দেখল... সাদা কাগজ।

স্তম্ভিত হয়ে বসে রইল খানিকক্ষণ, দুজনেই। তারপর সম্বিৎ শুকনো হাসল। নিস্তব্ধতা ভেঙে বলল, “এই ভাল হল। সবকিছু আবার নতুন করে লেখা যাবে।”

ফেসবুক মন্তব্য