দুহিতা

ঋতা বসু

স্কুটারটা কায়দা করে মানুষ গরু ঝাড়ুদার ময়লার গাড়ি বাঁচিয়ে ঈশানী শিভালা মোড়ে এসে বিলকিসকে খুঁজল। না দেখতে পেয়ে গোপনে একটা স্বস্তির শ্বাসও ফেলল। ও নিজে যে দেরী করেছে সেটা যখন বিলকিস জানতে পারছে না তখন গোটা দোষটাই বিলকিসের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া যাবে। ডি এম স্যার ভীষণ রাগী। ঠিক সময়ে প্র্যাকটিসে না গেলে ভীষণ রেগে যান। ঘাটের মাইকে গায়ত্রী মন্ত্রের শেষ লাইনগুলো ঘুরে ফিরে বাজছে। তার মানে এরপর সমবেত হাসি যোগব্যায়াম প্রাণায়াম। ঈশানী দেখল বিলকিস দৌড়োতে দৌড়োতে আসছে। হাতের কিটটা পিঠে তোলারও সময় পায়নি। এসেই ঈশানীর স্কুটারের পেছনে লাফ দিয়ে উঠে বলল - চল চল।
-কি হয়েছে? হাঁপাচ্ছিস কেন?
-পরে বলব।
অন্য শহরের তুলনায় বেনারস অনেক আগেই জেগে যায়। বেশিরভাগ কর্মকাণ্ডই ঘাটে গঙ্গাকে সাক্ষী রেখে তবু আর চার পাঁচ ঘণ্টা পর এখানেও শব্দ ও মানুষ মিলে কি যে হতে পারে তার কোন আন্দাজই পাওয়া যাবে না এখন। আপাতত ভোরের একটা আমেজ হালকা হয়ে জড়িয়ে আছে শহরটার গায়ে।। ঈশানী স্কুটারের হাতলে চাপ দিল। কৌতূহল চেপে রাখল আপাতত। এখন শুধু প্র্যাকটিস। ডি এম অর্থাৎ দয়ালমোহন শর্মার স্পোর্টস একাডেমী বেনারসের মধ্যে সবথেকে নামকরা। ডি এম উৎসাহী নিষ্ঠাবান ছাত্র ছাড়া ভর্তি করেন না। অকৃতদার মানুষটির বিশেষ চাহিদাও নেই। আন্তজার্তিকমানের খেলোয়াড় তৈরি করাই তাঁর জীবনের লক্ষ্য। যত প্রভাবশালী চাপই থাকুক না কেন পছন্দ না হলে সোজা মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিতে দুবার ভাবেন না। তেজের জন্য ডি এম বিখ্যাত। ওঁর জন্যই খেলার খবরে বেনারসের জায়গা পেয়েছে বেশ কয়েকবার। খেলা পাগল নির্লোভ মানুষটাকে কেউ বেশি ঘাটায় না। ঈশানী ও বিলকিস দুজনেই ডি এমের ছত্রছায়ায় কুঁড়ি থেকে ফুল হয়ে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কাল অনেক রাত জেগে ঈশানী রিও অলিম্পিকসের জিমন্যাস্টিকস ইভেন্টগুলো দেখেছে। দাদা আসবে অনেক রাতে। অত রাত জেগে টিভি দেখা দাদা পছন্দ করে না। কাল দুটো বড় বড় যজ্ঞ ছিল তাই দাদা তখনো ফেরেনি বলে ঈশানী টিভি দেখেছে অনেক রাত পর্যন্ত। মাকে অনেক খোশামোদ করে রাজি করিয়েছে যাতে দাদার থেকে দীপার ফাইনাল দেখার পার্মিশন আদায় করে রাখে। ইদানীং ঈশানীদের বাড়িতে নিয়মের খুব কড়াকড়ি। ঈশানী শুনেছে তাদের ঠাকুর্দার বেদজ্ঞ সংস্কৃতজ্ঞ বাবা নবদ্বীপ থেকে বেনারসে আসেন। এই সেদিন পর্যন্ত যতদিন বাবা বেঁচে ছিল সেই ধারাই বজায় ছিল। বাড়িতে সব রকম ধর্মের পণ্ডিত মানুষের আনাগোনা দেখেছে সে জন্ম থেকে। আজ যা অসম্ভব সেটাই যে কত সহজ স্বাভাবিক ছিল সেটা যেন আজ আর বিশ্বাস হয় না। তাদের ভাঙ্গা চোরা ছোট্ট একতলা বাড়ির উঠোনে বেদ ভাগবত গীতা পুরাণ কোরান বাইবেলের খোলা হাওয়ায় নিশ্বাস নিত তারা। নানা দেশের ছাত্রছাত্রী ছিল বলে বাবার একটা ছোট্ট টু ইন ওয়ানে সেই সব দেশের গান বাজত মৃদু স্বরে।
ঈশানীর থেকে পনেরো বছরের বড় ঈশান চন্দ্রের সাবালকত্ব প্রাপ্তির সঙ্গে হাওয়াটা বদলাতে লাগল খুব আস্তে আস্তে। স্ট্রোকের পর বাবা তখন বিছানাতেই বেশিরভাগ সময়ে। কথা দুর্বোধ্য বলে ছাত্র নেই।শুভার্থীরা আসেন কিন্তু তাতে তো সংসারের সুরাহা হয়না। ঈশান বেনারসের ফাইভ স্টার হোটেল রিগালে সপ্তাহে দুবার সংস্কৃত ক্লাস আর বিদেশীদের কাছে হিন্দু ধর্মের ব্যাখ্যা করে কোনরকমে সংসার টেনে নিয়ে চলছিল। তারপর সরকার বদলের সঙ্গে ঈশান চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় নানা অলংকার যোগে পীতাম্বরপুরার গভীর বেদজ্ঞ পণ্ডিত হিসেবে বাপ ঠাকুর্দার আসনে প্রকটিত হলেন। কিন্তু তারা যেটা পারেননি ঈশান সেটাই করে ফেলল কয়েক বছরে। ছোট টিমটিমে বাড়িটা দেখ দেখ করে দোতলা হল।আশেপশের আরও কয়েকটাকে গিলে বেড়ে উঠল গায়েগতরে।ঘরে ঘরে অষ্টাঙ্গ যোগ হট যোগ কুণ্ডলিনী যোগ গণনা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত তার সঙ্গে পারিবারিক বৃত্তি সংস্কৃত ও বেদশিক্ষার ক্লাসও যোগ হল মহা সমারোহে। এইসবের সঙ্গে নানা যজ্ঞ ধর্ম সভা এসবের যশ অর্থ যুক্ত হয়ে ঈশান ক্রমশই বেনারসের ব্রাহ্মণ সমাজে গণ্যমান্য হয়ে উঠলেন। সাধারণ ধুতি শার্টের বদলে গেরুয়া বা সাদা দামী কুর্তা, মাথার পেছনে আলগা অন্যমনস্ক এক টিকি, গলায় সম্ভ্রম জাগানো রুদ্রাক্ষ আর নানারকমের বীজের মালা। হাতের মণিবন্ধেও তাই। বাড়িতে মাংস না হলেও মাছ বরাবরই ছিল। এখন সবাই শুদ্ধ শাকাহারী। ঈশান বলে -এইজন্যই বাঙ্গালি ব্রাহ্মণকে কেউ পাত্তা দেয় না। বলে মছলি খোর।
মা মাছের গন্ধ ছাড়া খেতেই পারে না। ডাল তরকারী দিয়ে ভাত মাখতে মাখতে মা গল্প করে ঈশানীর সঙ্গে। রান্নার গল্পই হয়। যে রান্না বাংলার ভিজে মাটি মিষ্টি জলের আঁশটে গন্ধ জড়ানো যেন সেটাও একটা পদ যার জোরে ম্লান হবে আজকের অতৃপ্তি। কিন্তু হঠাৎ পাওয়া এত সম্মান সমৃদ্ধির কাছে সেই অভ্যাস আর এই স্মৃতিকাতরতা এতটাই অর্থহীন যে তা দিনের তারার মতই লুকিয়ে থাকে ঈশানের সংসারে। এখন তারা যে কোন সম্ভ্রান্ত ইউপি ব্রাহ্মণের সমতুল্য। ঈশানীর মনে আছে বাবা খাবার আগে নিয়ম করে আচমন করতেন। নীরব মন্ত্রোচ্চারণ তিনবার জলস্পর্শ করে থালার চারপাশের জমিতে সেই জল ছিটিয়ে আচমন শেষ হত। সেটা এতটাই নীরব ছিল যে কেউ সেটা লক্ষ্যই করত না। এখন ঈশানের আচমন উপেক্ষা করার উপায় নেই তা এতটাই বিস্তারিত আর সশব্দ। সনাতন গঙ্গা বন্দনা আর এখনকার গঙ্গা আরতির মত।
তারপর যেদিন বারান্দায় স্পীকার বসল আর তার থেকে স্তোত্র শ্লোক আর ভক্তিগীতি ছিটকে ছিটকে উঠতে লাগল সেদিন কয়েকজন বলে গেল বেশ করেছেন। এইবার ব্যাটারা জব্দ হবে। আমাদের গলার জোরটা দেখুক এবার।
বাবা তখনও বেঁচে। গলার স্বর জড়ানো কিন্তু বক্তব্যে কোন অস্পষ্টতা ছিল না - মানুষ ভয় পেলেই এভাবে গায়ের জোর দেখায়। ধর্ম কি এভাবে দেখাবার জিনিষ। সে থাকে প্রাণের মাঝে। প্রতিদিনের পালনে।
বাবার এসব কথা ঈশানীর কাছে নতুন নয়। তাদের বাড়ি তো সারাক্ষণই ভরে থাকত নানা ধর্মের অনুসন্ধিৎসু মানুষের প্রশ্ন উত্তরে। বিলকিসের ঠাকুর্দা জ্ঞানি পণ্ডিত মওলানা আব্দুল গনি সাহেবকে নিয়ে এসেছিল তাদের বাড়ি। বলেছিল - পন্ডিত মশাই আমরা তাঁতীমানুষ। ওঁর সঙ্গে কি কথা বলব? তাই যোগ্য লোকের কাছে নিয়ে এলাম।
চা জল খাবার দেবার ফাঁকে ফাঁকে কত কি যে তারা সেদিন শুনেছে। সারা পৃথিবী যেন নেমে এসেছিল তাদের ছোট্ট উঠোনটায়। বাবা সংস্কৃত ইংরেজি আর ফার্সির সঙ্গে আরও দুটো ভাষা জানত। ঈশানীর এত জানার খিদে নেই সে শুধু জিমন্যাস্টিকস শিখতে চায়। নাদিয়া কোমনচির মত উড়ন্ত পরী হবার স্বপ্নটাকে এবার দীপা প্রামাণিক আরও উসকে দিয়েছে। কিন্তু সে কি লক্ষ্য স্থির রেখে এগোতে পারবে? মাও যে দাদাকে ভয় পায়। হঠাৎ ঈশানীর বুক খালি করে সমস্ত অক্সিজেন বেড়িয়ে যায়। তখনই তার মনে পড়ে মওলানা সাহেবের কথা- ধর্ম হল ফুলের রেণুর মত। কোথা থেকে কোথায় উড়ে যায়। তারপর সেখানকার জল হাওয়া মাটিতে পুষ্টি লাভ করে একটা অন্য চেহারা নেয়। বাংলার মুসলমান যেভাবে নবান্ন নববর্ষ উৎসব পালন করে আরবের লোক কি তা করে? নেপাল আর দক্ষিণ ভারতের হিন্দুর পালন কি এক? ইয়োরোপ আর আফ্রিকার খ্রিষ্টান ধর্মের চেহারার মধ্যেও বিস্তর অমিল।
বাবা বলেছিল বদলায় বলেই তো ধর্ম এত সুন্দর। তার কাজই তো মানুষের প্রতিদিনের জীবনকে স্থিতি দেওয়া। ইতিহাস ভূগোল ও মানুষের সঙ্গে তো তাকে বদলাতেই হবে।
এই কথাগুলো এত সহজ বলেই ঈশানীর বুঝতে কোন অসুবিধে হয়নি। বাবার ভাত খাবার কাঁসার বগি থালা আর ঢাকনা পরানো জল খাবার গেলাসে বাবার নাম লেখা ছিল। মুর্শিদাবাদ থেকে সংস্কৃত পড়তে আসা সাদিকের উপহার। সেই জন্যই সেটাতে আর কেউ খেত না। বাকি বাসনে জাত ধর্ম নির্বিশেষে সবার অধিকার ছিল। কারও কোনদিন কোন অসুবিধে হয়েছে বলে মনে হয়নি। কিন্তু সেদিন মা বিলকিসকে একদম আলাদা করে রাখা একটা গেলাসে জল দিল। বিলকিস চলে যাবার পর ঈশানী মাকে আক্রমণ করল- এটা কি হল? বিলকিস আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। তার সঙ্গে তুমি এমন করলে? তুমি তো এমন ছিলে না।
মা নির্জীব চোখ তুলে বলল-আমাকে কিছু বলিসনা। তোর বাবার সংসারে তার মত করেছি। এখন তোর দাদার সংসার। সে যেমন চায় তেমন চলছি।
নদীতে ডুবে যাওয়া সন্ধাসূর্যের মত মা টুপ করে সংসারের গোলক ধাঁধায় মিলিয়ে যায়। উঠোনের তারে গেরুয়া পাঞ্জাবী গেরুয়া চাদর লুঙ্গির ছায়া। ঠিক ওইখানে জিমন্যাস্টিকস দেখিয়েছিল বাবার ছাত্রী আভিয়া। ইস্টোনিয়ার মেয়ে। জিমন্যাস্টিকস তার পেশা কিন্তু নেশা ছিল ভারতের প্রাচীন সংস্কৃতি। পড়াশুনো হয়ে গেলে জিমন্যাস্টিকস দেখাত। বিলকিস আর সে অপেক্ষা করে থাকত সেই মুহূর্তটার জন্য। ঈশানীদের আগ্রহ দেখে বলেছিল - এখনো তোমাদের শরীর নমনীয়। ইচ্ছে করলে তোমরা শিখতে পার।
তার কাছেই হাতে খড়ি। বাবা বিলকিস আর তার লম্ফঝম্প দেখে বলেছিল- শেখ যা শিখতে ইচ্ছে। শিক্ষা কখনো বিফলে যায় না।
বিলকিস আর সে ছোট থেকেই পুতুল খেলার বদলে গঙ্গায় ঝাঁপ দিতে ভালবাসত। একসঙ্গে পুজোমন্ডপ, রামলীলা, অঞ্জলি দেবার আগে লুকিয়ে নারকেলি কুল, ইদের বিরিয়ানি, রমজানের উপোস উপোস খেলা। বাবার সঙ্গে আখড়ায় গিয়ে মাটি মেখে ওস্তাদদের সঙ্গে ছেলেমানুষি কুস্তি লড়া। আভিয়ার কাছে শিক্ষাও শুরু হল একসঙ্গে। বাবার অসুখের পর আভিয়া আর একবারই এসেছিল। ততদিনে নেশা ধরে গেছে ওদের। সারাক্ষণ মাথায় ঘুরত আভিয়ার কথাগুলো- তোমরা এমন একটা জিনিস শিখছ যেটা স্পোর্টস ঠিকই কিন্তু তার সঙ্গে মেশাতে হবে নাচের শিল্প। শক্তি ব্যালেন্স কন্ট্রোল আর নমনীয়তায় যার সৌন্দর্যের সঙ্গে আর কিছুরই তুলনা হয় না।
বিলকিস আর সে ঘন্টার পর ঘন্টা প্র্যাকটিস করত। আর সব নেশা তুচ্ছ হয়ে গেল এর কাছে। কিন্তু দুজনেই বুঝতে পারছিল এভাবে বেশিদূর এগোন যাবে না। তখনই মনে হয়েছিল দয়াল স্যারের কথা। তিন বছর আগে এইরকম এক ভোরেই তারা হাজির হয়েছিল একাডেমীর দরজায়। তারা নিজেরাও জানত না স্যার এভাবে জান লড়িয়ে দেবেন তাদের পেছনে। গতকালই বলেছেন এবার বাইরে থেকে ভাল কোচ আনব তোদের জন্য। ন্যাশনালে যাবার আগে দস্তুর মত প্রস্তুত থাকতে হবে বুঝলি। এরপর আরও বড় উড়ান।
স্যারের কথা শুনে বিলকিস তাকে ফিসফিস করে বলেছিল দেখ আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
আর ঈশানী যেন তক্ষুনি পৌঁছে গেছিল আলো ঝলমলে এক গোলাকার বৃত্তে।তার পিঠে লেগে গিয়েছিল এক জোড়া পাখনা। সে উড়ে গেছিল নদী বেয়ে সাগর পেরিয়ে হাজার করতালির মাঝে।
বিলকিস একফাঁকে বলে গেল - তোর তাড়া নেই তো? একটু ঘাটে যাব। দরকার আছে।
ঈশানী আজ একটু অন্যমনস্ক। দীপার মত প্রোদুনভা করার কথা ভেবেছিল কাল অথচ আজ আন ইভন বারে আর একটু হলেই হাত ফসকে যাচ্ছিল। ফ্লোর এক্সারসাইজ করতে গিয়ে পেটের পেশীতে টান ধরল।
স্যার কপাল কুঁচকে বললেন বলেছিলাম লো ফ্যাট চিজ খেতে। খাচ্ছিস না?
মাথা নিচু করে রইল ঈশানী। সে যে কোনরকমে খালিপেটে বেরিয়ে এসেছে সে কথা স্যারকে বলা যায় না। বিলকিস একটার পর একটা ভল্ট দিচ্ছে। একেবারে নিখুঁত। ও কি আজ বাড়ি যাবে না? ঈশানীর অস্থির লাগছিল। ও বিলকিসের জন্য অপেক্ষা না করেই বেরিয়ে পড়ল।
আজ ভোরে দাদাকে রেগে রেগে কথা বলতে শুনে দরজার গায়ে কান রেখে শুনেছে তার বিষয়ে কথা হচ্ছে- আর কতদিন চলবে ওর এসব? ভাল সম্বন্ধ এলে কিন্তু আমি অপেক্ষা করব না বলে দিলাম। তাছাড়া সেন্ট্রাল থেকে মন্ত্রী এসেছে। কাল সবাই উপস্থিত থাকবে প্রভাতী অনুষ্ঠানে। গুরুজী ঈশানীকেও নিয়ে যেতে বলেছেন। কাল ও যেন কোথাও না যায়। কপাল ভাল হলে তোমার মেয়ের কালই একটা হিল্লে হয়ে যেতে পারে। অঢেল টাকা। ভি আই পিরা এই ফ্যামিলির কথায় ওঠেবসে তা জান?
রাস্তা থেকে উড়ে আসা কুটো বোধহয় ঢুকে গেছে চোখের ভেতরে। জলে ভাসা চোখে রাস্তাঘাট অস্পষ্ট। বিলকিস কি দারুণ ভল্ট দিচ্ছিল। খাওয়ার পর রাঁধা আর রাঁধার পর খাওয়া এই নিয়মে চলতে চলতে কোনদিন ও হয়ত বিলকিসকে টিভিতে দেখবে পরীর মত নেচে বেড়াচ্ছে। ল্যান্ডিং ম্যাটের ওপর দাঁড়িয়ে গর্বিত হাত তুলে ভেসে যাচ্ছে তৃপ্তি আর আনন্দে।
মা জিজ্ঞেস করল - তাড়াতাড়ি চলে এলি? শরীর খারাপ?
ঈশানী কোন উত্তর না দিয়ে স্কুটার তুলে ঘরে ঢুকে গেল। তার সত্যি সত্যি শরীর খারাপ লাগছে। আহা, আজই যদি সে মরে যেতে পারত--
খানিকটা আচ্ছন্নতার মধ্যেই সে বিলকিসের গলা শুনল-ওমা সেইজন্যই কারওকে না বলে ওভাবে চলে এসেছে। থাক এখন আর ডেকো না। কাল যেন আমার জন্য অপেক্ষা করে অসসি ঘাটে বলে দিও।
রিক্সাওলা চারু আসে। সাঁইথিয়ায় বাড়ি। কাজে অকাজে আসে।মার সঙ্গে দুচারটে সুখদুঃখের কথা বলে। ঈশানীর মনে হয় হিন্দি বলে বলে প্রাণ হাঁপিয়ে যায় বলে বাংলা বলতে আসে। লাভজনক বলে এখানে অনেকেরই রিক্সার ব্যাবসা। চারুদের মালিকের ষাটটা রিক্সা।বা ইরে থেকে আসা তেত্তিরিশজন একটা টানা ঘরে শোয়। নিজেরা মেস করে খায়। মালিককে দিয়ে থুয়েও দিনের কামাই যত হয় সেটা হতে দেশে মাস ঘুরে যায়। সেইজন্যই এত কষ্ট করে পরিবার ছেড়ে এখানে পড়ে থাকে। তার মত আরও অনেকে আছে।কি করবে?
অনর্গল কথা বলে চারু- ট্যুরিস্ট কত বেড়েছে। তাতে রিক্সা নৌকো চাওলা থেকে শাড়ি খাবার দোকান সবার রোজগার বেড়েছে। এভাবে চললে সামনের বছর ও ঘর পাকা করবে। তারপর গোপন খবর দেয় ফিসফিস করে বাদামওলি মতি পর্যন্ত জমি কিনবে ভাবছে।
দাদাও খোঁজ নেয় নানারকম। কত রোজগার হল। চারুর ছেলে স্কুল পাশ করে কি করবে ভাবছে। পা চালানোর সঙ্গে সঙ্গে চারুর কাঁধের পেশী নড়াচড়া করছে। ঈশানীর মনে হল কোনদিন সে জিজ্ঞেস করেনি চারুর ছেলে খেলাধুলো ভালবাসে কিনা।
দাদা বলল-ছেলেকে এদিকে নিয়ে আয়। ওখানে কিসসু হবে না। গোধুলিয়ায় গঙ্গা ভিউ হোটেল থ্রি স্টার হল। গাদা লোক নিয়েছে। সবকটা এসেছে তোদের মুলুক থেকে।
পথচলতি চেনাশোনারা দাদাকে সমীহ করে বুকে হাত দিয়ে মাথা ঝোঁকায়। দাদা কখনো মাথা নাড়ে। কখনো চাউনি ভাসিয়ে দেয় হাওয়ায়। চারুকে উদ্দেশ করে দাদা বলল-ওই যে ল্যাংড়া মুন্নাকে দেখছিস ঝাঁট দিচ্ছে কেউ কোনদিন ভেবেছিল চাকরি পাবে? আমাদের সরকারের দয়ায় বেনারসের প্রতিটা লোক করে খাচ্ছে। এইবেলা নিজের আখের বুঝে নিতে না পারলে পরে পস্তাবি এই আমি বলে দিলাম।
ঈশানীর কেমন যেন মনে হয় কথাগুলো আসলে চারুকে নয় তাকেই বলা হচ্ছে।
ঘাটে পৌঁছেই দাদার ব্যাস্ততা তুঙ্গে। আজ রবিবার বলে বিশেষ অনুষ্ঠান। ডায়াসে সেতার কোলে বসে আছেন মোহনজী। দেড়শো দুশো লোক যোগাসন প্রাণায়াম করছে। নদীর সামনে উঁচু বেদীতে পাঁচজন সিল্কের ধুতি কুর্তা পরা ছেলে গঙ্গা আরতির জন্য দাঁড়িয়ে আছে। সামনে রাখা কোশাকুশি শাঁখ। সবই বিরাট। তারই বয়সী একটি মেয়ের দল মাইকের সামনে গেরুয়া সালোয়ার কুর্তা পরে স্তোত্র পাঠ করবে বলে দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকটা এত পবিত্র আর সুন্দর যে মনে হচ্ছে খুব যত্ন করে এই ছবিটা আঁকা হয়েছে। সে যতটা নিষ্ঠা নিয়ে অন্যরকম একটা ভোর দেখে ততটাই এদেরও চোখে মুখে। এবার থেকে এই গুরুগম্ভীর শঙ্খধ্বনি সামগান আর বৈদিক মন্ত্রেই তার দিন শুরু হবে। গুড্ডু এসে ডাকল তাকে। ঈশানী প্রথমে চিনতে পারেনি। তারপর মনে পড়ল একাডেমীতে ছ সাত মাস কোচিং নিয়েছিল গুড্ডু। সে খুব উত্তেজিত। বলল- এসে গেছিস? ভাল করেছিস। খেলে কিছু হবে না। এখন কাজ অনেকরকম। ফাঁক বুঝে ধরে নিতে হবে।
একজন খেলোয়াড়ের জন্য এখানে কি ধরণের সুযোগ জানতে কৌতূহল হল ঈশানীর। গুড্ডু বলল দেখ আমার দমের জন্য টানা শাঁখ বাজাতে পারি। একটুখানি কাজ। সকালে আর সন্ধে গঙ্গা আরতির সময়টুকুর জন্য-ভাল টাকা দেয়।
-সকালেই তো প্র্যাকটিসের সময়। তাহলে সেটা করবি কখন?
-হবে না- কাঁধ উঁচু করে ও যতটা না তার থেকে বেশি লম্বা হয়ে যায়।
দাদা দূর থেকে হাতছানি দিয়ে ডাকল তাকে। ত্রিলোচনজীর একেবারে পায়ের কাছে নিয়ে গেল তাকে। প্রণাম করা মাত্রই সস্নেহে জড়িয়ে ধরে বললেন - কভি কভি ইস তরফ ভী আয়া কর। গঙ্গা কি সেবা দেশ কি সেবা। গঙ্গা কি সাফাই মন কি সাফাই, দেশ কি সাফাই। দাদা বিনয়ে নুয়ে পরে বলল - আসবে। এবার থেকে নিশ্চয়ই আসবে।
ত্রিলোচনজী গলার থেকে হঠাৎ হাসিটা মুছে বললেন-কেয়া তুমনে লেড়কিয়ো কো কাপড়ো কে বারে মে দয়ালকো পুছা?
দাদাকে নিরুত্তর দেখে উনি একটু অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন- এয়সা হোনা নেহি চাহিয়ে। হামারি সংস্কৃতিকে বারে মে হমে শোচনা চাহিয়ে।
তারপর মিষ্টি হেসে বললেন-তুমহারি শাদী কা মিঠাই হমলোগ কব খায়েঙ্গে? কুছদিন ঔর খেলনা চাহ তো খেল লেকিন পরম্পরা এক বহত বড়ি চিজ হ্যায়-প্রজাতন্তুং মা ব্যাবছেৎসী।
জীবনে প্রথম বিলকিসের সঙ্গে জায়গা বদলাতে ইচ্ছে করল ঈশানীর। দাদা ত্রিলোচনজিকে আশ্বস্ত করে ভীড়ের বাইরে এসে ঈশানীকে বলল তুই বাড়ি যা। আমার দেরি হবে।
চত্বর জুড়েই লোকের মেলা। তারমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু লক্ষ্য করে দাদা আবার ঢুকে গেল ভেতরে। বিলকিস আসবে বলে ঈশানীও রয়ে গেল। মন থেকে একাডেমীর কথা জোর করে মুছবে বলেই সে ইতস্তত ঘুরে বেড়াতে লাগল। ফ্লোর, বার এক্সারসাইজ, ভল্ট এসব জীবনে না থাকলে কি করে সবাই কে জানে। সে তো কতদিন হয়ে গেল এর বাইরে আর কিছু জানে না। ঘাট জুড়ে পুজো তর্পন স্নান, তেল মালিশ ডন বৈঠক চলছে। একটা লোক ছিপ দিয়ে মাছ ধরে আবার জলে ছেড়ে দিচ্ছে। হঠাৎ সে বিলকিসের পিঠটা দেখতে পেল। নদীর দিকে মুখ করে উঁচু গোলস্তম্ভের ওপর বসে আছে। ও যায়নি কেন প্র্যাকটিসে? ঈশানী দুটো তিনটে সিঁড়ি একসঙ্গে লাফিয়ে চলে এল বিলকিসের কাছে - কিরে যাসনি?
বিলকিস চমকালো না। পাথরের মত বসে রইল। তারপর বলল-আর যাওয়া হবে না।
- কেন?
- মিনাখালা এসেছে আজমীঢ় থেকে।
- তো?
- আমাদের লাস্ট কম্পিটিশনের ছবি কেটে নিয়ে এসেছে নর্দান নিউজ কাগজ থেকে।
- তুই তো ওটায় সেকেন্ড হয়েছিলি। সব কাগজে তোর পারফর্মেন্স নিয়ে লেখা হল ছবি দিয়ে।
- সেটাই তো কাল হল। মিনাখালা নাকি জানতই না আমি কি করছি। তারজন্য কি ধরনের পোশাক পরতে হয়। বাবাকে বলেছে গা দেখাতে হয় তো মডেলিং করুক। জিমনাস্টিক্স করার দরকার কি? কতটা বেশরম হলে সবার চোখের সামনে এভাবে বেপর্দা হওয়া যায় সেটা খালা কল্পনাও করতে পারে না। কলমা জানি না। রোজা রাখি না। শরিয়তি কানুন মানি না -এ কেমন মেয়ে পয়দা হয়েছে? আব্বু আম্মিকে খুব কথা শোনালো। খানদানি ঘরের কোন ছেলেই পাওয়া যাবে না বিয়ের জন্য। এমনিতেই যথেষ্ট বদনাম হয়েছে। তোর সঙ্গে মিশেই নাকি আমার এই অধঃপতন। ঠিক হয়েছে আমি চলে যাব আজমীঢ়ে। ওখানে আমার রগড়ানি চলবে।
বিলকিস দম দেওয়া পুতুলের মত একটানা কথা বলে থামল।
ঈশানীর ছোট্ট কিশোরী বুকটা যেন এখনই চৌচির হয়ে যাবে। এত কিছু একসঙ্গে হারিয়ে যাবে জীবন থেকে? বিলকিসও থাকবে না? এত অন্ধকার নিয়ে আজকের ভোর এল। স্যারের বকুনির বদলে ত্রিলোচনজী, দাদার মিষ্টি কথা শুভাকাঙ্ক্ষা এতক্ষণ ধরে যে চাপ সৃষ্টি করেছিল পাথর ফাটিয়ে ঝর্ণার মত তা বেরিয়ে এলো। খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মত বিলকিসকে জড়িয়ে ধরে সে বলল - কি হবে? কি করব আমরা?
দুজনের বুকের অসহায় ধুকপুক শুনতে শুনতে দুজনে চোখের জল ফেলতে লাগল। কে কার জন্য কাঁদছে জানে না।সাক্ষী রইল উত্তরবাহিনী নদী আর মাথার ওপর অনন্ত আকাশ।

ফেসবুক মন্তব্য