বাগানঘরের আলো

সঙ্গীতা দাশগুপ্তরায়

বাইরের হাওয়ায় ওপরের ঘরের জানলার কপাটগুলো ঠকঠকাস শব্দে বাড়ি কাঁপাচ্ছে। নীচ থেকে চিৎকার ভেসে এল পারুউউ, জানলাকটা কি ভাঙা অব্দি অপেক্ষা করবি নাকি বন্ধ করে আমায় উদ্ধার করবি?
পারু তড়িঘড়ি হাতের বই ফেলে জানলা বন্ধ করতে ওঠে। দক্ষিনের জানলার ছিটকিনিটা ভাঙা, টেনে বন্ধ করেও লাভ নেই। তাও সেটাকে টানতে গিয়ে ডাকুকে দেখতে পেল পারুলবালা। একটা আধময়লা পাজামার ওপর গামছাখানা কষে আঁটা। খালি গা, গলায় আর একখান গামছা প্যাঁচানো আলগা করে। হাতের ছিপটা গুটিয়ে তুলছে। পাশে খলুইটা চাপা দেওয়া। ঠাহর করলে বোঝা যায় একটু একটু নড়ছে।
ওপর থেকে কেউ দেখছে টের পেয়েই বোধহয় মাথা তুলে তাকাল ডাকু। চার চোখ এক মুহূর্ত আটকে থাকে। সাহস দ্যাখো! কালো মুখে মিটিমিটি হাসি আটকে আছে কেমন!
মাসিকে ডেকে দেখাবে নাকি একবার? বাবু পারুলদের পুকুরে মাছ ধরতে এয়েছেন আবারও। অবশ্য মাসির চেঁচানিও একে বাগে আনতে পারে না।
আগের দিন তো উল্টে খলুইয়ের ঢাকা খুলে হেসে হেসে বলেছিল, “তা তুমিও নাও না। তোমার যতটা লাগবে তুলে নাও, বাকিটা আমার ছেলেপুলের জন্যে দিও।”
শুনে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল পারুল। ওইটুকু ছেলে, পারুর চেয়ে কতই বা বড়! তার আবার কটা ছেলেপুলে! আর এ কেমন বাপ যে চুরি করে ধরা পড়লেও ভাগ চায়!
তার মধ্যে মাসির পেয়ারের ঝি রমলা খড়খড়িয়ে উঠেছিল, "তোমার ছেলেপুলে তো সম্বচ্ছর এর বাড়ির এঁটো তার বাড়ির পাতকুড়ুনি খেয়েই গতর বানাচ্চে! তার ওপর চুরিও, বুদ্ধিও কম না। বাগান থেকে যা পারে নিয়ে পালায়। তাদের জন্য তোমায় ভাবতে হবে নে। আর অত যদি ভাবনা তো নিজের পয়সা খচ্চা করে খাওয়াওগে না বাপু। আমাদের পুকুর থেকে চুরি কেন?"
ডাকু অবশ্য ওসব কথা গায়ে মাখে না। কাঁধ ঝাঁকিয়ে খলুই নিয়ে হাঁটা দেয়।
পারু পরে মাসির কাছে শুনেছে ওর ছেলেপুলে মানে এই বেনেগাঁ, চাপুই পুকুর আর তালসির গরীব বাচ্চারা। ওদের ধরে নিয়ে এসে পড়ায় ডাকু নিখরচায়। নিজে শহরে মেসবাড়িতে থেকে বিএ পাস করেছে। তারপর গাঁয়ে এসে পাঠশালা খুলে বসেছে। সে পাঠশালায় আবার সকালে পড়াশুনো হয় না। তখন তো চাষার ছেলে মাঠে যায়, মুচির ছেলে কাজে যায়, কামারের পো হাপর টানে আর কুমোরের পো ছাঁচে বসে। বিকেলে খেলা সেরে হাত মুখ ধুয়ে সব পড়তে যায়। আর সারা সকাল ওই পোড়োদের খাবার যোগাড় করে তাদের ডাকুমাস্টার। পড়া সেরে রাতে ভাত আর কচুর চোখা কিংবা চুনো মাছের চচ্চড়ি কি শাকসেদ্ধ যা পায় তাই খেয়ে বাড়ি যায় পোড়োর দল। খালি একটাই বিধি। পড়া না করে এলে খাওয়া পাবে না। সেদিকে ডাকু ভারি শক্ত মানুষ। সে পাঠশালতো নিজের বাড়ির উঠোনে, কিন্তু খাবার যোগাড় দেয় কে? সেই খাবার যোগাড়ের তাড়নাতেই এইসব উঞ্ছবৃত্তি ওর।

বিকেলের মুখে কালো কার দিয়ে মাসির চুলের গোছা এঁটে বেনী করার সময় কথাটা পাড়ল পারু... "ওই ছেলেটা, মাছ চোর যে... এসেছিল দুপুরে... বুঝতে পারছ কার কথা বলছি?"
এই সময়টা মাসির আয়েসের সময়। কথাটথা সব বারণ এমনিতে! চুলে ইলিবিলি হাত বুলিয়ে বুলিয়ে জট ছাড়িয়ে তবে পারু বিনুনি শুরু করে। ততক্ষণে আরামে মাসিরও চোখ বুজে আসে। তাও হুঁহাঁ সাড়া দেয়। এখনও দিল... হুঁ, বুঝেছি, ডাকু তো? কি করেচে?
নতুন আর কি করবে। আজও আমাদের আঘাটায় বসেছিল। টানা বঁড়শিতে মাছ ধরছিল।
তুই কোত্থেকে দেখলি?
ওই তো, তুমি যে বললে ওপরের ঘরের জানলা বন্ধ করতে, তখনই তো...
মাসি সজাগ হয়ে ওঠে... ওপরের ঘরে কী করিস রে সারা দুপুর? ঘরতো তেতে আগুনমুখো হয়ে থাকে!
আসলে পারুর অভিন্নহৃদয় বন্ধু তানির দাদা ওকে পুরোনো আনন্দলোক কিনে এনে দেয় মাঝেসাঝে। সেগুলো তানি পারুকে পড়তে দেয় চাইলে। বদলে পারুদের বাগানের পেয়ারা আর বিলিতি আমড়ার পেসাদ নেয় অবশ্য। বইগুলো ওলটাতে ওলটাতে সেই কোন দূর অজানায় হারিয়ে যায় মন। পাতায় পাতায় কী দারুণ দেখতে সব হিরোরা। বড় ছবিগুলোর চোখের দিকে তাকিয়ে দেখেছে পারু, ছবির চোখ ওর দিকে তাকিয়ে হাসে। ঘোর লেগে যায় যেন। আর বইয়ের মেয়েগুলো! চুল যেন নরম সিল্কের সুতো। শুধু চোখে কাজল ঠোঁটে লিপস্টিক লাগালে কি ওরকম লাগে? কই পারুকে তো লাগে না! রূপচর্চার পাতাগুলো ভালো করে পড়ে পারু। কিন্তু শুধু পড়ে তো আর অমন মাখনের মত চামড়া হতে পারে না! কিছুদিন আগে এদিকে বালির বাঁধের ওপর শুটিং পার্টি এসেছিল। পারুরা কয়েকজন বন্ধু মিলে স্কুল পালিয়ে দেখতে গেছিল সেখানে। সব্বাইকে কী সুন্দর দেখতে আর কেমন অদ্ভুত আধো আধো বাংলায় কথা বলছিল মেয়েগুলো। পারু দুপুরে ওই বইগুলো হাতে নিয়ে সেই মেয়েগুলোর মত হয়ে যায়। ছবি দেখে পছন্দসই কোন একজন হিরোকে বেছেবুছে তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে খানিক। কিন্তু মাসি এসব ঘুণাক্ষরেও জানে না। জানলে পারুর কপালে বিরাট দুঃখ আছে। তাই তাড়াতাড়ি কথা ঘোরায় পারু ..."মাসি, কেশুত পাতা ঘষে ঘষে তোমার চুলের গোছ কিন্তু বেড়েছে অনেক।"
বলচিস? আজকাল তো খোঁপাটাই কেমন হালকা ঠেকে ঘাড়ের ওপর... নে তাড়াতাড়ি সার। মেসো আসার আগে গা ধুয়ে খাবার যোগাড় করতে হবে। আজ আসুক উনি, ওই ডাকুর রোজ মাছচুরি আমি বার করছি।

সন্ধ্যের মুখে কালীদি এসে হাঁক দেয়। হাতের চুবড়িতে খানিক হলদে হলদে লম্বা কুঁড়ি আর দুটো ছোট ফুটি। কালীদির ভালো নামটি ভারি সুন্দর, প্রতিমা। কিন্তু ওই যে কষ্টিপাথরের মত গা আর তাতে বারোমাস লাল ডুরে শাড়ি, ওতেই গাঁয়ের মানুষের মুখে মুখে কালী হয়ে গেছে। তবে রং অমন কষকষে হলে কি, যেমন মিষ্টি কথা আর তেমনি ছেলেমান্‌ষি হাসি। মাসিকে দেখে ঝুড়িটা নামিয়ে হাঁক দেয় 'ও বৌদি, ফুটি এনেছি গো। চট চাপা দিয়ে রাখো আজ, কাল দেখবে কেমন মিষ্টি। গুড় না মাখিয়েও খেতে পারবে।"
"এই সাঁঝবেলার আগে কুমড়ো ফুলের কুঁড়ি তুলেছিস কালী?" মাসি চুবড়ি তুলতে তুলতে ভুরু কোঁচকায়
"কী করব বল? এখনই তুলে জলের ছিটে দিয়ে রাখলে কাল সকালে ভেজে নিতে পারবে। আমার তো সকালে বেরোনোর জো নেই তাই এখন দিয়ে গেলাম। তুমি বরম ইকটু পাতলা কাপড়ে জল ছিটিয়ে ঢেকে রাখ, কাল এক্কেবারে ফুটন্তি ফুল... বেসনে চুবোও আর খাও গে। তবে ইয়ে, ঘরে কুমড়ো কি ডাঁটা নেই তো? তাইলে কাল আর সেটা রেঁদোনি।"
“একই দিনে ফুল আর ডাঁটা দুইই খাব? ভীমরতি ধরেচে নাকি আমার? মা আর ছা-কে একদিনে খেতে আচে?"
মাসির কথা শুনে হেসে ফেলে পারু... তবে যে বর্ষা নামলে তুমি মেসোকে বল ডিম ভরা কই আর ইলিশ আনতে? সে বুঝি মা আর ছা একসাথে খাওয়া হল না?
"তুই থাম! সব কতায় উকিলি বক্তিমে। চা কি আজ রমলার হাতের খেতে হবে?" মাসি দাবড়ে পারুকে থামিয়ে দেয়।
পারু চায়ের জল বসায়। কালীদি চা খেতে ভালোবাসে। গাঁয়ের অনেকেই এ বাড়ির চা খেতে ভালোইবাসে। মেসো শহর থেকে চা আনে। মেসো এমনিতেই শৌখিন মানুষ। কথাও বলে শহুরে মত করে। মাসির মত না।
পারু একটু এলাচ আদা দিয়ে চা বানায়। কৌটোয় নিমকি ভাজা আছে। আঙ্গুলে ডিঙি দিয়ে সে কৌটো পাড়তে পাড়তে মাসির গলা পায় পারু 'কুমড়ো ফুলটুল তো এনেছ গুছিয়ে, আমি যেটা বলেচি সেটার কোনো খবর এনেচ কি?'
"খবর বলতে ঘোষাল বাড়ির মেজগিন্নীর দিদির শ্বশুরঘরের ছেলে। কলকাতায় চাকরি করে। দেখতে শুনতে দিব্যি। বয়স এ বছর আঠাশে পড়বে। তেমন খাঁই নেই...তবে বড্ড বয়সে তফাৎ।"
মাসি থামিয়ে দেয় এখানেই..."খাঁইয়ের কথা তো হচ্চেই না। পারুকে আমি এমনিতেই সবই দেব। কিন্তু কলকাতায় চাকরী করে মানে পারুকে ওই ঘিঞ্জি শহরে ভাড়া বাড়িতে থাকতে হবে নাকি?"
জল ফুটে চা উথলে যায়। দুধ পোড়া গন্ধে পারুর সম্বিৎ ফেরে। মাসি তার বিয়ের সম্বন্ধ করছে? এখনও তো ক’মাস বাকি ইস্কুল শেষ হতে। তারপর কলেজ। অবশ্য কলেজ বোধহয় মাসি যেতে দেবে না। পারুর মা রেললাইন পেরোতে গিয়েই কাটা পড়ে মারা যায় পাঁচ বছর আগে। সেই থেকে মাসির রেল লাইনে ভীতি। মেসোকে পইপই করে রোজ বলে ওভারব্রীজ দিয়ে ওঠানামা করতে। পারুকে নিয়ে মাসির যা ভয়! হয়ত কলেজে পড়তে ছাড়বেই না ...
ওদিকে কালীদির গলা শোনা যায় "অত তো জানিনা। তুমি বরং একবার ঘোষালবাড়ি গে কতা কয়ে দ্যাকো..."
পারু চা নিমকি নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরোতেই ওদিকের কথা বন্ধ হয়ে যায়। মেসোর সাইকেল ঢুকছে গেট দিয়ে। আওয়াজ পেয়ে পারু আবার রান্নাঘরে গিয়ে ঢোকে। ভারি দুধে চা পাতা, একটু আদা, এলাচ আর অল্প তুলসীপাতা দিয়ে মেসোর চা করে দিয়ে আসতে হবে বাগানঘরে। সাইকেলটা দাওয়ায় তুলে প্যান্টখানা ছেড়ে লুঙ্গি আর ফতুয়া পরে ভালো করে হাত পা মুখ ধুয়ে মেসো চা-টা খাবে আয়েস করে। ওই সময়টা পারুর জন্য বরাদ্দও বটে। রান্নাঘরের দায়িত্ব রমলাকে দিয়ে মাসিও এসে বসে খানিক। তারপর পারুকে তাগাদা দেয়, অনেক হয়েছে গপ্পগাছা। যাও গিয়ে রমলার হাতে হাতে রুটি কটা বেলে দাও দিকিনি।
মেসো বারণ করে। বলে কী এত এটা কর সেটা কর ফরমায়েশ কর? না পারু, তুই গিয়ে পড়তে বোস। কোথাও আটকালে এনে দেখাস আমায়।
মেসো হরিদাস হাইস্কুলের হেডমাস্টার। পাঁচ গাঁয়ের লোক মেসোকে দারুণ মান্যি করে জানে পারু। কেবল এই পারুমা-র কাছেই মেসোর কোন দাপট খাটে না। বাধ্য ছেলের মত সব বায়না মেটায় মুখ ফুটে বলার আগেই। বদলে একটাই আশা, পারু অন্ততঃ একটা পাশ দেবে।

চা বানিয়ে বাগানঘরে যেতে যেতে পারুর খেয়াল হয় ক'দিন পর বৃষ্টি নামার আগেই ইঁটগুলো পাল্টানোর কথা মনে করাতে হবে মেসোকে। আসলে ঘরটা বাড়ির মধ্যে না। মূল বাড়ি আর বাগানের মাঝে একটা জোড়া পাকুর-ডুমুর গাছের নিচে ঘরটা। মাঝের রাস্তাটার দুপাশে এমনিতেই আগাছায় ভর্তি। বর্ষায় সাপ খোপও আকছার বেরোয়। তবে সারাটি বছর ওই ঘরে বসেই সন্ধের চা খায় মেসো। খালি ঘরখানায় একটা তক্তাপোষ আর একটা চেয়ার। চার দেওয়ালে চারখানি ছোট জানলা। একদিকে একটা বইয়ের র্যাক, ব্যাস। সারাদিন ঘরখানা বন্ধ থাকে ছোট তালায়। খালি সন্ধেবেলায় একবার মেসোর এ ঘরে আসা চাইই চাই।

মেসো মাথা নিচু করে একটা ছোট কাগজের দিকে তাকিয়ে বসে ছিল। দরজায় আওয়াজ পেয়ে মাথা তুলল 'আয়, উফ্‌, কী গরম! হাতপাখাখানা কোথায় গেল?'
পারু হাসে, হাতপাখায় তো এত ফুটো যে হাওয়া ওর মধ্যে দিয়েই ফস্কে যায়। তুমি একটা সেকেন্ড হ্যান্ড ফ্যান এনেও তো লাগাতে পার এঘরে মেসো।
ফ্যান এই ঘরে? সে কি আমার ধম্মে সইবে? মেসো মাথা নাড়ে। পারু জানে এই ঘরের ধম্ম ভীষণ কড়া। এই ঘরের জন্য মাসির এই বাড়ি তাদের গাঁয়ের একটা দ্রষ্টব্য জায়গা। বাইরের লোকজনকে এ গাঁয়ের লোকেরা ছুতোয় নাতায় এ বাড়িটা একবার দেখিয়ে দেয় রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে। এই ঘরের ইতিহাস আশেপাশের সাত গাঁয়ের লোক জানে। স্বাধীনতার আগে, যখন আর পাঁচটা হতদরিদ্র গাঁয়ের মতই ছিল তাদের বেনেগাঁ, তখন এক কড়া পুলিশ সায়েব এসে এই গাঁ-কে, এই বাগানঘরকে বিখ্যাত করে দিয়েছিলেন।
আচ্ছা মেসো, যিনি এ ঘরে থাকতেন তার কি গরম লাগত না?
গরম? হা হা করে হাসে মেসো... তিনি ছিলেন মহিয়সী নারী, দেশ স্বাধীন করার ব্রতী। তিনি কি এই গরমে ডরাবেন। গরম তো সামান্যই রে। ওই পুকুরের জোঁক গায়ে পায়ে পিঠে আটকে হাসিমুখে উঠে আসতেন পুকুর থেকে নেয়ে। বাড়ির কোনো মেয়ে বৌ সঙ্গে সঙ্গে সবসময় থাকতই। তারাই মুঠো মুঠো নুন দিয়ে ওই জোঁক ছাড়াত। তার ওপর মশা সাপ এসব তো আছেই! ঠাকুমার কাছে শুনেছি তিনি হাসতেন আর বলতেন এভাবেই নুন দিয়ে ইংরেজদের ভারত ছাড়া করতে হবে।
তুমি তাকে কখনও দেখেছ মেসো?
না রে মা, আমি সে ভাগ্যই করিনি। তার সব গল্প মা ঠাকুমার কাছে শোনা। ঠাকুমা বলতেন কাত্তিক পূন্নিমার দিন রাতের একপহরের একটু আগে তাঁকে নিয়ে আসে বিরাট এক পুলিশ বাহিনী। সাদা নরুন পেড়ে শাড়ি, কবজী অবধি টানা সেমিজ, খালি পায়ে তিনি এসেছিলেন। পুলিশের গাড়ি থেকে নেমেছিল একটা ছোট ট্রাঙ্ক। তাতে আর এক প্রস্থ জামাকাপড়, একটি গীতা, একটি বালির কাগজের তাড়া আর একখান কলম।
ঘুটঘুটে গাঁয়ের পথে নেমে আসা নরুনপেড়ে শাড়িতে যেন সরস্বতী নামার গল্প বলে চলে মেসো। যদিও এই আগন্তুকের কথা পারু জানে। বাগানঘরের দেওয়ালের ভিতর দিকটা মাটির এখনও। বাইরের দিকে মাটির ওপর সিমেন্ট করে সাদা রং করা। তো ওই ভিতরবাগের দেওয়ালে জানলার নিচে লেখা আছে তাঁর নাম, ভারতমাতার কন্যা মলয়া দাস। এ বুদ্ধিও মেসোর ঠাকুমার। তিনিই স্মৃতি হিসেবে ওটা লিখিয়ে নিয়েছিলেন।
জানা গল্পই তবু শোনা চাই পারুর...
“মেয়েদের ওমনি নজরবন্দী করে রাখার নিয়ম ছিল তখনকার দিনে মেসো? তখন তো মেয়েরা বাড়ির বাইরেই বেরোতে পারত না।”
“সে তো পর্দানসীন মেয়েরা বেরোতো না। কিন্তু এই সব সাহসী মেয়েরা যারা ইংরেজদের বিরুদ্ধে পথে নেমেছিলেন তাঁদের জন্য শাস্তি বরাদ্দ তো ছিলই। আর আমাদের এই বাড়িতে, বুঝলিতো, তখন জনা বিশেক মহিলা। চারদিকে ছড়ানো বাগানঘেরা চারচালা আটচালায় মেয়েরা গিজগিজ করছে। বাড়ির পুরুষরা থাকতেন বাইরের দিকের মহলে। ভেতর বাড়িতে তারাও ঢুকতে ইতস্তত করতেন। চাদ্দিকে ভাদ্দরবৌ, বৌমারা পায়ে পায়ে ঘুরছে। ওদিকে আমার তিন জ্যাঠা ছিলেন সরকারের বেতনভোগী। সরকার বাহাদুর ঠিক করলেন এমন বাড়িতেই গৃহবন্দী করে রাখা ঠিক হবে ওনাকে। সে সময় পুলিশে কাজ করা মেয়েদের ডিউটি বেশিরভাগই জেনানা ফাটকে থাকত। তাও মলয়া দাসের সাথে একজনকে পাঠানো হয়েছিল। সে বেচারি বেনেগাঁর মশা আর ম্যালেরিয়ায় নাস্তানাবুদ হয়ে কেবল আপীল করত ট্রান্সপারের।”
আর সেই তিনি? মলয়া দাস? তাঁর ম্যালেরিয়া হত না?
মেসো উদাস হয়ে যায় ... কে জানে। তাঁকে কোনো রোগ বালাইই কাবু করতে পারত না। বাড়ির তখনকার ছোটরা, মানে আমার পিসি কাকারা অনেকেই তাঁকে দেখেছে। শুয়ে শুয়ে বই পড়তেন, ভোরে বাগানে পায়চারি করতেন, মাটি থেকে ফুল কুড়িয়ে ঘরে এনে রাখতেন গীতার ওপর। আমার পিসিকে বলেছিলেন এত বড় সম্পত্তি তোমার বাবা কাকার, বাড়িতে এত মেয়ে। বাড়ির মধ্যেই একটা স্কুল খোল না কেন তোমরা? চাও তো আমিই পড়াতে পারি...”
তারপর?
“তারপর আর কি? সরকার বাহাদুরের কাছে আর্জি গেছিল মলয়া দাস বাড়িতে বসে বাচ্চাদের পড়াতে পারেন কিনা জানতে। সে আর্জি নাকচ হয়। যদিও প্রস্তাবটা আমার বাবা জ্যাঠাদের মনে ধরেছিল কিন্তু আমার পিসি দিদিদের পড়াশুনোর সুযোগ আর হয় নি। ওদিকে মলয়া দাস ধীরে ধীরে আমার মা কাকিদের সাথে দিব্যি ভেতরবাড়িতে গিয়ে বসতেন। সম্বচ্ছরের আচার পাঁপড় বড়ি বানানোর কাজে হাতও লাগাতেন। ঠাকুমাও ওঁকে খুব শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন, তাই শুদ্ধাচার মেনে ওসবে হাত দিলে মানা করতেন না।
বাপরে! তখনকার দিনের পড়াশুনো জানা মহিলা আচার, বড়ি বানাতে পারতেন মেসো? তবে যে মাসি আমাকে ওসব করতে বললেই তুমি বল ওসব করতে হবে না, বরং একটু পড়াশুনো কর!
মেসো মিটি মিটি হাসে... ওরে, ওই বড়ি আর আচারের মধ্যে দিয়েই যে কান্ড যে তিনি করেছেন তাতেই এ বাড়ি বিখ্যাত হয়ে গেল!
কী কান্ড! এটা পারুর জানা গল্প না। উৎসাহে চেপে বসে পারু। মেসো বলে চলেন... তখন তো বড় বড় গয়না বড়ি বানানো হত।তাছাড়া চালকুমড়ো, পোস্ত, বিউলির ডালের বড়ি তো আছেই। তো একবার হল কি, এক ফেরিওয়ালা এসে ঠাকুমাকে ঝুলোঝুলি... তার ঝুড়িতে খান দশেক পাকা চালকুমড়ো। তার বাড়ির জিনিস। ঠাকুমারা যদি কিনে নিয়ে বড়ি বানিয়ে খান আর তাকেও চাট্টি দেন তো পরম উবগার হয়।
ঠাকুমা দোনামনা করেও রাজী হয়েই গেলেন। বড়ি বানানো হল শীতের দিনে সারা ছাদ জুড়ে। তারপর গরমের মুখে একদিন সে এসে হাজির... কই মা, আমার বড়ি দ্যান।
তখন মলয়াপিসি মায়ের সাথে ভাঁড়ারে সব বড়ি আলাদা আলাদা বয়ামে তুলছিলেন। চালকুমড়োওলাকে দেখে হাতে গয়না বড়ির বয়েম নিয়ে বাইরে গিয়ে দাঁড়ালেন। সে ডিজাইন দেখে তো ফেরিওয়ালা ঝুলে পড়ল।
তাকে খানিক বানিয়ে দিতে হবে ওই কলকা করা গয়না বড়ি। সে নাকি কোন ব্যাপারীকে বেচে ভালো দাম তুলে আনবে। ঠাকুমা তো এই মারেন কি সেই মারেন। এসব বাড়ির খাবার বড়ি। বাজারে বড়ি বেচবে এমন অলক্ষ্মীর কথা কেউ তখন গাঁ গঞ্জে শোনেনি। শেষে মলয়া দাস এগিয়ে এসে নিচু গলায় বললেন আপনি না হয় ওকে খানকয়েক দিয়ে দিন। আর কেমন করে বানায় তাও বলে দিন। গিয়ে উনি কারিগর ধরে শিখিয়ে দেবেন খন।তাতে যদি ব্যবসা করে ওঁর সংসারে একটু সুরাহা হয়...
হ্যাঁ, এই এক বুদ্ধিমান্যি মেয়ে বটে। ঠাকুমা রাজী হয়ে গেলেন। ফেরিওয়ালা গামছায় বেঁধে গোটা দশেক গয়না বড়ি নিয়ে রওনা দিল।
দিন তিনেক পর নতুন হালকা গরমে বাড়ির মেয়েরা যখন গায়ের কাপড়টি এলিয়ে হাতপাখা টানছে, ছোটমোটোগুলো মাটির মেঝেতে শেতলপাটি পেতে ঘুমিয়ে কাদা, তখনই আবার সদরে খটখট ঠাসঠাস আওয়াজে ঝাঁকে ঝাঁকে পুলিশ এসে দাঁড়াল। দশজন পুলিশ লাইন দিয়ে বাগানের দিকে দৌড় গেল এমন ভাবে যেন বিরাট কিছু ঘটেছে। মলয়া তখন নিজের তক্তপোষে আসনপিঁড়ি হয়ে বসে গীতা পড়ছেন নিঃশব্দে। দরজায় পুলিশের ঝাঁক দেখে ধীরে সুস্থে ঘরের কোণের দড়িটি থেকে গামছা, সেমিজ আর শাড়িখানা তুলে পাট করে ট্রাঙ্কে ভরলেন। হাতের গীতাটিও ভরে নিলেন সাথে। তারপর হাত দুটি বাড়িয়ে দিলেন। ভিতরবাড়ির খিড়কি দিয়ে ততক্ষনে সব্বাই বেরিয়ে এসেছে। ঠাকুমা হাউমাউ করে কাঁদছেন আর বলছেন কি করেছে ও? ওর হাতে শেকল কেন দিচ্ছ?
কেউ কোন উত্তর দেয়নি জানিস পারু? শুধু মলয়া দাস একমুখ হাসি নিয়ে বলেছিলেন কেঁদো না মা। যার মায়ের হাত পা শেকলে বাঁধা তাকে কি শেকল ছাড়া মানায়?
পারু চোখ গোল গোল করে শুনছিল।
আর বাড়ির লোকেরা? তাদেরকে পুলিশ কিছু বলেনি?
বলেছিল বই কি! তিন সরকারী কর্মচারীকেই জরিমানা দিতে হয়েছিল ভালোরকম। তবে বড় জ্যাঠামশাই সরকারী চাকরীটি এর পরই ছেড়ে দ্যান।”

“বলি দুজনে কি আজ এখানেই রাত কাবার করবে? আর এই গরমে তোকেও বলি পারু, গা ময় ঘামাচি নিয়ে কি পাত্তরপক্ষের সামনে যাবি তুই?" মাসির গলা বাইরের দাওয়া থেকে পাওয়া যায়।
“পাত্তরপক্ষ আবার কি? তোমার মাথায় আমার বে দেওয়ার ভূত এমন চড়ল কেমন করে শুনি?”পারু ফুঁসে ওঠে
“বে তো দিতেই হবে সে আজ দিই কি কাল দিই, না কি গো?” মাসি এবার মেসোকেই সালিশি করে।
“আরে আগে চল, দেখি আজ কি রান্না হল, বিয়ের কথা খালিপেটে হয় নাকি?”... মেসোর উত্তর পারুর কানে ঢোকেনা মনে হয়।
“তুমি আগে বল পুলিশ আবার মলয়া দাসকে ধরল কেন...” ইঁটের রাস্তা পেরোতে পেরোতে আবার খোঁচা দেয় “কী হল, বলবে তো?”
কেন আবার? ওই চালকুমড়োর আড়ে নাকি তার মধ্যে করেই তাঁর দলের লোকেরা খবর পাঠিয়েছিল কিছু। তারপর সেই খবর গয়নার কল্কায় ফুটিয়ে বড়ি বানিয়ে পাচার করে দিয়েছিলেন মলয়া। সে কি খবর কেমন খবর তা এবাড়ির কেউ জানেনা তবে সেই খবরের জেরে কোন এক পুলিশ থানায় ডাকাতি হয় বড় রকম। এক লপ্তে বেশ কিছু অগ্নেয়াস্ত্র আর সরকারী নথি চুরি যায়। পুলিশ বলেছিল থানার ভেতরের খবর আর কিছু নক্সা আঁকা ছিল বড়ির গায়েই।

গা শিরশির করে পারুর। বাগান থেকে বাড়ি ঢোকার পথটুকু রাতের বেলায় ও এখনও একা পেরোয় না। চারদিকের ঝুপ্সি গাছ আর পুকুরের কালো জল মিলেমিশে গা ছমছম করে। এখন তো তাও বাড়িতে ইলেক্ট্রিক লাইট। তার খানিকটা তো বাগানেও পড়ছে। সেই কোন সে এক কালে, মলয়া দাস নামে এক মেয়ে এক ঘুরঘুট্টি বাগানের মধ্যে একটা মাটির ঘরে কেমন করে একা একা থাকত? কোথা থেকে এমন সাহস আর বুদ্ধি পেয়েছিল সে?

রাতে খেতে বসে মাসি প্রথমে জরুরী কথাটাই পাড়ে ... "শুনছ, তোমার সেই ছাত্তর, ডাকু, তার উৎপাতে তো আর টেকা যাচ্চে না! পুকুরে দিন দুকুরে ছিপ ফেলে মাছ তুলে নিয়ে যাচ্চে। রমলা বলল উত্তরের কাঁটাল গাছ থেকে কদিন আগে একটা এঁচোড় পেড়ে নিয়ে গেচে। আজ আমি বিকেলে বাগানে গে দেকি পেঁপে গাচটা কেমন হালকা দেকাচ্চে য্যানো।'
ডাকুই নিয়েছে কে বলল তোমায়? মেসো ভাত মাখতে মাখতে জবাব দেয়।
ছিপ ফেলতে তো পারুই দেকচে রোজ, কি রে পারু? বল্‌... দেকেচিস না?
পারু মাথা নাড়ে। সত্যিই দেখেচে।
মাছ চুরি সব্জি চুরিটাই দেখলে? এই পোড়া গরমে যখন সূয্যিদেব অবধি বেলা গড়ালেই পুকুরের জলে নাইতে নামেন তখন ও সারা দুপুর বিকেল কেন চুরি করে ফেরে সেটা ভাবলে না? মেসোর গলায় স্পষ্ট হতাশা
তাই বলে তুমি ওকে কিচ্ছু বলবে না? দিনে দুপুরে এইভাবে ও গাঁ উজাড় করে লোক খাইয়ে নাম কিনবে?
হঠাৎ কি যেন খেয়াল হয় পারুর। আচ্ছা, মাছ সব্জী না হয় এভাবে ও চুরি চামারি করে যোগাড় করে, কিন্তু ভাত? রোজ ভাত দেয় বাচ্চাগুলোকে, সে চাল কোথায় পায়? সেও চুরির?
প্রশ্নটা শুনে মেসো মিটিমিটি হাসে। তারপর ফাঁস করে রেশন দোকানের বিভুও খানিক সাহায্য করে। তাছাড়া আমার স্কুলের দু তিন জন মাস্টারমশাইও নিজেদের রেশন কার্ড দিয়েছে ডাকুকে।
তুমিও দিয়েচ তবে, নাকি? মাসি গালে হাত দিয়ে অবাক হয়ে বসে... গোটা গাঁ মিলে ওই চোরের সাগরেদি করতে লেগেচ তোমরা?

সকালে ইস্কুলে বেরোনোর সময় পারু নিয়মমত ছাতা, ব্যাগ আর পানটা এগিয়ে দিচ্ছিল, মেসো হঠাৎ গম্ভীর গলায় বোমাটা ফাটাল... তোর মাসি যে বিয়ে বিয়ে করে খেপে উঠেছে। তোরও কি তাই ইচ্ছে?
থমকে যায় পারু। ওর ইচ্ছে কি তা তো জানেই না। কালই জেনেছে মাসি বিয়ের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। পড়তে যে খুব ভালো লাগে তাও না। আবার দুপুরবেলায় বইয়ের পাতার ওই ছবির মানুষগুলোকে দেখলে ওমনি একজনের বুকে মাথা রাখতেও যে মন চায় তাও মিথ্যে না। তবে কিনা তানি বলে সিনেমার হিরো আর জীবনের হিরো এক হয় না। বিয়ে মানেই হাঁড়ি পাতিল শ্বশুরঘরে সবার মন যোগানো বাচ্চাকাচ্চা ব্যাস। এই করতেই বুড়িয়ে যায় মেয়েরা। তানি অনেক পড়াশুনো করতে চায়। ওর ইচ্ছে পঞ্চায়েত দিদির মত ও ও ইস্কুলের মাস্টারনী হবে। মেসোর কথা শুনে খেয়াল হল পারু নিজেই জানেনা তানির মত স্পষ্ট করে যে ও কি চায়।
কি রে? মৌনম্‌ সম্মতি লক্ষণম ধরে নেব? তোর মাসি কিন্তু এই সপ্তাহেই একবার ওদের বাড়ি গিয়ে কথা বলতে বলছে। তবে তুই যদি আরও পড়তে চাস...
থতমত ভাবটা কোনরকমে কাটিয়ে ওঠে পারু তারপর মেসোকেই জিজ্ঞেস করে "আরও পড়তে হলে তো ট্রেন ধরে কলেজ যেতে হবে। মাসি কি যেতে দেবে আমায়?"
"যে বাড়িতে স্বাধীনতা সংগ্রামী কাটিয়ে গেছে সে বাড়ির মেয়ে এমন পরাধীন হলে আমি কি আমার চোদ্দ পুরুষের কাছে মুখ দেখাতে পারব?" হাসতে হাসতে ছাতা, রুমাল ব্যাগ নিতে হাত বাড়ায় মেসো...

স্কুল যাওয়ার পথে উল্টোদিক থেকে সাইকেল আসতে দেখে রাস্তার ধারে সরে যায় পারু আর তানি। ও হরি! ডাকুবাবুই আসছেন। তানিকে দেখে গতি কমায় "কোন ক্লাস হল রে তোর?"
“এই তো,বারো ক্লাসে এবার ডাকুদা। তোমার কাছে যাব ভাবছিলাম একটা ইংরাজী প্যারা বুঝতে..”
“আসিস কিন্তু বিকেলের পরে আসতে হবে। আর পড়া বুঝতে গেলে আমার ছেলেমেয়েগুলোকে একটা গান বা কবিতা শিখিয়ে দিতে হবে বদলে...”
“উফহ, তুমি তো গঞ্জের ব্যাপারীদের মত হয়ে গেছ ডাকুদা। আচ্ছা বেশ শিখিয়ে দেব গান... আমাদের ইস্কুলের প্রার্থনা সংগীতটাই শিখিয়ে দিয়ে আসব...” তানি হাসতে হাসতে পা চালায়।
প্যাডেলে চাপ দেওয়ার আগে ডাকু একবার পারুর দিকে তাকায় আর আবারও, চোখ আটকায়... ছেড়েও যায়।

দুপুরে চুনো মাছের ঝাল দিয়ে ভাত কটা মাখতে মাখতে একটু বুঝি অন্যমনস্ক হয়ে গেছিল পারু, মাসীর ডাকে পাশে তাকাল "কি অত ভাবতে ভাবতে খাচ্ছিস বলত? আমার কথা কি কানে যাচ্চেনা?"
কী? কী কথা?
"বলচি একন থেকে আর ওপরে গিয়ে শুতে হবে না। আমার পাশেই এট্টু গড়িয়ে নিবি দুকুরে। রোদে পুড়োনা বেশি। কবে তারা আসবে মনস্থ করে তার ঠিক নেই। এখন ক’দিন নিজেকে একটু যত্নে রাখ মা।"
"তুমি শোও। আমার তো পরীক্ষা সামনে। স্কুলের পড়াও বাকি আছে। আমি ওগুলো সেরে শোব খন।" এর বেশি আর কিছু বলতে বা জানতে ইচ্ছেও করেনা পারুর।

বাইরে বেশ মেঘ করে এসেছে। বোশেখ গিয়ে জস্টি এসে গেল তাও কালবোশেখি এদিক ওদিক হয়ে চলেছে। গোটা বাগানটা এই রকম মেঘে কেমন আবছা দেখায়। মাসি হাত ধুয়ে ঘরে গিয়ে শুয়েছে। রমলাও এঁটো সগড়ি বাসনকোসন নিয়ে পাতকোতলায় বসবে এখন। পারু পায়ে পায়ে বাগানঘরের দিকে যায়। চাবিখানা আগেই বার করে রেখেছিল মেসোর দেরাজ থেকে। দরজাটা খুলেই একটু থমকে দাঁড়ায়। একটা মানুষ, অত বছর আগে কতটুকুই বা বয়সে দেশকে ভালোবেসে সব ছেড়ে ঝাঁপ দিয়েছিল। এক জীবনে মানুষ কত কিই যে করতে পারে! ভাবতে ভাবতে জানলাকটা খুলেই অন্য একটা কথা মনে আসে পারুর। আজ পুকুরটা একদম শান্ত। ঘাটে আঘাটায় কোথাও কেউ নেই ছিপ হাতে খলুই নিয়ে। আচ্ছা, ওই ছেলেটা, ডাকু, ওওতো দেশের জন্যেই এই সব চুরি চামারি হাত পেতে ভিক্ষে নেওয়া এসব করছে। এই সব বাচ্চাদের পড়াশুনো খাওয়াদাওয়ার দায়িত্ব নেওয়াও কি দেশের কাজই না? এ প্রশ্নের উত্তর হয়ত মলয়া দাসই কেবল দিতে পারেন। জানলার বাইরে শুকনো পাতা ওড়ার খসখসে আওয়াজ। ঘরের ভেতরের ছোট বইয়ের ওপরের তাকটায় কয়েকটা পুরোনো বই রাখা। নিচের তাকে ছোট হাত খুরপি, একটা গাছের ওষুধের প্যাকেট। বইগুলো একটু উলটে পালটে দেখে পারু।
বাইরে থেকে রমলার গলা শোনা যায় পারুদিদি, বৃষ্টি আসছে জোরে। হাওয়ায় পাতা ঢুকবে ঘরে। জানলা টেনে দিও।
ওই ছেলেটা, ও আজ কাদের পুকুরে ছিপ ফেলেছে? এখানে এল না কেন? এরকম ঝড় বাতাসে বাগানে কত ছোট পেয়ারা, আম, পাকা নোনা খসে পড়ে। সেগুলো তুলে নিয়ে গেলেও তো বাচ্চাদের দিতে পারে। ভাবতে ভাবতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে পারু। সত্যিই বেশ জোরে হাওয়া উঠেছে। দূরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে বোধহয়। দরজাটা বন্ধ করে বাগানে নেমে পড়ে পারু। ডাকু কি কারুর নাম হয়? ভালো নাম আছে নিশ্চই একটা। মেসোর ছাত্র ছিল। তার মানে মেসোও জানে। ওর কথা উঠলে মেসো কেমন মায়ামায়া হাসে। মাসি বলে 'লাইয়ের হাসি'।
তানিকে কাল বলেছে বিয়ের সম্বন্ধর কথা। তানি হেসেছে। বলেছে বেশ তো। তুই বিয়ে করে কলকাতার বৌ হয়ে ভাড়া বাড়ির খাটে শুয়ে আনন্দলোক পড়বি। সন্ধেবেলায় বরের সাথে সিনেমা যাবি সেজেগুজে। মাঝেসাঝে আমাদের কাছে আসবি তো? কলকাতার গল্প শুনব তোর কাছে।
তানিটা যেন কেমন। সবেতেই ওর বেশ তো... পারুর কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। ঠিক কেন ফাঁকা লাগা সেটা কিছুতেই বুঝতে পারে না। ও তো সত্যিই পড়ায় মন দিতে পারে না। সিনেমার বইয়ের ছেলেদের ছবি দেখে দেখে গোটা দুপুর কাটিয়ে দেয়। স্কুলের বড়দিও বলেন পারুলবালার পক্ষে পাশ করা খুব কঠিন।
বড্ড এলোমেলো হাওয়ায় দুপুর উড়ছে। সদর দিয়ে বেরিয়েই দেখতে পেল উল্টোদিকে হারাধন জ্যাঠাদের নারকোল গাছে বাঁধা ছাগলগুলো উদাস মুখে আকাশপানেই তাকিয়ে। দুটো জুনিয়ার ইক্সুলের ছেলে খালি পায়ে পিঠে ব্যাগ নিয়ে গুলিপাটকেলি খেলতে খেলতে বাড়ি যাচ্ছে। কেন যে বার বার ওই চোর ছেলেটাকে দেখতে ইচ্ছে করছে এই সময়ে, পারু কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না। পায়ে পায়ে তানিদের বাড়ির দিকে যেতে গিয়ে থমকায় তানি। ওকে ঘিরে ঠাসঠাস ঠুপঠাপ করে বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা নামছে ধুলোয়। মাটির গরম ভাপ আর সোঁদা গন্ধ গায়ে পায়ে জড়িয়ে নিতে নিতে ঘুরে বাড়ির দিকে দৌড়য় পারু।

কাল তোর মেসোকে বলব নালতে আনতে বাজার থেকে। রসুন দিয়ে নালতে আর খেরোর চচ্চড়ি করব খন। তুই তো ভালো খাস ও দুটো। বাগানে অনেক খেরো হয়েছে দেখলাম সকালে। ঝিঙেরও বেশ জালি পড়েছে... আজ বৃষ্টিটা হয়ে ভালো হল বুজলি। গাছের আমগুলো নইলে সব কাঁচাতেই খসে পড়ত...
মাসির চুলে কালো কার কষতে কষতে হুঁ হাঁ জবাব দেয় পারু। আজ এত বৃষ্টি নামল। বাচ্চাগুলো কি খাবে কে জানে। মলয়া দাস থাকলে নিশ্চয় বাগানের খেরো তুলে দু একটা ওদের দিয়ে আসতেন। পারু অন্যমনস্ক হতে হতে বুঝতে পারে বাগানঘরের মলয়া দাস পারুকে বলছেন কটা খেরো ওই চোর ছেলেটাকে দিয়ে আসতে।
আচ্ছা মাসি, মলয়া দাসকে যে পুলিশে ফেরত নিয়ে গেল হাজতে, তারপর তার কি হল?
কে? ওই ডাকাতনি? তার কি হল তা আমি কি জানি? তোর মেসোকে জিজ্ঞেস করিস। আমি ভাবচি কোথায় মেয়ের বের কতা হচ্চে তাই মন উড়ু উড়ু। এদিকে এর মাতায় যত অনাচ্চিস্টি কতা ঢুকে বসেচে। এই জন্যি তোকে বলি মেসোর সাথে বাগানঘরে বসে গপ্প না করে সংসারের কাজে হাত লাগা...
পারু ফিক করে হেসে ফেলে। ডাকাতনি? স্বাধীনতার জন্য লড়তে এসে মলয়া ডাকাত কি করে হলেন মাসির বুদ্ধিতে কে জানে।

মেসো ফিরল ছেঁড়া জুতো লটরপটর করতে করতে। হাতে প্লাস্টিকে বাঁধা কয়েকটা খাতা। পারুর হাতে দিয়ে বলল তুলে রাখ। রাতে চেক করব।
চা আগেই বসিয়েছিল। ডালবড়া করেছে মাসি। প্লেটে করে ডালবড়া আর চা নিয়ে পারুই আগে বাগানঘরে ঢোকে। জানলার নিচে লেখা নামটার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ে "কি মলয়া দাস, খাবেন নাকি দুটো বড়া?"
মেসো চায়ে চুমুক দিয়ে দারুণ একটা তৃপ্তির শব্দ করে হাসে... তোর হাতের চা খেয়ে খেয়ে অভ্যেস হয়ে গেছে রে মা। এরপর তোর মাসির হাতের চা কি রুচবে?
মাসির হাতের চা খেতেই বা হবে কেন? আমি কোন চুলোয় চল্লুম তোমাদের ছেড়ে? পারু তেড়ে ওঠে।
সেকি রে! সকালেই যে মৌনম সম্মতি হয়ে গেল। এবার তো সানাই বাজতে যেটুক দেরী।
আচ্ছা, মলয়া সেনের মাসি মেসো নিশ্চয় তার বিয়ে দেওয়ার মত এরকম খেপে ওঠেনি বল?
মেসো তার বিখ্যাত হাসিটা হেসে ওঠে হো হো করে "মলয়া দাস তো বিয়েই করেন নি। চিরকাল দেশের কাজেই কাটিয়েছেন। স্বাধীনতার পর নাকি মেয়েদের ইস্কুল করেছিলেন নিজেদের মহকুমা শহরে।"
“তাহলে আমাকে বিয়ে করতে হবে কেন?”
“বিয়ে করবি না তো কি করবি? পড়াশুনোয় তো যা মন তা জানাই আছে আমার...”
“সে তো খালি পরীক্ষা দিতে ভাল্লাগেনা বলে। কিন্তু আমি যদি দেশের কাজ করতে চাই তাহলে এখুনি বিয়ে দিতে চাইবে না তো?”
“দেশের কাজ? মরণ দশা আমার! দেশ তো সেই কবেই স্বাধীন হয়ে বসে আছে। তুমি এখন কি কোমরে কাপড় বেঁধে ইংরেজ তাড়াতে কোথায় যাবে শুনি!” দরজা থেকে মাসির গলা পাওয়া যায়।
“স্বাধীন হয়েছে বলেই তো কাজ বেশি। এই যে আমাদের গ্রামেই একটা দাতব্য পাঠশালা চলছে সেখানেও তো কাজ অনেক আছে। নেই?”
মেসো অবাক হয়ে তাকায় "তুই ডাকুর সাথে ওর পাঠশালায় কাজ করতে চাস?"
মেঝেয় বসে আছে পারু। মাথাটা ঠেকে আছে জানলার কাঠে খোদাই করা নামটার ওপর... ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে, “আমি এখন বিয়ে করতে চাইনা। পড়াশুনোয় খুব ভালো না হলে পড়তে মানা আছে তা তো না। তুমি কি ইস্কুলে খালি ভালো ছেলেদের রাখ?”
মেসো চুপচাপ তাকিয়ে আছে...
“আমি খুব চেষ্টা করব একবারে পাশ করতে। খুব খেটে পড়ব। আর ওই চোর না ডাকু ওকে বোলো ওর ইস্কুলে বাচ্চাদের জন্য কিছু করতে হলে করেও দেব। আর কিছু না হোক বাচ্চাদের জন্য রান্নাটাও তো করে দিতে পারি।“
“পাগল নাকি তুই? মাসির চোখ ঠিকরে আসে। ওই চোরটার সাথে রাতের ইস্কুলে কাজ করার শখ হয়েছে! লোকে কি বলবে?”
“আঃ, বার বার চোর চোর বলছ কেন? কিছুই তো বোঝনা ও আসলে রবিনহুডের মত। যিনি ধনীর থেকে লুঠ করে গরীবকে সাহায্য করতেন। তাছাড়া শখটাও তো খারাপ না। এইসবের মধ্যে থাকতে থাকতে গ্র্যাজুয়েশনটাও হয়ে যাবে হয়ত, কিরে পারু? হবে না?” মেসোর কথা নিজের কানে শুনেও যেন বিশ্বাস হতে চায় না।
মাসি খালি চায়ের কাপ আর বড়ার বাটিটা তুলে দুমদাম পা ফেলে বেরিয়ে যায়। যাবার সময় মেসোকে বলে যায় মা মরা মেয়েকে গলায় ঝুলিয়ে রাখার খোয়ার যেদিন টের পাবে সেদিন যেন মাসিকে দুষতে না আসে।

সামনেই টেস্ট। সব ক্লাস হচ্ছেনা তাই মেয়েদের তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিচ্ছেন বড়দি। মাত্র দুটো ক্লাস হল। তানি অবশ্য থেকে গেল স্কুলে। কীসব বোঝার আছে ওর। একা একা বাড়ি ফিরতে ফিরতে পারুর খেয়াল হয় এই দু তিন দিন ও একবারও ওই বইয়ের হিরোদের কথা ভাবেনি। ভেবেছে খালি মলয়া দাস আর ডাকুর কথা। পায়ে পায়ে ডাকুদের বাড়ির দিকে এগোয় পারু।
সদর খোলা। ভেতরে বেশ পরিস্কার ছড়ানো দাওয়া। এক দিকে একটা তুলসী মঞ্চ । ডাকুর মা রান্নাঘরের সামনের বারান্দায় বসে কুটনো কাটছেন। ডাকু সেই পাজামার ওপর কোমরে গামছা জড়িয়ে খালি গায়ে উঠোন পেরিয়ে আসছিল। পারুকে দেখে থমকে দাঁড়াল। তারপর ঝট করে কোমর থেকে গামছা খানা খুলে গায়ে জড়িয়ে নিল।
রকম দেখে পারু হেসে ফেলে...
ডাকুর চোখে প্রশ্ন স্পষ্ট।
“আমি... তোমার ইস্কুলের জন্য কিছু করতে চাই...”
“দাঁড়াও এক মিনিট” ডাকু ঘরে গিয়ে শার্ট চড়িয়ে বাইরে আসে... “কিছু করতে চাও মানে?”
সামনের বুনো আকন্দর বেগনী ফুলের দিকে তাকিয়ে পারু আবার একই কথা বলে... “তোমার ওই নাইট স্কুলের জন্য আমিও কিছু করতে চাই।”
হঠাৎ?
মলয়া দাস হলেও তাই করতেন।
মলয়া দাস? ওঃ, তোমাদের বাড়ির সেই...
হুঁ, কী করতে পারি বল স্কুলের জন্য?
তুমি বল কি করতে পার...?
ডাব্বুর পুরুষালী ঘামঘাম গন্ধটা পারুকে একটু আচ্ছন্ন করে নাকি রোদ্দুরের তাতেই ঘোর লেগে যায় কে জানে।
তোমার মত মাছ চুরি পারব না, তবে পুকুর সাঁতরে কলমি তুলে দিতে পারি, বাচ্চাগুলোর রান্না বোধহয় মা-কে দিয়েই করাও, সেকাজেও সাহায্য করতে পারি।
কতদিন?
পূর্ণ চোখে তাকায় পারু এবার... যতদিন তুমি চাইবে।

দুপুরের রোদে ঝলসে ওঠে সুখ। পারু জানে আজ রাতের চাঁদেও উপছে যাবে জোছনা। মলয়া দাস কি জানেন পারুকে তিনি পথ চিনতে শেখাচ্ছেন ধীরে ধীরে? বাড়ির গেট খুলে পারু বাগানঘরের দিকে এগোয়। একা একা দাওয়ায় বসে আর একটু পোড়াতে ইচ্ছে করছে নিজেকে। তারপর পুকুরে ডুবসাঁতার।
এখন একটাই কাজ বাকি। ডাকুর ভালো নামটা জানতে হবে। ডাকাতির সম্ভবনা আছে বলেই কাউকে ডাকু বলে ডাকা যায় নাকি?
ধ্যাত!

ফেসবুক মন্তব্য