ডিপ্রেশন

সুমনা পাল ভট্টাচার্য


এতো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। ঠিক এই স্কুল ছুটি হবে, আর প্রতিদিন এই সময়টাতেই বৃষ্টি নামতে হবে। কি যে অসহ্য লাগে। মেয়েটার হাত ধরে, অত ভারি একটা স্কুল ব্যাগ সামলিয়ে আর পারা যায় না। তারপর গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো বাস আসবে তবে... কতোবার বলেছে তিথি, মোম এখন বছর আটেকের হয়ে গেছে, নিজের টা যে এক্কেবারে বোঝে না তা নয়, এবার স্কুল বাসে, বা পুল কারে দিয়ে দিক। কিন্তু একথা উঠলেই শ্বশুর, শাশুড়ির মুখ ভার। একেই তাদের ছেলের ট্রান্সফারেবেল জব বলে, নাকি নাতনির ঠিকমতো দেখাশোনা হয় না, বাবু থাকলে ঠিক এটা লক্ষ্য রাখতো, বাবু থাকলে ঠিক ওটা শেখাতো, বৌমা একা আর কি করে এতোদিক সামলাবে, মেয়েটার কপাল, এসব বাঁকা সুরের কথা শুনতে শুনতে তিথি অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তার ওপর যদি মোম কে নিজে না দেওয়া- নেওয়া করে স্কুলে, তবে তো আর দেখতে হবে না। রামকাহন শুরু হয়ে যাবে সম্ভাব্য কি কি বিপদ হতে পারে তাই নিয়ে!
রাস্তাটা পার হয়ে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছে তিথি, কোথাও একটু আনমনা-
একটা সময় ছিল, যখন বৃষ্টি তে সবাই ঘরের জানলা দিলে, তিথি দিত হাট করে খুলে, সবাই ছাতা মাথায় দিয়ে হাঁটলে তিথি ভিজত চুপচুপে হয়ে, আর আজ! আজ যেন কোথাও বড় কান্না পায় তিথির।
রাহুলের ট্রান্সফারাবেল জব একথা তো জানত তিথি, বিয়ের আগেই। বাইরে থাকতে হতে পারে বিয়ের পরে, এও জানত। কিন্তু এটা জানত না, যে তাকে এখানে শ্বশুর শাশুড়ির দেখভালের জন্য পড়ে থাকতে হবে, আর রাহুল থাকবে অন্য মুলুকে। আজকাল খুব একা লাগে। ফোনে কথা মানেই, টাকার হিসেব, মেয়ের শরীর, মেয়ের পড়াশুনা, বাবার প্রেসার, মায়ের সুগার, নিজের কাজের চাপ, অফিস পলিটিক্স এমন কি কখনো কখনো তিথির শরীরেরও খোঁজ নিতে ভোলে না রাহুল।
সব কথা এদিক সেদিক হলে, লাইন কেটে যায়, শুধু তিথির মনের খোঁজ নেওয়ার কথা কখনও ভুলে ও মনে হয় না রাহুলের। কি ভীষণ যে অভিমান হয়, তবু এটাই যেন স্বাভাবিক দাম্পত্যের নিয়ম, বুঝে গেছে তিথি।
এইসব সাতকাহন ভাবতে ভাবতেই যাও বা একটা বাস এলো, সাংঘাতিক ভীড়। কিছুতেই মোম কে নিয়ে ওঠার মত নয়। কি যে জ্বালায় পড়ল আজ। এদিকে মোম রেনকোট এতক্ষণ পরে থাকারও মেয়ে নয়, আর চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকারও নয়।
ইতিমধ্যেই বায়না শুরু হয়ে গেছে, 'কোলে নাও', 'গরম করছে', 'রেনকোট খুলে দাও', ইত্যাদি ইত্যাদি ঘ্যানঘ্যানানি।
বিরক্তি আর ধৈর্যের পরীক্ষায় বারবারই দ্বিতীয় টাকেই জিতিয়েছে তিথি। তাই নির্বিকার থাকার চেষ্টাই করছে।
এমনই সময় "ঋদ্ধিমা"... বলে এক চিৎকার।
ওমা, এতো মোমের প্রাণের বন্ধু ঐশী।
সেই নার্সারি থেকে এক সেকশনে দুজনে। মেয়েটা লেখাপড়ায় এতো ভাল। কয়েকবার অনুপস্থিত থাকায় ঐশীর খাতা নিয়ে এসেছে মোম বাড়িতে ক্লাশের কাজ টুকবে বলে, তখন দেখেছে তিথি, ঐশীর মুক্তোর মত হাতের লেখা। আর মোমটা কিছুতেই গুছিয়ে লেখেনা, অক্ষরগুলো যেন ডানা মেলে ওড়ে লাইন ছাড়িয়ে।
ঐশীর মা নেই, দুবছর হতে চলল বোধহয়। শুনেছে তিথি, ভদ্রমহিলার ক্যান্সার হয়েছিল। আহারে, ওটুকু মেয়ে, সেটাও হয়তো একটু বেশিই মায়ার কারণ তিথির। মোমের পাঁচ বছরের জন্মদিনে নিমন্ত্রণও করেছিল, ড্রাইভার নিয়ে এসেছিল, মেয়েটিকে, আবার ড্রাইভারই নিয়ে গেছিল।
"নমস্কার, আমি ঐশীর বাবা।"
বলতে বলতেই মোমের মাথায় খুব স্নেহের হাত বুলিয়ে দিলেন শান্তনু।
"ওর কথা শুনি তো ঐশীর থেকে, খুব ট্যালেন্টেড মেয়ে ঋদ্ধিমা।"
তিথি ভেতরে ভেতরে বেশ স্বস্তি ও আনন্দ পেলেও তাড়াতাড়ি বলে উঠল, "না, না, খুব ফাঁকিবাজ, ঐশী তো ভীষণ ভালো।"
এবার শান্তনু মুচকি হাসলেন। খুব চনমনে, প্রাণবন্ত এককথায় ভাল লাগার মত পুরুষ শান্তনু। তিথিও হাসল। গালে হাল্কা টোল পড়া তিথির দিকে চেয়ে থাকা শান্তনুর চোখ দুটোকে হঠাৎ মুগ্ধতা যেন কেমন বদলে দিল।
"ওবাবা, এরা তো খেলতে লেগে গেছে..." বলেই তিথির খিলখিলে হাসি।
একছুট্টে ঐশী এবার তিথির সামনে, দুহাতে জড়িয়ে ধরল তিথিকে, "আন্টি প্লিজ, ঋদ্ধিমা আমার গাড়িতে করে যাবে, তুমি না কোরোনা প্লিজ!"
মোম ও বেশ মিনতি করার ভঙ্গিতেই চেয়ে আছে তিথির দিকে। তিথি জানে, এসময় সব বাসেই কি ভীষণ ভীড় হবে, গাড়িতে গেলে তো ভালই, কিন্তু তবু, এটার কি দরকার!!
তিথি বেশ সংকুচিত হয়ে তাড়াতাড়ি বলে উঠল, "না সোনা, আজ নয় আর একদিন, কেমন! তুমি এসোনা আমাদের বাড়ি, খেলবে বন্ধুর সাথে..."
বলতে বলতেই শান্তনুর চোখে চোখ রাখল তিথি, "ওকে পাঠাতে পারেন তো আমাদের বাড়িতে প্লিজ, কাছেই তো, একা তো ওরা সবাই, একটু সঙ্গ পেলে ভাল কাটবে ওদের।"
শান্তনু কথাটা প্রায় লুফে নিয়েই বলল, "হ্যাঁ হ্যাঁ কেন নয়, নিশ্চয়ই যাবে, কিন্তু এখন আপনারা চলুন। বাসে খুব ভীড় হবে, বাচ্চা নিয়ে সমস্যায় পড়বেন, দেখা যখন হোলোই, আর একই পথে তো যাওয়া, আসুন প্লিজ।" বলতে বলতেই ওপারে পার্ক করা ঝকঝকে লাল স্যান্ট্রোর দিকে এগোতে লাগল শান্তনু। যেন আর উত্তরের অপেক্ষাই করল না।
তিথি বসেছে শান্তনুর পাশে, কারণ দু-বন্ধু কেউ কাউকে ছাড়বে না। আর, হুড়োহুড়ি করবেই দুটোতে একসাথে। তাই দুটোকে পেছনের বিস্তর সিট ছেড়ে দেওয়াই ভাল। বাড়ির গলির মুখেই তিথি বলল "ব্যস ব্যস এখানেই।" শান্তনু তাড়াতাড়ি একটা ব্রেক কষতেই, গাড়ির সামনে রাখা কাঁচের শো-পিসটা ঝনঝনিয়ে এসে পড়ল তিথির হাতের উপর। তিথি হাত থেকে গুছিয়ে তুলতে যেতেই হঠাৎ, "ওফ্",
শান্তনু তাড়াতাড়ি আঙুল টা ধরে, "ইস,রক্ত বেরিয়ে গেল তো!" বলেই নিজের পকেট থেকে রুমাল টা বের করে চেপে ধরল আঙুল টা। তিথির সারাটা শরীরের রক্ত প্রবাহ যেন ওই আঙুলের ডগায় এসে আছড়ে পড়তে লাগল। কেমন একটা শিরশিরে অনুভূতি। শান্তনু এক নি:শাসে পাড়ার অসুধের দোকানের সামনে এনে দাঁড় করালো গাড়িটা, "নিন নামুন, টিটেনাস নিতে হবে।"
তিথি বাচ্চাদের মত প্রায় আঁতকে উঠে বলল, "খেপলেন নাকি! একবিন্দু রক্ত বেরোলে কেউ টিটেনাস নেয়? কি যে বলেন না!"
"মানে? কাঁচে কেটে গেছে, ওইসব মেটাল টেটাল ও ছিল, চলুন তো!" বেশ ধমকের স্বরেই বলে উঠল শান্তনু।
তিথি এবার মৃদু হেসে বলল "আচ্ছা বিপদ তো, বেশ, সেরকম ব্যথা হলে, দরকার মনে হলে আমি ঠিক এসে নিয়ে নেবো, এখন চলুন।"
"ঠিক তো?"
তিথি ভেতরে ভেতরে কেমন যেন ভরে যাচ্ছিল, খুব নরম হয়ে বলল, "হুম, ঠিক।"
শান্তনু একছুটে দোকানে ঢুকেই মুহুর্তে বেরিয়ে এলো, "দেখি আঙুলটা, দেখি"
তিথিও এগিয়ে দিল হাত টা, ইস নখ গুলিতে আধওঠা, নেলপালিশ, এখন যদি নখ গুলো একটু রঙিন থাকতো, কি ভালই না হোতো, একটু সাজলেই তিথি কে এখনও কলেজ গার্ল মনে হয়, ভাবতে ভাবতেই তিথি জিগ্যেস করল, "কী হল?"
শান্তনু মুখে আর কিছু না বলে ব্যান্ডেডটা জড়াতে লাগল আঙুলে। আর ওষুধের প্যাকেট টা হাতে দিয়ে বলল, "কিছু খেয়ে, ওষুধটা খেয়ে নেবেন প্লিজ।"
তিথি মাথা নাড়ল।
খবরে বলল 'ডিপ্রেশন' শুরু হয়েছে। এই বৃষ্টি চলবে এখন, থামার নয়। ডাইনিং স্পেসের লাইটটা অফ করে, হাউস-কোট টা খুলে ফেলল তিথি, আয়নার সামনে বসে নাইট ক্রিম টা আলতো হাতে বোলাতে গিয়েই হঠাৎ টনটনিয়ে উঠল আঙুল টা। অনেকক্ষণ ব্যান্ডেড লাগানো আঙুল টাকে চোখের ঘন হয়ে আসা আদরে ভেজালো তিথি, কেমন যেন, শান্তনুর মুখটা খুব কাছে চলে আসছে তিথির, চোখ খুললেই যেন সব কথা সবাই পড়ে ফেলবে এখুনি।
আনমনে, নিজের নরম শরীরটাকে বিছানায় ঘুমন্ত মোমের পাশে নিয়ে গিয়ে ফেলল তিথি, বুকের খুব কাছে মোম কে টেনে নিয়ে নি:শ্বাস নিচ্ছে, এমন সময়ই মোবাইলটা উঠল বেজে,
"কি গো খুব বৃষ্টি হচ্ছে? অসুবিধে হয়নি তো মোমের ফিরতে? আরে, বাজার আছে তো?"
তিথি রাহুল কে প্রায় থামিয়ে দিয়েই বেশ জোর গলাতেই বলতে লাগল, "জানো আজ কি হয়েছে, ঐশীর বাবা তো লিফট দিলেন... আমার তো হাত কেটে..."
কথা শেষ ও হল না, তার আগেই রাহুল বলে উঠল, "ওহ শোনো না, কাল ও একটা মিটিং আছে, দেরি হবে ফোন করতে, ওকে চলো, ফাইল নিয়ে বসতে হবে আবার এখন, টেক কেয়ার, গুড নাইট।"
তিথির আজ আর তেমন মন কেমন করল না তো কই! এ তো অভ্যেস করে ফেলেছে তিথি, সামান্য আঙুল কাটায় রাহুল উতলা হবে হঠাৎ এমন ভাববেই বা কেন তিথি!
মোমের নরম তুলতুলে গালে একটা আলতো চুমু এঁকে দিয়ে ওর গায়ের মিষ্টি গন্ধটা নিতে নিতে মনে হল, ডিপ্রেশনের বাংলা বুঝি মন খারাপ? কিন্তু কই, এমন আকাশ জুড়ে ডিপ্রেশন মন যে চাইছে রোজ - রোজ- রোজ।
আস্তে করে উঠে ব্যাগ থেকে অসুধের খাম টা বার করল তিথি, তারপর ঢক ঢক করে অসুধ দুটো গিলে নিয়ে ব্যান্ডেডএর ওপর আলতো করে ঠোঁটটা চেপে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল "গুড নাইট!"
ড্রিমলাইটের নীল আলোটা শুধু জানলো আজ রাতে ড্রিম সত্যিই এসেছে এই বিছানা, বালিশ, চাদর ছাপিয়ে তিথির মন - শরীরের সমস্ত ভাঁজে ভাঁজে।
আকাশের ডিপ্রেশন বাড়ছে, রাত বাড়ছে, আর বাড়ছে স্বপ্নের জোনাকিরা...

ফেসবুক মন্তব্য