কলমের গাছ

অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়



জেঠিমণি রান্নাঘর আর দালানকোঠার মাঝখানে চাতালে বসে কতগুলো কুলোয় ডালের বড়ি দিচ্ছিলেন। মোটাসোটা মানুষ, একটা খুব নীচু মোড়ায় বসেও হাঁসফাস করছিলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, হাঁ করে দেখছিস কি, বড়ি-দেওয়া দেখিস নি কখনও? এ বাড়ির লোকগুলো সব এক ঝাড়ের বাঁশ, তোর বাবাও ভেতর বাড়িতে এসে আমাকে বড়ি দিতে দেখলে ফ্যাকফ্যাক করে হাসতো, বলতো, খোট্টার দেশের মেয়েরা যে লিট্টি-চোখাই বানায় না, বড়িও দেয়, জানতাম না তো!

আমি কিন্তু অতশত ভাবিনি। আসলে জেঠিমণিকে দেখে একটু অবাক লাগছিল। জেঠিমণির বাপের বাড়ি ছিল দেওঘর। দাদু-ঠাকুমা তীর্থে গিয়ে যে পান্ডার বাড়ি উঠেছিলেন তার পাশের বাড়িতেই বুঢ়াবাবা চক্রবর্তীর নাতনিকে তাঁদের দুজনেরই এত পছন্দ হয় যে জেঠামণির কনে হিসেবে ঘরে নিয়ে আসতে দেরি করেন নি। এসব আমার জন্মের অনেক আগের কথা।

জেঠিমণি আমার কাছে নিজেই গল্প করেছে, আমার বিয়ের সময় তোর বাবা পনেরো, হাফপ্যান্ট। এদিকে নিজে যে তখন সতেরো, এটা আর আমাকে বলবে না। আমি মায়ের কাছে, ঠাকুমার কাছে শুনে নিয়েছি। জেঠু তখন তেইশ-চব্বিশ হবে, এ জি বেঙ্গলে সদ্য চাকরি পেয়ে মা-বাবাকে তীর্থ করাতে নিয়ে গেছিলো বাবা বদ্যিনাথের কাছে।

সেই বিয়ের গল্প বাবা খুব মজা করে বলতো, এরকম কনে তো আগে কেউ এখানে দেখে নি। শোলার মুকুট কোথায়, একদম মা কালীর জরির মুকুট, কমলা রঙের সিঁদুর আর হলুদ শাড়ি। ভাগ্যিস গায়ের রঙ ফরসা। খোট্টার দেশের মেয়ে বলে কথা। জেঠিমণি কপট রাগে বলতো, সময়-অসময়ে দই-শুঁঠ, ঠেকুয়া ...খোট্টার দেশের মেয়ের হাতের খাবার ফরমাস কোরো, মজা টের পাওয়াবো এবার। বাবা জেঠিমণির সাথে এরকমই খুনসুটি করে আনন্দ পেত।

কিন্ত জেঠিমণি কি সত্যিই বড়ি দিচ্ছে, না ও আমার বিভ্রম। উনুনের পাশে বসে এ আবার কি রকম বড়ি-দেওয়া! আরে না, ও তো চাসকে পিঠে...ভেতরে পুরটা মিষ্টি হয় না, নোনতা। সঙ্গে একটা রাইয়ের চাটনি, একটু একটু করে মাখিয়ে মাখিয়ে খেতে হয়।

আসলে রান্নাঘর আর তার চারধারের চাতাল জেঠিমণিরই রাজপাট ছিল। একটা হাতে ঘুরানো যাঁতাও ছিল...ডাল ভাঙতে দেখেছি অনেকবার। শেষদিকটায় অবশ্য শুয়ে শুয়েই রান্না করার মত ভঙ্গি করতো...যাঁতা ঘোরানোর মত করে হাত ঘোরাতো। সঙ্গে কখনো কখনো একটা গানও গুনগুন করতো, কান পাতলে তার একটা শব্দই বোঝা যেত, কি যেন, হো দীননাথ.... মোট কথা, এখন বসে বসে জেঠিমার পক্ষে বড়ি-দেওয়া অসম্ভব। একথা মনে হতেই আমি জেগে উঠে বসলাম, টি-শার্টটা ঘামে ভিজে গায়ে সেঁটে গিয়েছে।

জেঠিমণি তো কবেই চলে গিয়েছে। আমিই এখন আটচল্লিশ।



রাত সাড়ে তিনটে, মশারির ভেতরে আবছা আলোয় সুমির ঘুমন্ত মুখটা একবার দেখলাম। তারপর বাথরুম ঘুরে এসে লিভিং রুমের ব্যালকনিতে দাঁডা়লাম। কয়েকঘন্টা অবিশ্রান্ত বর্ষণের পর প্রকৃতি যেন একটু থমকে দাঁড়িয়ে দম নিয়ে নিচ্ছে। সিগারেট ধরালাম একটা । সুমি জানতে পারলে অনর্থ করবে যদিও। ডাক্তারের পই-পই করে বারণ করা আছে।

এত রাত হল, স্ট্রীট ল্যাম্পের হলুদ আলো সাপের বিষের মত গড়িয়ে যাচ্ছে রাস্তা বেয়ে, এক আধটা গাড়ি, মোটরবাইক তার ওপর দিয়ে যেন স্রেফ গ্লাইড করে চলে যাচ্ছে নিজেদের গন্তব্যে। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে রাতচরা পাখির খ্যা-খ্যা করে ডেকে ওঠা শুনলে গা শিরশির করে ওঠে। মনে হয়, এ অন্ধকার আসলে একটা পর্দা। হাত বাড়িয়ে সরাতে পারলেই আমাদের সেই সানবাঁধা গ্রামের বাড়ি, খোলামেলা উঠোন, আমার কৈশোর। পর্দা একটু তুলে ঢুকে পড়তে পারলেই হয়।

অথচ একটু পরেই দিগন্তের অবয়বহীন অন্ধকার থেকে গাছপালা, বাড়িঘরদোরের গাঢ় শিলুয়েট জেগে উঠতে থাকবে। ঘন কৃষ্ণ প্রেক্ষাপট আস্তে আস্তে প্রগাঢ় নীল থেকে ক্রমশ ফিকে নীল হয়ে যেতে থাকবে। আকাশের সেই ফিকে নীলে যেই কমলারঙের ছোপ ধরবে, বিছানার পাশের ছোট্ট ঘড়ির আওয়াজে সুমি জেগে উঠবে, বাথরুম যাবে, হাত-মুখ ধুয়ে এসে রান্নাঘরে গিয়ে চা বসাবে। আমার বর্তমানের বাজারহাট বসে যাবে।

সুমি এই মহারাষ্ট্রেরই মেয়ে। শিবাজী পার্ক, দাদারের মেয়ে ইশকুল, সোফিয়া কলেজ.... আমাদের আলাপ কাজের জায়গায়। দুজনেই নাটক দেখতে ভালবাসি। প্রথমদিকে আমরা তিন-চারজন মিলে একসাথে যেতাম, মরাঠি-হিন্দি-গুজরাটি নাটক, মরাঠি সঙ্গীত নাটক...আমরা প্রথম একসাথে গেছিলাম একটা হিন্দি নাটক দেখতে, জুহুর পৃথ্বী থিয়েটারে...তারপর ভাইদাস অডিটোরিয়াম, দাদারের শিবাজী মন্দিরে, আরো অনেক খ্যাত-অখ্যাত হলে।

সুমিকে বিয়ে করবার ইচ্ছের কথা যখন বাড়িতে জানালাম, বাড়িতে প্রবল আপত্তি ....আমাদের কোন একজন আত্মীয়া বলেছিলেন, এক গাছের ছাল অন্য গাছে লাগে না। জেঠিমণি তখন বলেছিলেন, আমরা, মেয়েরা তবে কি? আমরা তো কলমেরই গাছ....নিজের সোনার চুড় তখনই তুলে রেখেছিলেন সুমির জন্য...সে প্রায় বাইশ–তেইশ বছর আগের আগের কথা।

সুমির বাড়িতেও খুব ভাল কিছু সিচুয়েশন ছিল না। চালচুলোহীন, বাংলা থেকে কাজ করতে আসা একটি ছেলে, তার নিজের খোলি (ফ্ল্যাট) নেই, তার সাথে বিয়ে দিলে মেয়েকে জামাই রাখবে কোথায় ভেবেই অস্থির সুমির বাবা-মা।

তাও বিয়েটা হল। মঙ্গলাষ্টকও পড়া হল, টোপর, শোলার মুকুট....জেঠিমণি আসতে পারেন নি, তখনই জেঠু খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন, কিন্তু সুমির জন্য আশির্বাদী উপহার ঠিক পৌঁছে গেছিল সুমির হাতে। পুরনো, ভারি স্টাইলের সে গয়না দেখে সুমির মা খুব খুশিও হয়েছিলেন শুনেছি, বঘ্, কিতী ছান দিসতোয়!


ব্যালকনিতে লাগানো টবে সদ্যফোটা বেলফুলে একটা পুরনো ব্যাথার মত চিনচিনে সুগন্ধ। সঙ্গে একটা অসোয়াস্তি, বাঁ-হাতের উপর ঘেঁষে একটা চিনচিনে ভাব... যেদিন লক্ষ্যাতোড়া শ্মশানে খোলা আকাশের নিচে জেঠিমণির নাইকুন্ডলী পুড়ছিল, সেদিনও আজকের মত আষাঢ়ের একটা প্রকান্ড জলভরা মেঘের পাহাড় ঠিক মাথার ওপর অপেক্ষা করে ছিল। শবযাত্রীর দল উদ্বিগ্ন হয়ে একবার আকাশ দেখছিল, একবার আগুনের রীতি। বাঁশ দিয়ে উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে দিচ্ছিল, যাতে তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে আসে।

আমার ভাইপো ছোটু নিচু গলায় বলছিল, এদানি খুব বাবার থানের কথা বলতো। বিকারের ঘোরে এমন ভুল বকতো, যেন পৌঁছেই গিয়েছে। আবার সাড় এলে বলত, দাদা, আমায় একটিবার সেখানে নিয়ে যাবি?
-তা একবার গাড়ি ভাড়া করে নিয়ে গেলে তো পারতিস!
-কি যে বল কাকা, সেখানেও কে-ই বা আছে? সব মরে হেজে গিয়েছে। খোকাদাদুরা আর নেই, সে বাড়িতেও দখলিসত্বে কে বসত করছে তার ঠিক আছে? ভাল করতে গিয়ে মারধোর খেয়ে ফিরতে হত। কথাটা, ভেবে দেখলাম, ঠিক।

দেওঘর থেকে বাংলার গন্ডগ্রামে সেই যে বিয়ের কনে হয়ে এসে ঢুকেছিল জেঠিমণি, তারপর ক’বার দেওঘরে গিয়েছে, এক হাতের কর গুনে বলা যায়। তার মধ্যে একবার ছিল খুড়তুতো ভাইয়ের বিয়ের সময়, যাকে আমরা খোকামামা বলে ডাকতাম। ঘোর সংসারি মানুষ, নিজের সংসারটাকে প্রাণ দিয়ে আগলে রেখেছিলেন অথচ কে জানতো বুকের মধ্যে ছিল ছেড়ে আসা জনপদের বসতি। কমলা,পুষ্পা, এতোয়ারী...ছোটবেলার সব সহেলীরা, যাদের নাম বিড়বিড় করে বলে যেত। ছটপুজোর গান...রান্না-বান্নায়, ঠেকুয়া, আরো সব মিঠাই বানানোতে আসলে সেই ছেলেবেলা ছুঁয়ে থাকা।

না, কেউ জানতো না বলা হয়ত ভুল, আমার বাবা, তাঁর দেওর নিশ্চয়ই এই গোপনপুরের কিছু খবর জানতো, তাই নিয়েই ছিল দুজনার মধ্যে খুনসুটি। জেঠুমণি, বাবা চলে গিয়েছে আগেই, আমাদের বাড়িতে পুরষরা তাড়াতাড়িই পাট চুকিয়ে ফেলে, নইলে নিশ্চয় বাবার থানে নিয়ে যাবার কথাটা বিবেচনা করা হত।

শরীরটা ঠিক লাগছে না। যুক্তি বলছে, সুমিকে এখন একবার ডেকে তোলা উচিত। অথচ মন বলছে, এমন তরল অন্ধকারে তোমার দেশের গন্ধেশ্বরী নদীর বর্ষার জলের ঘূর্ণি, তাকে হাত দিয়ে কতদিন ছোঁওনা, বলতো? এইটুকুই তো কলমের গাছের নিজস্ব সময়!

আলমারিতে বাংলা গানের সিডি, গল্পের বই....আ-শরীর বাংলার ঘ্রাণ। যেটুকু বাংলা নিজের মধ্যে বাঁচিয়ে রেখেছ, তা কার হাতে তুলে দিয়ে যেতে পারবে? তোমার ছেলে, তার পরের প্রজন্ম?
আমাদের একটাই ছেলে, অজিঙ্ক্য, যাকে বাংলায় অজেয় বলা যেতে পারে। ঘরে আমরা ভাঙা হিন্দী, মরাঠী আর ইংরাজী বলি। সুমি বাংলাও একটু একটু বলতে পারে। কিন্তু ছেলে একদমই পারে না। বাবার বাংলা নিয়ে এই মাতামাতিকে সে হয়ত যুক্তি দিয়ে বুঝবে, শ্রদ্ধা করবে, সাজিয়েও রাখবে....কিন্তু ঠিক হৃদয়ে তুলে রাখার মত সে হবে না না। সেটুকু আমার সঙ্গেই.....

ছেলে যখন বছর তিন-চার, ওদের সবাইকে নিয়ে যেবার সানবাঁধায় গেছিলাম, জেঠিমণির তখন শরীর খারাপ হতে শুরু করেছে, কিন্তু মাথা পরিষ্কার... ছেলেকে আদর করতে করতে আমার দিকে ফিরে বললেন, কলমের গাছ ঠিক লেগে যায় বই কি। কথাটায় কি পুরনো কথার জের টেনে ঠাট্টা ছিল না নিজের অনুভব, বোঝার আগেই প্রসঙ্গ পাল্টে গেছিলো পাঁচজনের পাঁচকথায়। এখন জেঠিমণিকে সামনে পেলে কি বঙ্কিমি স্টাইলে রহস্য করে বলে ফেলতাম, তাতে মালীর সুখ, কলমের গাছের তাতে কি! হয়তো তাও পুরোপুরি সত্য না।

এক নির্বাসিত নবাব কলকেতা শহরের মধ্যেই একটা আস্ত, আদ্যন্ত অন্য শহর বসিয়েছিলেন, প্রাসাদ, বাগিচা, নাচঘর, রসোই, মসজিদ.....যে শহর ছেড়ে আসবার সময়, তিনি গাইছিলেন, নৈহর ছুটো যায়, সেই ঘুচে যাওয়া, ছুটে যাওয়া নৈহরেরই প্রতিরূপ। তিনি কি প্রতিরাতে এই অন্ধকারের পর্দা তুলে দেখতেন তাঁর হারানো পলগুলিকে? অথচ এই কলকেতায় তিনি কি খুব কষ্টে ছিলেন?

আমাদের হাতের মুঠো থেকে খসে পড়ছে সময়ের তরল, টুপটুপ করে। নৈহর ছুট হি যা রহা হ্যায়। প্রতিনিয়ত। তাও আমরা আমাদের হারানো সময়ের স্মৃতিতে বাজার বসাই। পকেটে রেস্ত থাকলে নবাবের মত, বাসাবাড়ি ঘিরে জনপদ তৈরি করি, আর আমার মত ছা-পোষা গেরস্ত মানুষ হলে স্রেফ বুকের মধ্যে।

যেমন জেঠিমণি। যেমন আমি। যতই ভালভাবে লেগে যাক কলমের গাছেরও কিছু গোপন স্বপ্নের সম্বল হাতে থেকে যায় বই কি।

হাতের সিগারেটটা পুড়ে পুড়ে শেষ হচ্ছে। আমি একটা লম্বা শ্বাস নেবার চেষ্টা করতে থাকলাম। হয়তো সেই চিনচিনে ব্যাথাটা আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাবে। হয়তো আর চার-পাঁচ মিনিটের মধ্যেই এলার্ম বেজে উঠবে।

ফেসবুক মন্তব্য