অথ ইলিশ কথা

গোরা চক্রবর্তী



শিক্ষিত অথবা অশিক্ষিত, ধনী অথবা দরিদ্র, বাঙালি আজও মাছে-ভাতে বেঁচে বর্তে আছে। কত রকমের মাছ যে বাঙালি খায় তার নিখুঁত তালিকা বানানোও বুঝি দুঃসাধ্য। বাংলা কবিতা, গান, গল্প, ছড়া ও উপন্যাসেই যে কত রকমের মাছের উল্লেখ রয়েছে! শুধু প্রাচীন পল্লিগীতি ও লোকসংগীতগুলোর মধ্যেই রয়েছে নানান রকম মাছের উল্লেখ। বাংলার আচার অনুষ্ঠান এবং পূজাপার্বণেও মাছ ঢুকে পড়েছে অবলীলায়। যাত্রা শুভ করতে যাত্রারম্ভে দোর গোড়ায় মাছ রাখা অনেক বাঙালির বাড়িতে আজও অবশ্য পালনীয় আচার। বিয়ের তত্ত্বে এখনো সবার আগে পাঠানো হয় সিঁদুরে-হলুদে প্রসাধিত নাকে নোলক পরা মাছ। আজও মান্য ধর্মীয় আচরণের মতো অনেকেই নিয়ম করে বিজয়া দশমীর দিন বাড়িতে ইলিশমাছ রাঁধেন এবং সরস্বতী পূজার দিন জোড়া ইলিশ জোগাড়ের চেষ্টা করেন। মনসাদেবী এবং অষ্টনাগ পূজার শেষ দিন থাকে অরন্ধন ব্রত। আগের দিন মনসা দেবীর স্মরণে সারা রাত জেগে ভাত ও ইলিশমাছ ভাজা রান্না করে পরের দিন সেই পান্তাভাত ও বাসি ইলিশভাজা খাওয়া হয়।
তবে সব চেয়ে কোন মাছ ভালো সে তর্কের মীমাংসা না হলেও প্রচলিত কথায় তার একটি সঙ্কেত পাওয়া যায়।
মাছের মধ্যে ইলিশ রাজা,
রুই-কাতলা তাহার প্রজা।
ইলিশই বোধহয় একমাত্র সেই অভিজাত মাছ যাকে কবি বুদ্ধদেব বসু বলেছেন জলের উজ্জ্বল শস্য। তিনি গোটা একটি কবিতা লিখে গেছেন 'ইলিশ' শিরোনামে।
এপার বাংলা-ওপার বাংলা, বাঙালি মাত্রেরই প্রিয় এই ইলিশ। এই ইলিশ নিয়ে ছোটবেলায় যে মা-মাসিদের মুখে কত প্রচলিত গ্রাম্য ছড়া শুনেছি! তার বেশিরভাগই ইলিশ মাছ রান্না সংক্রান্ত এবং তার কোন অংশ পরিবারের কাকে কীভাবে বশ করতে পারে সেই বিষয়ে বৌমাকে দেওয়া শাশুড়ির উপদেশ। ভারি মজার সে সব কথা। স্মৃতি হাতড়ে মনে পড়ছে, শুধু ইলিশের মাথা দিয়েই কিভাবে ননদ বা শ্বশুরকে বশ করা যায় তাই বোঝাতে শাশুড়ি বৌমাকে উপদেশ দিচ্ছেন,
পুঁই শাকে যদি দাও ইলিশের মাথা,
ননদিনি কয় তার গুপ্ত যত কথা।
কিংবা,
যদি ইলিশের মাথা দিয়া রান্ধ কচুশাক,
গোমড়া শ্বশুর আনন্দেতে হইবে সবাক।
ইলিশ মাছে খুব কাঁটা হয়, তাই নিয়েও মুখে মুখে ঘুরতো দুটি পংক্তি। সিরাজগঞ্জের ডাঁটার কথাও ছিল তার ভেতরে। আসলে বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জের ডাঁটার বৈশিষ্ট হলো যে তা দৈর্ঘে প্রায় ছ-সাত ফুট এবং বেশ মোটা হয়। তাদের ত্বক খুব কঠিন হয়। তবে ভেতরে কোমল নির্যাস থাকে যা অতীব সুস্বাদু। মুগের ডালে তার ব্যবহার ডালের স্বাদে এক অন্য মাত্রা যোগ করে। তাছাড়া সরষে বাটা দিয়ে ঐ ডাঁটার মাখো মাখো ঝাল খেতেও খুব ভালো লাগে। ইলিশের বড্ড দুঃখ যে তার দেহও ঐ সিরাজগঞ্জের ডাঁটার মতো, কাঁটায় ভর্তি।
'ইলিশ মৎস বলে আমার গায়ে বড় কাঁটা,
আমারে মজায় শুধু সিরাজগঞ্জের ডাঁটা।'
বাঙালি সংস্কৃতির সাথে ইলিশ ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে। আজকাল তো বর্ষার সময় দুই বাংলাতেই, শুধু দুই বাংলা কেন, বাংলার বাইরেও অনেক শহরে ঘটা করে 'ইলিশ-উৎসব'-এর আয়োজন করা হয়। একসময় বর্ষা এলে বাঙালির ঘরে ঘরে আপনিই পালিত হত ইলিশ উৎসব। এমনকি কলকাতার কেরানীর ঘরেও। তাই তো কবি লিখেছিলেন,
"তারপর কলকাতার বিবর্ণ সকাল ঘরে ঘরে ইলিশ ভাজার গন্ধ;
কেরানীর গিন্নির ভাঁড়ার সরস সর্ষের ঝাঁজে। এলো বর্ষা ইলিশ উৎসব।" --- সেদিন অবশ্য আর নেই। ইলিশ এখন, কেরানীর সাধ্যাতীত হয়ে উঠছে, হয়ে উঠছে দুষ্প্রাপ্য।
ইলিশমাছ রাঁধারও হরেক প্রণালী। এবং ইলিশ কেনা এবং তা রান্না যে সর্বস্তরের বাঙালির মধ্যে এক উদযাপনের আনন্দ নিয়ে আসত, তা বোঝা যায় বুদ্ধদেব বসুরই অন্য আরেকটি কবিতা 'নদীস্বপ্ন' থেকে এই উদ্ধৃতিটুকু পড়লে,
"ইলিশ কিনলে? আঃ বেশ বেশ তুমি খুব ভালো, মাঝি
উনুন ধরাও ছোকানু দেখাবে রান্নার কারসাজি।"
ইলিশ রান্নার এই কারসাজিও ছিল মানুষের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। জেলে সম্প্রদায় যারা আসলে ইলিশ ধরে, তাদের অনেকের আর্থিক অবস্থা ভালো না হলেও, তাদের বাড়িতেও কিন্তু কালেভদ্রে ইলিশ মাছ রান্না করা হয়। খুব সাদামাটা পদ্ধতিতে হলুদ, কাঁচালঙ্কা এবং জিরে ফোঁড়ন দিয়ে তারা ইলিশের পাতলা ঝোল রান্না করে। সে রান্নাও কিন্তু খুব স্বাদু হয়। প্রায় পঞ্চাশ রকম পদ্ধতিতে ইলিশমাছ রান্না করা যায়। সরষে বাটা দিয়ে ভাপা ইলিশ অথবা ইলিশ-পাতুরী হলো জনপ্রিয় পদগুলির মধ্যে অন্যতম। ইংরেজ রাজত্বকালে যে সব সাহেবরা ঢাকায় বসবাস করতেন, তাঁরা ইলিশ পুড়িয়ে (Smoked Hilsha) খেতেন। ইলিশমাছের শুঁটকী ঠিক হয় না। তবে হলুদবাটা এবং নুন সহযোগে ইলিশ সংরক্ষণ করা হয় যাকে বলে নোনা ইলিশ। বেগুন দিয়ে এই নোনা ইলিশের মাখো মাখো ঝাল খেতে খুব ভালো লাগে। এ ছাড়াও আলু, বেগুন বা কাঁচকলা দিয়েও ইলিশের পাতলা ঝোল রাঁধা হয়। ইলিশ ভাজলে তার যে তেল এবং তার সঙ্গে ইলিশ বা তার ডিম ভাজা দিয়ে গরম ভাত, সাধারণত বাঙালি ইলিশ খাওয়া শুরু করে এই দিয়ে। তারপর একে একে আসে ঝোল ও ভাপার মতো অন্য পদগুলো। এমনকি ইলিশমাছের টকও খুব সুস্বাদু। আসলে ইলিশই বোধহয় সেই মাছ যা যে পদ্ধতিতেই রান্না করা হোক, স্বাদে তা উৎকৃষ্ট হতে বাধ্য।
এ পর্যন্ত ইলিশ নিয়ে যতটুকু আলোচনা হলো, তা দুই বাংলার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তবে অনেক পাঠক হয়তো জানেন না যে ইলিশের কদর কিন্তু অন্য প্রদেশেও রয়েছে। এপার বাংলার পাশের রাজ্যই উড়িষ্যা। সে রাজ্যেও ইলিশ সমান জনপ্রিয়। সেখানকার ভাষায় একটি প্রচলিত কথা আছে, 'মাছ খাইবা ইলিশি, চাকরি করিবা পোলিশি।' অর্থাৎ, পুলিশে চাকরির তুল্যই রাজকীয় ইলিশ খাওয়ার সৌভাগ্য। উড়িষ্যা সংলগ্ন তেলেঙ্গানাতেও ইলিশ খুব জনপ্রিয় মাছ। তেলেগু ভাষায় একটি প্রবাদ আছে,
পুস্তেলু অম্মি অইনা পুলাসা তিনছু। তেলেগু ভাষায় পুলাসা মানে হল ইলিশ। প্রবাদটির বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়, “বিবাহ বিক্রি করে ইলিশ খাওয়া শ্রেয়।“ এখানে বিবাহ বলতে বোঝানো হচ্ছে, বিবাহ সূত্রে পাওয়া ধন যা মূলত স্ত্রীর গয়নাগাটি। এই গয়না বিক্রি করা কোন ব্যক্তির চরম আর্থিক দুর্গতির পরিচায়ক। তবুও এই প্রবাদে বলা হচ্ছে “বিয়ের গয়না বিক্রি করে ইলিশ খাওয়া শ্রেয়।“
তেলেগু ভাষার মতো ভারতের সবচেয়ে পুরোনো ভাষা তামিলেও একটি প্রবাদ রয়েছে, যা তামিলনাডু়র ইলিশ সংস্কৃতির পরিচায়ক।
'উল্লধাই ভিটথু উল্লম ভাঙ্গি সাপিডু। 'উল্লম' হল তামিল ভাষায় ইলিশ মাছ। এই তামিল প্রবাদটির মানে হল “তোমার যা কিছু আছে তা বিক্রি করে ইলিশ খাওয়ার আনন্দ উপভোগ কর।“
অন্যদিকে মালয়ালাম (কেরলের ভাষা), কন্নড় (কর্ণাটকের ভাষা) বা কোঙ্কনী(গোয়া এবং কঙ্কান উপকুলবর্তী অঞ্চলের ভাষা)ভাষাগুলিতে ইলিশ মাছের কোনো উল্লেখ পাইনি। কারণ এই অঞ্চলগুলিতে কোন নদীর মোহনা না থাকা। পাঠক হয়তো জানেন যে, কোন নদী পশ্চিমঘাট পর্বতমালা থেকে নেমে এসে পশ্চিমে আরব সাগরে মিলিত হয় না। তারা বয়ে চলে পূব দিকে। যেমন কৃষ্ণা, কাবেরী, ভীমা প্রভৃতি নদী। সে জন্য ওই সব রাজ্যে কোন নদীর মোহনা নেই এবং ইলিশ মাছও ওখানে পাওয়া যায় না। ভারতের একমাত্র নামকরা পশ্চিমমুখী নদী নর্মদা মধ্যভারতের সাতপুরা পর্বতমালায় উৎপত্তি হয়ে বিন্ধ্যপর্বতমালার উত্তর পাদদেশ দিয়ে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হতে থাকে। সমস্ত মধ্য ভারতকে শস্যশ্যামলা করে গুজরাতে প্রবেশ করে এবং অবশেষে ক্যাম্বে উপসাগরে মিলিত হয়। সত্যি বলতে, এই দীর্ঘ যাত্রা পথে নর্মদা মধ্যপ্রদেশ ও গুজরাতের শুষ্ক ভূমিকে সিক্ত করার পর ক্যাম্বে উপসাগরে যখন আসে তখন তাতে আর বিশেষ স্রোত থাকে না। একমাত্র বর্ষাকালেই এই নদীতে খানিকটা স্রোত থাকে এবং তখনই শুধু জামনগরে পালা (ইলিশ) পাওয়া যায়। তবে বছরের প্রলম্বিত সময় ধরে এই মোহনায় বিশেষ স্রোত থাকে না বলেই বোধহয় পালাদের মধ্যে গঙ্গা বা পদ্মার ইলিশের উজ্জ্বল উল্লাস দেখা যায় না। আর তীব্র স্রোতের প্রতিকুলে সাঁতার কাটতে হয়না বলেই এদের দেহে মেদ কম হয়, এবং তাই তার স্বাদও বাংলার ইলিশের মতো মনোহর নয়।
বর্তমানে কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও ইলিশ স্থান করে নিয়েছে। সম্প্রতি (২০১৬) এপার বাংলায় বিধানসভা নির্বাচনে শ্রীমতী মমতা বন্দোপাধ্যায় বিজয়ী হওয়ার পর তাকে বাংলা দেশের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী শেখ হাসিনা দশ কিলোগ্রাম পদ্মার ইলিশ উপহার স্বরূপ পাঠিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। একসময় বাঙালি সমাজে শ্বশুর বাড়িতে জামাই বাবাজীর জোড়া ইলিশ নিয়ে আগমন উচ্চ সামাজিক অবস্থানের পরিচায়ক ছিল। এমনকি অফিসের বড়বাবুকে সন্তুষ্ট করতে দেড়-দু কিলো ওজনের পদ্মার ইলিশ ওঁনার বাড়িতে পাঠানোর চল একসময় কোলকাতায় চালু ছিল বলে শুনেছি।
ইলিশ সংস্কৃতি নিয়ে তো অনেক কথা লিখলাম, এবার তার জীবনবৃত্ত নিয়ে কিছু লেখা যাক। ইলিশ বসবাস করে সমুদ্রে। প্রজননের তাগিদে নদীতেও তারা জীবনের একটি অংশ কাটায়। তবে পুকুর, সরোবর, দিঘি, বিল অথবা ভেড়িতে কখনও বসবাস করে না। কারণ ইলিশ সবসময় জলের স্রোত চায়। আর এই জলাশয়গুলিতে জলের স্রোত থাকে না। পৃথিবীর ৫ ডিগ্রী থেকে ৩০ ডিগ্রী উত্তর অক্ষাংশ, আর ৪২ ডিগ্রী থেকে ৯৭ ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশ পর্যন্ত ব্যাপ্ত পরিসরের সমুদ্রে এরা বসবাস করে। ইলিশ সাধারণত সমুদ্রের ২০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত বিচরণ করে। পরিণত ইলিশ দৈর্ঘে প্রায় ৬০ সেন্টিমিটার এবং ওজনে প্রায় ৩ কিলোগ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। সাধারণত ইলিশ সমুদ্র ও নদীর ভাসমান ছোট ছোট পোকা, মাছ এবং শৈবাল (Plankton) খেয়ে বেঁচে থাকে। এছাড়াও সমুদ্র উপকূলবর্তী অথবা নদীর কাদার মধ্যে থাকা ছোট ছোট কীট ও মাছ খেয়ে থাকে। বর্ষাকালে (জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস) আর শীত শেষে (জানুয়ারী থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত) ডিম পাড়ার তাগিদে ইলিশ নদীর উজান বেয়ে ৮০ থেকে ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত নদীর ভেতর ঢুকে পড়ে। এবং সাধারণত তখনই ইলিশ ধরা হয়ে থাকে।
এই যে বলা হলো ইলিশ নদীর উজান বেয়ে মিষ্ট জলে ঢুকে পড়ে, তা কিন্তু সরাসরি নয়। নদীর মোহনায় আসার পর কয়েকদিন ওরা ওখানেই বসবাস করে। নদীর মোহনার জল সমুদ্রের জলের তুলনায় কম লবণাক্ত। তাই নদীর মিষ্ট জলে ঢোকার আগে ইলিশ কিছু দিন নদীর মোহনায় কম লবণাক্ত জলে (ইংরেজীতে এই জলকে বলা হয় Brackish Water) বসবাস করে নিজেদেরকে মিষ্ট জলে বসবাস করার উপযুক্ত করে তোলে। তা না হলে সমুদ্রের লবণাক্ত জল থেকে হঠাৎ করে নদীর মিষ্ট জলে এলে ওদের যকৃৎ ঠিকঠাক কাজ করে না এবং ওদের মৃত্যু হয়। মোহনায় এই কয়েকদিনের বসবাস প্রক্রিয়াকে বলা হয় কন্ডিশানিং। তেমনি নদী থেকে সমুদ্রে ফিরে যাওয়ার সময়ও কিছুদিন মোহনায় বসবাস করে তাদের দেহকে লবণাক্ত জলের জন্য কন্ডিশানিং করে নেয়।
চিন, ভিয়েৎনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, মাইনমার, বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি দেশের নদীগুলিতে ইলিশমাছ পাওয়া যায়। ইরান-ইরাকের টাইগ্রীস-ইউফ্রেটিস নদীতেও অল্প বিস্তর ইলিশমাছ পাওয়া যায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ মিলিয়ে সর্বমোট প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ টন ইলিশ নদী ও সমুদ্র থেকে ধরা হয়। তার সিংহ ভাগ, প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পাওয়া যায় বাংলাদেশে, প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পাওয়া যায় ভারত ও পাকিস্তান মিলিয়ে এবং বাকি শতাংশ পাওয়া যায় মাইনমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভিয়েৎনাম, চিন ও শ্রীলঙ্কা মিলিয়ে অন্যান্য দেশে।
ইলিশ জাতিতে হেরিং (Herring Shad) পরিবারের মাছ। এই মাছটির অনেক নাম। অসম এবং দুই বাংলায় এর নাম ইলিশ অথবা ইলশা, ওড়িষ্যায় ইলিশি, তামিল ভাষায় উল্লম মীন, তেলেগুতে পুলাস অথবা পুলাসা, মারাঠি ও গুজরাতি ভাষায় এর নাম পাল্বা অথবা মদেন্ন এবং ইরান-ইরাকে একে বলা হয় সবুর (Sboor)। ইলিশ খুব তৈলাক্ত মাছ। তবে ইলিশের তেল ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড (Omega-3 Fatty Acid)-এ পরিপূর্ণ থাকে বলে এই মাছ রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে বিশেষত দুই বাংলা (পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ)-য় ইলিশ অতি প্রিয় খাদ্য।
কোথাকার ইলিশ সবচেয়ে ভালো তা নিয়ে অনেক তর্কবিতর্ক হয়। গুণগত কারণে গঙ্গা ও পদ্মার ইলিশকেই উৎকৃষ্ট বলে মনে করা হয়। তবে পদ্মায় আসতে একটু দীর্ঘ সময় সাঁতরাতে হয় বলে ওখানকার ইলিশ বেশী মেদবহুল হয়। আর ঠিক সেই কারণেই পদ্মার ইলিশকে অনেকে বেশী প্রশংসা করে থাকেন। গঙ্গার উপনদী রূপনারায়ণের তীরে কোলাঘাটের ইলিশও বিখ্যাত।
বাংলাদেশ শুধু ইলিশ রপ্তানী করেই বেশ ভালো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। ইলিশ ধরে এবং রপ্তানীর করে বাংলাদেশে প্রায় সাড়েচার লক্ষ লোক জীবিকা নির্বাহ করে। ওই দেশের জাতীয় আয়ের এক শতাংশেরও বেশি GDP ইলিশ প্রকল্প থেকে উঠে আসে। বাংলাদেশের এই বিশ্বমানের ব্যবস্থার জন্য সারা বিশ্বের বাঙালিরা আমেরিকা, ক্যানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলিতে বসবাস করেও পদ্মার ইলিশ খেতে পারেন।
দুঃখের বিষয় এই যে অনেক জন্তু-জানোয়ার যেমন অবলুপ্তির পথে, তেমনি ইলিশ মাছও অবলুপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে। তার মূখ্য কারণ হল ইলিশের অতিরিক্ত চাহিদা। সারা বিশ্বে বছরে ৫০ লক্ষ টন ইলিশ ধরা হয়। এবং এর ভেতর ৩০ লক্ষ টনই শুধু বিশ্ব জুড়ে থাকা ২৫ কোটি বাঙালির রসনা পরিতৃপ্ত করে।
একসময় দুই বাংলারই জেলে সম্প্রদায় একটা অলিখিত নিয়ম পালন করতো। বিজয়াদশমীর দিন থেকে প্রায় সরস্বতী পূজার দিন পর্যন্ত তারা ইলিশমাছ ধরতো না। কারণ এই সময় ইলিশ নদীতে ডিম পাড়ে। ছানা ইলিশ একটু একটু করে বড় হয়ে খোকা ইলিশে পরিণত হয় এবং নদীর স্রোতে ভাসতে ভাসতে সমুদ্রে ফিরে যায়। ইলিশের বংশ বৃদ্ধির এই বৃত্ত তারা বাঁচিয়ে রাখতো। এমনকি তাদের অনেকেই খোকা ইলিশ (যে ইলিশ আকৃতিতে লম্বায় প্রায় সাত ইঞ্চি পর্যন্ত তাদেরকে খোকা ইলিশ বলা হয়। ওপার বাংলায় বলে ঝটকা।) কখনও শিকার করতো না। আর সত্যি বলতে কি, খোকা ইলিশের স্বাদও তেমন ভালো হয় না। কিন্তু গত দুই দশক ধরে আর্থিক লাভের লালসায় মৎস্য ব্যবসায়ীরা এ নিয়ম আর মানে না এবং জেলে সম্প্রদায়কে খোকা ইলিশ শিকারে প্ররোচিত করে। ফলে বর্তমানে দুই বাংলার নদীগুলিতে, বিশেষ করে গঙ্গায় ইলিশের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। যদি এমনটা চলতে থাকে ভবিষ্যতে ইলিশ প্রজাতির ধীরে ধীরে অবলুপ্ত হয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা।
বাংলাদেশ সরকার এই খোকা ইলিশ না ধরার নিয়মাবলী কঠোর অনুশাসনের মাধ্যমে ওখানকার জেলেদের পালন করতে বাধ্য করে। কারণ আগেই বলেছি যে ঐ দেশের GDP-র এক শতাংশেরও বেশি আসে ইলিশ শিকার এবং কেনাবেচা থেকে। কিন্তু এপার বাংলায় সারা বছর ইলিশ ও খোকাইলিশ ধরা বজায় থাকে। পশ্চিমবঙ্গে যদিও মৎস্য দপ্তর বলে একটি দপ্তর রয়েছে, একজন মন্ত্রীও রয়েছেন তবু এই দপ্তর শুধু একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেই তাদের কর্তব্য শেষ করেন। কিন্তু তা মানা হচ্ছে কি না সে বিষয়ে কেউ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন কারে না। এমনকি ২০১৫ সালে বর্ষার প্রথম দিকে হঠাৎ কোলকাতার মাছের বাজার ছেয়ে গিয়েছিল খোকাইলিশে যা কিলো প্রতি মাত্র তিন-চারশো টাকায় বিক্রি হয়েছিল।
ভবিষ্যতে ইলিশ যদি বিলুপ্ত না হয় তবে তা বাংলাদেশের জন্যই বেঁচে থাকবে। হয়তো পদ্মা ও মেঘনা নদীতেই শুধু ইলিশ পাওয়া যাবে। কোনদিন তারা গঙ্গাতে আর ঢুকবে না। পরের প্রজন্মের পশ্চিমবঙ্গীয়দের অধিকাংশকেই হয়তো শুধু ছবি দেখেই চিনে নিতে হবে তাদের সাধের মাছটিকে। কিংবা থাকবে ঐ সুন্দরবনের মুক্তাঞ্চলে গিয়ে রয়েল বেঙ্গল টাইগার দেখার মতো কোনো ব্যবস্থা। যেখানে গত তিন বছরে কোন পর্যটক বাঘের টিকিটিও পর্যন্ত দেখতে পান নি। হ্যাঁ, চিড়িয়াখানায় গিয়ে অবশ্য এই প্রজাতির বাঘ এখনো দেখতে পাওয়া যায়। তবে ইলিশ কিন্তু অ্যাকুয়ারিয়ামে গিয়েও দেখতে পাওয়া যাবে না কারণ জলের এই উজ্জ্বল শস্য যে স্রোত ব্যতীত থাকতে পারে না। তখন শুধু ছবি দেখেই আমাদের ইলিশ রসনা চরিতার্থ করতে হবে।

ফেসবুক মন্তব্য