কালবোশেখি

মিলন চট্টোপাধ্যায়



বিকেল হচ্ছে। বুবাইদের আমবাগানে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে দেখতে পাচ্ছি লাল হয়ে যাচ্ছে আকাশ। লাল মেঘে ঝড় আসে জেনেও আটকে গেছে পা। শোঁ-শোঁ আওয়াজের সঙ্গে পাক খাচ্ছে পাতা। আম পড়ছে। টুপটাপ, ধুপধাপ। মধুকুলকুলি গাছের তলায় দৌড়ে আসছে শিশির আর বাপ্পা।

তখন বছর দশ। তখন শৈশব। ভিজে চুপচুপে ফিরে আসছি বাড়ি। কোঁচড়ে আম। শিল পড়ে সাদা হয়ে আছে উঠোন।

একটু বড় হতেই শরীর জুড়ে কালবোশেখির দাপট। মাঝে মাঝেই চারদিক থেকে ছুটে আসে ঝড়। গাছ থেকে পাখি পড়ে যায়। আমবাগানে শুধু আম নয়, আমসদৃশ অন্যকিছুও। এখানে ঋতুর নিষেধ নেই। নীরবতা ছাড়া।

বেলখাস আমগাছতলায় একদিন দুপুরে দেখে ফেলেছিলাম রাজহাঁস। হালকা চর্বিওলা পেট। শাঁখ বেজেছিল অকাল সন্ধায়। সেবারও ভিজেছিলাম। বাড়ি ফেরার পর জ্বর এসেছিল খুব।

প্রিয়বন্ধু নামের অ্যালবামটা আমাকে শুনতে দিয়েছিল এক সদ্য গর্ভিণী নারী। বিয়ের বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বীজতলা তৈরি হয়েছিল তার। সারাদিন ফাঁকা বাড়িতে জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই সে খুঁজে পেয়েছিল অমলকে। সেই অমল, যার জানলা ছিল আকাশ, পৈঠে ছিল চূর্ণীর ধার। সেই নারীর ঘর ছিল চূর্ণীর ধারেই। তখন সিডি নেই, ক্যাসেট প্লেয়ারে সারা সন্ধে, রাত্তির শুনলাম অর্ণব আর জয়িতার মান-অভিমান, বন্ধুত্ব, প্রেম। পরেরদিনও। তারও পরেরদিন দুপুরবেলায় ফেরত দিতে গেলাম সেই ক্যাসেট। খুব গরম ছিল সেদিন। একটা পাতাও নড়ছিল না কোনও গাছের। চূর্ণীর ধারে জমাট বেঁধে ছিল একলা গরম। একদম একলা। পাকুড় গাছের কাকগুলো পর্যন্ত ডাকছিল না। অমন ভয়ংকর শূন্যতা, অমন পুড়িয়ে দেওয়া গরম আগে অনুভব করিনি। ঘণ্টাখানেক পর বন্ধ জানলার বাইরে আছড়ে পড়ছিল হাওয়া। জানলা খুলে দেখি নদীর ওপার থেকে ছুটে আসছে কুচকুচে কালো একটা মেঘের চাদর। সবকিছু গ্রাস করে প্রচণ্ড বৃষ্টিতে ধুয়ে যাচ্ছিল মনোরম নদী!

কালবোশেখি আমাকে শিখিয়েছে ঠাণ্ডা হতে। শিখিয়েছে ভিজে যাওয়া। খুব প্রিয় কিছু মানুষ যেমন শিখিয়ে দিয়েছে ভিজিয়ে দিতে। তাদের জন্যই একদিন শত্রু হয়েছি এমন কিছু মানুষের যাদের সঙ্গে আলাপ পর্যন্ত ছিল না, সেই তারাই ছুঁড়ে ফেলেছে কাজ মিটে গেলে। প্রকৃতির সঙ্গে তফাৎ এটুকুই - সে ফিরিয়ে দেয় জীবন, আর এরা চিতাকাঠের গীতিকবিতা! এ কালবোশেখি অন্তহীন। কেবলই ঝড় আর ঝড়। আশ্রয়ের নামে খুলে দেওয়া মর্গের দরজা। ফিরে আসা কঠিন জেনেও নিজেকে আবৃত করি বাঁচার চেষ্টায়। সরে যেতে চাই ক্রান্তীয় অঞ্চল ছেড়ে এক ইউটোপিয়ার দিকে! তবু যেতে পারি কই! জীবনের রাস্তায় উত্তমাশা অন্তরীপ পদে পদেই। তাই আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া মাত্রই বন্ধু ভুলে যায় বন্ধুত্ব। ভেঙে যায় প্রেম নামক অপার্থিব সম্পর্ক সামান্য পার্থিবতায়! দাদা বলে ডেকেছি যাদের, নামী কবি হওয়ার সুকৌশলী চেষ্টায় তারাই হাতে তুলে নেয় খঞ্জর। সামান্য ধানীজমির জন্য খুন হয় ভাইচারা।

এখন বুঝতে পারি - আমার আমগাছ নেই। ক্রমশ জীর্ণ হচ্ছে মায়ের আঁচল। রক্তচক্ষুর বদলে ঘোলা চোখে তাকিয়ে থাকেন বাবা। কেবল ধুলোঝড় আর ঝরে যাওয়া শুকনো পাতা ছাড়া পড়ে নেই কিছু। এখন চোখ আপনাআপনিই বন্ধ হয়ে যায় মাঝেমধ্যে। ভাবতে থাকি - মানুষের সাড়া পেলে উড়ে যাওয়া এক সারসের কথা। যার ডানায় লেগে থাকে কালবোশেখির হাওয়া, চোখে বৃষ্টির জল।

ফেসবুক মন্তব্য