অমৃত ফল

অনিরুদ্ধ সেন



“বোসো।” ক্ষীণকণ্ঠে বললেন প্রফেসার সুরঞ্জন বোস।
নার্সিং হোমের স্পেশাল রুম। প্রফেসার বোসের হাতে বেঁধানো একগাদা নল, মাথার কাছে রাখা অক্সিজেন মাস্ক। উদ্বিগ্ন ঋত্বিক বলল, “স্যার, আপনি খুব দুর্বল, কথা বলবেন না। মাস্কটাও আবার পরে নিন।”
“আমি ডঃ মুস্তাফির পারমিশন নিয়েছি। জানি, আর বেশি সময় পাব না। তার আগে তোমাকে কিছু কথা না বললেই নয়।”
প্রফেসার বোসের স্বরে কী ছিল, ঋত্বিক প্রতিবাদ করতে গিয়েও থেমে গেল। প্রফেসার এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগছেন। ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট ঋত্বিক তাঁকে বাবার মতোই দেখে, তিনি অসুস্থ হওয়া ইস্তক সে ছেলের মতো প্রাণ দিয়ে তাঁর দেখাশোনা করছে। তবে ডাক্তার বিশেষ আশা দিতে পারেননি।
“তুমি আমার সহকারী আর একান্ত নিকটজন।” প্রফেসর শুরু করলেন, “আমার অনেক রিসার্চের বিষয়ই তুমি জানো। কিন্তু তুমিও জানো না যে আমি একান্তে, বলতে পারো ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় এক অবিশ্বাস্য স্বপ্নকে ধাওয়া করেছিলাম – তা হচ্ছে অমরত্বের সাধনা। আর সেই গবেষণার ফল –” বলে তিনি মার্বেল সাইজের একটি গোলাকৃতির বস্তু সাবধানে ঋত্বিকের হাতে তুলে দিলেন।
“এটি হচ্ছে অমৃত ফল।” তিনি হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন, “আমি একে কোনও মানুষের ওপর পরীক্ষা করার সুযোগ পাইনি। কিন্তু আমি নিশ্চিত এটি অব্যর্থ। এটা তোমার হাতেই দিয়ে গেলাম।”
কয়েক মুহূর্ত বাকহারা হয়ে থাকার পর ঋত্বিক বলল, “কিন্তু অমরত্ব – এ যে অসম্ভব, স্যার!”
অনেক কষ্টে শক্তি সংগ্রহ করে প্রফেসার বোস বললেন, “চিকিৎসা শাস্ত্র আজ মানুষের শরীরকে কার্যত পুনর্গঠিত করতে পারে। অজস্র দুরারোগ্য ব্যাধির বিরুদ্ধেও সে লড়তে পারে, যদি সময় পায়। কিন্তু মুস্কিল হচ্ছে মস্তিস্ক থেমে গেলেই মানুষ মৃত। যে যন্ত্রেই রাখো না কেন, শরীরে তার নিজস্ব অনুভূতির স্পন্দন আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
আমি এই সমস্যাটাকেই আক্রমণ করার চেষ্টা করেছি। অনেক যত্নে সৃষ্ট এই ফলে রয়েছে এমন জৈব অণুর সংগঠন, যা মস্তিস্কের এই স্পন্দনকে কখনও থামতে দেবে না আর এই অর্থে মানুষকে অমরত্ব দেবে।”
“কিন্তু স্যার, যদি কোনও কারণে শরীর ধ্বংস হয়ে যায় তবে মস্তিস্ক কী করবে?”
“সেদিকেও আমি এগোচ্ছিলাম। বস্তুত, শরীর সেই অর্থে কখনও সম্পূর্ণ ধ্বংস হতে পারে না। তবে –”
বলতে বলতেই প্রফেসারের কাশির দমক এল। ঋত্বিক ব্যস্ত হয়ে বলল, “স্যার, আর কথা বলবেন না।”
অনেক চেষ্টায় আত্মস্থ হয়ে প্রফেসার বললেন, “আর সময় পাব না, তাই সংক্ষেপে সারছি। আমি তোমাকেই নিকটতম মনে করি, তাই এটা তোমার হাতে দিয়ে গেলাম। যদি সাহস হয় তো নিজের ওপর পরীক্ষা কোরো। আমার বিশ্বাস, এতে কাজ হবে। তবু তুমি এটা খাওয়ার পর নিজেকে অমর ভেবে কোনও দুঃসাহসিক ঝুঁকি নেবে না। তবে আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, এটা খেলে অন্তত কোনও অপকার হবে না।”
“কিন্তু স্যার, আমি কেন? আপনি –” মরণাহত প্রফেসারের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল আকুল ঋত্বিক।
“আমি – বড়ো ক্লান্ত।” বলেই প্রফেসার ধীরে ধীরে চোখ বুঁজলেন। সেদিকে একবার তাকিয়ে ঋত্বিক দৌড়ে বেরিয়ে গেল ডাক্তারকে ডাকতে।
# # #
ঋত্বিক একটা ঘোরের মধ্যে পথ চলছে। তার অতি প্রিয় স্যার চলে যাচ্ছেন, তার মাথার ওপর থেকে সরে যাচ্ছে এক বটগাছের ছায়া। কিন্তু সে তা না ভেবে ভাবছে তাঁর দান, ঐ গোলাকার বস্তুটির কথা। স্যার বলেছেন তিনি নিশ্চিত নন এটা কাজ করবে কি না। কিন্তু এ ক’বছরে ঋত্বিক তাঁকে যা জেনেছে, তিনি গবেষণায় প্রায় অভ্রান্ত আর নিশ্চিত না হওয়া অবধি কোনও বিষয়ে কাউকে বলেন না। তাই সে জানে, এই ফলে কাজ হবেই।
আকস্মিকতার ধাক্কা কাটিয়ে সে যখন চিন্তা করার ক্ষমতা ফিরে পেল, তার প্রথমেই এক অদ্ভুত অনুভূতি হল। ঋত্বিক এক অতি সাধারণ ঘরের ছেলে। অনেক কষ্টে নানা ধাক্কা খেয়ে বড়ো হতে হতে চিরকাল তার মনের যে অনুভূতি সব চেয়ে প্রবল তা হচ্ছে ভয়। খিদের ভয়, অসুখের ভয়, চাকরি হারাবার ভয়, দুর্ঘটনার ভয়, সর্বোপরি অজানা কিছুর ভয়। প্রতি মুহূর্তে এই আশঙ্কাই তাকে তাড়া করে চলেছে যে এক্ষুণি একটা কিছু ঘটবে, যা তার এই অনেক কষ্টে সাজানো এক চিলতে স্বস্তি ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু এই মুহূর্তে সে অনুভব করল, সেই ভয়টা তার কেটে গেছে।
একটু ভেবেই ঋত্বিক কারণটা বুঝতে পারল। সব ভয়ের মূলে ঘুরেফিরে সেই মৃত্যুভয়। সেটা কেটে গেছে দেখে তার এখন সাধারণভাবেই ভয়ের ধারণাটা কেটে যাচ্ছে। সে পৃথিবীর সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারছে। হঠাৎ মনে হচ্ছে তার অনেক ইচ্ছেকে সে গুটিয়ে রেখেছিল শুধু এই ভয়ের দাপটের সামনে, যা এখন প্রাণভরে মিটিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে।
ঋত্বিক অতি সাধারণ ঘরের ছেলে। বলতে গেলে তার তিনকুলে কেউ নেই। একটু বড়ো হওয়ার পর থেকেই সে নিজের লড়াই নিজে করে এসেছে। চেহারা অতি সাধারণ, আর্থিক পরিস্থিতিও কখনও দু’কুল ছাপানো হয়নি। সব মিলিয়ে, তার জীবনে কখনও কোনও নারীর ছায়া পড়েনি। বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে, এমন আত্মীয় বা হিতৈষী বন্ধুও নেই।
তা বলে যে তার কখনও নারীসঙ্গের বাসনা হয়নি তা নয়। লোকমুখে শোনা নিষিদ্ধ পল্লী তাকে প্রায়ই টেনেছে। কিন্তু নানা রোগব্যাধি, বিশেষত এইচ-আই-ভি’র ভয়ে সে কুঁকড়ে গেছে। আজ সব কিছু ছাপিয়ে সে অনুভব করল সেই বেআইনি, অনৈতিকতাই তাকে দুর্নিবার আকর্ষণে টানছে। তবে কি মৃত্যুভয় কেটে যাওয়ার অর্থ পাপবোধ চলে যাওয়া?

কোনওদিন সেখানে যায়নি। তবু ঋত্বিক এত নাবালক নয় যে কোনও লালবাতি এলাকার হদিস জানে না। একটু এদিক-সেদিক ঘুরে, সলজ্জভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে শেষ অবধি সে পৌঁছেও গেল লক্ষ্যে। মাসিটি তাকে দেখেই বুঝল, বাবুটি আনকোরা। একটু ভেবেচিন্তে সে তাকে মাঝবয়েসি মালিনীর ঘরে পাঠিয়ে দিল।
মালিনীও বাবুটিকে এক ঝলকে দেখে যা বোঝার বুঝে নিল। “এস”, বলে সে ঋত্বিককে তার বিশাল বুকে টেনে নিল। ঋত্বিক সেই উন্মুক্ত বুকে মুখ রেখে কিছুক্ষণ বুঁদ হয়ে রইল। সেখানকার বিন্দু বিন্দু ঘামে কিন্তু সে খুঁজে পাচ্ছিল উদ্দাম কাম নয়, কান্নার গন্ধ। একটু পরে মুখ তুলে সে সঙ্গিনীর দিকে চেয়ে তার মুখে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, “তোমাদের খুব কষ্ট, তাই না?”
এহেন আলটপকা কেস আজকাল মালিনীদের গা সওয়া। কত এনজিও বাবু আসে জ্ঞান দিতে, ভদ্রঘরের দিদিমনিরাও মাঝে মাঝে আসে লেখাপড়া শেখাতে। তাই সে না চমকে বলল, “তা বলে কাঁদুনি গাইলে তো পেট ভরবে নি। কেন, তোমার ঘরের মাগেদের কষ্ট নেই?”
“আমার ঘরে যে কেউ নেই, মালিনী। আমি বড়ো একা।”
“আহা রে, তোমার বুঝি আদর করার কেউ নেই!” ছলছল মালিনী ঋত্বিককে মাতৃস্নেহে কোলে টেনে পরম যত্নে গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। ঋত্বিকের বুক ঠেলে উছলে উঠতে চাইল এক হারিয়ে যাওয়া কান্না। একটু পর যখন সে আত্মস্থ হল, অবাক হয়ে দেখল তার মন অনেক শান্ত হয়ে গেছে।
মালিনী দেখেছে, এখানে এসে এমন কিছু বাবু শেষ অব্দি কামকম্মো না করেই চলে যায়। কিন্তু ঋত্বিক যখন টাকা বের করল, কী যেন ভেবে সে স্থিরদৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে বলল, “তুমি এসেছ আনন্দ পেতে। আনন্দ না দিয়ে তো আমরা টাকা নিই না।”
“কিন্তু তোমার যে কষ্ট হয়।”
“না বাবু, তোমার চোখেই লেখা আছে তুমি কাউকে কষ্ট দিতে পারো না। আমি তোমাকে সুখ দিয়ে নিজেও সুখ পাব। এস, আমায় আদর করবে।” মালিনী এরপর মা থেকে পরিপূর্ণা প্রেয়সী হয়ে উঠল।
“আবার এসো।” সবশেষে কাতর চোখে অনুনয় জানাল মালিনী। ঘাড় নেড়ে বেরিয়ে এল ঋত্বিক, আচ্ছন্ন অবস্থায় রাস্তায় পা দিল। হঠাৎ অনুভব করল, দুটি ইচ্ছুক অন্তরাত্মা এক হলে কীভাবে দুঃখের সমুদ্র মথিত হয়ে অমৃত উঠে আসে।

একটু রাত হয়ে গেছে। শহরতলির যে এলাকায় ঋত্বিক ভাড়া থাকে, সেটা মোটামুটি ভদ্রপাড়া। কিন্তু সেখানে পৌঁছনোর রাস্তাঘাট তেমন সুবিধের নয়। নোংরা বস্তি, তার মধ্যে এখানে সেখানে লুম্পেনদের আড্ডা। বিশেষ করে রাত বাড়লে জায়গাগুলি ভদ্রজনের চলাচলের উপযুক্ত থাকে না। দেরি হলে বাসায় পৌঁছনোর জন্য ঋত্বিক অনেক ভেবেচিন্তে একটা নিরাপদ রুট বের করেছে যাতে অনেকটাই বেশি হাঁটতে হয়, একটা পচা নালাও লাফ দিয়ে ডিঙোতে হয়। তবু সে এটুকু বাড়তি কষ্ট মেনে নেয় স্বস্তির স্বার্থে।
আজ কিন্তু হঠাৎ তার বস্তির মধ্য দিয়ে শর্ট-কাট করে বাড়ি ফেরার ইচ্ছে হল। রাতে এ পথে কোনওদিন পা বাড়ায়নি। জায়গাটা যে এত রাতেও এত কর্মচঞ্চল আর শব্দমুখর, সে ভাবতে পারেনি। একদিকে কিছু কিশোর সিনেমার নায়িকা ও ক্রিকেটের নায়কদের নিয়ে খিস্তি-খেউড় সহযোগে উত্তেজিত তর্ক করছে, মাঝে মাঝে বন্ধুত্বপূর্ণ হাতও চলছে। একটি শিশু তারস্বরে চ্যাঁচাচ্ছে, এক ক্লান্ত, অকালে বুড়িয়ে যাওয়া মহিলা এসে তাকে দুটো থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে টানতে টানতে ঘরে নিয়ে গেল। একটা খুপরির বাইরে বসে এক সিড়িঙ্গে মারা লোক তুরীয়ানন্দে মিটিমিটি হাসছে। কোথায় যেন ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছে জড়িত স্বরের তর্জন-গর্জন আর তার সাথে এক নারীকণ্ঠের রুটিনমাফিক প্রতিবাদের ইনুনি-বিনুনি।
কিন্তু এহ বাহ্য – এরপর রয়েছে ট্যারা পঞ্চুর ঠেক। ওখানে রামুদার চায়ের দোকান ঘিরে বসে ওরা জনা দশেক যুবক একটু রাতের দিকে আড্ডা জমায়। ওদের নেশা অবশ্য চায়ের নয়। একটু পরই তাই আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে দিশি-বিলিতির বোতল-পাউচ, তাই ঘিরে ওদের রসালো হুল্লোড় চলে। ওরা লোক যে সুবিধের, সেটা কেউ বলে না। অনেক বেআইনি কাজের সাথেই ওদের যোগ। তবে সাধারণত পাড়ার লোকজনদের ওরা ঘাঁটায় না। তবু লোকে অন্তত রাতবিরেতে ওদের এড়িয়ে চলে। নেশা বেশি চড়ে গেলে কী মুডে থাকে বলা যায় না।
তবু ঋত্বিক আজ বীরদর্পে সেদিকেই এগিয়ে গেল আর ঠেকের একটা খালি বেঞ্চির একপাশে বসে বলল, “রামুদা, একটা চা।”
পঞ্চু কিন্তু ঋত্বিককে দেখেই সসম্ভ্রমে উঠে দাঁড়িয়েছে। বলল, “দাদা যে হঠাৎ এদিকে?”
ক্লান্ত হেসে ঋত্বিক বলল, “কাজের চাপে দেরি হয়ে গেল, একটু টায়ার্ডও লাগছে। তাই ভাবলাম এক কাপ চা খেয়ে ঘরে ঢুকি।”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ – রামুদা, দাদাকে দুটো বিস্কুটও দিও, ঐ তোমার এস্পেশালটা।”
“তারপর পঞ্চু, তোমার কেমন চলছে?” চায়ে চুমুক দিতে দিতে ঋত্বিক জিগ্যেস করল।
“ভালোই। তবে কী বলে, আপনি তো সবই জানেন – আজ সব ঠিক আছে, কালই হয়তো ভেতরে গিয়ে উদোম ক্যালানি খাব নয় অ্যান্টি পার্টির চাকু খেয়ে ড্রেনের ধারে পড়ে থাকব।”
“তোমার ইচ্ছে করে না এসব ধান্দা ছেড়ে নিরাপদ জীবনে ফিরে আসতে?”
“করে কি আর না! মাঝে মাঝে দাদা আপনাকে দেখে হিংসে হয় – যদি অমন নিশ্চিন্ত দশটা-পাঁচটা চাকরি করতে পারতাম!”
“করবে?”
পঞ্চু একটু উদাস হয়ে গেল। তারপর বলল, “না, আর হবে না। ছোটোবেলায় বাপ লেখাপড়া শেখায়নি, সোজা কামধান্দায় ঢুকিয়ে দিল। এখন ওসব বাঁধা কাজের মেজাজই আর আসবে না। খরচের হাতও তৈরি হয়ে গেছে। তার ওপর এই চেলাগুলি আছে, ওদেরই বা ছাড়ি কী করে! না দাদা – পঞ্চুদের জীবন এভাবে, মিত্যুও তাই।”
“তাহলে অন্তত এটা তো ছাড়তে পারো?” পঞ্চুর হাতের গেলাসটার দিকে দেখিয়ে বলল ঋত্বিক, “গুলি-ছোরার সাথে সাথে তোমার ভেতরে তো তুমি আর এক শত্রুকেও তিলে তিলে তৈরি করছ – লিভার ক্যান্সার। তার ওপর তো আছেই বিষমদের ভয়।”
“কী করে ছাড়ি, বলুন দাদা?” করুণ চোখে বলল পঞ্চু, “এটাই তো আমাদের দুক্‌খু আর ভয় ডোবাবার একমাত্তর অস্তর।”
“ডোবে?”
পঞ্চু একটু অনিশ্চিতভাবে তাকাল। ঋত্বিক পঞ্চুর হাতের আধভর্তি গেলাসটা দেখিয়ে বলল, “দেখছ তো, বরফকুচিটা ভেসে আছে?”
“হ্যাঁ।”
“এবার ঐ গ্লাসে আর একটু মাল ঢালো – হ্যাঁ, আরও একটু – কী, বরফকুচিটা ডুবল?”
“না দাদা, ভেসেই উঠছে।”
“তেমন তোমার দুঃখগুলিও যতই মাল খাও, ডুববে না। আরও ভেসে উঠবে।”
চলে আসার আগে ঋত্বিক শুনল পঞ্চু সাকরেদদের ফিসফিসিয়ে বলছে, “দাদা আজ একটা বড়ো জ্ঞানের কথা বলে গেল – মালেতে দুক্‌খুগুলি ডোবে না, ভেসে ওঠে।”

অঘোরে ঘুমোচ্ছিল ঋত্বিক। জানালা দিয়ে রোদ চোখে পড়তে ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। ওঃ, বড্ড দেরি হয়ে গেছে। চটপট নার্সিং হোমে ফোন করল। বাঃ, স্যারের মেয়ে কাল লন্ডন থেকে এসে গেছে আর এসেই নার্সিং হোমে বাবার দেখাশোনা শুরু করেছে। তাহলে অন্তত আজ ঋত্বিকের ওদিকে না গেলেও চলবে। একটু ভেবে সে ঠিক করল, আজ কাজেও যাবে না। সুরজিৎদাকে ফোনে জানিয়ে দিলেই হবে।
বিছানায় বসে বসে ঋত্বিক কালকের সন্ধের কথা ভাবছিল। সত্যি, একদিনে যেন তার জীবনটা কত বদলে গেছে। কাল ঝটকায় যেন নেশার ঘোরে কতগুলো ছেলেমানুষি অ্যাডভেঞ্চার করে ফেলেছে। আজ দিনের আলোয় মাথা ঠাণ্ডা করে নিজেকে সংহত করতে হবে, যাতে অমন আনসান কেস আর না ঘটিয়ে ফেলে।
তবে তার আগে আর একটা আশ তাকে মিটিয়ে নিতে হবে। আর একটা জায়গায় সে যাবে – যেখান থেকে বলতে গেলে বেত্রাহত কুকুরের মতো পালিয়ে এসেছিল, আর কোনওদিন ফিরে যাওয়ার সাহস পায়নি। আজ সেখানে গিয়ে একবার বুক ফুলিয়ে দাঁড়াবে। তাহলে তার সুপ্ত ইচ্ছেগুলি এখনকার মতো মিটবে। চটপট তৈরি হয়ে ঋত্বিক শেয়ালদা স্টেশনের বাসে চড়ল। সেখান থেকে বারুইপুরের ট্রেন ধরবে।
ট্রেনে বসে ঋত্বিকের মনে সিনেমার দৃশ্যের মতো দ্রুত ছুটে চলেছিল তার স্কুলবেলার স্মৃতি। বাবা মারা যাওয়ার পর মা তাকে পাঠিয়ে দিয়েছিল এই বারুইপুরের কাছে মামাবাড়িতে। জায়গাটা তখন আধা গ্রাম। স্কুলে ও পাড়ায় তার কিছু বন্ধু হয়েছিল। হয়েছিল কিছু বান্ধবীও, যদিও সেই বয়েসে সেই যুগে তাদের ‘গার্ল ফ্রেন্ড’ হিসেবে দেখার চল ছিল না। তাদের একজন ছিল কয়লা গোলার মালিক গোবিন্দ লাহার মেয়ে চুমকি। প্রায়ই তারা একান্তে বসে গল্প করত। সে গল্পে অবশ্য ভালোবাসা বা কামের নামগন্ধ ছিল না। আসলে তারা দুজনেই ছিল দুখি। তাই পরস্পরের কাছে নিজেদের দুঃখের কথা উজার করে দিয়ে তারা একটু শান্তি পেত। পিতৃহীন ঋত্বিক মামাবাড়িতে অবহেলায় মানুষ হতো। আর ভাই হওয়ার পর থেকে স্রেফ মেয়ে হওয়ার অপরাধে চুমকিকে তার বাবা-মা কারণে-অকারণে বেধড়ক ঠ্যাঙাত। একদিন চুমকি ছোটো ভাইকে শাসন করে দু-চার ঘা দেওয়ার সময় মা’র কাছে ধরা পড়ে গিয়েছিল। ক্রোধোন্মত্ত মহিলা তার পিঠে চ্যালাকাঠের ঘা দিয়ে গায়ের ঝাল মিটিয়েছিল।
পিঠের টাটকা ক্ষতটা খুলে দেখিয়ে অঝোরে কাঁদছিল চুমকি আর তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল ঋত্বিক। কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটা ঋত্বিককে জড়িয়ে ধরেছিল। ওর তখনও বুক ওঠেনি, তাদের মনে কোনও কুভাবও ছিল না। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সেখান দিয়ে তখন যাচ্ছিল গোবিন্দ লাহার ম্যানেজার শ্রীপদ মুন্সি। সুতরাং কথাটা গেল গোবিন্দর কানে, তারপর জানল পাড়া-পড়শিরা। চুমকিও ভয়ে ভয়ে নির্লজ্জের মতো ঋত্বিকের ঘাড়েই সব দোষ চাপাল।
সবদিকেই ‘গুড বয়’ ঋত্বিককে মামারা ভালোভাবেই চিনতেন। কিন্তু তাঁরা ছিলেন ছাপোষা মানুষ আর গোবিন্দ লাহা এলাকার মাতব্বর। তাই পঞ্চাশ ঘা জুতো খেয়ে ঋত্বিকের রাতারাতি এলাকা ছাড়ার বিধানে মামারা প্রতিবাদ জানাননি। তারপর ভাসতে ভাসতে ঠোক্কর খেতে খেতে স্রেফ নিজের প্রতিভার জোরে ঋত্বিক যে আজ কীভাবে জীবনে দাঁড়াতে পেরেছে তা শুধু সে-ই জানে!
মামারা কেউ মৃত, কেউ ছেলেদের সাথে বাইরে। তাঁদের আদি বাড়িতে যারা আছে তাদের সাথে ঋত্বিকের তেমন পরিচয় নেই। কিন্তু আজ সে গিয়ে একবার গোবিন্দ লাহার মুখোমুখি দাঁড়াবে আর জিগ্যেস করবে, “দেখুন তো, আমাকে চিনতে পারছেন?”

স্টেশনে পৌঁছে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের পুরনো পাড়ায় পৌঁছতে ঋত্বিক বিশেষ বেগ পেল না। কিন্তু সেখানে গিয়ে গোবিন্দ লাহার গোলা খুঁজে পেল না, কেউ হদিসও দিতে পারল না। কুড়ি বছরের ওপর কেটে গেছে। সেই আধা গ্রাম আর নেই, বারুইপুর উপকণ্ঠ এখন রীতিমতো ঝাঁ-চকচক শহর। সেখানকার অধিবাসীরাও মূলত সদ্য গড়ে ওঠা বিভিন্ন বহুতল বাড়ির নবাগত বাসিন্দা। অনেক চেষ্টাতেও সে গোবিন্দ লাহার খোঁজ পেল না।
অগত্যা উদ্দেশ্য পূর্ণ না করেই ফিরে আসা। আসার সময় শেয়ার অটো নিয়েছিল, এবার ঠিক করল হেঁটে ফিরবে। হাজার হলেও এই জায়গাটার সাথে তার নানা স্মৃতি জড়িয়ে আছে। যদি কোনও চিহ্ন চোখে পড়ে!
বড়ো রাস্তা ধরেই ঋত্বিক হাঁটছে। হঠাৎ এক উত্তেজিত কোলাহল শুনে সে ফিরে তাকাল। এক বৃদ্ধ প্রায় অন্ধের মতো পথ হাতড়াতে হাতড়াতে রাস্তা পার হচ্ছেন। কিন্তু তিনি খেয়াল করেননি একটা ট্রাক উন্মত্তের মতো তাঁর দিকে ছুটে আসছে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মানুষেরা “গেল, গেল” করছে, কিন্তু এগিয়ে আসতে সাহস পাচ্ছে না। ট্রাকটা প্রায় এসে গেছে, সবাই চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। এমন সময় ঋত্বিক অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে ছুটে রাস্তায় নেমে প্রবল ধাক্কায় বৃদ্ধকে একপাশে ঠেলে দিল। কিন্তু সেই ধাক্কার তাড়নায় নিজে পা পিছলে ট্রাকটার সামনে পড়ে গেল।
রাস্তার লোক “হায়, হায়” করে উঠল। কিন্তু সেই মুহূর্তে ঋত্বিক এক অদম্য প্রেরণায় গড়িয়ে রাস্তার পাশে সরে এল। প্রায় সাথে সাথেই ট্রাকটার সামনের চাকা বলতে গেলে তার কান ঘেঁষে বেরিয়ে গেল আর তারপর সে দেখতে পেল অবশেষে ট্রাকটা ইমার্জেন্সি ব্রেক কষে থেমে দাঁড়িয়েছে।
লোকজন ছুটে এসে ঋত্বিককে টেনে তুলছে, “আপনার চোট লাগেনি তো?”
“না না। কিন্তু আপনারা আগে ওনাকে দেখুন।”
বৃদ্ধ হতভম্ব ভাব কাটিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। ধীরে ধীরে তিনি ঋত্বিকের দিকে এগিয়ে এলেন। তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “এমনটা করে না বাবা, এমনটা করে না। আমি বুড়ো মানুষ, তিন কাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে। আমি গেলে পৃথিবীর কারও কোনও ক্ষতি হবে না। তুমি জোয়ান মানুষ, জীবনটা পড়ে আছে। সেটাকে অকারণে ছুঁড়ে ফেলে দিও না।”
“কিন্তু আপনি এভাবে হাঁটছিলেন কেন? দেখেননি যে গাড়িটা আসছে?”
“বুঝতে পারিনি। চোখে তো ভালো দেখি না, ছানি পড়েছে।”
“কাটাননি কেন? আপনার কেউ নেই?”
“সবই ছিল। কিন্তু আজ আমি প্রায় নিঃস্ব। ব্যবসা ছিল, বাড়ি ছিল। বৌ মারা গেল। ছেলে মানুষ হল না, বদ খেয়ালে সব নয়ছয় করল। এখন কোথায় গাঁজাগুলি খেয়ে পড়ে থাকে, বাপকে দেখবার ইচ্ছে বা সামর্থ্য কোনওটাই তার নেই। এই তো আজ ব্যাঙ্কে টাকা তুলতে এসেছিলাম, তা এই ব্যাপার!”
“আপনার একই ছেলে?”
“হ্যাঁ। একটা মেয়েও আছে। তবে তার লেখাপড়া, বিয়ে কোনওটারই তো তেমন চেষ্টা করতে পারিনি। তাই সে এক টিউশন মাস্টারের সাথে পালিয়ে বিয়ে করল। তারা খুব গরিব, কষ্টেসৃষ্টে চলে। তবু সে-ই যেটুকু করার করে। কিন্তু তার আর কতটা সামর্থ্য? তা বাবা চোখে ভাল দেখি না, তুমি কে? তুমি কি এ পাড়ার ছেলে?”
“না কাকু, আমি কলকাতা থেকে এসেছিলাম অফিসের কাজে। কাজ শেষ হয়েছে, এবার ফিরে যাব। আর নাম বললেও আপনি আমাকে চিনবেন না। তা, আপনার কী নাম?”
“গোবিন্দ লাহা। এককালে গোবিন্দ লাহার কয়লার গোলা সবাই এক ডাকে চিনত, আর আজ –” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভদ্রলোক বললেন, “কিন্তু নাম জেনে তুমি কী করবে?”
এই তাহলে সেই গোবিন্দ লাহা – তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই অকালে বুড়িয়ে যাওয়া আর ফুরিয়ে যাওয়া মানুষটা! কিন্তু এই অসহায় লোকটাকে পুরনো দিনের কথাটা মনে করিয়ে খোঁচা দিতে ঋত্বিকের যে এখন একটুও ইচ্ছে করছে না। বরং তার মন লোকটার ও বাল্যসঙ্গী চুমকির প্রতি সহানুভূতিতে ভরে উঠছে। সে বলল, “কাকু, এবার আপনার ফোন নম্বরটাও বলুন। আমার চেনা কয়েকজন ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মী আছে, যারা মাঝে মাঝে খুব সস্তায় ছানি অপারেশনের ক্যাম্প করে। তারাই আপনার সাথে যোগাযোগ করে নেবে।”
“দীর্ঘজীবি হও, বাবা!” ফোন নম্বর বলে গোবিন্দ ঋত্বিককে আশীর্বাদ করে ঠুক ঠুক করে ব্যাঙ্কের পথ ধরল।

“কাকু, এই জিনিসটা কি আপনার? বোধহয় পকেট থেকে পড়ে গিয়েছিল।”
ঋত্বিক দেখে, এক কিশোর বালক হাঁফাতে হাঁফাতে ছুটে এসেছে। তার হাতে একটা গোলমতো জিনিস। কিছুক্ষণ সেইদিকে তাকিয়ে থাকার পর ঋত্বিকের চোখেমুখে ফুটে উঠল এক আশ্চর্য পুলক। কাল বিকেল থেকে উত্তেজনার রথে চড়ে সে অনেক কিছু করেছে, কিন্তু স্যারের দেওয়া ফলটাই খেতে ভুলে গেছে! সেটা যেমন-তেমন পকেটেই রয়ে গেছে!
কিন্তু তার কি আর দরকার আছে? এই স্বল্প সময়ে তার অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। একদিনে সে যা শিখেছে তা শিখতে অনেকের গোটা জীবন লাগে। সে জেনেছে, মানুষ বড়ো দুখি। তবু দুঃখের সাগর মন্থন করেই সে খুঁজে চলে টুকরো টুকরো সুখ। আর এই অমৃতের সন্ধানে তাদের সামিল হতে গৌতম বুদ্ধ হওয়ার দরকার নেই, ইচ্ছে করলে সেও পারে।
“ধন্যবাদ ভাই, ওটা আমার। তবে তেমন দরকারি নয়। তুমি নেবে?”
ছেলেটির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। হাত পেতে ফলটা নিয়ে সে এক দৌড়ে আবার তার দঙ্গলে মিশে গেল। আর ঋত্বিক প্রশান্ত মনে স্টেশনের পথে পা বাড়াল।

ফেসবুক মন্তব্য