আজ যা আশা করতে ইচ্ছে করে

অর্ঘ্য দত্ত


এই নববর্ষ সংখ্যাটি নিয়ে এ'পর্যন্ত বম্বেDuck -এর পাঁচটি সংখ্যা প্রকাশিত হল। হঠাৎ মনে হল আমি তো এখনো পর্যন্ত কোনো সংখ্যাতেই আমার নিজের লেখা একটাও কবিতা রাখি নি! কেন রাখিনি? 'দেখো আমি কত মহান, নিজের সম্পাদনা করা পত্রিকায় নিজের কবিতাই ছাপি না'-- শুধু এটা দেখানোর তাগিদে? না। অন্তত নিজে তো জানি যে ঠিক সে কারণে নয়। তেমন উদ্দেশ্য থাকলে তো নিজের লেখা গল্পও কখনো রাখতাম না। অথচ গত এই ক'মাসে আমার বেশ কিছু কবিতা অন্য পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। অর্থাত্ কম হলেও কবিতা আমি লিখেছি এবং সেগুলো বম্বেDuck-এর জন্য না রেখে পাঠিয়েছি অন্য পত্রিকার সম্পাদকের কাছে। কেন? আর এই 'কেন'-র উত্তর খুঁজতে গিয়েই বুঝতে পারলাম আমার নিজের ভেতরেই কবিতা নিয়ে ইদানীং কিছু ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। কিছু অস্পষ্টতা। ভালো কবিতা বলতে ঠিক কী বুঝব তা নিয়ে কিছু অনির্দিষ্টতা। আগে শুধু কবিতাই পড়তাম বেশি, এবং কবিতা পড়েই নিজের মতো করে চিনে নেওয়ার চেষ্টা করতাম কবিতার ভাল-মন্দ। আজকাল কবিতার ভালো কী, মন্দ কী নিয়ে এত মানুষ এত কথা বলছে, যে সে সব পড়ে কবিতা সম্বন্ধে নিজের ভিতরে বিস্তর ধন্দ তৈরি হয়েছে এবং নিজের লেখা আদৌ কবিতা হয়েছে কিনা এখন আর বুঝতেই পারি না। তাই অন্য কোনো সম্পাদক তাদের পত্রিকায় আমার কোনো লেখা ছাপার যোগ্য মনে করলে ভরসা পাই। তবে, শুধু নিজের লেখা-লেখির জন্যই নয়, পত্রিকা সম্পাদনার জন্যেও নিজের ভেতরের এই ধন্দ আমাকে দ্রুত কাটিয়ে ফেলতে হবে। কারণ এই ধন্দ, এই ধোঁয়াশা প্রায়শই কবিতা সম্বন্ধে স্বান্বেষণ সম্ভূত নয়।
সারা পৃথিবীর সমস্ত ঈশ্বরবিশ্বাসী ভক্তরা যেমন ধর্ম নির্বিশেষে ঈশ্বরের কোনো একটি সংজ্ঞা মেনে নিতে পারে না, কবিতার ক্ষেত্রেও যেন ঠিক তাই। আর কবিতার সেই নির্দিষ্ট সংজ্ঞাহীনতার জন্যই বোধহয় আন্তর্জালে কবিতাচর্চার এই নতুন ও ছোট্ট পরিসরেও খুঁজে পাই তীব্র মতভেদ, দ্বন্দ্ব, সহনশীলতার অভাব, হিংসা এবং তীক্ষ্ণ মৌলবাদ। এক ধর্মাবলম্বী বা গোষ্ঠীর আরাধ্য ঈশ্বর যেমন সর্বদা অন্যের কাছে প্রিয় বা পূজ্য নয় বরং প্রায়শই হেয় এবং উপহাসের পাত্র, কবিতার ক্ষেত্রেও তো আজকাল তাই দেখছি। ধর্মের ক্ষেত্রে যেমন মৌলবাদী নাটের গুরুরা নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক করে রাখার তাগিদে আজকাল সাধারণ মানুষের ঈশ্বর ও ধর্ম সম্বন্ধে ধারণাটিই গুলিয়ে দিতে উঠে পড়ে লেগেছে, ঠিক তেমনি ভাবেই কি সাধারণ পাঠক এবং নতুন লিখতে আসা কবিদের কবিতা সম্বন্ধে ধারণাটিকেও গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে না?
আজ এলাকা দখলে ধুন্ধুমার লাগানো দুই দল মাফিয়ার মতোই যখন কবিদেরও দেখি ডিগ্রি তুলে, জাত তুলে, কে কোথায় থাকে তাই তুলে, এমনকি মস্তকের কেশ-বিরলতা নিয়েও পরষ্পরকে প্রকাশ্যে গালিগালাজ করতে, চমকে উঠি। ব্যথিত হই। কবিরা তো শিল্পী। তাদের কি আরো একটু সংবেদী, আরো একটু উদার এবং সহনশীল হওয়ার কথা ছিল না?

আশা করতে ইচ্ছে করে নতুন বছরে জীবনের সমস্ত পরিসরে মানুষ আরো সহিষ্ণুতার পরিচয় দেবে। মান্যতা দেবে ধর্ম এবং কবিতা, সেও তো আমাদের মতে বহু মানুষের কাছে ধর্মই, এই দুয়েরই বিভিন্নতাকে।

বম্বেDuck-এর প্রতিটি সংখ্যা নির্ধারিত সময়ে প্রকাশ করার পেছনে প্রতিবার সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়ের অক্লান্ত পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করে থাকি, বলাইবাহুল্য এবারেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি।
একমাত্র আমার এই লেখাটির অলংকরণ, যেটি করে দিয়েছেন বন্ধু ও পেশাদার চিত্রশিল্পী অরিন্দম চক্রবর্তী এবং রম্যরচনার অলংকরণে বন্ধু স্বাতী বাউরার নিজের হাতে করা তিনটি আলপনা ছাড়া এই সংখ্যার প্রচ্ছদ, পঁচিশটি বাংলা মৌলিক কবিতা এবং চারটি গল্পের অলংকরণ সযত্নে করে দিয়েছেন কবিবন্ধু অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়। বম্বেDuck-এর প্রতি কতটা ভালোবাসা থাকলে, শিল্প-সাহিত্যের প্রতি কী নিবিড় অনুরাগ থাকলে ওর মতো একজন ইঞ্জিনীয়ার সমস্ত পেশাগত ব্যস্ততা সত্ত্বেও এত দ্রুত তিরিশটা ছবি এঁকে দিতে পারে ভাবলেই যেমন অবাক হই তেমনি ওর মতো মানুষকে পাশে পেয়েছি বলে গর্বিত হই, প্রত্যয়ী ও নিশ্চিন্ত হই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস লেখার সঙ্গে সঙ্গে অরিন্দমের করা অলংকরণগুলিও এই সংখ্যার এক অনন্য সম্পদ।
এছাড়াও দিনদিন বাড়ছে বম্বেDuck-এর শুভানুধ্যায়ীর সংখ্যা, লেখা পাঠাচ্ছেন অনেক অপরিচিত কবি-লেখক এবং সবাইকে নিয়ে, সবাই মিলে আমাদের সাহিত্য যাপন ও যাত্রা হয়ে উঠছে সুললিত এবং সহজতর।

বম্বেDuck-এর সমস্ত পাঠক এবং কবি-লেখক বন্ধুদের জানাই শুভ নববর্ষের প্রীতি ও শুভেচ্ছা। সবাই ভাল থাকুন, ভালোবাসায় থাকুন।

অলংকরণঃ অরিন্দম চক্রবর্তী

ফেসবুক মন্তব্য